সাফ কথা

সাইবার সুরক্ষা আইন নয় সরকার সুরক্ষা আইন

শহীদুল্লাহ ফরায়জী | এক্সক্লুসিভ
অক্টোবর ১০, ২০২৬
সাইবার সুরক্ষা আইন নয় সরকার সুরক্ষা আইন

ডিজিটাল যুগে মানুষের জীবন, অর্থনীতি, শিক্ষা, ব্যবসা, যোগাযোগ ও মতপ্রকাশের বড় অংশই সাইবার জগতের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সাইবার অপরাধ থেকে নাগরিক, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দেয়া রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু সেই নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কতো দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে-মূল সাংবিধানিক প্রশ্নটি সেখানেই।
২৮শে সেপ্টেম্বর প্রথম আলো’য় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজের “মতপ্রকাশকে সীমিত করতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন কেন” শীর্ষক নিবন্ধে যে প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলো শুধু একটি আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে প্রশ্ন নয়; এর গভীরে রয়েছে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা এবং নাগরিক স্বাধীনতার মৌলিক প্রশ্ন। মূল প্রশ্ন তাই-সাইবার নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্র কি নাগরিককে সুরক্ষা দেবে, নাকি নিরাপত্তার অজুহাতে নাগরিকের স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াবে?

 

সাইবার নিরাপত্তা নাকি নাগরিক স্বাধীনতা?
সাইবার অপরাধ বাস্তব-হ্যাকিং, পরিচয় চুরি, আর্থিক প্রতারণা, তথ্য চুরি, অনলাইন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোয় হামলা মোকাবিলায় কার্যকর আইন প্রয়োজন।
কিন্তু সাইবার অপরাধ দমন এবং নাগরিকের মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। নাগরিকের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। প্রকৃত সাইবার আইনকে একই সঙ্গে নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।
 

একজন নাগরিক অপরাধ করলে তাকে আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সরকারের সমালোচনা, কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা বা কোনো তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে অপরাধে পরিণত করার আগে রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। রাষ্ট্রের হাতে আইন, প্রশাসন, পুলিশ ও প্রযুক্তির ক্ষমতা থাকে; নাগরিকের হাতে থাকে অধিকার, স্বাধীনতা ও আইনের আশ্রয়। তাই প্রশ্ন হলো-রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা কোথায়, তার ওপর নজরদারি করবে কে এবং অপব্যবহার হলে নাগরিক প্রতিকার পাবেন কোথায়?
 

‘অপতথ্য’, ‘গুজব’, ‘মানহানি’-অস্পষ্টতা কেন বিপজ্জনক?
আইনের ভাষা এমন হতে হবে, যাতে নাগরিক আগে থেকেই বুঝতে পারেন কোন কাজ অপরাধ এবং কোনটি নয়। ভুল তথ্য ও ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য এক নয়। কঠোর সমালোচনা ও মানহানি এক নয়। রাজনৈতিক মতবিরোধ ও অপরাধমূলক উস্কানি এক নয়। সাংবাদিকতার অনুসন্ধান ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারও এক নয়।
আইন যদি এসব পার্থক্য স্পষ্ট না করে, তাহলে নাগরিকের মধ্যে আইনি অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। প্রস্তাবিত ২৬ নম্বর ধারা নিয়ে প্রশ্নটির গুরুত্ব এখানেই।
রাষ্ট্র কি সত্যের একমাত্র নির্ধারক?
 

‘ভুল তথ্য’ কে নির্ধারণ করবে-সরকার, পুলিশ, প্রশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, নাকি স্বাধীন বিচারিক কর্তৃপক্ষ?
এটি শুধু আইনগত প্রশ্ন নয়; সত্য নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, সেটিও সাংবিধানিক প্রশ্ন। সত্য যাচাই এবং মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। আইনের ভিত্তি হতে হবে নির্দিষ্ট অপরাধ, স্পষ্ট প্রমাণ ও ন্যায্য প্রক্রিয়া; রাষ্ট্রের পছন্দ-অপছন্দ নয়।
‘আশঙ্কা’ কি অপরাধের ভিত্তি হতে পারে?
প্রস্তাবিত ৮ (২) ধারায় কোনো তথ্য জনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার ‘আশঙ্কা’ থাকলেও ব্যবস্থা নেয়ার প্রশ্ন এসেছে। আইন কি সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, নাকি সম্ভাব্য অপরাধের আশঙ্কার ভিত্তিতে নাগরিকের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করবে?
 

