বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস কেবল ক্ষমতা বদলের নিছক কোনো দলিল নয়, আদর্শিক সংঘাত, ভূ-রাজনৈতিক মেরূকরণ, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং নিরন্তর শ্রেণি-সংগ্রামের অতিশয় জটিল আখ্যান। প্রাক-বৃটিশ আমলের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো থেকে শুরু করে স্বাধীনতাপরবর্তী সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের বিকাশ, স্বৈরশাসন এবং ২০২৪ সালের নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে সমকালীন রাজনীতি প্রতিনিয়ত তার রূপ ও চরিত্র পরিবর্তন করেছে। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান-পতন, মতাদর্শগত বিভাজন, নেতাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং স্বার্থকেন্দ্রিক জোট গঠনের বিচিত্র সমীকরণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছে।
বাংলার রাজনীতির আদি রূপরেখা বুঝতে হলে প্রাক-বৃটিশ আমলের বারো ভূঁইয়া ও নবাবী শাসনের পতন এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য বিস্তারের ইতিহাস অনুধাবন করা অপরিহার্য। ১৭৬৫ সালে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানি প্রশাসন বাংলার ভূমি রাজস্ব নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। রেজা খাঁ ও সিতাব রায়ের মতো স্থানীয় অভিজাতদের সঙ্গে আঁতাত করে ইজারাদারি প্রথার মাধ্যমে যে তীব্র অর্থনৈতিক শোষণ চালানো হয়, তার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৭৭০ সালের ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’, যা বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।
এই অরাজক পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নিজেদের রাজস্ব আয় স্থায়ী করতে ১৭৯৩ সালের ২২শে মার্চ লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তন করেন ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’। এই বন্দোবস্তের মাধ্যমে বাংলার কৃষিব্যবস্থায় আমূল কাঠামোগত পরিবর্তন আসে। জমির ওপর জমিদারদের স্থায়ী মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বংশানুক্রমিক অনুগত অভিজাত শ্রেণির জন্ম হয়, যারা মূলত বৃটিশদের পাহারাদার ও রাজস্ব আদায়কারী এজেন্ট হিসেবে কাজ করতো। এই ব্যবস্থার সুদূরপ্রসারী প্রভাবটি ছিল ভয়ঙ্কর কৃষকরা, যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল বাংলার মুসলমান, তারা তাদের প্রথাগত ভূমি অধিকার হারিয়ে কার্যত কোর্ফা প্রজা বা দাসে পরিণত হয়। বর্ণহিন্দু জমিদারদের অধিকাংশের বাসস্থান ছিল কলকাতায়, আর তারা পূর্ববঙ্গের অবহেলিত মানুষের রক্ত পানি করা খাজনার টাকায় বিলাসী জীবনযাপন করতো।
বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এই অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক রূপ ধারণ করে। ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর লর্ড কার্জন প্রশাসনিক সুবিধার কথা বলে বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে দ্বিখণ্ডিত করেন, যা ‘বঙ্গভঙ্গ’ নামে পরিচিত। নতুন প্রদেশ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’-এর রাজধানী হয় ঢাকা, যা পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান, এবং প্রশাসনিক অবকাঠামো উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। কিন্তু বর্ণহিন্দু জমিদার ও কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের তীব্র আপত্তির মুখে স্বদেশী আন্দোলন ও সশস্ত্র বিপ্লব শুরু হয়।
এই বঙ্গভঙ্গই বাংলার রাজনীতিতে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক সাম্প্রদায়িক বিভাজন রেখা টেনে দেয়। নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার তাগিদে ১৯০৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ’র উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’। বৃটিশ সরকার ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা প্রকারান্তরে মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে আরও সুসংহত করে। বঙ্গভঙ্গ রদের এই সিদ্ধান্তই মূলত ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন এবং এমনকি ১৯৭১ সালের স্বাধীন বাংলাদেশের ভৌগোলিক মানচিত্রের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষের মোহভঙ্গ ঘটতে শুরু করে। ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নগ্ন আগ্রাসন নতুন এক রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেয়।
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। এর নেপথ্যে ছিল ১৯৪৭-এর বাংলাভাগের পর থেকেই গড়ে ওঠা ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক কর্মীদের দীর্ঘ আন্দোলন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কেন্দ্রীয় সরকার ও উর্দুভাষী নেতৃত্ব উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নিলে ঢাকায় প্রফেসর আবুল কাসেমের নেতৃত্বাধীন তমদ্দুন মজলিস প্রথমদিকে সংগঠিতভাবে বাংলার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৪৮ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে; একই সময়ে ছাত্রসমাজ, মুসলিম ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিসসহ বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়। ১৯৫২ সালে খাজা নাজিমুদ্দীন আবারো উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান ঘোষণা করলে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে ৩১শে জানুয়ারি সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং কাজী গোলাম মাহবুব আহ্বায়ক হন; এর সঙ্গে ছাত্রনেতা আবদুল মতিন, আবদুল গাজীউল হক, অলি আহাদসহ বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মী যুক্ত ছিলেন। তাই ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনকে শুধু কয়েকজন ছাত্রের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ হয়-এর পেছনে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তমদ্দুন মজলিস, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, ছাত্রসমাজ, বাম ও প্রগতিশীল সংগঠন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত দীর্ঘ প্রস্তুতি ছিল।
১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন ঢাকার কে. এম. দাস লেনের রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের সমন্বয়ে গঠিত এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক হন শামসুল হক। তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান কারাবন্দি অবস্থাতেই যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগে বামপন্থি ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার ব্যাপক প্রভাব ছিল। ১৯৫৫ সালের ২১ থেকে ২৩শে অক্টোবর অনুষ্ঠিত তৃতীয় কাউন্সিলে অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ধারণের জন্য দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে আদর্শিক দ্বন্দ্ব চরম রূপ নেয় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে কেন্দ্র করে। হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘেঁষা (ঝঊঅঞঙ, ঈঊঘঞঙ সামরিক জোট) পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন এবং দাবি করেন যে, পূর্ব পাকিস্তান ৯৮ শতাংশ স্বায়ত্তশাসন পেয়ে গেছে, সুতরাং স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের আর প্রয়োজন নেই। মওলানা ভাসানী, যিনি ছিলেন ঘোর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, এই নীতির তীব্র বিরোধিতা করেন। ভাসানী মনে করতেন সোহ্রাওয়ার্দীর “জিরো প্লাস জিরো সমান জিরো” নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ওয়ান’ ধরা হয়েছে, যা প্রকারান্তরে সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ।
