বাল্যপ্রেমের মতোই রাজনীতির প্রেমে পড়েছিলাম আমার কলেজবেলার শুরুতেই। ঠিক কৈশোরে ছেলেমেয়েরা যেভাবে প্রেমে পড়ে সেভাবে। মানে ঐ বয়সে জানালা খুলে যে মেয়েটিকে দেখা যায় প্রতিদিন অথবা বাসায় যে ছেলেটি পড়াতে আসে তার প্রতি যেমন একটা অজানা, অচেনা দারুণ এক আসক্তি তৈরি হয় নিজের ভেতর ঠিক তেমনি করেই কৈশোরে রাজনীতির প্রতি আমার আসক্তি তৈরি হয়েছিল। স্কুলে যেতে যেতে পথের পাশের বাড়ির বারান্দায় কিংবা ছাদে সেই মেয়ে বা ছেলেটিকে দেখতে দেখতে যে রকম অনুভূতি তৈরি হয় তেমন আর কী! চিন পরিচয় নেই; ভবিষ্যৎ ও বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিবিহীন; শুধুই কাছে পাবার বা মিলিবার আশা ছাড়া তেমন কোনো চাওয়া নেই; কেবলই একটু নিত্য দেখা কিংবা সামান্য আলাপের সুযোগ কিংবা তাও না; ব্যস অতটুকুতেই। বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা না করে অতি আপন ভাবা আর ভবিষ্যতের সুখ ও স্বপ্নের অত্যাবশ্যকীয় সঙ্গী হিসেবে কাছে পাবার অদম্য স্বার্থপর চিন্তাই তো কৈশোরের প্রেম। বয়ঃসন্ধির ঐ সময়টাতে যাকে প্রথম কাছে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় তার প্রেমেই তো হাবুডুবু খাই আমরা। ওরকম প্রেমে মজেই আমি যুক্ত হয়েছিলাম ছাত্ররাজনীতিতে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পরবর্তী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ-পূর্ব রাজনীতির ইতিহাসে ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতি অত্যন্ত উজ্জ্বল। মূলত ’৬২’র ছাত্র আন্দোলন, ’৬৬’র ছয় দফা, শিক্ষার্থীদের ১১ দফা এবং ’৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মূল চালিকা শক্তি ছিল ছাত্ররাজনীতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার গত ৫৫ বছর পূর্তিতে বর্তমান রাজনীতির কুশীলব যারা, তারা প্রায় প্রত্যেকেরই রাজনীতিতে অভিষেক, রাজনীতির পাঠ ও অনুশীলনে পোক্ত হয়েছিলেন বিগত শতকের ৬০-এর দশকে। ১৯৭১ সালে আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় যোদ্ধাদের একটি বড় অংশই ছিল ছাত্র একথা আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি। স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী দেশের প্রথম দশকে ছাত্ররাজনীতি তার যথাযথ ভূমিকা তৈরি ও পালন করতে দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। সত্তর দশকে সরকারদলীয় কিংবা বিরোধীদলীয় ছাত্রসংগঠনের বিরোধ রাজনীতিতে ফলদায়ক সম্ভাবনা তৈরিতে ব্যর্থ হলেও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ৮০’র দশকে এ দেশের ছাত্ররাজনীতি সামরিক স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে নতুনমাত্রা পায় বলে আমি মনে করি। তো সেই আশির দশকের ছাত্ররাজনীতির অগ্নিঝরা দিনগুলোতে সদ্য এসএসসি পাস করা আমি আমার কলেজবেলার শুরুতেই দারুণভাবে মজে গেলাম ছাত্ররাজনীতিতে। তখন বুকে কেবলই ‘নূর হোসেন’ হবার স্বপ্ন। ‘একদফা একদাবি, এরশাদ তুই কখন যাবি’? ‘একদফা এক দাবি এরশাদ তুই এখন যাবি’। ‘এরশাদ তুই স্বৈরাচার, গদি কি তোর বাপ-দাদার’- এই সব স্লোগানে স্লোগানে আর দেয়াল লিখনে একটা ঘোর আর অন্যরকম ভালোলাগা। হঠাৎই যেন বড় হয়ে গেলাম আমার সমবয়সী বন্ধুদের চেয়েও। স্কুলের যে বড় ভাইরা তিন/চার বছর আগে আমাদের স্কুল ছেড়েছিলেন সেই বড় ভাইরা বন্ধুর মতো সার্বক্ষণিক সাথী হলেন। সিগারেট খাওয়া, নিয়মিত ক্লাস না করা, ছোটখাট ইস্যুতেও দলবেঁধে প্রতিপক্ষকে ধাওয়া করা, হুমকি দেয়া আরও কতো কী! আহা! কতোই না উত্তেজনা আর ব্যস্ততার সেইসব দিন!
