সমকালীন প্রসঙ্গ

জুলাই: গণ-অভ্যুত্থান, বিপ্লব বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট

ড. মাহফুজ পারভেজ | মতামত
আগস্ট ১, ২০২৬
জুলাই: গণ-অভ্যুত্থান, বিপ্লব বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট

২০২৪ সালের জুলাই মাসের অগ্নিগর্ভ ঘটনাপ্রবাহের শেষ পর্যায়ে দৃশ্যমান গণ-অভ্যুত্থানের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ফলাফল ছিল একটি সরকারের পতন ও ক্ষমতার পরিবর্তন। অন্যদিকে ‘জুলাই বিপ্লব‘ ধারণাটি শুধু শাসক পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্র, শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক বৈধতা এবং নাগরিক-রাষ্ট্র সম্পর্কের পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের পরিভাষায় গণ-অভ্যুত্থান (mass uprising) সাধারণত বিপ্লবী প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় বা অনুঘটক। আর বিপ্লব (revolution) হলো সেই দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর, যার লক্ষ্য রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, জুলাই ছিল গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সূচিত একটি গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা। তবে এই বিপ্লবের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে এর ঘোষিত লক্ষ্য- গণতন্ত্র, জবাবদিহি, আইনের শাসন ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান-কতোটা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তার ওপর।  
 

ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, যেকোনো বিপ্লবের প্রকৃত সাফল্য কেবল সরকার পরিবর্তনে নয়, নতুন রাজনৈতিক আদর্শকে টেকসই প্রতিষ্ঠান, নীতি ও নাগরিক সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত করার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। ইতিহাস দেখায়, বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যদি সাংবিধানিক সংস্কার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, কার্যকর নির্বাচনব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে না ওঠে, তবে বিপ্লবের অর্জন ক্ষণস্থায়ী হয়ে পড়ে। 
এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক উদ্যোগ ও বৌদ্ধিক রূপান্তর- যেখানে ব্যক্তি-পূজা, দলীয় আনুগত্য এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে সমালোচনামূলক চিন্তা, প্রমাণভিত্তিক নীতি-প্রণয়ন, সহনশীল রাজনৈতিক বিতর্ক, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়। অর্থাৎ, বিপ্লবের শক্তিকে স্থায়ী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপ দিতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন (institutional reconstruction) এবং বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ (intellectual transformation)-এই দুই প্রক্রিয়া একসঙ্গে অগ্রসর হতে হবে। একটি বিপ্লব তখনই ঐতিহাসিকভাবে সফল বলে বিবেচিত হয়, যখন তার চেতনা কেবল রাজপথে নয়, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারণ এবং জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও চেতনাতেও স্থায়ীভাবে প্রতিফলিত হয়।
 

এখন প্রশ্ন হলো, জনতার আন্দোলন বা বিপ্লবের বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব বহন করবে কে এবং জাতীয় ঐকমত্যের বুনন রচনা করবে কারা? এটি কি কেবল রাজনীতিবিদদের একার দায়িত্ব, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, নীতিনির্ধারক, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজেরও সমান দায় রয়েছে? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো বিপ্লব কেবল রাজপথের সংগ্রামের মাধ্যমে সফল হয় না। তার স্থায়িত্ব নিশ্চিত হয় তখনই, যখন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে বৌদ্ধিকভাবে ব্যাখ্যা, নীতিগতভাবে পরিশীলিত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রূপায়িত করা যায়। তাই রাজনীতির সঙ্গে জ্ঞান, গবেষণা ও নৈতিক নেতৃত্বের সংযোগ স্থাপন করে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় ঐকমত্য নির্মাণ করা অপরিহার্য। সেই ঐকমত্যই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র সংস্কারের অগ্রাধিকার, গণতন্ত্রের রূপরেখা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথরেখা। 
 

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে জুলাই ২০২৪-এর দুই বছর পর এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে একটি সুস্পষ্ট শূন্যতা বিরাজমান। বিশ্ববিদ্যালয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর এখনো জাতীয় সংলাপের কার্যকর প্ল্যাটফরমে পরিণত হতে পারেনি। রাজনৈতিক নেতৃত্বও দলীয় প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় কর্মসূচি নির্মাণে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অতীতের মতোই ব্যক্তিগত, দলীয় ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ ও দ্বন্দ্ব জাতীয় স্বার্থকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিভাজন, প্রতিহিংসা ও মেরূকরণ সমাজ জুড়ে পুনরায় দৃশ্যমান হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে গণ-আন্দোলনের বৈপ্লবিক শক্তি জাতীয় পুনর্গঠনের ভিত্তিতে রূপান্তরিত না হয়ে বিচ্ছিন্নতা ও অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হতে পারে। অতএব, জুলাই-পরবর্তী সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আর শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং দলীয় ক্ষমতায়নের বাইরে এসে জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক দূরদর্শিতা এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার জাতীয় পরিসর বিনির্মাণ করা। 
 

