প্রচ্ছদ রচনা

জ্বালানি বোমায় জেরবার জীবন

লুৎফর রহমান | এক্সক্লুসিভ
সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
জ্বালানি বোমায় জেরবার জীবন

গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া ছিল জীবনযাত্রায় স্বস্তি। আওয়ামী লীগের জমানায় ক্ষমতাসীনদের লুটপাটের খড়্‌গ চেপেছিল মানুষের জীবনে। নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামে অতিষ্ঠ মানুষের ক্ষোভ গণ-অভ্যুত্থানে বড় রসদ জুগিয়েছে। অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশৃঙ্খলার মধ্যেও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। সরকারের চেষ্টার কারণে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে মানুষ খুব একটা অসন্তুষ্টও ছিল না। তবে পুরো স্বস্তি আসেনি। মব সংস্কৃতির বাড়-বাড়ন্ত আর দাবি আদায়ের নামে একের পর এক আন্দোলনে কাবু হয়ে ইউনূস সরকার যখন নির্বাচন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তখনো বাজার পরিস্থিতি খুব একটা খারাপ ছিল না। 
 

একটি গণতান্ত্রিক সরকার আসছে, পরিস্থিতির উন্নতি হবে-এমন আশা নিয়ে মানুষও তাকিয়ে ছিল। কিন্তু সেই সরকার আসার সাত মাস পরের পরিস্থিতি এখন মানুষের জন্য কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। নিত্যপণ্যের দাম কমবে, মানুষের এই আশা পূরণ হয়নি উল্টো বিদ্যুৎ জ্বালানির সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় অবস্থা অসহনীয় হয়ে উঠার উপক্রম। সর্বশেষ সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ঘটনাকে অনেকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন। কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তকে সরকারের জন্য আত্মঘাতী বলেও মনে করছেন। যদিও সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত নেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলে। জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ে সর্বত্র। কিন্তু এই সংকট কেবল যে বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে তা নয়। এটি এখন এক বৈশ্বিক সমস্যা। এই পরিস্থিতিতেও অনেক দেশ নানা কৌশলে নিজেদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা কি করেছি। সংকটের কথা বলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। গ্যাসের প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে পুরো উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থায় বড় প্রভাব পড়েছে। 

উৎপাদন পণ্যের দাম বেড়েছে। কৃষিপণ্যের দাম বেড়েছে। সেবাপণ্যের দাম বেড়েছে। 

 

চাল, ডাল, তেল কিনতে মানুষকে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। সড়কে চলতে গিয়ে বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। সেবা প্রতিষ্ঠানের সেবামূল্য বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর খরচও বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে কঠিন এক চাপে পড়েছে মানুষ। বাড়তি ব্যয়ে অনেকটা জেরবার জনজীবন। বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য পরিস্থিতি বেশি কষ্টকর হয়ে উঠেছে। অনেকে বলছেন, আয়ের দিক থেকে মানুষের স্তর বিন্যাসের প্রচলিত ব্যবস্থাও এখন আর কার্যকর নেই। কারণ স্বস্তিতে আছে এমন মানুষ এখন অনেক কম। এই অবস্থার মধ্যেই সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আরেকটি দরজা খোলা হয়েছে। সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের বেতন বাড়ানোর মতো অজনপ্রিয় আলোচনাও সামনে এসেছে। যার তুমুল সমালোচনা করছে খোদ বিরোধী দলও। বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয় এবং তারা সমর্থন করেন না বলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পর মন্ত্রী-এমপিদের বেতন বাড়াতে হবে এটি স্বাভাবিক হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের আলোচনা যারা সামনে এনেছে তারা সরকারের সুহৃদ কিনা- এমন প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ। 
 

সর্বশেষ এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম। আর দাম বাড়ানোর একদিনের মধ্যেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করে গণপরিবহন থেকে পণ্য পরিবহন, কৃষি ও বাজারে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। এর ফলে শুধু গাড়ির মালিক বা তেল ব্যবহারকারীর খরচই বাড়েনি; বরং জ্বালানি ব্যবহার করে এমন প্রায় প্রতিটি খাতের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে? উত্তরটি খুব কঠিন নয়। পরিবহন মালিক, কৃষক, ব্যবসায়ী বা শিল্পোদ্যোক্তা বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা নিজেদের কাঁধে নেবেন না; বরং এর বড় অংশই শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়বে। ইতিমধ্যে সরকার দূরপাল্লা ও নগর পরিবহনের বাসভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দূরপাল্লার বাসে ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন বাসে যাতায়াত করা লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন খরচ এখন আরও বাড়বে।
 