স্বাধীনতা-পূর্ব ৬০-এর দশকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন আর বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ছাত্ররাজনীতির মূলধারা হিসেবে সক্রিয় ছিল বলে আমরা জানি। ৮০’র দশকের ছাত্ররাজনীতিও মূলত বাম ও ডান ঘরানার ১৬টি ছাত্র সংগঠনের বৃহত্তর ঐক্য ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ আর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্বে মধ্যপন্থা ও ডান ঘরানার সাতটি ছাত্রসংগঠনের ‘সংগ্রামী ছাত্র জোট’ এ দু’ধারায় আবর্তিত হতো। এর পাশাপাশি উগ্রধারার ইসলামী ছাত্রশিবিরও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল। জাতীয় রাজনীতির মূলধারায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোট এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দলীয় ঐক্য জোট গঠিত হয়েছিল তখন। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ফলে ১৫ দলীয় জোটে ভাঙন দেখা দেয়। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের আগ পর্যন্ত বিএনপি’র নেতৃত্বে ৭ দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দল এবং বাম রাজনৈতিক দলগুলোর ৫ দলীয় ঐক্যজোট সক্রিয় ছিল। এর বাইরে মৌলবাদী ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিতর্কিত ভূমিকার জামায়াতে ইসলামী মূলধারার জোটগুলোর সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে শরিক হতো। ১৯৮৬ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের অধীন আঁতাতের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী অংশগ্রহণ করলে সেই নির্বাচন বর্জন করে আপসহীন নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার ভাবমূর্তি দারুণভাবে গড়ে ওঠে। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয়ী হতে থাকে। স্বৈরাচারী এরশাদের পতন ডঙ্কা বাজাতে মরিয়া ছাত্রদল সারা বাংলাদেশে একক ছাত্র সংগঠন হিসেবে আবির্ভূত হয়। জিন্সপ্যান্ট আর টি-শার্ট পরা এক ঝাঁক মেধাবী ও সাহসী তারুণ্যের দারুণ এক কাফেলা তখন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সুতিশাড়ির আটপৌঢ় মাতৃপ্রতিম বেগম খালেদা জিয়া সে সময় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের এক ও অদ্বিতীয় পরম আশ্রয় ও অবলম্বন। ঐ যে বাল্যপ্রেমে পড়ার মতো কোনো কিছু না জেনে, না বুঝে একটা তাৎক্ষণিক ভালোলাগা কিংবা বিকল্প পছন্দের সুযোগ না থাকা আমরা বন্ধুরা দল বেঁধে যোগ দিয়েছিলাম জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে। ‘নেত্রী মোদের খালেদা- গর্ব মোদের আলাদা’- কি অদ্ভূত এক টান ছিল স্লোগানের। ‘নেত্রী আছে?- আছে, কোন সে নেত্রী?- খালেদা জিয়া’ মিছিলে মিছিলে নেত্রীর বন্দনার জিকির চলতো সে সময়। সাহসী আর দৃঢ় প্রত্যয়ে স্লোগান দিতাম ‘অ্যাকশন অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন, খালেদা জিয়ার অ্যাকশন ডাইরেক্ট অ্যাকশন’। দৃপ্ত পায়ে পায়ে চলতেই থাকতো মিছিল। ‘শহীদ জিয়া অমর হোক- খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ’ এই সব স্লোগানই ছিল আমাদের রাজনীতির প্রাথমিক পাঠ। আর একটু গভীরে গিয়ে স্লোগান দিতাম ‘সিকিম নয় ভুটান নয়- এদেশ আমার বাংলাদেশ’, ‘রুশ-ভারত-মার্কিন ফুরিয়ে গেছে তোদের দিন’। এভাবে বিশ্বাস দৃঢ় হতে হতে স্লোগান শিখি ‘আর নয় কোনো বিদেশিবাদ, কায়েম করো জাতীয়তাবাদ।’
‘শহীদ জিয়ার মতবাদ-বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। মূলত স্লোগানে স্লোগানেই রাজনৈতিক পাঠ, অনুশীলন ও অংশগ্রহণ পোক্ত হতে থাকে আমাদের। আমরা বন্ধুরা সে সময় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের এক একজন অবিসংবাদিত সিপাহীসালার হিসেবে নিজেদের গড়তে প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠন আর স্বৈরাচার পুলিশ দুইপক্ষের সঙ্গে গোলাগুলি ও ককটেল চার্জ করতেও দ্বিধা করতাম না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুলিশের সঙ্গে কিংবা প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ‘অস্তিত্ব সুরক্ষা কিংবা আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের’ সংবাদ আমাদের দারুণভাবে আলোড়িত ও উদ্বেলিত করতো। সেই সময় আমরা যারা, উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরে যাদের বসবাস তারা দৈনিক পত্রিকা পেতাম পরদিন সকালে। জাতীয় দৈনিকগুলো ঢাকা থেকে সৈয়দপুরে বা যশোরে যেত প্লেনে। এরপর ট্রেনে/বাসে করে বিভিন্ন জেলা শহরে। তো সেই বাসি খবরের কাগজই মৌ মৌ গন্ধভরা টাটকা খবরের কাগজ আমাদের কাছে। কলেজ হোস্টেলের পত্রিকা ডেস্কে পালাক্রমে একজনের কাঁধে অপরজন শ্বাস ফেলতে ফেলতে গোগ্রাসে পড়ে ফেলতাম সেই সব দৈনিক পত্রিকা। ইত্তেফাক, সংবাদ, ইনকিলাব আর বাংলাদেশ অবজারভার। সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে ছিল বিচিত্রা, রোববার আর যায়যায়দিন। সাপ্তাহিক বিচিন্তাও পড়তাম আমরা। অবশ্য দৈনিক খবরের কাগজ ছাড়াও সে সময় আমরা নিয়মিতভাবে রেডিওতে বিবিসি আর ভয়েস অব আমেরিকা শুনতাম। সারাদিন হরতাল পালন শেষে সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে উৎসুক মানুষের খবর শোনার জন্য সে কী ভিড়! সেই ভিড়ে নিজেদের ভেতরে দারুণ এক হিরোইজম অনুভূত হতো। খবর শুনতাম আর মনে মনে অভিসম্পাত করতাম ‘খবর শুনতে ভিড় করা সেই সব মানুষদের’। ইশ! এত মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যদি আমাদের মিছিলে আসতো। কী ভালোটাই না হতো আমাদের আন্দোলনের! তো রাজনীতির পাঠ শাণিত করতে নিয়মিত পত্রিকার খবর পড়া, সম্পাদকীয় আর উপ-সম্পাদকীয় পড়া কিংবা বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদ বিশ্লেষণ বিষয়ক ফিচার শোনা। অতটুকুই। প্রতিপক্ষের সঙ্গে রাজনৈতিক আড্ডার বিতর্কে খুব যে পেরে উঠতাম তা না। তাদের নানারকম তাত্ত্বিক আলোচনায় মন খারাপ হয়ে যেত আমার। আমার দলকে জানবার বা বুঝবার মতো বই কীভাবে পাই, কোথায় পাই- এ নিয়ে কিছুটা উৎসুক তৈরি হতে থাকে নিজের ভেতর। ১৯৮৭ সালে দিনাজপুর জিলা স্কুল থেকে আমরা যারা এসএসসি পাস করি তাদের অধিকাংশই ভর্তি হই দিনাজপুর সরকারি কলেজে। অবশ্য প্রথমে আমি ভর্তি হই আমার নিজ শহর জয়পুরহাট সরকারি কলেজে।
