গণমাধ্যম

কতোটা মুক্ত আমাদের গণমাধ্যম?

সোহরাব হাসান | মতামত
মে ৩, ২০২৬
কতোটা মুক্ত আমাদের গণমাধ্যম?

৩রা মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসকে সামনে রেখে রিপোর্টার্স সান ফ্রন্টিয়ার্সের (আরএসএফ) বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের সূচকে দেখা যায়, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতার সূচকে আরও তিন ধাপ নিচে নেমে গেছে। ১৮০টি দেশের মধ্যে এবারে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২। গত বছর ছিল ১৪৯। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে গণমাধ্যম নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে।  বাংলাদেশের অবস্থা আরও সঙ্গিন।
এ কথা সত্য যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক গণমাধ্যম বন্ধ করে দেয়া হয়। অনেক সাংবাদিক বেকার হয়ে পড়েন। এই প্রেক্ষাপটে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশা ছিল গণমাধ্যমের ওপর খবরদারি ও হয়রানি বন্ধ হবে। সাংবাদিকরা নির্ভয়ে সত্য প্রকাশ করতে পারবেন। বাস্তবতা হলো গণমাধ্যমের ওপর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য খবরদারি এখনো চলছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের অনেক স্থায়ী সদস্যের সদস্যপদ স্থগিত করা হয়। সংবাদ সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকদের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যেই অ্যাক্রেডিয়েশন কার্ড দেয়া হয়, তাও বাতিল করা হয় পাইকারিভাবে।
আরএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৬ কোটি ৯০ লাখ জনসংখ্যার বাংলাদেশে ২০ শতাংশেরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন। এদের কাছে মূলধারার গণমাধ্যমের অভিগম্যতা কম। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১৩০ জনেরও বেশি সাংবাদিক মামলার শিকার হয়েছেন।


এদিকে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এক চিঠিতে বাংলাদেশে কারাবন্দি চার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের মুক্তি ও তাদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানালেও সরকারের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে লেখা চিঠিতে সংগঠনটি কারাবন্দি সাংবাদিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে। এই সাংবাদিকরা হলেন- ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, একাত্তর টিভি’র মোজাম্মেল, প্রধান নির্বাহী মোজাম্মেল বাবু, বার্তা সম্পাদক শাকিল আহমেদ ও বিশেষ প্রতিবেদক ফারজানা রূপা। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার হওয়া এই সাংবাদিকরা  গত ১৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন।
সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর কুনাল মজুমদার স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, এই চার সাংবাদিককে খুনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হলেও সিপিজের নথিপত্র, স্বজনদের বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা বলছে, তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি এবং কোনো অভিযোগপত্রও (চার্জশিট) দেয়া হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করার পক্ষে নানা যুক্তি দেখানো হয়েছে। তাদের দাবি, সরকার মামলা করেনি। মামলা করেছেন ভুক্তভোগীরা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে যাদের বাদী হিসেবে দেখানো হয়েছে, তারা বলেছেন, আসামিদের চেনেন না। আর আসামিদের যদি বাদী না চেনেন মামলা দিলেন কীভাবে। এসব মামলা নিয়ে বড় ধরনের বাণিজ্য হওয়ারও খবর পাওয়া গেছে।


কেবল সাংবাদিক নন, প্রায় সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা হয়েছে। ২৭শে এপ্রিল ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রায় দুই বছর পার হলেও দায়ের করা হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও অন্যান্য অপরাধের মামলার ৯০ শতাংশেরও বেশি তদন্তকাজ শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল; যার মধ্যে ৭৯৯টিই ছিল হত্যা মামলা। বাকি ১ হাজার ৫৬টি হত্যাচেষ্টা বা অন্যান্য অপরাধের কারণে দায়ের করা। পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, ১৭৬টি মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র জমা দেয়া হয়েছে, যা মোট মামলার ৯.৫ শতাংশ। ঢাকায় ৯০৫টি মামলার মধ্যে তদন্ত শেষ হয়েছে মাত্র ৪৩টি মামলার, যা শতকরা হিসাবে মাত্র ৪.৭৫ ভাগ।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, একেকটি মামলায় অসংখ্য আসামি থাকায় তদন্তকাজ শেষ করা যায়নি। তাহলে প্রশ্ন আসে অসংখ্য মানুষ মিলে কি একজন মানুষকে খুন করেছেন? ঢাকার যেই ৪৩টি মামলার তদন্তকাজ শেষ হয়েছে, তার মধ্যে ১৪টিতে অভিযোগপত্র দায়ের করা হয়েছে। আর ১৯টিতে ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। এর অর্থ তদন্তাধীন মামলার আসামিদের বড় অংশ নির্দোষ। অথচ তাদের কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে কাটাতে হয়েছে তদন্তকাজ শেষ না হওয়ার কারণে।


