বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় মব সহিংসতা বর্তমানে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। মব কালচার বা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার এই প্রবণতা ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রবণতাটি চলে আসলেও ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এটি অনেক বেশি ব্যাপকতা পেয়েছে। ২০২৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার আসার পর পরিস্থিতির উন্নতি আশা করা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের উপস্থিতিতেই বাধাহীনভাবে মব সংঘটিত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অসহায়ত্বও ফুটে উঠছে। অতি সমপ্রতি জাসদের দলীয় কার্যালয়ে একটি ঘরোয়া আলোচনা সভায় দলটির নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত শারীরিক আক্রমণ একটি আলোচিত ঘটনা এবং ওই আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়েছেন যুবদলের একজন শীর্ষ সারির নেতা। এটিও পুলিশের উপস্থিতিতেই ঘটেছে। আরও একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই মব কালচারের জের দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও বিস্তৃত হচ্ছে। কিছুদিন আগে ইতালিতে চলচ্চিত্র অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে হেনস্তা করার ঘটনাটি তো দেশের অনেকেই জানেন।
২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসে মব সহিংসতার শিকার হয়ে ১৩৩ জন নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ‘মব’ সহিংসতার অন্তত ৬৫টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৭৪ জন আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আগস্টের তুলনায় নিহতের সংখ্যা কম।
কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা প্রমাণের তোয়াক্কা না করে কেবল গুজব, সন্দেহ বা তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বশে একদল মানুষ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর সহিংস চড়াও হচ্ছে। মব জাস্টিস বলা হলেও আদতে এটি কোনো বিচার নয়, বরং আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চরম বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ। একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজে মব কালচারের বিস্তার কেবল মানবাধিকারেরই লঙ্ঘন নয়, বরং তা সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে পঙ্গু করে দেয়। এটি আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করার শামিল।
যদিও বাংলাদেশে মব কালচার বা গণপিটুনির মতো ঘটনা হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে বেশ কিছু গভীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা, গুজবের দ্রুত বিস্তার, সামাজিক সহনশীলতার অভাব ও চরমপন্থা, দণ্ডহীনতার সংস্কৃতি, মনস্তাত্ত্বিক হিড়িক বা ‘ডি-অ্যারেঞ্জড মব সাইকোলজি অন্যতম। বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে মব সহিংসতার কিছু ধরন লক্ষ্য করা যায়। যেমন, গ্রামাঞ্চল ও শহরাঞ্চলের নিম্নবিত্ত এলাকায় সামান্য চুরির অভিযোগে বা স্রেফ সন্দেহের বশে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটছে। এই প্রবণতাটি বহু পুরনো।
আরেকটি হচ্ছে, রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক মব। দৃশ্যত, বর্তমানে এটি অনেক বেশি ব্যাপকতা পেয়েছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা অস্থিরতার সময়ে প্রতিপক্ষকে দমনে কিংবা ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে মব জাস্টিসের আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। এমনকি ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে জোরপূর্বক বের করে দিতে বা পদত্যাগ করাতেও মব জাস্টিসের আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। এই মব কালচার রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরেই ছড়িয়ে গেছে। যেটির দীর্ঘমেয়াদি একটি ভয়াবহ সামাজিক প্রভাবের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক মবের ক্ষেত্রে বিষয়টি পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হচ্ছে। যা দেশের দূর অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সর্বোচ্চ হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। দেশের রাজনীতিতে ন্যূনতম সৌজন্য, সহনশীলতা, এমনকি পারস্পরিক সামাজিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এটি দীর্ঘস্থায়ী দেয়াল তৈরি করছে।