১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়। ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানকে লক্ষ্য করে তার বিখ্যাত “আসসালামু আলাইকুম” উচ্চারণ করেন এবং স্বায়ত্তশাসন ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার প্রশ্নে আপসহীন থেকে ওই বছরের মার্চ মাসে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। ভাসানীর এই দলত্যাগের ফলে আওয়ামী লীগের বামপন্থি অংশটি বেরিয়ে গিয়ে ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ (ন্যাপ) গঠন করে। এর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব ছিল অভাবনীয়। ভাসানীর প্রস্থান এবং প্রগতিশীলদের নিষ্ক্রমণের ফলে আওয়ামী লীগ আবুল মনসুর আহমদ ও আতাউর রহমান খানদের মতো নেতাদের প্রভাবে একটি নিখাদ দক্ষিণপন্থি ও মধ্যবিত্তের জাতীয়তাবাদী সংগঠনে পরিণত হয়।
মওলানা ভাসানীর মতো একজন প্রবাদপ্রতিম নেতার শূন্যস্থান পূরণের জন্য আওয়ামী লীগ এক বিকল্প আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সন্ধান করে। এই প্রেক্ষাপটে দলের হাল ধরেন বৃটিশবিরোধী ঐতিহাসিক সলংগা বিদ্রোহের (১৯২২) তরুণ নায়ক মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একটানা দীর্ঘ এক দশক তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই দীর্ঘ সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান তার ছায়াসঙ্গী হিসেবে দলের যুগ্ম সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে ধাপে ধাপে নিজেকে বাঙালির নেতা হিসেবে প্রস্তুত করেন। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক মানস গঠনে তর্কবাগীশের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য।
আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের ইতিহাস বুঝতে হলে ১৯৫৮ সালের পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিটিও দেখতে হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলায় প্রথমে মুসলিম লীগ সরকারের প্রভাব থাকলেও ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয় কেন্দ্রের সঙ্গে পূর্ব বাংলার সম্পর্ককে নতুন দিকে নিয়ে যায়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের নতুন সংবিধান কার্যকর হলে পূর্ব বাংলার নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান এবং শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক গভর্নর হন; কিন্তু ১৯৫৮ সালের ৩১শে মার্চ প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা তাকে অপসারণ করেন এবং পরে সুলতানউদ্দিন আহমদ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হন। সেই সময় প্রাদেশিক রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান খান এবং কৃষক-শ্রমিক পার্টির আবু হোসেন সরকারসহ বিভিন্ন শক্তির মধ্যে সরকার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল।
এই অস্থিরতার পেছনে শুধু পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই ছিল না; কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ১৯৫৬-৫৮ সালের মধ্যে পাকিস্তানে দ্রুত কয়েকটি কেন্দ্রীয় সরকার পরিবর্তিত হয় এবং ১৯৫৯ সালের সম্ভাব্য সাধারণ নির্বাচনে বাঙালি নেতৃত্ব শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে-এমন আশঙ্কাও ইস্কান্দার মির্জা ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে ছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তৎকালীন নথিতেও বলা হয়েছিল, মির্জা ও আইয়ুব আশঙ্কা করছিলেন যে, নির্বাচনে বাঙালি স্বার্থ ও পূর্ব পাকিস্তানের অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি আরও শক্তিশালী হবে।
৭ই অক্টোবর ১৯৫৮ প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল করেন, জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙে দেন, সামরিক আইন জারি এবং সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন। তিনি সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খানকে Chief Martial Lwa Administrator করেন। কিন্তু মাত্র ২০ দিন পর, ২৭শে অক্টোবর ১৯৫৮, আইয়ুব খান সামরিক বাহিনীর চাপে ইস্কান্দার মির্জাকে পদত্যাগ ও নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে নিজেই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এই অভ্যুত্থানে আজম খান, ওয়াজিদ আলী খান বুরকি ও খালিদ শেখের মতো শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পূর্ব পাকিস্তানে এর তাৎক্ষণিক ফল ছিল গভর্নর ও বেসামরিক রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি। সুলতানউদ্দিন আহমদ ১০ই অক্টোবর ১৯৫৮-তেই গভর্নরের পদ থেকে অপসারিত হন, এরপর জাকির হুসাইন গভর্নর হন। পরে ১৯৬০ সালে আইয়ুব খান তার ঘনিষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজম খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করেন। অর্থাৎ আইয়ুবের শাসনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন ধীরে ধীরে বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে যায়।
এরপর আইয়ুব খান ইধংরপ উবসড়পৎধপরবং নামে একটি বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করান। দলীয় সংসদীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ রেখে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে একটি পরোক্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। একই সময়ে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ থাকলেও ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের বিভিন্ন পরিসরে রাজনৈতিক চেতনা ও বিরোধী মতাদর্শ টিকে থাকে। ১৯৬২ সালে রাজনৈতিক দলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে এই সুপ্ত রাজনৈতিক শক্তিগুলো আবার প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে আইয়ুবের শাসনকে কেবল সামরিক দখল হিসেবে দেখলে পুরো ইতিহাসটি ধরা পড়ে না-এটি ছিল দলীয় গণতন্ত্র ভেঙে একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, যার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে ধীরে ধীরে নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের বামপন্থি রাজনীতি ছিল একদিকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ, মাওবাদ ও সোভিয়েতপন্থি ধারার আদর্শগত দ্বন্দ্বে বিভক্ত, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন ও আইয়ুববিরোধী গণ-আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের প্রশ্নেও তীব্র মতভেদ ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তানের (ঈচচ) ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় বামপন্থিরা বিভিন্ন কৃষক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে মণি সিংহ, মোহাম্মদ তোয়াহা, খোকা রায়, সুখেন্দু দস্তিদার, রণেশ দাশগুপ্ত প্রমুখ নেতার নেতৃত্বে বিভিন্ন ধারা সক্রিয় ছিল; কিন্তু ১৯৬৩-৬৪ সালের চীন-সোভিয়েত বিভাজন পূর্ব পাকিস্তানের বাম রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলে। একদল সোভিয়েতপন্থি থেকে যায়, অন্যদিকে তোয়াহা, আবদুল হক, সিরাজ সিকদার প্রমুখের নেতৃত্বে চীনপন্থি ও পরে বিভিন্ন মাওবাদী ধারা শক্তিশালী হয়। আবার চীনপন্থিদের মধ্যেও মস্কোপন্থি কমিউনিস্টদের সঙ্গে সম্পর্ক, আওয়ামী লীগের ছয় দফা ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতি অবস্থান, এবং সশস্ত্র বিপ্লব বনাম গণ-আন্দোলনের কৌশল নিয়ে নতুন বিভাজন সৃষ্টি হয়। ফলে ষাটের দশকের শেষভাগে পূর্ব পাকিস্তানের বাম রাজনীতি একটি একক সংগঠন বা নেতৃত্বের অধীনে ছিল না; বরং মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট ধারা, মোহাম্মদ তোয়াহার নেতৃত্বাধীন চীনপন্থি ধারা, আবদুল হকের পৃথক বিপ্লবী ধারা এবং সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে নতুন মাওবাদী/বিপ্লবী প্রবণতা-এভাবে বহু ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভাজন পরবর্তীকালে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বাম রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলে।