ভর্তি হয়েই একদিন হঠাৎই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মিছিলে ভিড়ে গিয়েছিলাম বন্ধুরা সবাই মিলে। সুনির্দিষ্ট কারও আহ্বান ছাড়াই। কোনো কিছু না জেনে বা বুঝেই। সে মিছিল করে নিজের ভেতরে দারুণ এক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। এরপর বাবার পীড়াপীড়িতে পুনরায় দিনাজপুরে গিয়ে কলেজে ভর্তি হলাম। কলেজে ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়ে আব্বা আমাকে বললেন, “এই যে দেয়াল লিখনগুলো দেখছিস, আমি যখন তোর মতো বয়সে কলেজের ছাত্র ছিলাম তখনো এই দেয়াল লিখনগুলোই ছিল। একটুও বদলায়নি। কিছু তাজা প্রাণের আত্মাহুতি ছাড়া ছাত্ররাজনীতি দিয়ে আসলে এ পর্যন্ত কিছু হয়নি এদেশে।” আব্বা আমাকে সতর্ক করে আরও বললেন যে, “আর যাই করিস কলেজে ছাত্ররাজনীতি করবার দরকার নাই। কথাটা মনে রাখিস”। আব্বার সেকথা সেদিন মূল্যহীন মনে হলেও আমার অভিজ্ঞতায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও অর্ন্তর্নিহিত তাৎপর্যময় মনে হয় এখন। আমার আব্বা সে সময় দিনাজপুরে একটি বেসরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। সপ্তম শ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত আমার পড়াশুনা দিনাজপুরে। মাঝখানে কিছুদিন জয়পুরহাট সরকারি কলেজের ছাত্র ছিলাম আমি। দিনাজপুরে বাবা-ছেলের সংসার ছিল আমাদের। কলেজে আব্বা আমাকে হোস্টেলে দিয়ে তিনি এক বাসায় সাবলেট থাকতেন। মাঝে মধ্যে দেখা হতো আমাদের। আমি গিয়ে দেখা করতাম আব্বার সঙ্গে আবার আব্বাও কখনো কখনো আমার হোস্টেলে এসে দেখা করতেন। কলেজ বেলায় হোস্টেল জীবনে সে এক অবাধ স্বাধীনতা আমার। আর তখন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় হঠাৎ করে অনেক বড় হয়ে গেলাম আমি। সেই হঠাৎই বড় হওয়া আমার মনে কেবল ‘রাজনীতিই মুক্তির একমাত্র পথ’ বিবেচিত হতে থাকে। আমার মন থেকে তখন মধ্যবিত্ত বাঙালি শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য ‘ডাক্তার’ বা ‘ইঞ্জিনিয়ার’ কিংবা ‘শিক্ষক’ হওয়ার বাসনা উবে যায়। তখন মনে হতে থাকে ‘কি হবে এইসব পাস দিয়ে!’ ‘কেবল যেকোনো একটি বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র হবার আর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হবার স্বপ্নে বিভোর’ আমি। তখন কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতির খোলনলচে বদলে দেয়ার কী অদম্য স্বপ্ন আমার। এসএসসিতে দিনাজপুর জিলা স্কুল থেকে স্টারমার্কস সহ পাস করে কেবল রাজনৈতিক অংশগ্রহণের কারণে উচ্চ মাধ্যমিকে আমার পাঠ বিরতি ঘটে। ততদিনে আব্বাসহ গ্রামের বাড়িতে বসবাসরত আমার আম্মা ও ভাইবোনেরা বুঝে ও জেনে গেছেন আমার রাজনীতিতে অংশগ্রহণের কথা। আমার আম্মা আমাকে রাজনীতি থেকে ফেরাতে আমাদের মহল্লার মেধাবী ছাত্র ‘আজম ভাই’ ও ‘শান্তা ভাইয়ের’ উদাহরণ দিয়ে বলতেন ‘তোর পরিণতিও ওদের মতোই হবে। পড়াশুনাতে ডাব্বা খাবি আর রাজনীতিতেও হতাশ হবি’। আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি শান্তা ভাই আর ‘আজম’ ভাই না পারলে আমি পারবো না কেন? নিশ্চয় পারবো আমি’। আমাদের গ্রামের স্কুলের দুই মেধাবী ছাত্র ছিলেন আজম ভাই ও শান্তা ভাই। এরা দু’জনই কলেজে ছাত্ররাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে এবং এইচএসসি পরীক্ষায় খারাপ ফল করে। উচ্চতর শিক্ষায় তারা আশানুরূপ সাবজেক্টে ভর্তি হতে পারেন নি।
পরবর্তীতে রাজনীতি থেকেও অকাল বিচ্যুতি ঘটে তাদের। আমার পরিণতিও আমার আম্মার শঙ্কারই পুনরাবৃত্তি দেখতে পেয়ে মনে মনে আতঙ্কিত হই। আমি না পারলে তো রাজনীতিতে ব্যর্থতার উদাহরণ আরও দীর্ঘ হবে। পরের বছর এইচএসসিতে দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে পাস করলাম আমি। ইতিমধ্যে তৃতীয় দফা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আব্বা মারা গেলেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে আমি ছোট। এসময় আম্মার সঙ্গে আমার দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। আমার প্রতি তার কেমন জানি নির্লিপ্ত ভাব। আমার কোনো কিছুতেই কোনো মতামত নেই তার। আম্মার এই নির্লিপ্ততাকে ভীষণ ভয় পেতাম। তবু এইচএসসি দিয়ে কেবল ঢাকায় আসা নিশ্চিত করতে আম্মাকে খুশি করার ছলনায় মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষার কোচিংয়ে ভর্তি হই। উদ্দেশ্য ভর্তি কোচিং নয়, রাজধানীতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শামিল হওয়া। হতামও তাই। শাহবাগ, টিএসসি আর মধুর ক্যান্টিন কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হল আমার কেবলা তখন।
