জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি সেইসব শহীদ, আহত, নির্যাতিত এবং সংগ্রামী মানুষদের, যাদের আত্মত্যাগ, সাহস ও প্রত্যয়ের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। তাদের কেউ জীবন দিয়েছেন, কেউ ভবিষ্যৎ, কেউ স্বপ্ন, কেউবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন একটি অধিক ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশায়। ইতিহাসে কোনো গণ-অভ্যুত্থান কেবল রাজনৈতিক ঘটনার মাধ্যমে নয়; মানুষের আত্মত্যাগ ও নৈতিক শক্তির মাধ্যমেই স্থায়ী অর্থ লাভ করে। তাই জুলাইয়ের আলোচনা শুরু হয় স্মৃতির মধ্যদিয়ে, কিন্তু তার গন্তব্য রাষ্ট্রের রূপান্তরে। শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা কেবল স্মরণে নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণে, যেখানে নাগরিকের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একই দাবির জন্য আর কখনো জীবন দিতে হবে না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু কিছু মুহূর্ত এমন আসে, যা কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয় না; বরং জাতির রাজনৈতিক গতিপথকে নতুনভাবে নির্ধারণ করে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল তেমন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তেমনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও কেবল একটি প্রতিবাদ, একটি আন্দোলন কিংবা একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং নাগরিকের পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুনভাবে বিন্যস্ত করার এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।
দুই বছর পর আজ আরও স্পষ্টভাবে বলা যায়-
জুলাই একটি ঘটনা নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া।
একটি ঘটনা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তার একটি সূচনা আছে, একটি সমাপ্তি আছে। কিন্তু একটি প্রক্রিয়া সমাজের চিন্তা, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রের চরিত্রকে দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায়। একটি ঘটনা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে; কিন্তু একটি প্রক্রিয়া ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে।
জুলাই যদি কেবল স্মৃতির অংশ হয়ে থাকে, তবে তার রাজনৈতিক শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় হবে। কিন্তু যদি জুলাই রাষ্ট্রের কাঠামো, শাসনব্যবস্থা, আইন, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিকের ক্ষমতায়নে স্থায়ী পরিবর্তনের ভিত্তি হয়ে ওঠে, তবে সেটিই হবে জুলাইয়ের প্রকৃত ঐতিহাসিক সাফল্য। এই দুই বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দিয়েছে-সরকার পরিবর্তন এবং রাষ্ট্র পরিবর্তন এক বিষয় নয়।
একটি নির্বাচন ক্ষমতার হাতবদল ঘটাতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র অপরিবর্তিত থাকতে পারে। প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহিতার সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন জনগণের প্রত্যাশিত রূপান্তর নিশ্চিত করতে পারে না।
এ কারণেই জুলাইকে কেবল একটি ক্ষমতা পরিবর্তনের আন্দোলন হিসেবে নয়; বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি ঐতিহাসিক সূচনা হিসেবে দেখা জরুরি।
রাজনৈতিক তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে-গাঠনিক ক্ষমতা (constituent power) এবং সাংবিধানিক ক্ষমতার (constituted power) মধ্যে।
সংসদ, সরকার, আদালত কিংবা সংবিধান নিজেই সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রকাশ। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানেরও একটি উৎস আছে, আর সেই উৎস হলো জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাÑগাঠনিক ক্ষমতা।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম তাৎপর্য এখানেই যে, জনগণ নিজেদের কেবল ভোটার হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রক্ষমতার মূল উৎস হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। জনগণ ঘোষণা করেছে যে, রাষ্ট্রের বৈধতা কেবল প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব থেকে আসে না; বরং আসে জনগণের সম্মতি ও আস্থার মধ্য থেকে। সেই কারণে জুলাইকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হলে জনগণের এই গাঠনিক ক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
রাষ্ট্র সংস্কার কোনো প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রকল্প নয়; এটি একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নির্মাণের প্রক্রিয়া।
রাষ্ট্রের বৈধতা শেষ পর্যন্ত নাগরিকের সম্মতি, আস্থা এবং অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করে। যখন রাষ্ট্র সেই আস্থা হারায়, তখন কেবল সরকার পরিবর্তনই যথেষ্ট হয় না; রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককেই নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হয়। এই অর্থে রাষ্ট্র সংস্কার হলো জুলাইয়ে প্রকাশিত জনগণের আকাক্সক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
জুলাই জনগণের ইচ্ছাকে প্রকাশ করেছে; রাষ্ট্র সংস্কার সেই ইচ্ছাকে সংবিধান, প্রতিষ্ঠান, আইন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে স্থায়ী রূপ দিতে চায়।
আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা মূলত একটি সামাজিক চুক্তির ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। জনগণ রাষ্ট্রকে ক্ষমতা প্রদান করে এই শর্তে যে, রাষ্ট্র তাদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং অধিকার রক্ষা করবে।
যখন সেই চুক্তি ভঙ্গ হয়, তখন রাষ্ট্রের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং একটি নতুন সামাজিক চুক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়।
জুলাইকে সেই নতুন সামাজিক চুক্তির সূচনা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এটি কেবল শাসক পরিবর্তনের দাবি নয়; বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে নতুন নৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর পুনর্গঠনের দাবি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো বিপ্লব একদিনে সম্পন্ন হয় না।
বিপ্লবের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় তার পরবর্তী প্রতিষ্ঠান নির্মাণের মাধ্যমে। আন্দোলন রাস্তা দখল করতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ধৈর্য, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
এই অর্থে জুলাইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে তার স্মৃতিচর্চা দিয়ে নয়; বরং তার প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সক্ষমতা দিয়ে।
যদি জুলাই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নতুন জবাবদিহিতা এবং নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারে, তবেই এটি একটি ঐতিহাসিক রূপান্তরে পরিণত হবে।
একটি কার্যকর গণতন্ত্র কেবল প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না; এর জন্য প্রয়োজন নাগরিকের ধারাবাহিক অংশগ্রহণ, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সমাজের বিস্তৃত সম্পৃক্ততা।
রাষ্ট্রের ক্ষমতা রাজধানী কিংবা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত না থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়লে গণতন্ত্র আরও জীবন্ত ও টেকসই হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে।
ইতিহাস প্রমাণ করে, ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতি দেয়। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জবাবদিহিতাকে ব্যক্তির ইচ্ছার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের নিয়মের অধীন আনতে হবে।
রাষ্ট্র যদি কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর সম্প্রসারণে পরিণত হয়, তবে গণতন্ত্রের আত্মা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু রাষ্ট্র যদি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নাগরিক স্বাধীনতা উভয়ই শক্তিশালী হয়।
রাষ্ট্র কেবল আইনের মাধ্যমে টিকে থাকে না; এটি জনগণের নৈতিক স্বীকৃতির ওপরও নির্ভর করে।
কোনো সরকার আইনগতভাবে বৈধ হলেও যদি জনগণের আস্থা হারায়, তবে তার রাজনৈতিক বৈধতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
জুলাই এই প্রশ্নটিকেও সামনে নিয়ে এসেছে- রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস কি কেবল সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, নাকি জনগণের নৈতিক সম্মতিও তার অপরিহার্য শর্ত?
রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনায় এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭১ আমাদের দিয়েছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা। সেই সংগ্রামের ঘোষিত আদর্শ ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার।
স্বাধীনতার পর সেই আদর্শ বাস্তবায়নের পথে বহু সাফল্য যেমন এসেছে, তেমনি বহু সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতাও রয়ে গেছে।
এই অর্থে জুলাইকে স্বাধীনতার ঘোষিত আদর্শের বিরুদ্ধে নয়; বরং তার অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
অতএব, জুলাই কোনো বিচ্ছিন্ন সূচনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের দীর্ঘ যাত্রার একটি নতুন অধ্যায়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে-
আমরা কি জুলাইকে কেবল স্মৃতিতে সংরক্ষণ করতে চাই, নাকি রাষ্ট্রের চরিত্রে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই?
যদি আমরা জুলাইকে একটি সমাপ্ত ঘটনা মনে করি, তবে তার উত্তরাধিকার ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাবে। কিন্তু যদি আমরা একে একটি চলমান গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করি, তবে রাষ্ট্র সংস্কার হবে সেই প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিণতি।
আজকের প্রশ্ন কেবল কে ক্ষমতায় যাবে-তা নয়।
আজকের প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশ কেমন রাষ্ট্র হবে।
ক্ষমতার হাতবদল ইতিহাসের শেষ কথা নয়; ইতিহাসের প্রকৃত অগ্রগতি ঘটে তখনই, যখন রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায়, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়, নাগরিকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রকৃত অংশীদার হয়ে ওঠে।
জুলাই আমাদের সামনে সেই সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। সেই কারণে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে আমরা আবারো দৃঢ়ভাবে বলিÑ
জুলাই একটি ঘটনা নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া।
আর রাষ্ট্র সংস্কার সেই প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক রূপ, প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা এবং ঐতিহাসিক পরিণতি।
লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
faraiæees@gmail.com