ষাটের দশকে পূর্ব বাংলার রাজনীতি কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরেও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে। রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনকে কেন্দ্র করে ‘ছায়ানট’-এর মতো সংগঠনগুলোর মাধ্যমে রবীন্দ্রসংগীত ও বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধের এক শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়। রাজনীতি ও সংস্কৃতির এই অভূতপূর্ব মেলবন্ধন বাঙালি জাতীয়তাবাদকে এক ধর্মনিরপেক্ষ ও স্বকীয় রূপ দান করে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চীন-সোভিয়েত আদর্শিক দ্বন্দ্বের (Sino-Soviet split) প্রভাব সরাসরি পূর্ব বাংলার বাম রাজনীতিতে পড়ে। মস্কোপন্থি ও পিকিংপন্থি-এই দুই ধারায় কমিউনিস্টরা বিভক্ত হয়ে যায়। মাত্র এক বছরের মাথায় ভাসানীর ন্যাপও এই আন্তর্জাতিক বিভাজনের শিকার হয়। মস্কোপন্থি ন্যাপ (মোজাফফর) আওয়ামী লীগের সঙ্গে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করে, কারণ তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসক্রিপশন ছিল জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়াদের সঙ্গে মিলে কাজ করা। অন্যদিকে পিকিংপন্থি ন্যাপ (ভাসানী) সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের বিরোধিতায় সোচ্চার হয় এবং সশস্ত্র বিপ্লবের লাইনে অগ্রসর হতে থাকে।
১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ (রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য) দায়ের করে। অভিযোগ ছিল, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় বসে ভারতীয় অর্থ ও অস্ত্রের সাহায্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ ঘটিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। এই মামলার বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। আকর্ষণীয় ও ঐতিহাসিক একটি বিষয় হলো, সে সময় শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে ডান-বাম রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে গঠিত ‘ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি’ (ডিএসি)-তে অন্যান্য দলের পাশাপাশি পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীও যুক্ত ছিল। জামায়াত বলে থাকে, এই অ্যাকশন কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন জামায়াতের তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম এবং জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন আব্দুস সামাদ আজাদ। তৎকালীন রাজনীতির এটি একটি অদ্ভুত সমীকরণ, যেখানে পরবর্তীকালের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির এক প্রধান রূপকার ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য রাজপথে আন্দোলন করেছিলেন।
১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তবে এই নির্বাচনে মওলানা ভাসানীর অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তটি ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কমিউনিস্টদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে “ভোটের আগে ভাত চাই” স্লোগান তুলে ভাসানী নির্বাচন বর্জন করেন। ভাসানীর এই সিদ্ধান্তের কারণে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পায় এবং নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। বিশ্লেষকদের মতে, ভাসানী নির্বাচনে থাকলে বামপন্থিরা কিছু আসন পেতো এবং আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য তৈরি হতো না, যা স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হতো।
১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, ছাত্রনেতা, লেখক-সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম. মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান, আবদুস সামাদ আজাদ, আমির-উল ইসলাম, ড. কামাল হোসেন, মশিউর রহমান ‘জাদু মিয়া’, আবদুল মালেক উকিল, জিল্লুর রহমান, শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ, এএসএম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল কুদ্দুস মাখন, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, মণি সিংহ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অমল সেন, আবুল মনসুর আহমদ, অধ্যাপক আহমদ শরীফ, ড. আনিসুজ্জামান, শহীদুল্লাহ কায়সার, মুনীর চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, শামসুর রাহমান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, জহির রায়হান, এম. আর. আখতার মুকুল, ফয়েজ আহমদ, কামাল লোহানী, সন্জীদা খাতুন, সৈয়দ হাসান ইমাম, বারীন মজুমদার, সুফিয়া কামাল, ওয়াহিদুল হক, কামরুল হাসান, আলতাফ মাহমুদ, সমর দাস, আবু সালেহ, ইন্দু সাহা, আবদুল জব্বার, অজিত রায়সহ আরও বহু কবি, শিল্পী, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী; পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সামরিক নেতৃত্বে ছিলেন এমএজি ওসমানী, জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ, কে এম শফিউল্লাহ, আবু তাহের, মীর শওকত আলী, সি আর দত্ত, এ টি এম হায়দার, কাজী নুরুজ্জামান, নাজমুল হক, মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, মতিউর রহমান প্রমুখ।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি বড় রাজনৈতিক ও গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৪৭-৪৮ সালে শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, যার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে; এরপর ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ও স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন, ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬২-৬৪ সালে আইয়ুববিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৮ সালে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির আন্দোলন, এবং ১৯৬৮-৬৯ সালে ছাত্রদের ১১ দফাকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অর্জন হলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথটি ছিল কণ্টকাকীর্ণ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মওলানা ভাসানী, মণি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, সিরাজ সিকদার, কর্নেল আবু তাহেরসহ বামপন্থি নেতৃবৃন্দ বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করলেও স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে তাদের অবদান অনেক ক্ষেত্রেই অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায়।