‘আশঙ্কা’ যদি আইনি ক্ষমতার ভিত্তি হয়, সেই আশঙ্কা নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে এবং নাগরিক কীভাবে তার বিরুদ্ধে প্রতিকার পাবেন?
রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত অস্পষ্ট ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে, নাগরিকের স্বাধীনতা তত অনিশ্চিত হবে। সাইবার অপরাধ দ্রুত মোকাবিলা করার প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু দ্রুততা কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধের বিচার হলে নির্বাহী বিভাগ একই সঙ্গে অভিযোগকারী, তদন্তকারী ও বিচারকের ভূমিকা কতোটা নিতে পারে-এটি গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ক্ষমতার পৃথক্‌করণ শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব নয়; এটি নাগরিক স্বাধীনতার অন্যতম সাংবিধানিক সুরক্ষা।
 

সমালোচনা, ব্যঙ্গ, কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্য এবং প্রকৃত ক্ষতিকর মিথ্যা তথ্যকে একই আইনি কাঠামোয় ফেলা হলে মতপ্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
দুর্নীতি, অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যদি কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ন করে, তাহলে সেটি কি মানহানি-নাকি জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ?
একজন সাংবাদিকের ডিভাইসে সংবাদসূত্র, নথি, সাক্ষাৎকার ও অপ্রকাশিত তথ্য থাকতে পারে। তাই ডিজিটাল তল্লাশি ও তথ্য জব্দের ক্ষেত্রে সাংবাদিকের গোপনীয় সূত্র এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার স্বার্থ সুরক্ষিত থাকা জরুরি।
নাগরিকের জানার অধিকার ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সাইবার নিরাপত্তার শত্রু নয়; বরং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের অপরিহার্য উপাদান। ডিজিটাল ডিভাইস মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সংরক্ষিত ভাণ্ডার। সেখানে থাকে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, ছবি, নথি, ব্যাংকিং তথ্য, পারিবারিক তথ্য, ব্যবসায়িক তথ্য ও ব্যক্তিগত চিন্তার নানা উপাদান। তাই ডিজিটাল ডিভাইসে রাষ্ট্রীয় প্রবেশ অনেক সময় একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের গভীরে প্রবেশের শামিল।
প্রশ্ন শুধু রাষ্ট্রের ক্ষমতা আছে কিনা-তা নয়; সেই ক্ষমতা কতোটা প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক, কী ধরনের তদারকির অধীন এবং অপব্যবহারের বিরুদ্ধে নাগরিকের প্রতিকার কী-সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
সন্দেহ তদন্তের কারণ হতে পারে; কিন্তু সন্দেহ নিজেই অপরাধের প্রমাণ নয়।
 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ নিয়ে যে বিতর্ক ও অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, নতুন আইন প্রণয়নে তা উপেক্ষা করা যাবে না।
আলী রীয়াজের নিবন্ধে উদ্ধৃত গবেষণা অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে ১ হাজার ৪১৭টি মামলা হয়েছিল, যার প্রায় ৬৫ শতাংশই ছিল ৫৭ ধারায়। আর ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১ হাজার ৪৩৬টি মামলায় ৪ হাজার ৫২০ জন অভিযুক্ত হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়-আইনের নাম পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দর্শন ও প্রয়োগের কাঠামোও পরিবর্তন করতে হবে।
গুজব ও অপতথ্য প্রতিরোধ করতে হবে। কিন্তু তার প্রতিষেধক শুধু ফৌজদারি শাস্তি নয়।
 

প্রয়োজন অবাধ তথ্যপ্রবাহ, স্বাধীন সাংবাদিকতা, পেশাদার ফ্যাক্ট-চেকিং, দ্রুত সরকারি তথ্য প্রকাশ এবং নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার।
মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে সত্য তথ্যই রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিরোধ; শাস্তি তার শেষ অবলম্বন। তথ্যের প্রবাহ বন্ধ করে গুজব বন্ধ করা যায় না। বরং সত্য তথ্যের প্রবাহ যত কমে, গুজবের জায়গা তত বাড়ে।
ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে নাগরিকের ডিভাইস, তথ্য ও যোগাযোগে রাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার যত বাড়বে, ততই প্রয়োজন হবে স্পষ্ট আইনি ভিত্তি, বিচারিক অনুমোদন, প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার পরীক্ষা, স্বাধীন তদারকি এবং কার্যকর প্রতিকার।
 