ওদিকে বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লঞ্চসহ ডিজেলনির্ভর যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। একটি ট্রাকের ভাড়া কোনো কোনো রুটে এক ধাক্কায় কয়েক হাজার টাকা বাড়ানোর দাবি উঠেছে। কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনের একটি ট্রাকের ভাড়া আগে ৩২ হাজার টাকা থাকলেও তেলের দাম বাড়ার পর তা ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে; এমন উদাহরণও পাওয়া যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই বাড়তি টাকা তারা নিজেদের পকেট থেকে দেবেন না। পরিবহন ব্যয় বাড়লে তা পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হবে।
 

এর অর্থ হলো- একটি পণ্য উৎপাদনের পর কারখানা থেকে পাইকারি বাজার, সেখান থেকে খুচরা বাজার এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাড়তি পরিবহন ব্যয় যুক্ত হতে পারে। ফলে শুধু বাসভাড়া নয়, বাজারের প্রায় সব পণ্যের দামেই এর প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
 

কৃষকের খরচ বাড়বে, চাপ পড়বে খাদ্যপণ্যের দামে
 

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে কৃষিতে। দেশের কৃষি এখনো ব্যাপকভাবে ডিজেলচালিত সেচ ও কৃষিযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। জমি প্রস্তুত, সেচ, ফসল কাটা, মাড়াই, পরিবহন; কৃষির বিভিন্ন পর্যায়েই ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে সামনে বোরো মৌসুম। দেশের মোট চাল উৎপাদনের বড় অংশ আসে বোরো থেকে এবং এই ফসলের সেচব্যবস্থা অনেকটাই ডিজেলনির্ভর। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ার অর্থ হলো কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া। 
 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে বছরে ডিজেলের যে ব্যবহার হয় তার একটি বড় অংশ কৃষিতে ব্যবহৃত হয়। নতুন দামে কৃষকদের জ্বালানি ব্যয় বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। 
কৃষক যদি বাড়তি উৎপাদন খরচের সমান দাম না পান, তাহলে তার আয় কমবে। আর কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লে বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার চাপও তৈরি হবে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রভাব শুধু কৃষকের জমিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা শহরের ভোক্তার বাজারেও পৌঁছে যাবে। 
 

শিল্পে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
 

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের কারণে দেশের শিল্প খাত অনেকদিন থেকেই ধুঁকছে। দফায় দফায় বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। এর মধ্যে নতুন করে যোগ হয়েছে বাড়তি জ্বালানির দাম। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল, সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জ্বালানি ব্যবহার হয়। কারখানার নিজস্ব পরিবহন, জেনারেটর, পণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতির পরিচালন ব্যয় বাড়বে জ্বালানির দাম বাড়ানোর কারণে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমনিতেই ঋণের ব্যয় বেশি, অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল এবং বিনিয়োগের গতি কম। এর মধ্যে জ্বালানি ব্যয় বাড়ানোয় উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে। উদ্যোক্তারা বাড়তি খরচ পণ্যের দামে সমন্বয় করার চেষ্টা করলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে। আর দাম বাড়ানো সম্ভব না হলে কমতে পারে মুনাফা ও বিনিয়োগের সক্ষমতা। এমন এক সময়ে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে যখন দেশে বিনিয়োগের খুব একটা ভালো পরিস্থিতি নেই। দাম বাড়ানোর এই উদ্যোগ নতুন বিনিয়োগের জন্যও এক ধরনের অনিশ্চয়তার পরিস্থিতি তৈরি করে। 
 

শুধু দাম বাড়ানোই কি সমাধান?
 

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরে সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছিলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে অব্যাহতভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আমাদের সামনে আবির্ভূত হচ্ছে। এর ফলে বীমার প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়া বাড়ছে। এ অবস্থায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের পক্ষে এ মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না।’ সরকারের তরফে এটা বলা হলেও ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন- দাম বাড়ানো ছাড়া ব্যয় কমানোর অন্য পথগুলো কতোটা কাজে লাগানো হচ্ছে? এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক মনে করেন, জ্বালানির দাম বাড়ানোই সমস্যার একমাত্র সমাধান কিনা, তা বিবেচনা করা দরকার। জ্বালানি সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থার অপচয়, সিস্টেম লস এবং ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা কমানোর সুযোগ থাকলে সেদিকেও নজর দেয়া প্রয়োজন।
 

অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের ওপর শুল্ক-কর কাঠামোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিপিসি’র তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আমদানি করা ডিজেলের ওপর লিটারপ্রতি উল্লেখযোগ্য অঙ্কের শুল্ককর দিচ্ছে সরকার। ফলে মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি কর কাঠামো, সরকারি ব্যয় এবং জ্বালানি খাতের দক্ষতাও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। 
 

এ ছাড়া বিদ্যুৎ  ও জ্বালানি খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র পুরনো। এই চিত্র বদলাতে দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত না নিয়ে ক্রমাগত দাম বাড়িয়ে চললে সরকারের লক্ষ্য অর্জন কিছুতেই সম্ভব হবে না। 
 

সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে বেশি
 

অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার প্রভাব বেশি পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর- বিশেষ করে কম ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের ওপর। উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য এটি ততোটা প্রভাব ফেলে না। উচ্চআয়ের মানুষ বাড়তি পরিবহন বা জ্বালানি ব্যয় তুলনামূলক সহজে সামলাতে পারলেও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য ১০০ বা ২০০ টাকা অতিরিক্ত খরচও মাসিক বাজেটে বড় ধাক্কা হয়ে দেখা দেয়। একজন দিনমজুর, পোশাকশ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী কিংবা নিম্ন আয়ের চাকরিজীবীর আয় যদি একই থাকে অথচ প্রতিদিনের যাতায়াত, বাজার ও পরিবারের খাবারের খরচ বাড়ে, তাহলে তাকে অন্য কোনো খাতের ব্যয় কমাতে হয়। সঞ্চয় কমে যায়, ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। যার ফলে জীবনযাত্রার মান নিম্ন থেকে নিম্নমুখী হতে থাকে। 
 

জ্বালানি তেলে কর কমালে কি দাম ঠিক রাখা যেতো
 

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কর-শুল্কের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। খাত-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ২৫ শতাংশ কর-শুল্ক যুক্ত হচ্ছে, যার পরিমাণ ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা। তাদের মতে, সংকটের সময়ে এই করের হার সাময়িকভাবে কমিয়ে আনা গেলে দাম আরও কম বাড়ালেও হতো। এতে একসঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর বড় চাপ পড়তো না। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন কর-শুল্কের একটি অংশ সরকার সাময়িকভাবে ছাড় দিলে রাজস্ব কমবে ঠিকই। কিন্তু এর বিনিময়ে পরিবহন, কৃষি ও পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হতো। যা মূল্যস্ফীতি চেপে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হতো। জ্বালানি তেলে আগে বিপিসি কর-শুল্ক দিতে হতো ট্যারিফ ভ্যালুতে। ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকার বিপিসিকে কর-শুল্ক দিতে বাধ্য করেছে ইনভয়েজ ভ্যালুতে। এতে তেলের দাম বাড়লে কর-শুল্কও বাড়ে। প্রতি লিটার তেলে এখন ২৫ শতাংশ কর-শুল্ক ধরলে ৩৫-৩৮ টাকা পরিশোধ করতে হয়। ট্যারিফ ভ্যালুতে এটা প্রায় নির্ধারিত ছিল। 
 

এ ছাড়া জ্বালানি আমদানি করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিপিসি’র আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ১১ বছরে সংস্থাটি প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। গত অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে বিপিসি। বিপিসি’র অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিপিসি ও এর আওতাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিপুল অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকে আমানত হিসেবে রাখা হয়। সেই অর্থ থেকে সুদ আসে। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা- এই তিন বিপণন কোম্পানির মোট লাভের বড় অংশ সুদ থেকে আসে। এই মুনাফা থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বড় অঙ্কের বোনাস নেয়ার তথ্যও এসেছে সময়ে সময়ে। এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, পরিচালন ব্যয় নিয়েও বহু বছর ধরে প্রশ্ন জারি আছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সংকটের সময়ে এসব ব্যয়, ব্যাংক আমানত, বোনাস ও উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রাধিকার নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বিপিসি’র ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমানোর পাশাপাশি জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখাও সম্ভব। 
 

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হওয়া নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নেয়া সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। বিশেষ করে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমাগত জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় মানুষ যে ত্রাহি অবস্থায় পড়ে তা থেকে বাঁচাতে সরকার চাওয়ার চেয়েও বেশি কিছু করবে- এমনটা আশা করেছিল মানুষ। দায়িত্ব নেয়ার পর সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। কিছু উদ্যোগ পরিস্থিতিকে উল্টো দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটা সত্য, মানুষের প্রত্যাশা পূরণে শুধু প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না। সরকারকে বাস্তবমুখী ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নতি করতে হবে। উৎপাদন খরচ কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পণ্য বাজারে বিদ্যমান সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। এসব করার ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগগুলো খুব একটা দৃশ্যমান নয়।

 

 সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের পারফরমেন্স হতাশাজনক। দপ্তরগুলো অনেকটা অকার্যকর, নিষ্ক্রিয়। সর্বশেষ ব্যয় সামলানোর কথা বলে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়া, গণশুনানি ছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ’২৪-এর অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষের মন-মানসে কিন্তু অনেক পরিবর্তন এসেছে। মানুষের চিন্তা ও কৌশল আর আগের মতো নেই। এসব বিবেচনায় নিয়েই সরকারকে দিক নির্ধারণ করতে হবে। সস্তা জনপ্রিয়তার অতীত কৌশল বাদ দিয়ে নতুন চিন্তা করতে হবে। জীবনযাত্রার অব্যাহত চাপ লাঘব করতে না পারলে মানুষ সরকারের অন্যকোনো অর্জনকেই ধর্তব্য মনে করবে না। 

 

এক্সক্লুসিভ'র অন্যান্য খবর