১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ‘দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশ ১৯৭২’ জারি করে। এই আইনের আওতায় প্রায় ৩৭ হাজার ৪৭১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দ্রুত বিচারের মাধ্যমে ৭৫২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়। তবে ১৯৭৩ সালের ৩০শে নভেম্বর সরকার এক সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে, যার ফলে ২৬ হাজারেরও বেশি কারাবন্দি মুক্তি পায়। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার অন্তর্নিহিত কারণ হিসেবে দেখা যায়, অনেকেই আদর্শিক কারণে নয় বরং দুর্ভিক্ষ, অভাব-অনটন বা পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে শান্তি কমিটি বা রাজাকারে যোগ দিয়েছিল।
স্বাধীনতার ঠিক পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের নামে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্বাধীনতার প্রথম তিন বছরে দেশ জুড়ে অন্তত ৬,০০০ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভারতীয় ক্ষমতা বলয়ের একাংশের সমর্থন ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় গড়ে ওঠা ‘মুজিব বাহিনী’কে মূলত আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এবং স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকেই স্থানীয় মুজিব বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের হত্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
১৯৭২-১৯৭৫ সময়কে ধরে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের বিরোধী বা সমালোচনামূলক রাজনৈতিক নেতৃত্ব একসঙ্গে ধরলে তালিকাটি শুধু জাসদে সীমাবদ্ধ নয়। প্রধান বিরোধী ও সমালোচনামূলক ধারার নেতাদের মধ্যে ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আতাউর রহমান খান, অলি আহাদ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, মণি সিংহ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল হক, রাশেদ খান মেনন, কাজী জাফর আহমদ, সিরাজুল আলম খান, এএসএম আবদুর রব, মেজর এম.এ. জলিল, শাজাহান সিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল কুদ্দুস মাখন, খালিকুজ্জামান ভূঁইয়া, হায়দার আকবর খান রনো, আবদুল মতিন, আবদুল্লাহ সরকার, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক প্রমুখ। এদের মধ্যে মওলানা ভাসানী ছিলেন সবচেয়ে প্রবীণ ও প্রভাবশালী বিরোধী নেতা; তার ঘঅচ (ভাসানী) ১৯৭২ থেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধিতা করে এবং ১৯৭৩-৭৪ সালে খাদ্যসংকট, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে আন্দোলন করে। জাসদ ৩১শে অক্টোবর ১৯৭২ সালে গঠিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে শক্তিশালী বামপন্থি বিরোধী শক্তিতে পরিণত হয়; এর সঙ্গে সিরাজুল আলম খান, এএসএম আবদুর রব ও মেজর এম এ জলিলের নেতৃত্বে বিশেষভাবে যুক্ত ছিল, আর শাজাহান সিরাজও প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে জাসদ ২৩৭টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ১টি আসন পায়; ঘঅচ (ভাসানী) ১৬৯টি এবং ঘঅচ (মোজাফফর) ২২৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কোনো আসন পায়নি। আতাউর রহমান খানের জাতীয় লীগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশের জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন, ন্যাপ-ভাসানী, জাসদ এবং বিভিন্ন কমিউনিস্ট ও বামপন্থি দল মিলিয়ে তখন আওয়ামী লীগের বাইরে একটি বিস্তৃত বিরোধী রাজনৈতিক পরিসর তৈরি হয়েছিল। তবে ১৯৭৫ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি ইঅকঝঅখ গঠনের মাধ্যমে অন্যান্য রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একদলীয় ব্যবস্থা চালু করা হয়, ফলে এরপরের সময়কে স্বাভাবিক বহুদলীয় বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যায় না।
শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে (১৯৭২-১৯৭৫) সরকারের নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হ্রাস, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে লেখালেখি বা সাংবাদিকতার মাধ্যমে সরাসরি সমালোচনামূলক ভূমিকা নেয়া উল্লেখযোগ্য লেখক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন এ. জেড. এম. এনায়েতুল্লাহ খান, আবদুস সালাম, আল মাহমুদ, সিকান্দার আবু জাফর, অধ্যাপক আহমদ শরীফ, আবদুল হক, বদরুদ্দীন উমর, ফয়েজ আহমদ, আবু সালেহ, রফিক আজাদ; এদের মধ্যে এনায়েতুল্লাহ খান, আবদুস সালাম, আল মাহমুদ, আবু সালেহ-এর ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত, সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা/ব্যবস্থা এবং সমালোচনামূলক লেখালেখির প্রমাণ সবচেয়ে স্পষ্ট।
মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বিশাল অংশের মধ্যে হতাশা ও মোহভঙ্গ দেখা দেয়। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের একাংশের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ (জাসদ)। ১৯৭২ সালের ৩১শে অক্টোবর মেজর (অব.) এম এ জলিল এবং আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে জাসদ প্রতিষ্ঠিত হলেও এর মূল তাত্ত্বিক ছিলেন সিরাজুল আলম খান। জাসদের সশস্ত্র শাখা হিসেবে ‘গণবাহিনী’ গঠিত হয়, যা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করে।
অন্যদিকে, সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এবং জাসদের মতো চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে দমনের জন্য ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’ গঠন করে। রক্ষীবাহিনী মূলত প্রচলিত সামরিক কমান্ড কাঠামোর বাইরে থেকে কাজ করতো এবং শেখ মুজিবের প্রতি অন্ধ অনুগত এই বাহিনীর বিরুদ্ধে বিরোধী মত দমনের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে যে, শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে রক্ষীবাহিনীর হাতে জাসদের প্রায় ৩০ হাজার নেতাকর্মী নিহত হন, যাদের অনেকেই ছিলেন রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭৪ সালের ১৭ই মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচিতে রক্ষীবাহিনীর গুলিতে অন্তত ৫০ জন জাসদ কর্মী নিহত হন, যা রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘রমনা হত্যাকাণ্ড’ নামে পরিচিত।
একই সময়ে চরমপন্থি সশস্ত্র ধারার রাজনীতিতে আবির্ভূত হয় সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি’। ১৯৬৮ সালে ‘পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন’ হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই দলটি স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে। সিরাজ সিকদার তার থিসিসে পূর্ব বাংলাকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের উপনিবেশ এবং তৎকালীন সরকারকে দালাল শাসকশ্রেণি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সশস্ত্র শ্রেণি সংগ্রামকে একমাত্র পথ হিসেবে গ্রহণ করেন। সরকার কঠোর হাতে এই সশস্ত্র বিদ্রোহ দমন করার উদ্যোগ নেয়। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের শেষে সিরাজ সিকদারকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৭৫ সালের ১লা বা ২রা জানুয়ারি পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে তাকে হত্যা করা হয়, যা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম হাই-প্রোফাইল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত।
