মজুরি বাড়ানোর দাবি নিয়ে ভেতরে ভেতরে অনেক আগে থেকেই অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি জোরালো হয়ে উঠে। দাবি নিয়ে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের কর্মসূচি দিয়ে তারা হঠাৎ মাঠে নামেন। শুরুতে এই আন্দোলন বিক্ষিপ্ত হলেও পরে তা ব্যাপক রূপ পায়। আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই প্রশ্ন তৈরি হয় শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে কারা সহিংস পথে নিয়ে গেল? কারা পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়ে, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে জনমনে ভীতির পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চালালো? আন্দোলনের মধ্যেই ঢাকা ও গাজীপুরে বেশ কয়েকজনকে সহিংসতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য প্রমাণ আসায় এই আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধনের বিষয়টি জোরালো হয়।
গোয়েন্দা তথ্য ও সহিংস কার্যক্রমের তদন্তে ভয়ঙ্কর তথ্য মিলেছে এই শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনে পলাতক শক্তি ভর করেছিল নিজেদের ফেরার পথ তৈরি করার জন্য। এ জন্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, এমপি, নেতাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা এই আন্দোলনে উস্কানি দিয়েছেন। ইন্ধন যুগিয়েছেন। অর্থায়ন করেছেন। ইতিমধ্যে গোয়েন্দা তথ্যে তাদের নাম-পরিচয়ও প্রকাশ হয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিতে উস্কানি দেয়া দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে তাদের তথ্য দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্দেশনা দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এই তালিকা দেখে অনেকে বুঝতে পেরেছেন শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে কেমন রাজনৈতিক ছক কষা হয়েছিল। এ ছাড়া এই আন্দোলন ঘিরে জামায়াত-এনসিপিসহ বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও সরকারি দলের তরফে প্রশ্ন তোলা হয়।
যদিও আন্দোলনে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর সরকারও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীলদের তরফেও বলা হয়েছে আন্দোলনটি আর শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর আন্দোলনের মধ্যে নেই। এখানে রাজনীতি ভর করেছে। সীমান্তের ওপার থেকে আন্দোলনে উস্কানি দেয়া হচ্ছে, অর্থায়ন করা হচ্ছে এটিও বলেছেন দায়িত্বশীলরা। এ ছাড়া আন্দোলন চলাকালে গ্রেপ্তার হওয়াদের কয়েকজনের পরিচয় দেখে আন্দোলনরত শ্রমিকদের মাঝেও বিভ্রান্তি দেখা দেয়। তাদের কেউ কেউ বুঝতে পারেন মজুরি বাড়ানোর যৌক্তিক আন্দোলনকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে একটি পক্ষ। এ কারণে সহিংস কর্মকাণ্ড হওয়ার পর ওই এলাকার শ্রমিকরা আর বড় ধরনের বিক্ষোভের দিকে যাননি। কোথাও কোথাও শ্রমিক আন্দোলন একেবারেই থেমে যায়। শ্রমিক আন্দোলনে রাজনীতি ভর করার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সরকারও দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। শ্রমঘন এলাকার নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিজিবি নামিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্টদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করে দ্রুত নির্দেশনা দিয়েছেন।
দ্রুতই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ডের প্রথম সভা থেকে জানিয়ে দেয়া হয় ডিসেম্বরেই শ্রমিকরা বাড়তি বেতন পাবেন। জানুয়ারিতে নতুন বেতন পাওয়ার সময়ই তাদের হাতে বাড়তি বেতন যাবে। আর বোর্ড দ্রুতই মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করে সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে। সরকারি এই উদ্যোগের পরও শ্রমিক আন্দোলন একেবারেই থেমে যায়নি। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জে বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ হয়েছে। তবে বেশির ভাগ কারখানায় এখন পরিস্থিতি শান্ত। শ্রমিকরা কাজে ফিরেছেন। দু’একটি কারখানা বন্ধ থাকলেও এগুলোও স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো মজুরি বাড়ানোর মতো একটি স্বাভাবিক ও যৌক্তিক দাবি নিয়ে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এই খাত ঘিরে কেন এই অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করা হলো। বড় দিন সামনে রেখে পোশাক শিল্প কারখানায় যখন কাজের ধুম তখন কেন শত শত কারখানা দিনের পর দিন বন্ধ রাখতে হলো। এই পরিস্থিতি তৈরি করে লাখ লাখ শ্রমিককে বেকার অবস্থায় ফেলে দেয়া হলো। বন্ধ থাকা কারখানায় এই সময়ে শ্রমিকদের হাজিরা দেয়া ছাড়া কোনো কাজ ছিল না। এসব কারখানা বন্ধ থাকায় তাদের কি পরিমাণ অর্ডার সরবরাহে সমস্যা হয়েছে। শিপমেন্ট, অর্ডার বাতিল হয়েছে এসব তথ্য আসতে আরও সময় লাগবে। কিন্তু খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমিক আন্দোলনের জেরে এই খাতের কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে ক্রেতাদের কাছে ভুল বার্তা গেছে। দেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগী দেশগুলো এ থেকে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করবে। আর এই পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মালিক, শ্রমিকসহ সব পক্ষ। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে দেশের অর্থনীতির।