যেকোনো মামলার বিশ্বাসযোগ্য ও যৌক্তিক সময়ে তদন্তকাজ শেষ করতে হয়। নির্দোষ মানুষগুলোই শুধু নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন না; বিচার ব্যবস্থার ওপরও মানুষ আস্থা হারায়।
উদ্বেগের বিষয় সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের বিরুদ্ধে যেসব হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়েছে, বেশির ভাগই রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক।
আদালতের নথিপত্রে দেখা যায়, ঢাকা শহরে বিভিন্ন থানায় ২৪টি মামলায় ৭৭ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে, এদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও অবৈধ সমাবেশ করার কথা বলা হয়েছে। একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ীতে সংঘটিত হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সাংবাদিক ডেইলি স্টারকে বলেছেন, আমি এই ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানি না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনা জানতে পেরেছেন। দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে তাকে ওই মামলার ভোগান্তি বইতে হচ্ছে। তার পেশাগত জীবনও হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত।


শরীয়তপুরে কর্মরত কাজী নুরুল ইসলাম নামে  আরেক সাংবাদিককে নিউ মার্কেট এলাকার এক হত্যাচেষ্টা মামলায় আসামি করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি শরীয়তপুরের বাসায় অবস্থান করলেও তাকে ২০২৪ সালের ১লা আগস্ট সংঘটিত ঘটনায় আসামি করা হয়।  
ঢালাও মামলা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাপক সমালোচনা হলে নীতিনির্ধারকরা ভুয়া মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ভুয়া মামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কোনো মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। ভুয়া মামলা দায়ের করার কারণে কাউকে শাস্তিও দেয়া হয়নি।
জামিনের ক্ষেত্রেও নানা বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে গ্রেপ্তার করে তার নামে হত্যা মামলা দেয়া হয়েছে। তিনি আইনের চোখে অপরাধ করলে, সংবিধান লঙ্ঘন করলে সরকার সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করতে পারতো। কিন্তু একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে হত্যা বা হত্যাচেষ্টা মামলা কি আইনের শাসনের পরিপন্থি নয়?


সাবেক প্রধান বিচারপতির ক্ষেত্রেও দেখলাম একটি মামলায় জামিন পান তো আরেক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একই ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ক্ষেত্রেও। সর্বশেষ উচ্চ আদালত তাকে দুটি মামলায় জামিন দিয়েছেন। এখন থানা পুলিশ নতুন কোনো মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখায় কিনা সেটাই প্রশ্ন। জামিন ও বিচারের নামে এই বিড়াল-ইঁদুর খেলা বন্ধ না হলে আইনের শাসন যেমন প্রতিষ্ঠিত হবে না, তেমনি ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়া দুঃসাধ্য হবে।
এবার যখন মুক্ত সাংবাদিকতা দিবস পালিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম কতোটা স্বাধীনতা ভোগ করছে? অনেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। অনেক সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান চললেও কর্মীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।


এবারে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যমের প্রতিপাদ্য বিষয়: ‘শান্তিময় ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য গণমাধ্যম: পরিবেশগত সংকটের মুখে সাংবাদিকতা।’
সাংবাদিকরা শান্তিময় ভবিষ্যৎ গড়বেন কীভাবে, তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ-ই যেখানে অন্ধকার। পরিবেশগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন। মুক্ত সাংবাদিকতার বাধাগুলো তুলে নেয়া দরকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস মন খুলে সাংবাদিকদের লিখতে বলেছিলেন। কাউকে বাধা দেয়া হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু মন খুলে লেখা ও বলার কারণে তার আমলে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার সময়েই সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি মব হয়েছে। পত্রিকা অফিস, সংগীত প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
৩রা মে যখন মুক্ত গণমাধ্যম দিবসটি উদ্‌যাপিত হচ্ছে, তখন দেশের জনপ্রিয় ও পুরনো পত্রিকা জনকণ্ঠ বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ আছে আরও কিছু প্রতিষ্ঠান। এসব পত্রিকা বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে মুক্ত সাংবাদিকতা হতে পারে না।
অতএব, সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতাদের কাছে আহ্বান থাকবে, তারা যেন পত্রিকাটি নতুন করে চালু করার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। 

মতামত'র অন্যান্য খবর