কারণ, ইতিহাসে এটাও দেখা গেছে যে, কোনো গণ-আন্দোলন কেবল রাজপথে জয়ী হয়ে স্থায়ী বিপ্লব হয়নি। প্রতিটি সফল বিপ্লবের দু’টি ধাপ থাকে। প্রথম ধাপ রাজনৈতিক বিজয়, দ্বিতীয় ধাপ বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা (Intellectual Legitimacy)। প্রথম ধাপে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে। দ্বিতীয় ধাপে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম,  চিন্তক, লেখক, শিল্পী এবং নীতিনির্ধারকেরা সেই পরিবর্তনের দর্শন, ভাষা, নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ করেন। যদি দ্বিতীয় ধাপটি ব্যর্থ হয়, তবে আন্দোলনটি সফল বিপ্লব না হয়ে ধীরে ধীরে স্লোগানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং তার জায়গা দখল করে বিভ্রান্তি, দলীয় প্রচার কিংবা ব্যক্তি-পূজা, যা ফ্যাসিবাদ ও অগণতান্ত্রিকতার আলামত।
বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর যে প্রশ্নটি ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে, তা হলো-রাষ্ট্র কি তার বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে? বিশ্ববিদ্যালয়, উপাচার্য, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা কি জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্রচিন্তার নির্মাতা হতে পেরেছেন, নাকি তারা প্রশাসনিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক আনুগত্যের সংকীর্ণ পরিসরে আটকে গেছেন? এই প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক প্রশ্ন। তা হলো-আন্দোলনকে বিপ্লবের পথে নিতে রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রের বৌদ্ধিক নেতৃত্ব কোথায়?
 

এ কথা সত্য যে, বিপ্লব টিকিয়ে রাখতে শুধু প্রশাসন যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার দু’টি স্তম্ভ রয়েছে। একটি হলো প্রশাসনিক রাষ্ট্র (Administrative State), অন্যটি বৌদ্ধিক রাষ্ট্র (Intellectual Statecraft)। প্রশাসন আইন-শৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু রাষ্ট্রের নৈতিক দিকনির্দেশনা, জাতীয় বয়ান, সংস্কার-দর্শন ও ভবিষ্যৎ কল্পনা নির্মাণ করে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর।
 

অ্যান্টোনিও গ্রামসি তার সাংস্কৃতিক আধিপত্য (Cultural Hegemoû) তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে টিকে থাকে না। টিকে থাকে ধারণা, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের মাধ্যমে। কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আন্দোলন যদি নিজস্ব ধারণাগত ভিত্তি গড়ে তুলতে না পারে, তবে পুরোনো চিন্তার কাঠামোই নতুন রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এই অর্থে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রশাসনিক নয়; ধারণাগত।
গণতান্ত্রিকতার পথে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বদলে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি চিন্তাকেন্দ্র আর বিভিন্ন একাডেমিগুলো শুধু অফিস হয়ে থাকলে বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধারণাগত দায়-দায়িত্ব পালনে মোটেও সক্ষম হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর কোথাও কেবল ডিগ্রি দেয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি জাতির চিন্তার কারখানা (Factory of Ideas)। এখানেই নতুন রাজনৈতিক তত্ত্ব, সামাজিক দর্শন, নীতি-প্রস্তাব এবং জাতীয় বিতর্কের জন্ম হয়। উপাচার্যের (Vice-Chancellor) পদও কেবল প্রশাসনিক নয়। এটি এক ধরনের নৈতিক ও বৌদ্ধিক নেতৃত্বের পদ। যদি একজন উপাচার্যের সাফল্য কেবল ভবন নির্মাণ, চাকরি দেয়া, পরীক্ষা নেয়া বা প্রশাসনিক ফাইল নিষ্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তিনি একজন দক্ষ প্রশাসক হতে পারেন। কিন্তু একজন বিশ্ববিদ্যালয়-নেতা নন, শিক্ষাবিদ বা বুদ্ধিজীবী তো ননই। 
 

বিশ্বের খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব জাতীয় সংকটের সময় শুধু প্রশাসন চালায়নি। তারা সমাজকে বৌদ্ধিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গণতন্ত্র পুনর্গঠনের দর্শন তৈরি করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য-পরবর্তী পুনর্মিলনের ধারণা একাডেমিক পরিসরেই শক্তিশালী হয়েছে। লাতিন আমেরিকায় সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজ গঠনে বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
 