১৯৯০ সালের অক্টোবর-নভেম্বরের দিনগুলোতে ঘোরলাগা মাতম আমার মনে। ২৭শে নভেম্বর ডা. মিলনের মৃত্যুর মধ্যদিয়ে আন্দোলন পেলো নতুন মাত্রা। নভেম্বরের ২৭ থেকে ডিসেম্বরের ৩ তারিখ। আমার রাজনৈতিক জীবনে দারুণ এক মাহেন্দ্রক্ষণ। এরপর এলো কাঙ্ক্ষিত সেই দিন। ৪ঠা ডিসেম্বরেই আমরা জেনে গেলাম এরশাদের পতনের খবর। ৫ই ডিসেম্বর ঢাকার রাজপথে মানুষের ঢল আর সে ঢলে আমার সাঁতার কাটা ও ভাসাভাসি। আহা! কী সেই আনন্দ, প্রাপ্তি কিংবা অর্জন! ৬ই ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পতন ঘটে এরশাদের। ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয়ী হয়। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে সরকার গঠন করেন। যেকোনো রাজনৈতিক কর্মীর জীবনে একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে “তার দল ক্ষমতায় গিয়ে দলীয় কর্মসূচি রাষ্ট্রীয় কল্যাণে বাস্তবায়ন করবে”। আমার রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মাত্র চার বছরেই আমার সে স্বপ্ন পূরণ হয়। এটা যে একজন রাজনৈতিক কর্মীর কাছে কতো বড় পাওয়া তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। তবে ১৯৯১ সালের সে নির্বাচনে বিএনপি’র বিজয়ী হওয়া তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে ‘আবাহনী-মোহামেডানের’ খেলায় পছন্দের দলের বিজয়ী হওয়ার মতোই আনন্দ দেয় আমাকে। দারুণ এক অনুভূতি ক্রিয়া করে আমার ভেতর। আমার পাঠ্যবইয়ের পাতায় তখন কেবলই বেগম খালেদা জিয়ার ছবি ভাসে, আর কিছুই দেখি না বা পড়তে পারি না। বেগম খালেদা জিয়াকে বিটিভি’র রাত আটটার সংবাদে দেখেই আমি আহ্লাদে আটখানা হয়ে যাই। আকাশে হেলিকপ্টার দেখলে যখন বুঝি, আমার নেত্রী এক জনসভা থেকে আর এক জনসভায় যাচ্ছেন তখন কী যে ভালো লাগতো আমার! তো এই সব ভালোলাগার ভেতরে মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা শেষ হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাও শেষ হয়। অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এ ভর্তি পরীক্ষাগুলোর কোনো প্রকার প্রস্তুতি ছাড়া অংশগ্রহণ করে চান্স পাওয়া আমার কপালে জোটে না। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বদল করে জাহাঙ্গীরনগরে সরকার ও রাজনীতি বিভাগে ভর্তি পরীক্ষা দেই। সে বছর কেবল ঐ একটি সাবজেক্টেই পরীক্ষা দেই। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে তোমার প্রিয়ব্যক্তি রচনায় লিখি “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া”র নাম। কী প্রেম! আহা! বাড়ি ফিরে আম্মাকে যখন বলি তখন আম্মা যখন বলে যে “তোর বাবাকেও তো তোর প্রিয় ব্যক্তিত্ব লিখতে পারতি, তখন মনের ভেতরে একটু কেমন জানি অনূভূতি তৈরি হয়”। সে বছর কোথাও চান্স না পেয়ে আমি ঢাকা কলেজের তৎকালীন ভিপি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নেতার সার্বিক সহযোগিতায় রসায়নে অনার্সে ভর্তি হই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারার যন্ত্রণা আমার ভেতরে হতাশা তৈরি করে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছাকাছি আসা এবং রাজনীতির হাল-চাল আরও নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ তৈরি হলে স্বপ্নভঙ্গের অনুভূতি তীব্র হতে থাকে। আজীবন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার এবং ছাত্ররাজনীতি করার স্বপ্ন দূরবর্তী হলে কেমন এক অবসাদ তৈরি হতে থাকে মনে মনে। এসময় জাতীয় সংসদের অধিবেশন দেখার সুযোগ ছিল আমার। ৫ম জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ সবগুলো সংসদ বিতর্ক সরাসরি দেখবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। জাতীয় সংসদ ভবনের দর্শক গ্যালারি থেকে, পার্লামেন্টারি লাউঞ্জে বসে, কিংবা ক্যাফেটেরিয়াতে ও এমপি হোস্টেলে জাতীয় নেতৃবৃন্দকে অনেক কাছে থেকে দেখা ও জানার সুযোগ হলো সে সময়। নেতৃত্বের প্রতি মোহভঙ্গও ঘটতে থাকলো। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম যেতে হবে বহুদূর। পড়াশুনাতে দু’বছরের বিরতি এ আর এমন কী! তাছাড়া শান্তা ভাই ও আজম ভাইয়ের মতো আমিও যদি অন্যকোনো মেধাবী তরুণের মায়ের কাছে উদাহরণ হই তবে তো রাজনীতির ক্ষতি হবে ভীষণ। ততদিনে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি বুঝে গেছি তা। নিজেকে আবারো পরবর্তী বছরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সরকার ও রাজনীতি বিভাগে ভর্তির জন্য তৈরি করতে থাকি এবং চূড়ান্তভাবে ভর্তির সুযোগও পাই। তখন আমার আম্মা আর কোনোভাবেই আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে রাজি নন। তার ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংঘাতে মৃত্যু হবে আমার। আমিও নাছোড়বান্দা, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বোই। আম্মা কৌশলে আমার একমাত্র ফুপুকে দিয়ে রাতে ভাতের থালায় শপথ করান আমাকে “যেন আমি বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি না করি”। ততদিনে ‘মানুষ পণ করে পণ ভাঙ্গিয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিবার তরে’ আমার জানা হয়ে গেছে। আমি অবলীলায় পণ করি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরুর আগের দিন হলে উঠে নবীন ছাত্রদের স্বাগতম জানিয়ে আয়োজিত মিছিলে সে রাতেই যোগ দিই আমার প্রিয় ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাকসুতে সে সময় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের হ্যাটট্রিক বিজয়ের কাল।