চরম অর্থনৈতিক সংকট, ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ (যাতে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়) এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সামাল দিতে ১৯৭৫ সালের শুরুতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্র বাতিল করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাকশাল’ (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) কায়েম করেন। এর মাধ্যমে দেশের সব রাজনৈতিক দল এবং চারটি বাদে সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে এটি ছিল বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত। মওলানা ভাসানী তার পরিচালিত ‘সাপ্তাহিক হক কথা’ পত্রিকার মাধ্যমে সরকারের কঠোর সমালোচনা করতেন, যা পরবর্তীতে স্তব্ধ করে দেয়া হয়। বাকশাল কায়েম স্বাধীন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় এক বিশাল ছন্দপতন হিসেবে বিবেচিত হয় এবং প্রকারান্তরে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করে দেয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল- দেশি-বিদেশি গভীর ষড়যন্ত্র এবং আওয়ামী লীগেরই একাংশের বিশ্বাসঘাতকতা। শেখ মুজিব খন্দকার মোশ্তাক আহমেদকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতেন, কিন্তু মোশতাকই ছিলেন এই ষড়যন্ত্রের অন্যতম মূল কুশীলব।
মওলানা ভাসানী, যিনি রাজনৈতিকভাবে শেখ মুজিবের তীব্র সমালোচক ছিলেন, এই হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে চরমভাবে ভেঙে পড়েন। রেডিওতে খবর শুনে ভাসানীর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে এবং তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেল... কতো বললাম কিছুতেই শুনলো না... এমন কর্মী, এমন সংগঠক আমি আর পাই নাই।’ হত্যাকাণ্ডের মাত্র তিনদিন আগে, ১২ই আগস্ট, ভাসানী শেখ মুজিবকে একটি গোপন চিঠি পাঠিয়ে তিনবার সতর্ক করে লিখেছিলেন, ‘ভাই সাবধান হও, সাবধান হও, সাবধান হও।’ কিন্তু সেই অন্তিম সতর্কবার্তা তার জীবন বাঁচাতে পারেনি।
১৫ই আগস্টের পটপরিবর্তন এবং ৩ ও ৭ই নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের অস্থিরতার মধ্যদিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আবির্ভূত হন জেনারেল জিয়াউর রহমান।
জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন, বাংলাদেশ তখন চরম নৈরাজ্য ও অর্থনৈতিক দৈন্যদশার শিকার। ১৯৭৮ সালে তিনি ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ঐতিহ্যবাহী রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি সমাজের অত্যন্ত মেধাবী পেশাজীবী, টেকনোক্র্যাট ও বুদ্ধিজীবীদের রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। শাহ আজিজুর রহমানের মতো ডানপন্থি, যাদু মিয়ার মতো চীনপন্থি বাম নেতা এবং মধ্যপন্থিদের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়ে জিয়াউর রহমান বিএনপিকে একটি গণমুখী দলে পরিণত করেন।
১৯৭৫-এর পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল- সামরিক ক্ষমতার বাইরে কীভাবে একটি রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা যায়। এ জায়গাতেই মশিউর রহমান যাদু মিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যাদু মিয়া ছিলেন মওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহচর এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। পাকিস্তান আমল থেকেই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচয় ছিল এবং ১৯৭১-এর আগেও তিনি বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭৬ সালে ভাসানীর মৃত্যুর পর তিনি ন্যাপের ভাসানী অংশের নেতৃত্বে আসেন। এরপর জিয়ার সঙ্গে তার রাজনৈতিক যোগাযোগ ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হয়। ১৯৭৭ সালে ন্যাপের সম্মেলনে যাদু মিয়া নেতৃত্বে আসেন এবং পরবর্তী সময়ে জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে ন্যাপের একটি বড় অংশকে নিয়ে যোগ দেন। যাদু মিয়ার নিজের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, তিনি শুধু জিয়ার জনপ্রিয়তার ভাগ নিতে সেখানে যাননি; বরং তার ভাষায়, তারা জিয়াকে আরও জনপ্রিয় করতে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ এখানে একটি রাজনৈতিক বিনিময় ছিল- জিয়ার প্রয়োজন ছিল একটি গ্রহণযোগ্য বেসামরিক রাজনৈতিক ভিত্তি, আর যাদু মিয়ার প্রয়োজন ছিল সামরিক শাসনের পর রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী রাজনীতিকে নতুন কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনা।
এই সমঝোতাকে অনেকে ‘জিয়া-যাদু মিয়ার গোপন চুক্তি’ বলে উল্লেখ করেন। তবে এটি ছিল রাজনৈতিক সমঝোতা ও পারস্পরিক প্রয়োজনের সম্পর্ক। ন্যাপের ভাসানী অংশের একটি বড় অংশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে যাওয়ার ফলে জিয়া শুধু সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বিভিন্ন পুরনো রাজনৈতিক ধারার সমর্থন নিয়ে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পান। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি গঠনের সময় যাদু মিয়া ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকদের একজন। ন্যাপের রাজনৈতিক পরিচয়ও এই প্রক্রিয়ায় কার্যত ভেঙে যায় বা বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী কাঠামোর মধ্যে চলে যায়। তবে এটিও মনে রাখা দরকার, ন্যাপের সব নেতা বা সব ধারা জিয়ার সঙ্গে যায়নি; বাম ও ন্যাপ রাজনীতির অন্য অংশগুলো আলাদা পথ নেয়।
রাজনীতিকদের বাইরে জিয়াউর রহমানের সমর্থন শুধু সাংবাদিক ও লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ১৯৭৮ সালে তার জাতীয়তাবাদী প্ল্যাটফরমে আমলা, শিক্ষক, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সামরিক ও বেসামরিক পেশাজীবীদেরও বড় অংশ যুক্ত হয়। গবেষণায় ১৯৭৮ সালের বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির পেশাগত গঠনে ৫৩ জন পেশাজীবী, ২০ জন শিক্ষক, ১১ জন আমলা, ৫৭ জন ব্যবসায়ী ও ২৮ জন কৃষিজীবী থাকার হিসাব পাওয়া যায়। সরাসরি নথিভুক্ত অরাজনৈতিক/পেশাজীবী সমর্থকদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, এ. জেড. এম. এনায়েতুল্লাহ খান, শামসুল আলম চৌধুরী, জাকারিয়া চৌধুরী, অধ্যাপক ড. এম. আর. খান, সাইফুর রহমান, এম. হামিদুল্লাহ খান এবং মেজর জেনারেল (অব.) এম. মাজিদুল হক- এরা জাগদলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন; যা জিয়ার জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কাঠামোর প্রথম সংগঠিত ভিত্তি।
যাদু মিয়ার গুরুত্ব এখানেই শেষ হয়নি। জিয়া তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব দেন। ১৯৭৮ সালের ২৯শে জুন থেকে মৃত্যুর দিন ১২ই মার্চ ১৯৭৯ পর্যন্ত তিনি মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী-সমমর্যাদার সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে বলা হয়েছে, জিয়ার ইচ্ছা ছিল যাদু মিয়াকেই প্রধানমন্ত্রী করা। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ১২ই মার্চ যাদু মিয়ার আকস্মিক মৃত্যু সেই পরিকল্পনা বদলে দেয় এবং পরে শাহ আজিজুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হন।
জিয়ার স্বাধীন ও স্বকীয় পররাষ্ট্রনীতি অনেক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির চক্ষুশূল ছিল। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক সামরিক অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিলেন চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল এম. এ. মঞ্জুর। যদিও জিয়া ও মঞ্জুর একসময় অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, কিন্তু সেনাপ্রধান এরশাদের সঙ্গে মঞ্জুরের দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক-সামরিক উচ্চাকাক্সক্ষা এই মর্মান্তিক ঘটনার জন্ম দেয়।
