ইতিহাস গড়েই চলছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন এবং কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দিয়ে দেশে ফেরেন তিনি। তার নেতৃত্বেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। তিনি হন সরকারপ্রধান। রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের পর এবার বিশ্বমঞ্চে অনন্য এক রেকর্ডের সঙ্গী হলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো যোগ দিয়ে দেশের জন্য বিরল এই রেকর্ড গড়লেন। তারেক রহমানের বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথমবার ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশ নেন। এর ঠিক তেরো বছর পর প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে একই মঞ্চে প্রথম ভাষণ দেন। এবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান জাতিসংঘের মঞ্চে ভাষণ দেন। এর আগে এই উপমহাদেশের ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে একই পরিবারের ৩ জন সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী এবং ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে রাজীব গান্ধী। ওদিকে শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রধানমন্ত্রী আর ডি বন্দরনায়েকে, তার স্ত্রী শ্রী মাভো বন্দরনায়েকে ও কন্যা চন্দ্রিকা বন্দরনায়েকে।
বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্ক সময় বিকালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই ভাষণের মধ্যদিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সঙ্গে জিয়া পরিবারের চার দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে এটিই জাতিসংঘে তার প্রথম ভাষণ এবং প্রথা অনুযায়ী তিনি বাংলায় বক্তব্য রাখেন।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬শে আগস্ট প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন। এর ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১লা অক্টোবরে তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রথমবার সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দেন। পরবর্তীতে আরও কয়েকবার তিনি সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমে বক্তব্য দেন। এর মধ্যে ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে স্মারক সভা এবং ২০০২ সালে শিশুবিষয়ক ২৭তম বিশেষ অধিবেশন এবং ২০০৫ সালে ৬০তম অধিবেশনের দু’টি পৃথক সভাতেও বেগম খালেদা জিয়া বক্তব্য রাখেন। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মোট পাঁচবার সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে বক্তব্য দেন বেগম খালেদা জিয়া। এবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান।
গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ মহাসচিবের দেয়া প্রাতঃরাশে অংশগ্রহণ শেষে অধিবেশনে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রেকর্ডের পাশাপাশি এবার ভিন্ন এক পরিবেশে অধিবেশনে অংশ নিয়েছেন। অধিবেশনে এবার সভাপতির আসনে দায়িত্ব পালন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন কক্ষে ইংরেজি বর্ণমালায় আদ্যাক্ষর দিয়ে আসন বণ্টনে বাংলাদেশের আসন ছিল সামনের সারিতে। অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করে অধিবেশনের সভাপতির প্রতি সম্মান জানিয়ে নিজের আসনে বসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গত ৮ই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের আনুষ্ঠানিকতা। এই অধিবেশনের উচ্চ পর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক শুরু হয়েছে ২২শে সেপ্টেম্বর থেকে। উচ্চ পর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক পর্বের প্রথম দিনের প্রথম পর্বে ভাষণ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দ্য সিলভাসহ ১৩ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান।
৮১তম সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। যিনি ২রা জুন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে ৯৯ ভোট পেয়ে ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী যেসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-গত বুধবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে নিউ ইয়র্কের বিলাসবহুল ‘লোটে নিউ ইয়র্ক প্যালেস হোটেলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের প্রদত্ত বিশ্বনেতাদের সম্মানে নৈশভোজে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান। ট্রাম্পের এই নৈশভোজে ১৪৫টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা সস্ত্রীক অংশ নেন। এর আগে গত মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে ইউনাইটেড নেশনস প্লাজায় তুর্কি হাউজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। বৈঠকে দুই দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান সহযোগিতা সমপ্রসারণের সম্ভাবনা প্রভৃতি বিষয় আলোচনা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ের ৩৪তম তলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ। বৈঠকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনায় পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং দুই দেশের জনগণের কল্যাণে সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়ে গঠনমূলক মতবিনিময় হয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমঝোতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়া এবং উভয় পক্ষ অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে নিয়মিত যোগাযোগ ও সংলাপ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল হোটেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম ছালিহ। বৈঠকে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এদিন বিকালে একই স্থানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি। বৈঠকে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ওদিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিস-আইমে। বৈঠকে বাংলাদেশ ও হাইতির মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণে সহযোগিতা আরও জোরদার এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সমপ্রসারণের সম্ভাবনা নিয়েও মতবিনিময় করেন বাংলাদেশ ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীরা। এর ফাঁকে সাইড লাইনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেছেন মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট উজ হুসেইন মোহামেদ লতিফ এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে। বৈঠক দুইটি সৌহার্দ্যমূলক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে মালদ্বীপ ও ভুটানের মধ্যকার বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদারসহ দেশ দুইটির সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণে বিদ্যমান সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আরও সমপ্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে। এ ছাড়া অধিবেশনের ফাঁকে সাইড লাইনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। সাক্ষাতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, বিভিন্ন প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট প্রভৃতি বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
অন্যদিকে গত বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে ‘জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য উত্তরণ’ বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভায় জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ ‘বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ’ উল্লেখ করে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ‘এককভাবে নয়, সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ’ গ্রহণে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এদিন নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অধিবেশন কক্ষের বাইরে সাইড লাইনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচ। বৈঠকে বাংলাদেশ ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সমপ্রসারণ এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
একই দিন নিউ ইয়র্কে হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল হোটেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও মার্ক সুজম্যান। বৈঠকে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, সাশ্রয়ী ভ্যাকসিন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া বুধবার রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক উচ্চপর্যায় কমিটির বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে গত সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে নিউ ইয়র্ক পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।