রাজনীতির ছাত্র হওয়া এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মী হওয়া আমার ভেতরে ভিন্নমাত্রার এক অনুভূতি তৈরি করে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররাজনীতিতে আন্তঃদলীয় সহিংসতা, আন্তঃদলীয় কোন্দলে আমার মার খাওয়া, শিক্ষকদের ক্ষমতা ও পদ-পদবির লোভের রাজনৈতিক স্বার্থে ছাত্র সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করা, ছাত্রনেতাদের শ্রেণিকক্ষ ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সম্পর্কহীনতা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক ছাত্র সংসদ নির্বাচন নির্বাসনে দেয়া এবং সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের রাজনীতির স্বরূপ ও ভূমিকা যথাযথভাবে নির্ধারিত না থাকায় ক্রমান্বয়ে আমার রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কমতে থাকে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে। তদুপরি ১৯৯৬ সালের ১২ই জুন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় পরবর্তী প্রশাসন ও পুলিশ আর বহিরাগতের সহযোগিতায় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের হল দখল এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বৈধ ছাত্রদের হল ও ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি রাজনীতিতে আমার অংশগ্রহণের তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে নানাভাবে বিঘ্নিত করে। বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে আমার সর্বোচ্চ অর্জন সহ সভাপতি পদ। যদিও সে কাউন্সিল দলীয় অন্তর্কলহের কারণে আমরা বর্জন করেছিলাম।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের চরিত্র একটু ভিন্নমাত্রার ছিল বরাবরই। ১৯৮৯ সালে জাকসুতে ভিপি ও জিএস পদে মাত্র ২৯ ও ১৭ ভোটে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কাছে একক সংগঠন হিসেবে ছাত্রদল হেরে গেলে নবনির্বাচিত নেতৃত্বকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেছিল ছাত্রদল। পরবর্তী ৩টি ডাকসুতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল একক সংগঠন হিসেবে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের দারুণ জৌলুস দেখেছি। পরবর্তীতে সংগঠনের ভেতরে ‘লোকাল’ ও ‘এন্টিলোকাল’ বিরোধ, নিয়মিত কাউন্সিল না হওয়া, জাকসু নির্বাচনের অনুপস্থিতি, দুর্বল প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠন প্রভৃতি কারণে এ জৌলুস ফিকে হতে থাকে। ১৯৮৯ সালে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা হাবিবুর রহমান কবীর ইসলামী ছাত্রশিবিরের হাতে নিহত হলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও অন্যান্য সকল ছাত্রসংগঠন এক সঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করে এবং তাদের প্রকাশ্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে সামপ্রদায়িকতামুক্ত রাজনীতির অন্যতম কারিগর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল যার ধারাবাহিকতা বিদ্যমান আজও। আমার ক্যাম্পাসকালে ইসলামী ছাত্রশিবির দু’দফা চোরাগোপ্তা আক্রমণ করে ক্যাম্পাস দখলের চেষ্টা করে তাদের রাজনীতি করার অধিকার আদায়ের দাবি জানালে সাধারণ ছাত্রছাত্রী ও অন্যান্য সকল ছাত্রসংগঠন আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্বে তা প্রতিহত করা হয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে সে বছর ২রা নভেম্বরের রাতে তারা একতরফা ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সহাবস্থানের রাজনীতির অবসান ঘটায়। বেশ কয়েক মাস জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সহাবস্থান নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যায়। প্রশাসনের বিমাতাসুলভ আচরণে
ছাত্রদলের ন্যায্য দাবি পরাভূত হলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। ছাত্রলীগের অন্তর্দলীয় কোন্দলে ‘আনন্দ হত্যাকাণ্ড’ ঘটলে তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে একটি অংশ ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়। সে সময় অন্য পক্ষের নেতা জসিম উদ্দিন মানিকের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে ছাত্রী নিপীড়নের মহোৎসব চলতে থাকে। সাধারণ ছাত্র ঐক্যপরিষদের ব্যানারে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধে ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল এই সব আন্দোলন প্রত্যক্ষ করার এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের ছাত্ররাজনীতিতে সাফল্যের ঘাটতি আমাকে শ্রমিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণে ব্রতী করেছিল ভীষণভাবে। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তখন আমার আম্মা মারা যান। আম্মার এ অকাল মৃত্যুতে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের আর কোনো বাধা থাকে না আমার। আব্বা- আম্মার ছোট ছেলে হওয়ায় তেমন কোনো পারিবারিক দায়দায়িত্ব অনুভব করিনি কখনো। তো তখন আমার আদমজীর শ্রমিক হওয়ার বাসনা জেঁকে বসে। বিয়ে-শাদি করার ও প্রথাগত পেশা নির্বাচনের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না আমার। মনে মনে স্বপ্ন দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে কোনোভাবে আদমজী জুট মিলে একটা চাকরি নিয়ে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হবো। কিন্তু সে আশায়ও গুঁড়েবালি। ২০০১ সালের ১লা অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি’র নেতৃত্বে চারদলীয় জোটের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সরকার গঠন করলে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ক্রমাগত লোকসান দেয়া আদমজী জুট মিল বন্ধ করে দেয়। অবশ্য এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষকালে ক্যাম্পাস রাজনীতির খুবই জটিল মুহূর্তে আমি প্রেমে জড়িয়ে পড়ি। মাস্টার্স পাসের সঙ্গে সঙ্গেই একটি চাকরি জুটিয়ে বিয়ে করার দায় তৈরি হয় আমার। এসময় দাম্পত্য, সংসার আর চাকরির জন্য রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণের কিছুটা ছেদ পড়লেও নিয়মিত যোগাযোগ ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন নির্বাচন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম অটুট থাকে। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য আমার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমি সরকারি চাকরির তেমন কোনো চেষ্টা করিনি। বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে ক্যারিয়ার শুরু করলেও পরবর্তীতে মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি দীর্ঘদিন। পাশাপাশি দলীয় রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণও অব্যাহত রেখেছি।