বাংলাদেশে জুলাই-পরবর্তী সময়ে গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের সাপেক্ষে সেই বৌদ্ধিক নেতৃত্ব কি দৃশ্যমান? নাকি রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগির মতো বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রের লোকজনও পদ-পদবি ভাগের লড়াইয়ে লিপ্ত? অতীতের দুর্নীতি, অনিয়ম, নিয়োগের রাজনীতি, দলীয়করণ, নতজানু নেতৃত্বের দায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও একাডেমিগুলোর নেতৃত্ব মুক্ত হতে পেরেছে? পারেনি। কারণ, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রবণতা দেখা যায়- সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কমিশন, একাডেমি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নতুন নিয়োগ হয়। এটি কোনো একটি সরকারের একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য নয়; বরং বহু সরকারের আমলে পুনরাবৃত্ত একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কিন্তু সমস্যা নতুন নিয়োগে নয়। সমস্যা হলো টাকা-পয়সার বিনিময়ে অযোগ্য দলীয় কর্মীর নিয়োগে এবং নিয়োগের পর তাদের কলঙ্কিত ভূমিকার বিষয়গুলো এবং তাদের নৈতিক দায়িত্ব পালনের বদলে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের বিষয়গুলো। 
যারা বিশ্ববিদ্যালয় বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পান, তারা যদি নিজেদের কেবল সরকারের অনুগত প্রতিনিধি মনে করেন, তাহলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার চেতনাকে দুর্বল করেন। আবার যদি তারা সরকারের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন অবস্থান নেন, তবুও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের প্রকৃত ভূমিকা হওয়া উচিত- রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কারকে গবেষণা, নীতি-প্রস্তাব ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে শক্তিশালী করা। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, একজন পাবলিক ইন্টেলেকচুয়ালের আনুগত্য ব্যক্তি বা সরকারের প্রতি নয়: সত্য, যুক্তি এবং জনস্বার্থের প্রতি।
 

নিজের বৈধতার জন্য প্রতিটি সরকারই বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন চায়। কিন্তু ইতিহাস বলে, চাটুকারিতা কখনো কোনো সরকার বা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করেনি। জার্মান দার্শনিক ইউর্গেন হাবারমাস বলেছেন, গণতন্ত্রে বুদ্ধিজীবীর কাজ হলো “সমালোচনামূলক জনপরিসর” (Critical Public Sphere) সৃষ্টি করা। অর্থাৎ, সরকার ভালো কাজ করলে তা যুক্তি দিয়ে সমর্থন করা, ভুল করলে তথ্য ও তত্ত্ব দিয়ে সমালোচনা করা। চাটুকারিতা নয়, যা সরকারের ক্ষতি করে। কারণ এতে নীতিনির্ধারকেরা বাস্তব সমস্যার প্রতিফলন পান না। বিপরীতে, দায়িত্বশীল সমালোচনা রাষ্ট্রকে সংশোধনের সুযোগ দেয়। অতএব, সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়া আর সরকারের মুখপাত্র হয়ে যাওয়া বুদ্ধিজীবীর কাজ নয়।
 

বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে জুলাইয়ের ন্যারেটিভ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রতিটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি ন্যারেটিভ বা ধারণাগত কাঠামো থাকে। আমেরিকার স্বাধীনতা “স্বাধীনতা ও প্রাকৃতিক অধিকার”-এর ভাষায় ব্যাখ্যা হয়েছে। ফরাসি বিপ্লব “স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব”-এর ভাষা সৃষ্টি করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা “সত্য ও পুনর্মিলন”-এর নৈতিক দর্শন নির্মাণ করেছে।
 

বাংলাদেশের জুলাইয়ের ভাষা কী? এটি কি কেবল সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন? নাকি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন? নাকি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বৈপ্লবিক সূচনা? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে নয়; গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়, চিন্তাচর্চা এবং নীতিগত আলোচনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। যদি এক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ বয়ান নির্মাণ না হয়, তাহলে সবাই নিজেদের সুবিধামতো জুলাইকে ব্যাখ্যা করবে। তখন একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে ঘিরে বহু পরস্পরবিরোধী বয়ান তৈরি হয়ে মৌলিক জাতীয় ঐকমত্য দুর্বল হবে।
 

এডওয়ার্ড সাঈদ তার Representations of the Intellectual গ্রন্থে লিখেছিলেন, প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর কাজ হলো ক্ষমতার আরামদায়ক অবস্থানে বসে প্রশংসা করা নয়। বরং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, যদিও তা অস্বস্তিকর হয়। চিন্তার লড়াই জারি রাখাই বুদ্ধিজীবীর মূল কর্তব্য, পদ-পদবির পেছনে ধাওয়া করা বা বক্তি ও দলের চাটুকারিতা করা তার কাজ নয়। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বুদ্ধিজীবীদের অন্তত চারটি দায়িত্ব রয়েছে- প্রথমত, জুলাইয়ের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ইতিহাস নির্মাণ করা। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক মেরূকরণের পরিবর্তে জাতীয় ঐকমত্যের ভাষা তৈরি করা। তৃতীয়ত, সরকারকে নীতি-সংস্কারের জন্য গবেষণাভিত্তিক সহায়তা দেয়া। চতুর্থত, তরুণ প্রজন্মকে গণতান্ত্রিক নাগরিকত্বের শিক্ষা দেয়া। এসব কাজ করার প্রণোদনা ও তাগিদ না থাকলেও জুলাই নিয়ে বাগাড়ম্বর এবং জুলাইয়ের পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি করে সুযোগ-সুবিধা নেয়ার প্রবণতা দৃশ্যমান রয়েছে। 
 