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে (১৯৭৫-১৯৮১) সাংবাদিক, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর চাপ ও সেন্সরশিপের অভিযোগের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ছিল- সামরিক আইনের অধীনে মার্শাল ল’কে সমালোচনা করা বা এমন সংবাদ প্রকাশ করা যা সরকার ‘ভয় বা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে’ বলে মনে করতো, তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা; ১৯৭৫ বা ’৭৬-এর দিকে সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ-কে তাহেরের বিচার নিয়ে রিপোর্টের কারণে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়, ইত্তেফাকের চেয়ারম্যান মইনুল হোসেন গ্রেপ্তার হন, এবং কলাম লেখকদের আর্থিক তথ্য দিতে বলা হয়। ১৯৭৭-৭৮ সালে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে আন্দোলনে ২২ জন সাংবাদিক পুলিশের মারধরে আহত হন; আজাদ পত্রিকার অফিসও একটি ‘জনমনে আঘাতকারী’ লেখাকে কেন্দ্র করে আক্রান্ত হয়। নির্মল সেনসহ সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতারা সাংবাদিকদের অধিকার ও ওয়েজ বোর্ড নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করলেও একই সময়ে সংবাদমাধ্যমের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ছিল। সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও চাপের অভিযোগ পাওয়া যায়- চলচ্চিত্র নির্মাতা সুভাষ দত্ত পরে দাবি করেছিলেন যে, জিয়ার আমলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক নিরুৎসাহ ছিল।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নীরব ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এরশাদ তার ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত ও বৈধতা প্রদানের জন্য ‘জাতীয় পার্টি’ গঠন করেন এবং অত্যন্ত সুকৌশলে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ এবং বামপন্থি দলগুলোর প্রথম সারির নেতাদের প্রলোভন ও ভয় দেখিয়ে নিজ দলে ভিড়িয়ে নেন। রাজনীতির এই কো-অপটেশন বা লোভ দেখিয়ে বশীভূত করার সংস্কৃতি বাংলাদেশের আদর্শিক রাজনীতিতে এক স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করে। ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনের সময় এক অদ্ভুত রাজনৈতিক চাল দেখা যায়। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি এই নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেও, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং আরও কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। এই অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রকারান্তরে এরশাদের সামরিক শাসনকে এক ধরনের রাজনৈতিক বৈধতা প্রদান করা হয়। ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী তীব্র গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরশাসনের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রের যুগে পুনঃপ্রবেশ করে।
এরশাদ আমলে (১৯৮২-১৯৯০) কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি সেন্সরশিপ, গ্রেপ্তার, মামলা, পত্রিকা বন্ধ এবং পুলিশি হয়রানির বেশ কিছু নথিভুক্ত ঘটনা আছে। উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো- সাংবাদিক গোলাম মাজেদ সামরিক আইন সমালোচনা করে তিন বছরের কারাদণ্ড পান; মাহফুজ উল্লাহ নিয়মিত সরকারি ‘চৎবংং অফারপব’ নথিবদ্ধ করেন, যেখানে সম্পাদকদের কী কী সংবাদ প্রকাশ না করতে হবে তার নির্দেশ দেয়া হতো; কবি মোহাম্মদ রফিক ১৯৮৩ সালে তার ‘খোলা কবিতা’র মাধ্যমে এরশাদের সামরিক শাসন ও কবি হিসেবে এরশাদের আত্মপ্রচারের ব্যঙ্গ করেন এবং তাকে সামরিক বোর্ডে তলব করা ও পরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়; কবি ফরহাদ মজহার তার ‘সব লাশ প্রতিশোধ নেবে’ কবিতার জন্য গ্রেপ্তার হন এবং পরে ‘লেফটেন্যান্ট জেনারেল ট্রাক’ কবিতার জন্য আবার গ্রেপ্তার হন। ছড়াকার আবু সালেহকে ‘কেউ বলে খালেদা কেউ বলে হাসিনা/দুইভাবে ভাগ হওয়া মোটে ভালোবাসি না’ এবং ‘এক দফা এক দাবি/ এরশাদ তুই কবে যাবি’ ছড়া লেখার জন্য বাংলামোটরে লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে আক্রমণ করে পাঁজরের হাড় আর হাতের কব্জি ভেঙে ফেলে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ইত্তেহাদ, ইতেফাক, একতা, যায়যায়দিন, জয়যাত্রা, রোববার, বিচিত্রাসহ বিভিন্ন পত্রিকা/সাময়িকীর ওপর নিষেধাজ্ঞা বা স্থগিতাদেশ দেয়া হয়। ১৯৮৭-৮৮ সালে দুর্নীতি ও এরশাদবিরোধী আন্দোলন নিয়ে রিপোর্ট করার কারণে কয়েকটি পত্রিকা বন্ধ করা হয়; আর ১৯৯০ সালে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ৬৭টি হয়রানির ঘটনা, ২৪টি মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে হামলা, ৮টি প্রকাশনা নিষেধাজ্ঞা, ১২ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার এবং ২ জন সাংবাদিকের মৃত্যুর কথা সমকালীন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে বাংলাদেশের কবিতা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কার্যত দু’টি ভিন্ন ধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে- একদিকে এরশাদ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় কবিকণ্ঠ ও এশীয় কবিতা উৎসবকে ঘিরে একটি সরকারি/এরশাদ-ঘনিষ্ঠ সাহিত্যিক পরিমণ্ডল গড়ে ওঠে, যেখানে আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ আলী আহসান, ফজল শাহাবুদ্দীন, আল মাহমুদ, ইমরান নুর, আল মুজাহিদী’র মতো কবিদের নাম বিশেষভাবে আলোচিত হয়; অন্যদিকে ১৯৮৭ সালে জাতীয় কবিতা পরিষদ ও জাতীয় কবিতা উৎসব আত্মপ্রকাশ করে, যার সঙ্গে সুফিয়া কামাল, আবুল হোসেন, শামসুর রাহমান, মোহাম্মদ রফিক, রফিক আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, আবু সালেহ, সমুদ্র গুপ্ত, মোহন রায়হান, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, ফয়েজ আহমদ, হেলাল হাফিজসহ বহু কবি-সাহিত্যিক যুক্ত হয়ে স্বৈরাচারবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৮৭ সালের প্রথম জাতীয় কবিতা উৎসবের সেøাগান ছিল ‘শৃঙ্খল মুক্তির জন্য কবিতা’, আর ১৯৮৮ সালের উৎসবের সেøাগান হয় ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা’; ফলে কবিতার আয়োজন কেবল সাহিত্য অনুষ্ঠান না থেকে এরশাদ সরকারের পক্ষে রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা বনাম বিরোধী কবি-সাহিত্যিকদের গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতিদ্বন্দ্বী মঞ্চে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ বৃহত্তর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর অধ্যায়। সবারই ধারণা ছিল- আওয়ামী লীগ সহজেই সরকার গঠন করবে। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর থেকেই মাগুরা-২ আসনের উপ-নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে বিরোধী দলগুলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দিকটি ছিল- এর রাজনৈতিক সমীকরণ। আওয়ামী লীগ, যাদের চরম আদর্শিক শত্রু ছিল জামায়াতে ইসলামী, সেই জামায়াত এবং পতিত স্বৈরাচার এরশাদের জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে একযোগে রাজপথের আন্দোলন শুরু করে।
