চলমান তৈরি পোশাক (আরএমজি) শ্রমিকদের বিক্ষোভ ঘিরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে। এর ফলে তার প্রত্যাশিত ভারত সফরের সম্ভাবনা দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে বলে জানিয়েছেন দেশটির উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা। দ্য হিন্দুকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ‘নিজ দলের লোকেরাই ভুল পথে পরিচালিত করছেন’। বাংলাদেশের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘তৈরি পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ একটি গুরুতর সমস্যা। কারণ, অর্থনীতি সংকটের মুখে রয়েছে। এটি স্বল্পমেয়াদি সংকট বলে মনে হচ্ছে না। এমনকি প্রশাসনের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, তেমনটিও মনে হচ্ছে না।’ রাজধানী ঢাকায় গত কয়েকদিন ধরে চলা বিক্ষোভের বিষয়ে ভারতের মূল্যায়ন তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ করে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। এর কারণ অভ্যন্তরীণ সংকট। তবে তার সফরের জন্য আমরা এখনো প্রস্তুত।’ ওই সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় ফেরার পর দুই দেশের সম্পর্ক কার্যকর পর্যায়ে ফিরে আসবে বলে আশা করেছিল নয়াদিল্লি। ওই নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
বাংলাদেশে অব্যাহত অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা শুধু ঢাকার জন্য নেতিবাচক খবর নয়, বরং ভারতের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি করছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘ঢাকার সরকার একসঙ্গে দু’টি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একদিকে মৌলবাদীরা সরকারকে চ্যালেঞ্জ করছে, অন্যদিকে জনগণের কাছেও সরকার ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের কোনো প্রতিবেশী দেশে অনিশ্চয়তা আমাদের জন্য খারাপ খবর। আর বাংলাদেশের মতো একটি দেশে অনিশ্চয়তা, যার সঙ্গে আমাদের ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, তা অবশ্যই ভালো কিছু নয়।’ ভারতীয় সূত্রটি জানায়, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে আগেই ধারণা করেছিল নয়াদিল্লি। এ কারণেই ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পরপরই তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ভারত। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণে তারেক রহমানের সাড়া না দেয়া এবং ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দেয়ায় হতাশ হয়েছে নয়াদিল্লি। ওই সম্মেলনে তারেক রহমানের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ এবং ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ভারতীয় ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করলে অন্তত বাংলাদেশের শিল্প খাতকে দেখানোর মতো একটি ইতিবাচক দিক থাকতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘মনে হচ্ছে, তাকে তার নিজের লোকেরাই ভুল পথে পরিচালিত করছেন।’
বিএনপি সরকারের সামনে কঠিন সময় আসছে বলেও আভাস দিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। তার মতে, তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে বড়দিন উপলক্ষে বিদেশি ক্রয়াদেশ ব্যাহত হয়েছে। এসব ক্রয়াদেশ বাতিল হলে ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ, বিক্ষোভের কারণে পোশাক খাতের সামগ্রিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়বে।
তিনি আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে, আন্দোলনের বিরুদ্ধে পুলিশের দমনপীড়ন চলতে থাকায় ডিসেম্বর মাস তারেক রহমানের সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসছে। একই সময়ে ভারত-বাংলাদেশের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদও শেষ হতে যাচ্ছে।