১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন। প্রতিটি দিন, মাস, বছর কেটেছে দেশে ফেরার আকুতি নিয়ে। প্রতিটি কর্মঘণ্টা কাটিয়েছেন দল আর নেতাকর্মীদের সঙ্গে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন, দল পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন নিরলসভাবে। সেই আন্দোলনের রক্তাক্ত যবনিকার মাধ্যমে সুযোগ আসে দেশে ফেরার। ২৫শে ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন দেশের মাটিতে পা রাখেন সে এক নতুন ইতিহাস। লাখ লাখ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হন। দেশের ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরার পর এমন সংবর্ধনা অতীতে আর হয়নি। দেশে ফেরার ৫ দিনের মাথায় মমতাময়ী মা দেশের গণতন্ত্রের বাতিঘর বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বড় আঘাত। এরপরই কাঁধে আসে দলের পুরো দায়িত্বভার। দেশে ফেরার প্রায় দেড় মাসের মাথায় একটি জাতীয় নির্বাচন। পুরো দলের দায়িত্ব মাথায় নিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নির্ঘুম ছুটে চলা। সকাল থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত একের পর এক জনসভায় দৃপ্ত কণ্ঠে বক্তৃতা। দলীয় প্রধানের নিরলস এই প্রচারণায় জোয়ার উঠে পুরো দেশে। ফল ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস জয়। বিএনপি একাই ২০৯টি আসনে জয়লাভ করেছে। জোটগত আসন ২১২। নিরঙ্কুশ এই জয়ে সরকার গঠন। নির্বাসন থেকে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছা তারেক রহমানের ওপর এখন পুরো দেশের দায়িত্ব। ইতিহাসের বাঁক বদলে দেশের নেতৃত্ব নেয়া তারেক রহমান এখন নতুন এক সম্ভাবনার বাতিঘর। তার প্রেরণায় প্রয়াত বাবা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সৎ ও সাহসী, দেশপ্রেমের সঞ্জীবনী শক্তি। প্রয়াত মা বেগম খালেদা জিয়ার ন্যায় ও আপসহীন চরিত্রের অনন্য উদাহরণ। চোখের সামনে বাবা-মায়ের দু’টি বিরল জানাজার ছবি। যা শুধু এই ভূখণ্ডই নয় তামাম পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসের উজ্জ্বল নজির।
২৫শে ডিসেম্বর নেতাকর্মী ও দেশবাসীর উষ্ণ সংবর্ধনা নিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করা তারেক রহমান মার্টিন লুথার কিং-এর বিখ্যাত উক্তি উচ্চারণ করে বলেছিলেন ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বা ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’। ১৭ বছরের বিড়ম্বিত জীবন কাটিয়ে যে পরিকল্পনা নিয়ে তারেক রহমান দেশে ফেরেন তা বাস্তবায়নের কঠিন দায়িত্ব পালনের জনরায় এসেছে তার প্রতি। কঠিন হলেও সেই দায়িত্ব পালনে তিনি যে নির্দ্বিধা, অকুতোভয় তা ইতিমধ্যে জানান দিয়েছেন বক্তৃতা-বিবৃতিতে। ভূমিধস বিজয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে অতি সংক্ষেপে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন তিনি কি করতে চান, দেশের জন্য বিএনপি কী করতে চায়। জনপ্রত্যাশার বিপরীতে তিনি ও তার দলের অবস্থান কেমন হবে তারও একটি পূর্বাভাস মিলেছে ওই সংবাদ সম্মেলনে। এই জয় দেশ ও দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের উল্লেখ করে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার বার্তা দিয়েছেন দেশবাসীকে। দলের নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল আচরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। অনৈতিক, বেআইনি কাজ বরদাশত করা হবে না- এমন হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছেন। বলেছেন, দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ মেনে নেয়া হবে না।
সরকার এবং বিরোধী দল যে যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে অবশ্যই দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে এমন কথাও বলেছেন। দেশ গঠনে নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রতিটি রাজনৈতিক দলের চিন্তাভাবনাও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এই বার্তা দিয়ে অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের দরদী আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি। পথ এবং মত ভিন্নতা থাকলেও দেশের স্বার্থে সবাই এক- এমন কথাও বলেছেন তিনি।
৩১ দফা অঙ্গীকার, জুলাই সনদসহ জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তারেক রহমান।
দেশে গণতন্ত্রকামী জনগণকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের মতোই যে যার অবস্থান থেকে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বিদেশ নীতির বিষয়েও তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। বলেছেন, বাংলাদেশের স্বার্থ, বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ আমাদের কাছে প্রথম। বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষের স্বার্থ ঠিক রেখেই তার সরকার বিদেশনীতি নির্ধারণ করবে।
বড় বিজয়ের পর চমক দিয়েই শুরু করেছেন রাষ্ট্রনায়কের প্রাথমিক অধ্যায়। প্রায় ২০ বছর পর দলের জয় উদ্যাপনে নিয়েছেন সতর্ক পদক্ষেপ। বিজয় মিছিল, শোভাযাত্রা করতে বারণ করেছেন নেতাকর্মীদের। শুক্রবার মসজিদে মসজিদে দোয়ার মাধ্যমে উদ্যাপন করা হয়েছে বিজয়।
ভোটের মাঠের প্রতিপক্ষ জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপি প্রধান নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই বিরল উদাহরণ তারেক রহমানই তৈরি করলেন। এটি অতীতের জরাজীর্ণ সংকীর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে দিতে তার দৃঢ় সংকল্পই প্রমাণ করে।
