রাজনীতি

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা কতোটা বাস্তবায়িত হয়েছে?

সাইফুল হক | মতামত
আগস্ট ১, ২০২৬
জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা কতোটা বাস্তবায়িত হয়েছে?

দুই বছর আগে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের মানুষ একটি ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে এক অসহনীয় পুরানা রাজনৈতিক জমানা বিদায় দিয়েছিল। আশা ছিল এক ধরনের নতুন রাজনীতি, নতুন একটা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এক অংশ বৈষম্যহীন একটা ব্যবস্থারও স্বপ্ন দেখেছিল। সেই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে-সেই স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার কতোটা বাস্তবায়িত হয়েছে? দুই বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে যে বাস্তবতা তুলে ধরে, তা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। যে চেতনা ও প্রত্যাশাকে ধারণ করে জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল- রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং সমাজের বড় একটি অংশ যেন ক্রমেই সেই পথ থেকে সরে এসেছে।
 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল মূলত বৈষম্যবিরোধী এক গণআকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণ, ঘোরতর এক অন্যায় নিপীড়নমূলক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রকাশ। ছাত্র-তরুণদের চাকরিক্ষেত্রে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন আসলে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল। তাই এই আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল একটা বৈষম্যহীন  ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা। মানুষ এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিল, যেখানে সুযোগের সমতা থাকবে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে, দমন-পীড়নের অবসান ঘটবে এবং বৈষম্যের বিদ্যমান কাঠামো ভেঙে পড়বে, গণতান্ত্রিক পরিসরে সুযোগের সমতা নিশ্চিত হবে।
 

কিন্তু অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর আওয়ামী ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের অবসান ঘটলেও পরবর্তী বাস্তবতা খুব বেশি আশাব্যঞ্জক হয়ে ওঠেনি। গত প্রায় দুই বছরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে বৈষম্য কমার পরিবর্তে আরও বেড়েছে; ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বিস্তৃত হয়েছে, আয়ের বৈষম্য গভীরতর হয়েছে এবং সম্পদ আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে। অর্থ পাচার থামেনি; বরং নতুন নতুন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর নাম এই পাচারের সঙ্গে  যুক্ত হয়েছে। সুইস ব্যাংকসহ বিদেশে বাংলাদেশিদের সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। অর্থাৎ, যে অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছিল, সেই প্রবণতার উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে বহু কলকারখানা বন্ধ হয়েছে, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন খাতে কয়েক লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে এবং দারিদ্র্য আরও প্রকট হয়েছে। বৈষম্য দূর হওয়ার পরিবর্তে তা যেন নতুন রূপে ফিরে এসেছে। 
 

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলেও বৈষম্য দূরীকরণের প্রশ্নটি কার্যত উপেক্ষিত থেকেছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনসহ বিভিন্ন কমিশন গঠিত হয়েছিল, নানা উদ্যোগও নেয়া হয়েছিল; কিন্তু অর্থনৈতিক বৈষম্য, সম্পদের কেন্দ্রীকরণ, শোষণমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে কোনো কমিশন গঠিত হয়নি, এসব নিয়ে কার্যকর কোনো রূপরেখা প্রণয়ন বা পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ফলে গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে  দুর্বৃত্তায়নের যে শেকড় বাকড় বহুদিন ধরে প্রোথিত ছিল, তা আজও বহাল তবিয়তে  রয়েছে; ক্ষেত্রবিশেষে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। 
 

এই দুর্বৃত্ত অর্থনীতি এখন দুর্বৃত্ত রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অশুভ আঁতাত ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। হাতেগোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের বাইরে অধিকাংশ প্রভাবশালী গোষ্ঠী এখনো কার্যকর জবাবদিহির আওতার বাইরে। ফলে যে বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী স্বার্থনির্ভর অশুভ নেক্সাস একসময় পুরনো শাসনব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করেছিল, তা নতুন বাস্তবতায়ও টিকে আছে। রাজনৈতিক রং বদলেছে, কিন্তু সেই কাঠামোর মৌলিক চরিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।
 

এই বাস্তবতারই আরেকটি প্রকাশ সামাজিক নৈরাজ্য ও মব-সংস্কৃতির বিস্তার। গত দুই বছরে সমাজে যে নৈরাজ্য দেখা গেছে, তা কেবল সামাজিক নয়, রাজনৈতিকও। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা সরকার যখন মব-জাস্টিসের নামে নৈরাজ্যকে প্রশ্রয় দেয়, উস্কানি প্রদান করে কিংবা কোনো না কোনোভাবে তাদের নেতৃত্বে বা মদতে তা পরিচালিত হয়, তখন সেই নৈরাজ্য আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা থাকে না; বরং তা শাসনকাঠামোরই অংশে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন স্থানে মব-সহিংসতার পুনরাবৃত্তি এই ধারাবাহিকতারই ইঙ্গিত বহন করে।
 

রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে, কিন্তু তার অধিকাংশই ছিল কসমেটিক বা উপরিতলের। সংস্কারের নামে বিদ্যমান রাষ্ট্রের দমনমূলক ও বলপ্রয়োগনির্ভর চরিত্রকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনার আলোচনা হয়েছে বটে, কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তরের প্রশ্নটি তেমন কোনো গুরুত্বই পায়নি। রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে কিছুটা স্বচ্ছ, কিছুটা জবাবদিহিমূলক এবং তুলনামূলকভাবে মানবিক বা উদারনৈতিক চেহারা দেয়ার প্রচেষ্টাই সংস্কারের প্রধান মনোযোগ ও আলোচ্য বিষয় হয়ে থেকেছে। দুর্বৃত্ত অর্থনীতি ও দুর্বৃত্ত রাজনীতির কবলে থাকা একটি রাষ্ট্রকে কয়েকটি সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক রূপ দেয়া সম্ভব নয়, এই উপলব্ধি খুব পরিষ্কার নয়।
 

অবশ্য এর মধ্যে যে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও হয়েছে, তা উল্লেখের দাবি রাখে। এখন যদি স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীসহ অন্যান্য সাংবিধানিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়, তাহলে সেটা বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে খানিকটা  গণতান্ত্রিক  ও জবাবদিহিমূলক করার একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই উদ্যোগ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক পরিসর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কিছুটা  অগ্রগতি বলা যেতে পারে, কিন্তু এটিকে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক  রূপান্তর হিসেবে দেখার অবকাশ নেই।
 

গণ-অভ্যুত্থান রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক পরিচালনার প্রশ্নেও কোনো উল্লেখযোগ্য  পরিবর্তন আনতে পারেনি। জবরদখল, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং মাফিয়া-সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপে আবারো ফিরে আসছে। এসব দখলদারিত্ব ও মালিকানার ধরন কিছুটা বদলালেও দখলদারিত্বের  মৌলিক চরিত্র মোটামুটি একইরকম রয়েছে। এসব বিষয়ে গুরুত্ব না দিলে রাষ্ট্রের ভেতরে গড়ে ওঠা ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলোই কেবল আরও শক্তিশালী হবে, রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতা বাড়তেই থাকবে;  বিদ্যমান অমানবিক নিদারুণ বৈষম্য ও শোষণমূলক কাঠামো অক্ষতই থেকে যাবে। 
 

এতসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ২০২৬ এর ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং পরবর্তীতে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসাবে চিহ্নিত হবে।  জনগণের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায়  এরইমধ্যে সরকার কিছু জনপ্রিয় উদ্যোগ নিয়েছে, যার ইতিবাচক দিকও রয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে বাজেট প্রণয়ন ও উপস্থাপনের মাধ্যমে সরকার অর্থনৈতিক উদ্যোগে যে গতি সঞ্চার করার চেষ্টা করেছে এটিও অস্বীকার করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী একটি কাজের সংস্কৃতি গড়ে তোলার যে আগ্রহ ও সদিচ্ছা দেখাচ্ছেন, সমাজে এরও একটা ইতিবাচক দিক রয়েছে। তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সরকার ও বিএনপি যে বেশ  পিছিয়ে পড়ছে এটা বিবেচনায় রাখা দরকার। 
 

বিশেষ করে গণভোটের প্রশ্নে  হ্যাঁ-সূচক ভোটে বিএনপি সমর্থন দেয়ার পর ও গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হওয়ার পর জাতীয় সংসদে এ ব্যাপারে  ইতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারা রাজনৈতিকভাবে  বিএনপি’র জন্য একটি পশ্চাদপসরণ বৈকি! এর ফলে বিএনপিসহ আমাদের একটি বড় রাজনৈতিক অর্জন বিরোধী শক্তির হাতে কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিএনপিকে এখন সংস্কারবিরোধী শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা আরও জোরালো হয়েছে। অথচ যুগপৎ আন্দোলনের সময়ে  রাষ্ট্র  সংস্কারের ৩১ দফা, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দলটির সংস্কারমুখী ভূমিকা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম-এসব বাস্তবতা বিএনপি’র পক্ষেই কথা বলে। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো বিএনপি’র বিরুদ্ধে  এই সুযোগকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে। তারা ধারাবাহিকভাবে বিএনপি’র বিরুদ্ধে এমন একটি জনমত তৈরির চেষ্টা করছে, যাতে মনে হয় সংস্কারের পথে প্রধান বাধা বিএনপি। অথচ বাস্তব রাজনৈতিক ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। দুর্ভাগ্যজনক হলো, বিএনপি তাদের অতীত ভূমিকা, ৩১ দফা কিংবা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে তাদের অবস্থান জনগণের সামনে যথেষ্ট জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারেনি, পারছে না। ফলে জনগণের একটি অংশের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে এবং ভুল বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে। 
 