ফ্যাসিস্ট আমলের লুটপাটের কারণে দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাত আগে থেকেই খাদের কিনারে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চেষ্টা করলেও কিছু করতে পারেনি। অবস্থা যেখানে ছিল সেখানে রেখেই তারা বিদায় নেয়। বরং ইন্টিরিম সময়ে মব কালচারের কারণে শিল্পোদ্যোক্তাদের নতুন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর তারাও এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারেনি। নাজুক অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই ভালো অবস্থায় নেই। এই অবস্থায় দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলে পরিচিত পোশাক শিল্প খাতে অস্থিরতা যে শুধু মজুরি বাড়ানোর আন্দোলন নয় তা আগেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কারা এই আন্দোলনে বাতাস দিয়েছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংস করার চেষ্টা করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন এখানে অনেক পক্ষ এবং শক্তি কাজ করেছে। কারণ এই খাতটির ক্ষতি হলে অনেক পক্ষ এ থেকে সুবিধা নিতে পারে। দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে পলাতক শক্তি চায় সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে। তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলে এই দেশে তাদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করতে চায়। একইভাবে বিরোধী দলগুলোও সরকারকে ঘায়েল করতে চাইছে।
কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পুরনো ধাঁচের এই রাজনীতি দেশের মানুষ ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট প্রত্যাখ্যান করেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ অতীতের ভুল ত্রুটির জন্য ক্ষমা না চেয়ে যে পথে হাঁটছে তা মানুষ গ্রহণ করছে না। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে শ্রমিক আন্দোলনে দলটির নেতাকর্মীদের মিশে যাওয়ার তথ্য প্রকাশের পর শ্রমিকরাও সতর্ক হয়ে যান। তারা কারও উস্কানিতে সহিংসতার পথে যাননি। শ্রমঘন এই খাতটি ধ্বংস হলে এর বড় ফায়দা পাবে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো। যারা বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগী। এসব দেশের সমর্থনে নানা পক্ষ এই খাত অস্থির রাখতে কাজ করে এমন তথ্য নতুন নয়। এ ছাড়া দেশের প্রধান এই শ্রম খাতে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এর অবদানও ৮ শতাংশের বেশি। ফলে কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার অর্থ শুধু শ্রমিকদের আয় বন্ধ হওয়া নয়; একই সঙ্গে দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস এবং এর সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হওয়া। অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে থমকে থাকা কর্মসংস্থান পরিস্থিতির মধ্যে এই খাতে নতুন কোনো অবস্থা তৈরি হলে হুমকির মুখে পড়বে লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন। যা দেশের অর্থনীতির জন্য মোটেও কাম্য নয়। এ ছাড়া কোনো কারণে এই খাত ঝুঁকিতে পড়লে এর প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে। পোশাক রপ্তানি থেকে পাওয়া আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান ভিত্তি। এ প্রবাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে ডলারের সরবরাহেও চাপ তৈরি হবে। এতে আমদানি ব্যয় মেটানো এবং শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে সমস্যা তৈরি হতে পারে। আমদানিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থায় বড় বিঘ্ন তৈরি করতে পারে।
পোশাক শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান। সুতা, কাপড়, ডায়িং, ওয়াশিং, প্রিন্টিং, বোতাম, জিপার, কার্টন ও প্যাকেজিং শিল্পের বড় অংশের ব্যবসা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি পরিবহন, বন্দর, শিপিং, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও পণ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভর করে। কারখানায় উৎপাদন কমলে এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ ও আয় কমে যাবে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বা কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হতে পারে। ফলে একটি শিল্পের সংকট ছড়িয়ে পড়তে পারে বহু খাতে। এ থেকে সরকারের রাজস্ব খাতেও বড় হুমকি তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।