নিরাপত্তার নামে নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসর যেন রাষ্ট্রীয় নজরদারির অনিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্রে পরিণত না হয়। রাষ্ট্র জনগণের অভিভাবক নয়-সেবক। সরকার জনগণের অভিভাবক নয়-সেবক। জনগণ রাষ্ট্রের জন্য নয়; রাষ্ট্র জনগণের জন্য।
রাষ্ট্র নাগরিককে কী দেখতে হবে, কী বলতে হবে বা কী ভাবতে হবে-তার অভিভাবক নয়। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিককে অপরাধ ও ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দেয়া; নাগরিকের বিবেক ও মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করা নয়।
সাইবার নিরাপত্তার প্রকৃত দর্শন হওয়া উচিত-নাগরিককে নিরাপদ করা; নাগরিককে নিয়ন্ত্রিত করা নয়।
সংসদ, সরকার, প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগ-সবই Constituted Power বা গঠিত ক্ষমতার বিভিন্ন রূপ। তারা জনগণের কাছ থেকে এবং সংবিধানের মাধ্যমে ক্ষমতা পেয়েছে। তাদের ক্ষমতা সংবিধানপ্রদত্ত; তাই তা অসীম নয়।
 

জনগণ ক্ষমতার উৎস; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সেই ক্ষমতার ব্যবহারকারী-মালিক নয়। সংবিধান যেমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে, তেমনি তাদের ক্ষমতার সীমাও নির্ধারণ করে। সুতরাং কোনো সাইবার আইনই সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়।
ডিজিটাল জগৎ রাষ্ট্রের বাইরে কোনো অরাজক এলাকা নয়; আবার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো নির্বিচার পরিসরও নয়। সাইবার স্পেসও মানুষের নাগরিক পরিসরের অংশ।
এখানে প্রয়োজন এমন একটি আইন, যেখানে নিরাপত্তা থাকবে, কিন্তু স্বাধীনতার বিনিময়ে নয়; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু জবাবদিহির বাইরে নয়; আইন থাকবে, কিন্তু আইনের নামে নাগরিকের অধিকার সংকুচিত হবে না।
একটি নৈতিক প্রজাতন্ত্রে তিনটি প্রশ্ন সবসময় সামনে রাখতে হবে-
প্রথমত-রাষ্ট্র কী করতে পারবে?
দ্বিতীয়ত-রাষ্ট্র কী করতে পারবে না? তৃতীয়ত-রাষ্ট্র সীমা অতিক্রম করলে নাগরিকের প্রতিকার কী?
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কোনো নিরাপত্তা আইনই পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক আইন হতে পারে না। জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো-রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাঠামো ও ব্যবহারের সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। নাগরিকের অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা না করে কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্কারই পূর্ণতা পেতে পারে না।
সাইবার আইনও সেই বৃহত্তর রাষ্ট্র সংস্কারের বাইরে নয়।
 

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু সাইবার অপরাধ কীভাবে দমন হবে-তা নয়। প্রশ্ন হলো, অপরাধ দমনের ক্ষমতা দিতে গিয়ে আমরা রাষ্ট্রকে কতোটা ক্ষমতা দেবো এবং সেই ক্ষমতা থেকে নাগরিককে কীভাবে সুরক্ষা দেবো। রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বাড়বে, সেই ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমা ও জবাবদিহিও তত শক্তিশালী হতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা নয়-নাগরিককে নিরাপদ রেখে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে রাখাই একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের লক্ষ্য।
আর সেই লক্ষ্যই আমাদের নিয়ে যায় নৈতিক প্রজাতন্ত্রের দিকে-যেখানে রাষ্ট্র শক্তিশালী হবে, কিন্তু নাগরিকের স্বাধীনতার ঊর্ধ্বে নয়; আইন কঠোর হবে, কিন্তু ন্যায়ের সীমা অতিক্রম করবে না; এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষমতার শেষ জবাবদিহি থাকবে জনগণের কাছে।

 

রাষ্ট্র জনগণের অভিভাবক নয়-সেবক।
নাগরিককে শুধু অপরাধীর হাত থেকে নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার থেকেও সুরক্ষা দেয়াই নৈতিক প্রজাতন্ত্রের দায়িত্ব।
 

লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 
faraizees@gmail.com
 

এক্সক্লুসিভ'র অন্যান্য খবর