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদসহ নানা প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় ব্যাপক  নিয়োগ ও পদায়নের প্রবণতা। এত বিস্তৃত দলীয়করণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে আগে এভাবে দেখা যায়নি। দ্বিতীয়ত, আরও একটি বিষয় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিএনপি’র সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যে ৪০-৪২টি রাজনৈতিক দল  ফ্যাসিবাদবিরোধীয় দীর্ঘ সময় ধরে সংগ্রাম করেছে, কঠিন সময়ে রাজপথে থেকেছে, রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে একসঙ্গে আন্দোলন করেছে-তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে গেল ২০শে জুলাইয়ের আগে গত পাঁচ মাসে  দৃশ্যমান কোনো পরামর্শ বা সমন্বয়  করতে দেখা যায়নি। সংসদে সংরক্ষিত আসনের প্রশ্ন হোক, কিংবা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ-যেখানে  অন্যদের রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের একটি প্রতিফলন থাকার কথা ছিল, সেখানে বাস্তবে এরকম  কিছুই দেখা যায়নি। এতে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে-আমরা কি আবারো এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে ফিরে যাচ্ছি, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনা মূলত একটি দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে? এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সময় সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত ছিল  সংসদের ভেতরে বাইরে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব। বাস্তবে যদি সেই জায়গায় দূরত্ব তৈরি হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক মূল্য ভবিষ্যতে অনেক বড় হয়ে দেখা দিতে  পারে। এবারের  অভ্যুত্থানে, নির্বাচন ও সরকার গঠিত হওয়ার পর বিএনপি’র মধ্যে এক ধরনের ‘একলা চলো’ প্রবণতাও দৃশ্যমান হয়েছে। দলটি অবশ্য বলে যে, তারা সবাইকে নিয়ে চলতে চায়, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে চায়। 

 

কিন্তু রাজনীতিতে কথার চেয়ে পদক্ষেপই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব পদক্ষেপে যদি অংশীদারিত্বের প্রতিফলন না থাকে, তাহলে মানুষের মধ্যে ভিন্ন ধরনের ধারণা জন্ম নেয়। ব্যক্তি মানুষের প্রেম ভালোবাসা যেমন প্রকাশ চায়, রাজনীতিতেও এই ভালোবাসা বা রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকাশ জরুরি। না হলে পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস গড়ে উঠবে না। শুধু বৈঠক বা শুভেচ্ছা বিনিময় যথেষ্ট নয়; তার বাস্তব প্রতিফলন থাকতে হয় সিদ্ধান্তে, পদক্ষেপে ও  রাজনৈতিক আচরণে। সমপ্রতি যমুনায় যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সঙ্গে বিএনপি’র চেয়ারপারসন এবং প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বৈঠক রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। এতে একসঙ্গে চলার একটি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বার্তা কি বাস্তব রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতিতে প্রতিফলিত হবে, নাকি এটি কেবল একটি সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক আচরণের মধ্যেই খুঁজতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে, সবাই সরকারের অংশ হবে বা সবাই মন্ত্রী- মিনিস্টার হবে। অন্যদিকে আমরা লক্ষ্য করছি, জামায়াত তাদের জোটসঙ্গীদের সঙ্গে নির্বাচনের আগে যেমন সমন্বয় করেছে, নির্বাচনের পরও সেই ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। আরেকটি বিষয়ও রাজনৈতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
 

রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশ জুড়ে বিএনপি সরকারের উপস্থিতি স্পষ্ট হলেও, রাজনৈতিক দল হিসেবে মাঠে-ময়দানে বিএনপি’র সক্রিয় উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান নয়। আমাদের মতো সমাজে শুধু সরকার পরিচালনা করলেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না, সরকার চালিয়ে যাওয়া যায় না। জনগণের সঙ্গে ধারাবাহিক জীবন্ত যোগাযোগ, মাঠের রাজনৈতিক কর্মসূচি, সংগঠনের সক্রিয়তা-এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এটা এক অদ্ভুত দেশ যেখানে সবাই সরকারে থাকতে চায়, সরকার পরিচালনায় অংশ নিতে চায়। কিন্তু সরকারই সবকিছু করবে-এমন ধারণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবসময় কার্যকর হয় না। মাঠের রাজনীতি যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগও অনেক সময় জনগণের কাছে কাঙ্ক্ষিতভাবে পৌঁছায় না। বিএনপি’র সামনে এখন এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার সময় এসেছে। কারণ সরকার পরিচালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংগঠনকে সক্রিয় রাখা, যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে বিশ্বাস ও সমন্বয়ের সম্পর্ক পুনর্গঠন করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদারিত্বের সংস্কৃতি গড়ে তোলা-এসবই আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। বিএনপি এই প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারবে কিনা  তার উপর আগামী দিনের রাজনৈতিক মেরূকরণও অনেকটা নির্ধারিত হবে।
 