ন্যূনতম মজুরির তুলনামূলক চিত্র:
পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের মূল দাবি তাদের মজুরি বাড়ানো। ২০২৩ সালে মজুরি বোর্ড পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করেছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এর সঙ্গে ওভারটাইমসহ কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন শ্রমিকরা। বর্তমান বাজারে এই টাকা দিয়ে একটি পরিবার যেনতেনভাবেও চলতে পারে না। একজন শ্রমিক তার পরিবারের ভরপোষণ এবং সন্তানের শিক্ষা নিয়েও ভাবতে হয়। বর্তমান মজুরি দিয়ে তারা পেরে উঠছেন না। এটি মালিক পক্ষও অনুধাবন করছেন। এর বাইরে বকেয়া বেতন পরিশোধ, ছাঁটাই বন্ধ, চাকরির নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানি বন্ধের দাবিও রয়েছে।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি একেবারেই যৌক্তিক। কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণে সরকার অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেও সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা একশ’ শতাংশের বেশি বাড়িয়েছে। যদিও এই বেতন দুই বছরে ধাপে ধাপে বাড়বে।
এ ছাড়া দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যবসা বাড়ছে। রপ্তানি বেড়েছে। এই খাতে সরকারের নীতি সহায়তাও অন্যান্য খাতের চেয়ে বেশি। তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় ন্যূনতম মজুরিতে দেশের শ্রমিকরা কিন্তু অনেক পিছিয়ে আছেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের শীর্ষ ক্রেতা সুইডেনভিত্তিক এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের গত মার্চের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী চীন, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, ভারত ও তুরস্ক-এই সাত দেশেই পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। দেশের ট্যানারি, জাহাজভাঙা, স’মিল এবং নির্মাণ-এই চার খাতেও ন্যূনতম মজুরি পোশাক শিল্পের চেয়ে বেশি। এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের গত মার্চের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০২ ডলার। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে নিম্নতম মজুরি ১২৪ মার্কিন ডলার। এ ছাড়া চীনে ২৯৪, কম্বোডিয়ায় ২০৮, ইন্দোনেশিয়ায় ১৭২, ভিয়েতনামে ১৬৩ এবং পাকিস্তানে ১৩৫ ডলার।
মালিকপক্ষ অবশ্য বলছে, শ্রমিকের কম উৎপাদনশীলতা, কম দামের পোশাক এবং পোশাক তৈরিতে কম মুনাফা হওয়ায় শ্রমিকদের বেতন তুলনামূলক কম। তারা বলছেন, ন্যূনতম মজুরি কম হলেও অনেক শ্রমিক সব মিলিয়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পেয়ে থাকেন।
এখানে উল্লেখ করা যায় যে, ১৯৮৪ সালে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের জন্য প্রথম ন্যূনতম মজুরিকাঠামো ঘোষিত হয়। তখন সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬২৭ টাকা।
গত দেড় দশকে রানা প্লাজা ধস, তাজরীন ফ্যাসনে অগ্নিকাণ্ডসহ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়েছে এই খাত। কোভিডের বৈশ্বিক সংকট, বর্তমানে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সংকটের মধ্যেও দেশের পোশাক খাত অবস্থান ধরে রেখেছে। যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সুসংবাদ।
তৈরি পোশাকের রপ্তানি ২০১১ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত বছর ৩ হাজার ৮৮২ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি এর আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। গত জুলাইয়ে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্যানুযায়ী, বিশ্ববাজারে গত বছর তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সবচেয়ে বেশি হিস্যা (মার্কেট শেয়ার) ছিল চীনের, ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। তারপরই বাংলাদেশের অবস্থান, ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এ ছাড়া ভিয়েতনামের হিস্যা ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ভারতের ৩ শতাংশ এবং তুরস্কের ২ দশমিক ৩ শতাংশ। দেশের রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় এই শিল্পের উদ্যোক্তারা বিভিন্ন ধরনের কর-সুবিধাও পেয়ে আসছেন। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা ধরে রাখার লক্ষ্যের কথা বলে মালিকেরা প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকার করছাড় পেয়ে থাকেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত শুধু করপোরেট করে ৫ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার ছাড় পেয়েছে। এর কারণ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পোশাক খাতে করপোরেট করহার সবচেয়ে কম, মাত্র ১২ শতাংশ। পরিবেশবান্ধব কারখানা হলে করপোরেট করহার ১০ শতাংশ। যদিও অন্য খাতের প্রতিষ্ঠানকে ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ করপোরেট কর দিতে হয়। আয়কর ছাড়াও বিভিন্ন বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নগদ সহায়তা পায় পোশাক শিল্প। বন্ড সুবিধাও পান শিল্প মালিকেরা। এই সুবিধার আওতায় পোশাক খাতের কাঁচামাল যেমন সুতা, কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্য বিদেশ থেকে আনতে কোনো শুল্ক-কর দিতে হয় না। চামড়া খাতসহ হাতেগোনা কয়েকটি খাত শুধু বন্ড সুবিধা পায়। অন্য খাতগুলো এসব সুবিধার বাইরে।
শ্রমিকদের নিয়ে নোংরা রাজনীতি আর কতোদিন: মজুরি সহ নানা দাবিতে পোশাক শিল্প শ্রমিকদের আন্দোলন আগেও হয়েছে। আন্দোলন ঘিরে প্রাণহানি, সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বেশির ভাগ আন্দোলনে ছিল রাজনৈতিক খেলা। রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থে তারা শ্রমিক আন্দোলনে উস্কানি দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা করেছে। এতে এই খাতের ক্ষতি হয়েছে। শ্রমিক, মালিক এবং দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০০৬ সালেও মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনের পর ন্যূনতম মজুরি পুনঃনির্ধারিত হয়েছিল। এরপর ২০১০ সালে শ্রম অসন্তোষের জেরে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১,৬৬২ টাকা থেকে ৩,০০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়। এরপরও ব্যাপক আন্দোলন চলে এবং সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ২০১৩ সালেও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন হয়। ওই বছর ন্যূনতম মজুরি ৫,৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পোশাক খাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ওই বছরের চব্বিশে এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১১শ’র বেশি শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায়। ২০১৮ সালে ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ৮ হাজার টাকা করা হয়। কিন্তু নতুন মজুরি কাঠামোর বিভিন্ন গ্রেডের অসংগতি নিয়ে শ্রমিকেরা তখন আন্দোলন করেছিলেন। সর্বশেষ ২০২৩ সালে মজুরি বৃদ্ধির দাবির আন্দোলনেও সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ওই বছরের ৩০শে অক্টোবর গাজীপুরে মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন রাসেল হাওলাদার। মার্কিন শ্রম দপ্তর ৮ই নভেম্বর প্রকাশিত বিবৃতিতে তার মৃত্যুর ঘটনাকে উল্লেখ করে বাংলাদেশে শ্রমিক আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংসতার নিন্দা জানায়। ৮ই নভেম্বর গাজীপুরে আন্দোলনের সময় নিহত হন শ্রমিক আনজুয়ারা খাতুন। ২০২৩ সালের আন্দোলনে অন্তত চারজন শ্রমিক নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে।
সময়ে সময়ে শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে, এর পেছনে তাদের আন্দোলন এবং আত্মদানের ঘটনাও রয়েছে। সামনে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করা হোক যাতে তাদের আর আন্দোলন করতে না হয়, জীবন দিতে না হয়। তার জন্য একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। পরিস্থিতি বিবেচনায় বর্তমান সরকার শ্রম আইনে সংশোধনী এনেছে। আগে ৫ বছর পর পর মজুরি বোর্ড গঠনের কথা থাকলেও এখন তা ৩ বছর করা হয়েছে। আমরা আশা করবো, শ্রম আইন অনুযায়ী তিন বছর পর পর নিয়মিত বোর্ড গঠন করে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করা হবে। একইসঙ্গে বর্তমানে ছয় সদস্যের যে বোর্ড মজুরি নির্ধারণে কাজ করছে তারা একটি যৌক্তিক মজুরি কাঠামো সুপারিশ করবে যা মালিক, শ্রমিক সবার জন্য গ্রহণযোগ্য হয়। একটি সন্তোষজনক মজুরি কাঠামো নির্ধারণ দেশের সবচেয়ে বড় এই খাতের স্থিতিশীলতার জন্য খুবই জরুরি। ঢালাওভাবে মালিকদের অ্যাকাউন্ট জব্দ করা ভুল বার্তা দিতে পারে। এমনিতেই গার্মেন্টস বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। এই ষড়যন্ত্রে যেন আমরা পা না দেই। মনে রাখতে হবে, সব গার্মেন্টস মালিক ষড়যন্ত্রের মধ্যে নেই। বিষয়টা খুবই স্পর্শকাতর। সরকারকে খুব সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা শ্রম আইন অনুযায়ী নিয়মিত মজুরি নির্ধারণ হলে শ্রমিকদের নিয়ে বার বার নোংরা রাজনীতির খেলার পথও বন্ধ হয়ে যাবে চিরতরে।