এই আন্দোলনের চূড়ান্ত ও আজব রূপ ছিল ‘জনতার মঞ্চ’, যেখানে সরকারি আমলারাও দলীয় রাজনীতিতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে নিয়মভঙ্গের এক ভয়ঙ্কর নজির স্থাপন করেন। প্রবল বিক্ষোভের মুখে বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি একটি একতরফা নির্বাচন করে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করে এবং পদত্যাগ করে। ১২ই জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে গোলাম আযমকে ঘিরে বিএনপি সরকার ও জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ টানাপড়েন তৈরি হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে খালেদা জিয়া সরকার গঠন করলেও, ১৯৯১ সালের শেষ দিকে গোলাম আযমকে প্রকাশ্যে জামায়াতের আমীর ঘোষণা করা হলে তার নাগরিকত্ব ও একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে তীব্র জনআন্দোলন শুরু হয়। সেই আন্দোলনের চাপে ২৪শে মার্চ ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়ার সরকার গোলাম আযমকে গ্রেপ্তার করে; যা জামায়াতে ইসলামীর কাছে স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তিকর ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণ হয়। একই সময়ে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করে এবং ২৬শে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণ-আদালত বসিয়ে তার প্রতীকী বিচার করে। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি- তৎকালীন বিএনপি সরকার গণ-আদালতকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেনি; বরং ১৪৪ ধারা জারি করে সমাবেশ ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল এবং পরে জাহানারা ইমামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেছিল। ফলে বলা যায়, গোলাম আযমকে গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ এবং গণ-আদালত আন্দোলনের অগ্রগতি- দু’টি ঘটনা একই রাজনৈতিক সংকটের ধারাবাহিক অংশ ছিল। আর বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেই কেন বিচারের কথা বলা হয়- এটা নিয়ে তখন বেশ সমালোচনা ছিল।
১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত দুইটি নির্বাচনের মধ্যদিয়ে তৈরি হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলোর দীর্ঘ আন্দোলনের পর খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকার ১৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ নির্বাচন আয়োজন করে; আওয়ামী লীগসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো সেই নির্বাচন বর্জন করে এবং বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২৭৮টি আসন পায়, ফলে নির্বাচনটি ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে ষষ্ঠ সংসদ ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করে এবং ৩০শে মার্চ খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন। এরপর বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১২ই জুন ১৯৯৬ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়; এতে আওয়ামী লীগ ১৪৬, বিএনপি ১১৬, জাতীয় পার্টি ৩২ এবং জামায়াতে ইসলামী ৩টি আসন পায়। আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও জাতীয় পার্টি ও জাসদ (রব)-এর সমর্থনে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন এবং সরকার নিজেকে ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে এ সময় থেকেই বিরোধী দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রশাসন, পুলিশ, সরকারি গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ তুলতে শুরু করে; মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ১৯৯৬-৯৭ সালের প্রতিবেদনে বিএনপি’র পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ ও সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপি, বিরোধী নেতাকর্মীদের হয়রানি ও গ্রেপ্তারের অভিযোগের কথা উল্লেখ আছে। পরবর্তী ১৯৯৭ সালের প্রতিবেদনে সরকারি সংবাদমাধ্যমে বিএনপি’র খবর সীমিত করা, বিএনপিপন্থি সাংবাদিকদের বদলি এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের সংবাদে সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগও নথিভুক্ত হয়।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় ও বিতর্কিত ঘটনার জন্ম হয়- স্বাধীনতাবিরোধী দল হিসেবে পরিচিত জামায়াতে ইসলামী সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতায় এবং মন্ত্রিসভায় স্থান পায়। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী দলটির নেতাদের গাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ওড়ার দৃশ্যটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দেয়।
২০০১-২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল ও ১৪-দলীয় জোট একাধিক আন্দোলন গড়ে তোলে। এর মধ্যে ছিল- সংসদ বয়কট ও হরতাল, বিদ্যুৎ ও সারের দাবিতে কানসাট আন্দোলন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদ, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং ২০০৫ সালে ১৪-দলীয় জোটের ২৩ দফা কর্মসূচি ও বিএনপি-জামায়াত সরকারকে হটানোর গণ-আন্দোলনের ডাক। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর বিরোধী রাজনীতিতে আরও তীব্রতা আসে। ২০০৬ সালে আন্দোলন মূলত নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকার অভিযোগ এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে কেন্দ্রীভূত হয়; ১৪-দলীয় জোট নির্বাচন কমিশন ঘেরাও, হরতাল ও অবরোধের কর্মসূচি দেয় এবং নভেম্বর ২০০৬-এ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে। শেষ পর্যায়ে ২৮শে অক্টোবর ২০০৬-এর লগি-বৈঠা আন্দোলন ও ব্যাপক রাজনৈতিক সংঘর্ষ, এরপর অবরোধ-হরতাল এবং নির্বাচন নিয়ে অচলাবস্থা বাংলাদেশকে গভীর রাজনৈতিক সংকটে ঠেলে দেয়; শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালের জানুয়ারির নির্বাচন স্থগিত হয় এবং ১১ই জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হয়।
২৮শে অক্টোবর ২০০৬-এর লগি-বৈঠা আন্দোলন ও ব্যাপক সংঘর্ষের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতা ছাড়ে, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন এবং নির্বাচন কতোটা নিরপেক্ষ হবে- এ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র বিরোধ চলতে থাকে। প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিএনপি-ঘেঁষা বলে অভিযোগ করে; হরতাল, অবরোধ ও রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়তে থাকে এবং ৩রা জানুয়ারি ২০০৭ আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। পরিস্থিতি আরও সংকটময় হলে ১১ই জানুয়ারি ২০০৭(১/১১) জরুরি অবস্থা জারি হয়, ইয়াজউদ্দিন প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়েন এবং সামরিক সমর্থনে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়; রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করা হয় এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের বহু নেতা, ব্যবসায়ী ও আমলা গ্রেপ্তার হন। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া- দু’জনই গ্রেপ্তার ও মামলার মুখোমুখি হন; যা ‘মাইনাস টু’ রাজনীতির আলোচনা সৃষ্টি করে। তবে জরুরি অবস্থার মধ্যেও ২০০৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন হয়। শেষ পর্যন্ত প্রায় দুই বছর পর ২৯শে ডিসেম্বর ২০০৮ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ-মহাজোট বিপুল বিজয় লাভ করে এবং ৬ই জানুয়ারি ২০০৯ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সাম্প্রতিক এবং যুগান্তকারী বাঁকটি পরিলক্ষিত হয় ২০২৪ সালে। টানা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন জুলাই মাসে এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এই পতনের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অলিখিতভাবে সামরিক বাহিনীর হাতে চলে আসে।