রাজনীতির ময়দানে সৌহার্দ্যের বার্তা নিয়ে হাজির হওয়া তারেক রহমান ও তার পরিবার কতোটা রাজনৈতিক নিষ্পেষণের শিকার হয়েছে তা দেশবাসীর অজানা নয়। চরম বৈরী পরিস্থিতিতে পরে নির্যাতনের শিকার হয়ে তারেক রহমানকে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়তে হয়েছিল। অমানবিক পরিস্থিতিতে পড়ে মারা যান তার ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে জোর করে উচ্ছেদ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি চরম জিঘাংসা চরিতার্থ করেছিল ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকার। এরপর মিথ্যা সাজানো মামলায় জড়িয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে নির্জন কারাগারে আটকে রেখে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয় অনেকটা বিনা চিকিৎসায়। জিয়া পরিবারের প্রতি জিঘাংসা থেকেই তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা ও সাজা দিয়ে তাকে রাজনীতি থেকে বাইরে রাখার সব কৌশলই প্রয়োগ করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। দেশের চিকিৎসা ও শিক্ষায় সর্বোচ্চ মেধার রেকর্ড করা তারেক রহমান পত্নী জুবাইদা রহমানও বাদ যাননি সরকারি রোষানল থেকে। সরকারের নানা নিপীড়নমূলক আচরণে তিনিও চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। শুধু কি জিয়া পরিবার? ক্ষমতা ধরে রাখতে গুম, খুন আর নির্যাতনের কৌশল নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি যে নির্দয় আচরণ করেছে তার বড় শিকার ছিল পুরো বিএনপি। দলটির শত শত নেতাকর্মীকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে, গুম করা হয়েছে। হাজার হাজার নেতাকর্মীকে জেলে ভরে রাখা হয় সাজানো মামলায়। চরম এই বৈরী পরিস্থিতিতেও তারেক রহমান পিছপা হননি। লন্ডনে বসে দিন-রাত নির্দেশনা দিয়েছেন দলের নেতাকর্মীদের। সাহস আর শক্তি যুগিয়েছেন। কেন্দ্র থেকে ওয়ার্ড, সব স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। গুম, খুন, নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। দায়িত্ব নিয়েছেন। তার এই সাহসী এবং দৃঢ় অবস্থানের কারণে নির্যাতিত হলেও ভেঙে পড়েননি দলের নেতাকর্মীরা। সাহস নিয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন গণতন্ত্র উদ্ধারের লড়াইয়ে। ১৬ বছর ধরে চলা যে লড়াই ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত অধ্যায়ের মধ্যদিয়ে শেষ হয়।
রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে তরুণ বয়স থেকেই তারেক রহমানের রাজনীতির মাঠে হাঁটাচলা শুরু। তরুণ বয়সেই ছড়িয়েছেন সম্ভাবনার দ্যুতি। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা তাকে ১৭ বছর সরাসরি রাজনীতির ময়দানে উপস্থিত থাকতে দেয়নি।
সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন তরুণ তারেক রহমান। ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলা বিএনপি’র গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সদস্য হিসেবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যুক্ত হন। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময় তিনি রাজনীতি তিনি পুরোমাত্রায় সক্রিয় হন। বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনী প্রচারে তিনি ছিলেন সার্বক্ষণিক সঙ্গী। এ ছাড়া সেই সময় খালেদা জিয়া যে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করেছিলেন তারেক রহমান সেগুলোর তদারকির মধ্যেও ছিলেন।
২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০০২ সালের ২২শে জুন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হওয়ার পর থেকে তিনি চষে বেড়ান সারা দেশে। তৃণমূলে প্রতিনিধি সম্মেলন করে দলে নব জাগরণ তৈরি করেন। মাঝে এক/ এগারোর কালো অধ্যায় তারেক রহমানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ছন্দপতন ঘটায়। কিন্তু বিশ্বাসীদের জন্য সাফল্য যে সময়মতোই ধরা দেয় তার বড় প্রমাণ তিনি।
২০০৪ সালে দৈনিক মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে প্রথম টেলিভিশন সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন তারেক রহমান। চ্যানেল আইতে প্রচারিত ওই সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনার বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তারেক রহমান লাজুক হাসিতে জবাব দিয়েছিলেন উপরে হাত তুলে। ‘সেই সিদ্ধান্ত তো উপরে’। তারেক রহমানের সেই বিশ্বাস সত্য হয়ে তার সামনে হাজির হয়েছে ২২ বছর পর। তিনি এখন আরও পরিণত, প্রাজ্ঞ। কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসের ভার এখন তার উপর। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ- অভ্যুত্থানে রূপ নেয়া প্রতিবাদের ঝড়ে জীবন দেয়া হাজারো ছাত্র-জনতার স্বপ্নের বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব তার কাঁধে। ’২৪-এর অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে আওয়াজ তুলেছে তরুণ প্রজন্ম তার গুরুভার সামলানোর দায়িত্বও তার ওপর। স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনীতির নানা বাঁকে জমে থাকা হিংসা, প্রতিশোধের রাজনীতির বাইরে এসে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির নতুন কিছু তৈরি করার অনন্য সুযোগও হাতছানি দিচ্ছে তার সামনে। একই পরিবার থেকে বাবা-মায়ের পর সন্তানের দেশের দায়িত্ব গ্রহণের নয়া নজিরও গড়লেন তিনি। বাবা-মায়ের বর্ণিল ও গর্বিত রাজনৈতিক জীবনের পথ ধরে, প্রেরণা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় তারেক রহমান বিরল ইতিহাসের জন্ম দেবেন- এমন প্রত্যাশায় গোটা বাংলাদেশ।