বাংলাদেশের বিগত পঞ্চাশ বছরের রাজনীতিতে ১৯৯০ এর গণ-অভ্যুত্থান অনেক বড় ঘটনা। মূলত ১৯৯০ এর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে সার্বজনীন গণ-অংশগ্রহণের আর কোনো নজির নেই। আমাদের দেশের বিগত ৫০ বছরের ইতিহাসে গত শতাব্দীর নব্বইই একমাত্র মাইলফলক যা টিম টিম বা জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। তিন জোটের রূপরেখার ভিত্তিতে এরশাদের পদত্যাগের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনী নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি ও সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারা সুগম হয়। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাজনীতিকে কয়েকটি পর্যায় আমরা দেখতে পারি। প্রথমত: দলীয় অন্তর্কলহ, ভাঙন ও স্বপ্নভঙ্গের প্রাথমিক কাল ১৯৭২-১৯৭৫ সময়কাল। এসময়ের সদ্য স্বাধীন দেশে সকল সম্ভাবনা ও সুযোগ থাকার পরেও জাতীয় ঐক্যের ফাটল তীব্রভাবে অনুভূত হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সামরিক ও বেসামরিক দ্বন্দ্ব ভেতরে ভেতরে ক্ষোভের আগুনে সঞ্চারিত হতে থাকে। সামরিক শিবিরে নানা মাত্রায় উপর্যুপরি আত্মঘাতী সংঘাত তীব্রতর হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বে বাহ্যিক ঐক্যের সুর ধ্বনিত হলেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে তা নানা উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দা, দারিদ্র্য আর দুর্ভিক্ষ, সুশাসনের সংকট, রাষ্ট্রীয় মতাদর্শিক দোদুল্যমানতা এবং মুহুর্মুহু ক্ষমতার পালাবদলে হাঁপিয়ে উঠে দেশবাসী। দ্বিতীয়তঃ ১৯৭৫- ১৯৯০ সময়কাল হচ্ছে বহুদলীয় গণতন্ত্র, রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার, সামরিক স্বৈরাচার ও রাজনীতির সামরিকীকরণের কাল। এসময়ের রাজনীতিতে সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের দুজন সেনানায়কের শাসন দেশবাসী প্রত্যক্ষ করে। জিয়াউর রহমান মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী যোদ্ধা আর এরশাদ হচ্ছে পাকিস্তানে আটকে পড়া সামরিক কর্মকর্তা। একজন বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক আর অন্যজন অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক স্বৈরাচার। জিয়া সিপাহী-জনতার ঐক্যে বিপ্লব ও সংহতির প্রতীক হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন আর এরশাদ রাতের অন্ধকারে অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক ক্যু-এর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। জিয়ার সততা ও দেশপ্রেম পরীক্ষিত আর অপরজন এরশাদ যিনি রাজনীতিতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের হিরণ্ময় কারিগর ও কাণ্ডারি। জিয়া হত্যা পরবর্তী ক্যু-এর মাধ্যমে জিয়ার রাজনীতি ক্ষমতা হারালেও এরশাদের পতন ঘটে দেশের আপামর জনসাধারণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও আকাঙ্ক্ষায় গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। রাজনীতির সামরিকীকরণের ঐকালে জিয়া ও এরশাদ একই পথে হাঁটলেও জিয়া নন্দিত রাষ্ট্রনায়ক আর এরশাদ দারুণভাবে নিন্দিত স্বৈরশাসক।
তৃতীয়তঃ ১৯৯১-২০০৬ সাল পর্যন্ত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং সংসদীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তনের কাল। মূলত এসময় কালে নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের গণতান্ত্রিক উপায় পালাবদলের সংস্কৃতি তৈরি হয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী পরাজিত দল এসময় অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করলেও তা তাদের মুখরক্ষার রাজনীতি হিসেবেই দেশবাসী মনে করে। ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ সালের ১২ই জুন এবং ২০০১ সালের ১লা অক্টোবরের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য অনন্য মাইলফলক বলে আমি মনে করি। সংসদীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্খলন, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে যেকোনো উপায়ে কব্জা করার হীন রাজনৈতিক মানসিকতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণে ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সন্দেহ ও আস্থাহীনতায় বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে কালমেঘ ঘনীভূত করে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসের ১১ তারিখে তথাকথিত ১/১১’র মস্তকহীন কিম্ভূতকিমাকার সরকার আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। আর চতুর্থতঃ ২০০৭ সাল থেকে বর্তমান সময়কালের রাজনীতি। ২০০৭ সাল পরবর্তী আওয়ামী লীগের একতরফা ফ্যাসিস্ট রাজনীতির একালে রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতার চরমতম অবস্থায় আমরা আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উদ্যাপন করতে যাচ্ছি। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির একতরফা ভোটারবিহীন নির্বাচন পরবর্তী বিরোধী রাজনৈতিক মতামত দমনের যে সংস্কৃতি চলছে তা আমাদের সকল গণতান্ত্রিক অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছে। এদেশের মানুষ অবাক বিস্ময়ে ২০১৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর মধ্যরাতের নির্বাচনও প্রত্যক্ষ করেছে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের একজন ক্ষুদ্রকর্মী হিসেবে ৯০ পরবর্তী রাজনীতিতে আমার ধারাণা ছিল এ গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্তত দুটো বিষয় স্থায়ীভাবে অর্জিত হয়েছে। এক. অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনী সংস্কৃতির সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতি। দুই রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপের স্থায়ী অবসান। ২০০৭ সালের ১/১১ পরবর্তী রাজনীতি আমার ঐ বিশ্বাসকে দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনা সম্পৃক্ততার পরিধি যেমন বেড়েছে ঠিক তেমনি সংসদীয় রাজনীতি এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনী প্রক্রিয়া আজ দূর দ্বীপবাসী। জাতীয় রাজনীতিতে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকাও বর্তমানে অত্যন্ত ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে, যা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। আমার আব্বা বিগত শতকের ৬০-এর দশকে আইয়ুববিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামের ভেতর দিয়ে আমার রাজনীতির অভিষেক গত শতকের ৮০’র দশকে। আর এখন আমার সন্তানের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বেলায় দেশে চলছে ভোটাধিকারবিহীন অদ্ভুত এক দুঃশাসনের কাল। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পঞ্চাশ বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক উন্নয়নে ভীষণ হতাশাজনক আর একই ভুলের পুনরাবৃত্তিতে ভরপুর।
রাজনীতিতে মেধাবী, সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মীদের অংশগ্রহণই বাংলাদেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটাতে পারে বলে আমি মনে করি। রাজনীতি একটি ক্রমাগত খেলা। ভালোরা না খেললে এ খেলা থেমে থাকে না। তখন দুষ্টু ও অদক্ষদের দিয়েই তা চলতে থাকে। গ্যালারিতে বসে তৃতীয় শ্রেণির খেলোয়াড়দের কাছে আমরা প্রথম শ্রেণির খেলা আশা করতে পারি না। এ ধরনের খেলোয়াড়দের কাছে নিম্নমানের খেলা খুবই স্বাভাবিক। খেলার নিয়মভঙ্গ করা আরও স্বাভাবিক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমনটিই চলছে। ছাত্রজীবনে মেধাবীরা কিঞ্চিৎ দলীয় সম্পৃক্ততা রেখে তা ভাঙ্গিয়ে আমলা হচ্ছে আর কম মেধাবীরা অবৈধভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে রাজনীতিতে নাম লিখিয়ে নীতিনির্ধারক সাজছেন। পরিণামে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। অন্যদিকে আমলারা অবসর গ্রহণ করে কিংবা চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছে। রাজনীতিবিদরাও নিজেদের অজ্ঞতা ও অদক্ষতার ঘাটতি পূরণে নয়া হাইব্রিড নেতৃত্বকে কাছে টানছে। ফলত যা হওয়ার তাই হচ্ছে। রাজনীতিবিদদের স্বেচ্ছাচার ও সীমাহীন ক্ষমতার লোভে আকৃষ্ট হয়ে ব্যবসায়ীরাও উৎসাহী হচ্ছে রাজনীতিতে। লোভী ও দুর্নীতিপরায়ণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের জায়গাও করে দিচ্ছে। এমত পরিস্থিতি আমার মতো রাজনৈতিক কর্মীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ প্রতিনিয়তই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনীতিতে ৭০-এর দশকে বিএনপি’র আর্বিভাবের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে দ্বি-দলীয় ধারার রাজনীতির সূচনা হয় যা ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক মাত্রা পায়। আমি মনে করি বাংলাদেশের রাজনীতিকে গণমুখী করতে দ্বি-দলীয় ভারসাম্যের রাজনীতি খুবই লাগসই ও কার্যকরী। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা পোক্ত করতে জামায়াত ও জাতীয় পার্টির উপর নির্ভর করতে হয় যা এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য খুবই খারাপ নজির। রাজাকার আর স্বৈরাচার যখন ক্ষমতা দখলের নিয়ামক সহায়ক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় তখন রাজনৈতিক নীতি ও নৈতিকতা ভূলুণ্ঠিত হয়। এদেশের রাজনীতিতে তা হয়েছেও বারবার। বিএনপি জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করেছে ২০০১ সালে। অন্যদিকে ক্ষমতা হারানোর পাঁচবছরের মাথায় জাতীয় পার্টি ১৯৯৬ সালেই সরকারের অংশীদারিত্ব পেয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে। যে বিএনপি এরশাদের বিচার করেছিল সেই বিএনপিই ১৯৯৮ সালে জাতীয় পার্টি আর জামায়াতসহ চারদলীয় জোট গঠন করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতির এই সব মেরূকরণ ঘটতে পেরেছে তৃতীয় শক্তিশালী গণমুখী রাজনৈতিক ধারার অনুপস্থিতির কারণে বলে আমি মনে করি। সারা দেশে তৃতীয়ধারার মাত্র ১০ শতাংশ ভোট অথবা জাতীয় সংসদে ৩০টি আসন প্রাপ্তির নিশ্চয়তাই এদেশের নীতিহীন ক্ষমতা দখলের রাজনীতির লাগাম টেনে ধরতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পারিবারিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐতিহ্য, শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা, পেশীশক্তি ও অর্থ ইত্যাদির যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইদানীং অর্থকে অন্যতম প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবে দেখা হয়। রাজনীতিতে অর্থের প্রয়োজনীয়তা আছে তবে আমার মতে তা লবণের মতো। রান্নায় লবণের মাত্রা বেশি বা কম হলে যেমন স্বাদ নষ্ট হয় তেমনই। লবণ যতটুকু প্রয়োজন সেই মাত্রা নির্ধারণ জরুরি। আমাদের রাজনীতিবিদরা এই মাত্রা নির্ধারণে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন পৌনঃপুনিক ভাবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সততার সঙ্গে যুক্ত থাকার দুটো পেশা খুবই লাগসই বলে মনে হয় আমার। প্রথমটি হচ্ছে ডাক্তারি পেশা। এ পেশায় প্রত্যক্ষ সেবা প্রদান যেমন সহজ তেমনি ভাবে অর্থ উপার্জনের সুযোগও অনেক। জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে ডাক্তারি পেশাটি বেশ চমকপ্রদ। পেশার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পছন্দ হচ্ছে ওকালতি। এ পেশায় থেকেও রাজনীতি সহীভাবে করা সহজতর হয় বলেই আমার ধারণা। আমাদের দেশের রাজনীতিতে এটি অনেককাল আগে থেকেই বেশ উপযোগী পেশা।