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও কিছু উদ্বেগ রয়ে গেছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখনো কাঙ্ক্ষিত আস্থার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ভারতের দিক থেকে  বন্ধুত্বের বার্তা থাকলেও সীমান্ত হত্যা, পুশইন এবং দ্বৈত আচরণের বাস্তবতা এখনো কাটেনি। একইভাবে গেল ৯ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে তড়িঘড়ি করে এক ধরনের  গোপনীয়তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অন্যায় ও অন্যায্য  বাণিজ্যচুক্তি থেকে বাংলাদেশ কীভাবে বেরিয়ে আসবে বা নিদেনপক্ষে এই চুক্তি পর্যালোচনা করে পুনর্বিন্যস্ত করা যাবে বিএনপি সরকারের জন্য তা এক বড় গলার কাঁটা হয়ে থাকছে। এই চুক্তি অনুসারে মার্কিন স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হলে বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক  ও অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারবে না। একইসঙ্গে এই চুক্তি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। আমাদের জন্য বাস্তবতা হচ্ছে- বাংলাদেশের পক্ষে  কোনো পরাশক্তির প্রভাববলয়ে ঝুঁকে পড়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশকে তার স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাসম্পন্ন পররাষ্ট্রনীতিই অনুসরণ করে যেতে হবে।
 

বাংলাদেশের সামনে এখন তার গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিএনপি যদি বিচক্ষণতা,  দূরদর্শিতা এবং গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার নিয়ে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে দেশে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে একটি স্থিতিশীল  উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু দলীয় সংকীর্ণতা,  রাজনৈতিক শরিকদের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব, এককেন্দ্রিকতা এবং রাজনৈতিক ভুলের পুনরাবৃত্তি যদি অব্যাহত থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাবে না। এটাও মনে রাখা দরকার যে, প্রতিটি বিপ্লবের পেছনেই যেমন প্রতিবিপ্লবের আশঙ্কা থাকে, তেমনি প্রতিটি অভ্যুত্থানের পরও প্রতিঅভ্যুত্থানের ঝুঁকি সৃষ্টি  হয়। 
 

এখন একদিকে যেমন নতুন রাজনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, আবার অন্যদিকে বিভিন্ন দিক থেকে  সরকারকে ব্যর্থ  করে দেয়ার  নানা তৎপরতাও লক্ষণীয়। একদিকে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে; অন্যদিকে সংসদের বিরোধী দল ও জোট সংসদের ভেতরে এক ধরনের ভাষা ব্যবহার করলেও সংসদের বাইরে সরকার উচ্ছেদের আহ্বান জানাতে শুরু করেছেন। কোনটা আসল কথা বোঝা মুশকিল। তারা তাদের কথিত দ্বিতীয় বিপ্লব বা দ্বিতীয় অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে কি রাজনৈতিক নৈরাজ্য ডেকে আনছেন, নাকি পালিয়ে যাওয়াদের ফিরে আসার রাস্তা প্রশস্ত করছেন- রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মধ্যে তা নানা কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। 
 

বাংলাদেশে গত ১৬ বছর আর ৩৬ দিনের অসম সাহসী এক লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে  এখন এমন একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে, যারা প্রশ্ন করতে জানে, জবাবদিহি দাবি করতে জানে এবং জবরদস্তিমূলক কোনো ক্ষমতাকে আর অন্ধভাবে মেনে নিতে রাজি নয়। এটাই জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন। কিন্তু এই অর্জনকে টেকসই করতে সমগ্র ব্যবস্থার কসমেটিক  সংস্কার যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমগ্র রাষ্ট্র, রাজনীতি ও অর্থনীতির ভেতরে জমে থাকা  শোষণ  বৈষম্য, দুর্বৃত্তায়ন ও দখলদারিত্বের কাঠামোগত গণতান্ত্রিক রূপান্তর। 
 

জুলাই অভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনা কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে না পারলে অভ্যুত্থানের ইতিহাস থাকবে, কিন্তু তার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে এবং আবারো জুলাই ফিরে আসবে।
 

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি

 

মতামত'র অন্যান্য খবর