আসলে গণ-আন্দোলন ও বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় শূন্যতা হলো বৌদ্ধিক শূন্যতা। এই শূন্যতা একদল অনুগত শিক্ষক দিয়ে পূর্ণ হয় না। হয় মেধাবী ও যোগ্যদের দিয়ে। অতীতে বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক আন্দোলনের অভাব কখনো ছিল না। কিন্তু রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বৌদ্ধিক রূপান্তর সবসময় ঘটেনি। এই কারণেই বহু ঐতিহাসিক মুহূর্ত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলীয় বিতর্কে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও সেই একই ঝুঁকির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। যদি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, একাডেমি এবং দেশের বুদ্ধিজীবীরা জুলাইকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তায় রূপান্তর করতে ব্যর্থ হন আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্র গণতান্ত্রিক সংস্কার সাধনে অনাগ্রহী হয়, তাহলে জুলাইয়ের নৈতিক শক্তির ক্ষয় হয়ে তা জাতীয় ঐকমত্যের বদলে নতুন মেরূকরণ সৃষ্টি  করবে।
 

এই প্রেক্ষাপটে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যদি জুলাই সত্যিই একটি নতুন বাংলাদেশের সূচনার প্রতীক হয়ে থাকে, তবে তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন স্লোগান, নতুন প্রতীক বা নতুন রাজনৈতিক আনুগত্য নয়; বরং নতুন চিন্তা, নতুন বৌদ্ধিক কল্পনা এবং নতুন প্রাতিষ্ঠানিক দর্শন ও সংস্কার। গণ-আন্দোলনের বৈপ্লবিক স্থায়িত্ব রাজপথের আবেগে নয়, ধারণার গভীরতায়; রাজনৈতিক আস্ফালনে নয়, জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র পরিগঠনে। সেই নতুন চিন্তা নির্মাণের দায়িত্ব শুধু রাজনীতিবিদদের ওপর ন্যস্ত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নীতিবিশ্লেষক, বুদ্ধিজীবী, সংবাদমাধ্যম এবং বৃহত্তর জ্ঞানসমাজকে এই প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার হওয়ার কথা। সেই অংশীদারগণ যদি চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির অংশীদার না হয়ে ক্ষমতা ও পদ-পদবির অংশীদার হয়, তাহলে পরিস্থিতির ইতিবাচক বদল প্রত্যাশা করাই বাতুলতা মাত্র।  
 

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত শুধু ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডের বিচার করে না; এটি সমানভাবে বিচার করে সেই সময়ের চিন্তাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং জ্ঞানসমাজ নিজেদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব কতোটা পালন করেছে, সেসব বিষয়ও। অনেক সময় একটি জাতির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় শুধু রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্তে নয়, বরং শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা কতোটা স্বাধীনভাবে সত্য উচ্চারণ করেছেন, কতোটা নৈতিক সাহস দেখিয়েছেন এবং কতোটা নতুন ধারণা নির্মাণ করতে পেরেছেন তার ওপর। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের এই সন্ধিক্ষণে ব্যক্তিস্বার্থে সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব এড়ানোর চিত্র সত্যিই বেদনাদায়ক। জুলাই গণ-আন্দোলন থেকে সফল বিপ্লব হবে কিনা, তা উপরোক্ত চিত্রেই প্রতিবিম্বিত। একইভাবে, বিপ্লবের প্রকৃত উত্তরাধিকার শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের মানদণ্ডে নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নতুন জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি এবং নতুন গণতান্ত্রিক চেতনাকে কতোটা স্থায়ীভাবে সংস্কার ও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, তার ভিত্তিতে।  এসব জরুরি ক্ষেত্রে শূন্যতা, রাজনৈতিক অনীহা, আমলাতান্ত্রিক অসহযোগিতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবহেলা থাকলে জুলাই গণ-আন্দোলন ও বিপ্লবের মধ্যবর্তী পর্যায়ে অমীমাংসিত সফলতা ও ব্যর্থতার পেণ্ডুলামে  দোদুল্যমান থাকবে।  
 

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

 

মতামত'র অন্যান্য খবর