একদিন যে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, আমার সে স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার আগে রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে কণ্টকাকীর্ণ হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারিনি আমি। সহীহ্ রাজনীতির জন্য লাগসই বা উপযোগী যে দু’টি পেশা ডাক্তার কিংবা উকিল তাও হওয়া হয়নি আমার। পৈতৃকসূত্রে বা বৈবাহিক সূত্রে কিংবা পেশাগত ভাবে তেমন বিত্তবৈভবের মালিকও হতে পারিনি আমি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ঔপনিবেশিকতা মুক্ত করতে আর সংসদীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে চাওয়া এই আমার কপালে দলীয় মনোনয়নের শিকাও ছিঁড়েনি এখনো। নির্বাচন কিংবা ভোটাধিকার এদেশে এখন সোনার হরিণ। মত প্রকাশ ও বিরোধী মত দমনের ভয় এখন অত্যন্ত প্রকট। এমত পরিস্থিতিতে আমাদের মতো রাজনৈতিক কর্মীর অংশগ্রহণের সকল পথ সংকুচিত হলেও রাজনীতিতে জনবান্ধব, সৃষ্টিশীল ও মেধাবী নেতৃত্বে অংশগ্রহণের ন্যায্যতা আরও তীব্রতর হয়েছে। দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নে রাজনীতিতে আমার অংশগ্রহণের লড়াই আমার অকাল প্রয়াত আম্মার সেই অশুভ অশনি আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার লড়াই। লড়াইটা দিন দিন আরও কঠিনতর হচ্ছে। তবু আমি রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনে আমার মতো মানুষের রাজনীতিতে টিকে থাকার কোনো বিকল্প দেখি না আজও। এ টিকে থাকা বাল্যপ্রেমের সফল পরিণতি পরিণয়সূত্রে দাম্পত্য টিকিয়ে রাখার মতোই। এ টিকে থাকা নিয়ে হাসাহাসি আর বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত মানসিকতার বলে ফুঁৎকারে সমালোচনাকারীরা উড়িয়ে দিলেও কিচ্ছু যায় আসে না আমার। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আমার বাল্যপ্রেম আর বিএনপি আমার পরিণয়সূত্রে দাম্পত্য। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনার সে সংসার আমার চলছে তো। এ চলতে পারা নিশ্চয় একদিন এদেশের রাজনীতিকে জনবান্ধব গণতান্ত্রিক আর নিষ্কলুষ করবে।
পাদটীকা: ২০২১ সালে বাংলাদেশের যখন ৫০ বছর পূর্তির সময় তখন আমার বন্ধুরা একটি বই প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। ২০২০ সালে করোনা মহামারি কালে প্রায় একবছর অনলাইন ও অফলাইন আড্ডায় কাঙ্ক্ষিত বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায় পরিকল্পনা ও নিবন্ধ লেখার প্রস্তুতি চলে। ২০২১ সালের ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের পঞ্চাশে আমাদের যাদের বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বা পঞ্চাশ কিংবা কিছুটা পঞ্চাশ পেরিয়েছি তাদের আনাড়ি হাতের লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয় “স্বপ্নের বাংলাদেশ” নামক বইটি। বন্ধু শাকিল আহমেদ, সহযোগী অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে উল্লিখিত শিরোনামে একটি লেখা লিখতে বলে। আমি নিয়মিত লেখক নই। অনেক কষ্টে “রাজনীতিতে অংশগ্রহণের উপাখ্যান” শিরোনামে লেখাটি লিখি। “স্বপ্নের বাংলাদেশ” বইটির সম্পাদনা পরিষদ লেখাটির নানা ফিডব্যাক দেয়। সে সব ফিডব্যাক যুক্ত বা বিযুক্ত করে লেখাটি চূড়ান্ত হয়। কিন্তু আফসোস ঐ বইয়ে আমার এ লেখাটি আর ছাপা হয় না। না ছাপার কারণ হিসেবে বন্ধু শাকিল জানায় যে, বইটির রাজনীতি অধ্যায়ের জন্য তেমন কোনো লেখা না পাওয়ায় স্বপ্নের বাংলাদেশ বইটিতে রাজনীতি অধ্যায়টি বাদ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পঞ্চাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতি অধ্যায়টি বাদ রেখেই প্রকাশিত হয় স্বপ্নের বাংলাদেশ বইটি। ফ্যাসিস্ট হাসিনা রেজিমে বাংলাদেশের পঞ্চাশ একটি বড় ঘটনা। এই লেখা ছাড়া স্বপ্নের বাংলাদেশ বই প্রকাশও হাসিনা রেজিমের রাজনীতিহীনতার একটি বড় উদাহরণ। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটুক। রাজনীতির বিকল্প প্রতিবাদ হোক কাজনীতি। এটাই আমার প্রত্যাশা।
লেখক: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সহ-সভাপতি। ২২শে জানুয়ারি ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিতব্য বাতিল হয়ে যাওয়া নির্বাচনে সংসদীয় আসন জয়পুরহাট-২ (বাংলাদেশ-৩৫) এ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। এরপর থেকে বিএনপি যেসব জাতীয় নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণ করেছে তার সবক’টিতেই দলীয় মনোনয়ন চেয়ে বিফল। ২০০৯ সাল থেকে জয়পুরহাট জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি। এ ছাড়া জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হিসেবেও কাজের অভিজ্ঞতা এক দশকের। ২০১৯ সাল থেকে বিএনপি’র হিউম্যান রাইটস বিষয়ক জাতীয় সেলে নিয়মিতভাবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দিবসে দলীয় ক্রোড়পত্র প্রকাশের টিমে নিয়মিতভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। বিএনপি’র নারী ও শিশু বিষয়ক জাতীয় কমিটিরও একজন সক্রিয় সদস্য।