ছেলেধরার নাম করে গুজবের মাধ্যমে মব সৃষ্টি করাকে এর আরেকটি ধরন হিসেবে লক্ষ্য করা যায়। ২০১৯ সালের পদ্মা সেতু নিয়ে ছড়ানো ‘ছেলেধরা’ গুজবের জেরে ঢাকার বাড্ডায় তসলিমা বেগম রেণু নামের এক মাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, যা মব কালচারের এক কালো অধ্যায়। এটি একটি উদাহরণ মাত্র। পরবর্তীতে একই ধরনের ঘটনা আরও ঘটেছে।
কেউ কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা। কিন্তু বিদ্যমান মব কালচার এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে। এটিকে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগ তথা আইনের প্রতি অনাস্থার প্রকাশ হিসেবেও কেউ কেউ দাবি করেন। সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের ধারণা, প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের শাস্তি পেতে দীর্ঘ সময় লাগে বা অনেক সময় প্রভাবশালীরা পার পেয়ে যায়। এই অনাস্থা থেকে অনেকক্ষেত্রে মানুষ নিজেরাই অপরিণামদর্শী হয়ে তাৎক্ষণিক ‘বিচার’ করতে প্রলুব্ধ হয়।
ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বর্তমানে মব সহিংসতা উস্কে দেয়ার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। কোনো তথ্য যাচাই না করেই মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া উস্কানিমূলক পোস্ট বা ভিডিও হাজারো মানুষকে সহিংস করে তুলছে। সমাজে পারস্পরিক সহনশীলতা, ধৈর্য এবং পরমতসহিষ্ণুতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। যেকোনো ভিন্নমত বা আচরণের মুখোমুখি হলে আলোচনার চেয়ে বলপ্রয়োগকে সহজ সমাধান মনে করা হচ্ছে। অতীতে ঘটে যাওয়া বহু গণপিটুনি বা মব সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলেছে।
এই মব কালচারের প্রভাব কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকে এক চরম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। মব জাস্টিসের সবচেয়ে বড় শিকার মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে আইনের আশ্রয় লাভের এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার দিয়েছে। কিন্তু মব কালচারে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই পিটিয়ে মেরে ফেলা বা পঙ্গু করে দেয়া হয়। সভ্য সমাজে এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং বর্বরতাসম। একটি দেশে যখন সাধারণ নাগরিকরা নিজেরাই পুলিশ, আদালত ও জল্লাদের ভূমিকা পালন করতে শুরু করে, তখন সেখানে আইনের শাসন বলে কিছু থাকে না। মব কালচার বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মব সহিংসতার বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এতে অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই শাস্তি দেয়া। ফলে বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সম্পূর্ণ নিরপরাধ মানুষ স্রেফ ভুল বোঝাবুঝি বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে মব জাস্টিসের শিকার হয়েছেন। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায়, এর সঙ্গে সম্পত্তি বা আর্থিক স্বার্থ হাসিলের বিষয়ের যোগসূত্র রয়েছে। এতে সমাজের সাধারণ মানুষের মনে তীব্র নিরাপত্তাহীনতাবোধ তৈরি হয়। কেউই আর নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারে না, কারণ যেকোনো সময় যেকোনো উসিলায় যে কেউ মবের শিকার হতে পারে। মব কালচার সমাজের ভেতরকার পারস্পরিক বিশ্বাস ও সৌহার্দ্য নষ্ট করে দেয়। প্রতিবেশী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে, এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দলবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে সামাজিক ও সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে এবং সমাজে স্থায়ী বিভাজনের সৃষ্টি হচ্ছে।
কাজেই রাষ্ট্রকে এটি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে যে, অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে মব কালচার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করছে, যা বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মব সহিংসতার সময় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনায় সরকারি-বেসরকারি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বিপুল। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও এটি অন্যতম প্রতিবন্ধকতা।
এই আত্মঘাতী মব কালচার থেকে বের হয়ে আসতে হলে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। দল বা গোষ্ঠী বিবেচনায় না নিয়ে এ ধরনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদার মনোবৃত্তি নিয়ে তৎপর হতে হবে। এ ব্যাপারে গণসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে, অপরাধী নিশ্চিতভাবেই যথাসময়ে শাস্তি পাবে।