পরবর্তীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রস্তাবনায় এবং প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ৮ই আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। ১৬ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সরকারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ কয়েকজন সমন্বয়কও স্থান পান, যা দেশের রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করার উদ্যোগকে। বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাত থেকে সরিয়ে আনার লক্ষ্যে অধ্যাদেশ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়, যা স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছরে কোনো নির্বাচিত সরকারই কার্যকর করেনি। এ ছাড়া, নির্বাচন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের জন্য বিভিন্ন কমিশন গঠন করা হয়।
তবে এই সরকারের শাসনকালকে বেশ কিছু গুরুতর সংকটেরও মুখোমুখি হতে হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ‘মব ভায়োলেন্স’ বা উন্মত্ত জনতার আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা। হাসিনা সরকারের পতনের পর সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এক চরম অরাজকতা দেখা দেয়। ফ্যাসিবাদী সরকারের দোসর আখ্যা দিয়ে দেশের প্রায় ১.৭৮৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয় এবং প্রায় ২,০০০ শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এমনকি সুপ্রিম কোর্টসহ বিভিন্ন আদালত প্রাঙ্গণে আসামিদের ওপর নজিরবিহীন মব আক্রমণ ও লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে, যা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতির এই সুদীর্ঘ ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি অন্তর্নিহিত সত্য স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এ ভূখণ্ডের রাজনীতি কখনোই রৈখিক ছিল না। স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতিতে সামরিক-বেসামরিক মেরূকরণ, রক্ষীবাহিনী গঠন, জাসদ ও সর্বহারা দমনে রাষ্ট্রীয় শক্তির নির্মম প্রয়োগ এবং সর্বোপরি বাকশাল গঠনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পথের রুদ্ধ হওয়া প্রমাণ করে যে, সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রকাঠামো কতোটা ভঙ্গুর ছিল।
নব্বই-পরবর্তী গণতান্ত্রিক যুগে এসেও সংঘাতের রাজনীতি বন্ধ হয়নি। ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনে আদর্শিক শত্রু আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান, কিংবা ২০০১ সালে বিএনপি সরকারে জামায়াতের সরাসরি অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে চিরস্থায়ী কোনো আদর্শ বা শত্রুতা নেই; এখানে সবকিছুই কৌশলগত এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক।
সমকালীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সংঘাত, অসহিষ্ণুতা ও মেরূকরণ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এক গভীর সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমালোচক মনে করেন, বর্তমান সময়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতার পরিস্থিতি পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরের চেয়েও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সাংবাদিক নিবর্তন, সেলফ-সেন্সরশিপ এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একপেশে ব্যবহার প্রমাণ করে যে, গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা এখনো তার প্রকৃত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। চড়াই-উতরাই, রক্তপাত, দল ভাঙন, আমলাদের রাজনৈতিকীকরণ আর বিচিত্র জোট গঠনের এই জটিল সমীকরণই বাংলাদেশের রাজনীতির সেকাল ও একালের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশের রাজনীতির পুরনো দিনের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল তীব্র, কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রুতা ও প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা আজকের মতো সর্বগ্রাসী ছিল না। শেখ মুজিবুর রহমান ও মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল গভীর, ভাসানী স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন; আবার আতাউর রহমান খান, অলি আহাদ, আবুল মনসুর আহমদসহ বহু বিরোধী রাজনীতিকের সঙ্গেও আওয়ামী লীগের তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিরস্থায়ী ব্যক্তিগত শত্রু হিসেবে দেখার সংস্কৃতি এতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়নি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ১৯৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলন-আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা ও বিএনপি’র খালেদা জিয়া, যারা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন, তারাও তখন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার বৃহত্তর লক্ষ্যে একই আন্দোলনের অংশ হতে পেরেছিলেন। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর থেকে বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র মধ্যে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা ক্রমশ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়, আর এর পেছনে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থার ক্রমাগত ভেঙে পড়া ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, ২০০৬-০৭ সালের নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংকট এবং পরবর্তীকালে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধ দেখিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক দলগুলো আর প্রতিপক্ষের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিশ্বাস করতে পারছিল না। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৪ সালের নির্বাচন, যেখানে বিএনপি ও অধিকাংশ বিরোধী দল অংশ নেয়নি এবং বিপুলসংখ্যক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত হন, ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে ভোট কারচুপি ও অনিয়মের ব্যাপক অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ও নির্বাচনের প্রতিযোগিতামূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন- এসব ঘটনা নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও ক্ষয় করেছে। ফলে ক্ষমতায় থাকা দল যদি নির্বাচনকে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার যন্ত্রে পরিণত করে এবং বিরোধী দল যদি মনে করে যে, স্বাভাবিক নির্বাচনে ক্ষমতার পরিবর্তন সম্ভব নয়, তখন রাজনীতি সংসদীয় প্রতিযোগিতা থেকে রাজপথের সংঘাত ও প্রতিশোধের রাজনীতিতে চলে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে- মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক সহিংসতা, ব্যক্তিগত কটূক্তি এবং পাল্টাপাল্টি প্রতিহিংসা; ফলে ‘প্রতিপক্ষকে নির্বাচনে হারাবো’- এই গণতান্ত্রিক মানসিকতার জায়গায় ‘প্রতিপক্ষকে ক্ষমতায় আসতেই দেয়া যাবে না’- এই ভয় ও অবিশ্বাস জায়গা করে নিয়েছে। তাই আজকের রাজনৈতিক বিদ্বেষকে শুধু নেতাদের ব্যক্তিগত চরিত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো ইতিহাসটি বোঝা যাবে না; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এবং ক্ষমতার পালাবদলকে নিরাপদ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থতা। একসময় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন প্রতিপক্ষের সঙ্গে মতের লড়াই করা মানুষ; কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থা যখন বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, তখন সেই প্রতিপক্ষই ধীরে ধীরে অস্তিত্বের শত্রুতে পরিণত হয়। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় এমন এক রাজনীতি, যেখানে একজন আরেকজনকে পরাজিত করতে নয়, রাজনৈতিকভাবে বিনাশ করতে চায়।