সাম্প্রতিক

ত্রিবেদীর ঝটিকা দিল্লি সফর কী বার্তা দিচ্ছে

আব্দুল কাইয়ুম | এক্সক্লুসিভ
অক্টোবর ১০, ২০২৬
ত্রিবেদীর ঝটিকা দিল্লি সফর কী বার্তা দিচ্ছে

বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক। চব্বিশের ৫ই আগস্টের পর সেই আলোচনা পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। রাজনীতিবিদ থেকে সাধারণ মানুষ- সবারই এখন কৌতূহল, কোন পথে যাচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। সে কারণে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর কর্মকাণ্ডেও বাড়তি নজর রয়েছে। তিনি কী করছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে বৈঠক করছেন- এসব নিয়ে ঢাকা থেকে দিল্লি, দুই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে আগ্রহ।
 

গত সপ্তাহে ত্রিবেদীর আকস্মিক দিল্লি সফর সেই কৌতূহল আরও বাড়িয়েছে। এর পেছনে কারণও রয়েছে। সাধারণ কূটনৈতিক প্রটোকলের বাইরে গিয়ে সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। একজন হাইকমিশনারের জন্য সরকারপ্রধানের সঙ্গে এমন সরাসরি বৈঠক খুব ঘন ঘন দেখা যায় না। সাধারণত দূতাবাস ও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমেই কোনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সরকারপ্রধানের কাছে পৌঁছায়। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দিল্লি এবার কিছুটা ভিন্ন পথেই হাঁটছে।
 

সাউথ ব্লকের একটি শক্তিশালী অংশের বিরোধিতা সত্ত্বেও কেবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদায় থাকা দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় হাইকমিশনার করে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পেছনে যে বিশেষ বার্তা ছিল, তা এখন স্পষ্ট হচ্ছে। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তিনি সরাসরি মোদির কাছে তুলে ধরছেন। গত পাঁচ মাসে দুই দফায় দিল্লি গেছেন ত্রিবেদী। দুই সফরেই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন তিনি।
গত সোমবার মোদি-ত্রিবেদী বৈঠকটি তাই আলাদা করে নজর কেড়েছে। কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ জানা যায়, ঢাকায় নেই ভারতীয় হাইকমিশনার। তিনি দিল্লিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। কেন এই আকস্মিক সফর, কী বার্তা নিয়ে ত্রিবেদী দিল্লি গেলেন- তা নিয়ে শুরু হয় নানা জল্পনা।
 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে সামনে রেখেই ত্রিবেদীর এই ঝটিকা সফর। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নভেম্বরের শেষ অথবা ডিসেম্বরের শুরুতে দিল্লি সফরে যেতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সেই সফর নিয়ে ঢাকার অবস্থান ও প্রত্যাশার একটি স্পষ্ট বার্তা নিয়েই দিল্লি গেছেন ত্রিবেদী। 
এর আগে আগস্টেও তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ওই সময় দিল্লিতে অবস্থান করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও সফরটির ক্ষেত্রে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এবার সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সে বিষয়ে আগেভাগেই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে দিল্লি।
 

আগস্টে ঢাকার পক্ষ থেকে দিল্লিতে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রত্যাশার কথা জানানো হয়েছিল। এরপর ২৯শে আগস্ট দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানের অনুমতি চায় বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টরা। এবার দিল্লি সেই অনুমতি দেয়নি। এরপর শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটি ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও সেটিও করতে দেয়া হয়নি। বৈঠকে অংশ নিতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দিল্লিতে যাওয়া নেতাদের নিজ নিজ এলাকায় ফেরার ক্ষেত্রেও বিমানযাত্রার সুযোগ দেয়া হয়নি। বৈধ কাগজপত্রের প্রয়োজন হওয়ায় তাদের ট্রেনে ফিরতে হয়েছে।
ঢাকার একটি দায়িত্বশীল সূত্র দিল্লির এসব দৃশ্যমান পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। ওই সূত্রের মতে, দিল্লিতে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লাগাম টানার বিষয়টি তারেক রহমানের ভারত সফরের পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
 

মোদির পাশাপাশি ত্রিবেদীর ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। পরে সেই বৈঠকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে ভারতীয় সেনাবাহিনী জানায়, বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা ইস্যুতে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। ধীরাজের পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির সঙ্গেও ত্রিবেদীর সাক্ষাৎ হয়। দিল্লির একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ত্রিবেদী দিল্লিতে বিভিন্ন গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। কূটনৈতিক সূত্রের মতে, সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার বিষয়ে গোয়েন্দাদের সঙ্গে বসেন ত্রিবেদী। 
 

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর শুধু তারিখ কিংবা নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব বিষয়ে আগেভাগেই দিল্লির অবস্থান জানতে চায় ঢাকা। বিশেষ করে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ফেরত দেয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
 

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এসব বিষয়েই ঢাকার বার্তা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজ করছেন ত্রিবেদী। ফলে তার আকস্মিক দিল্লি সফরকে শুধু একজন হাইকমিশনারের রুটিন সফর হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
গঙ্গার পানি বণ্টন ইস্যুতে নতুন চুক্তি চায় ঢাকা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর হলে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছরের এই চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ই ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। ফলে চুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই আলোচনা শুরু করতে চায় ঢাকা। নতুন চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ বিষয়ে একটি গ্যারান্টি ক্লজ চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি প্রবাহের কারণে বাংলাদেশে বন্যা ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর বিষয়টিও নতুন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রত্যাশা রয়েছে ঢাকার। সম্প্রতি পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী আশা প্রকাশ করেছেন যে, ডিসেম্বরের আগেই নতুন করে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পন্ন হবে।
 

যদিও গঙ্গা চুক্তির নবায়ন নিয়ে দুই দেশের অবস্থান এখনো এক জায়গায় আসেনি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং পার্লামেন্টে জানিয়েছিলেন, তখনো চুক্তিটির নবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়নি। পরে দিল্লির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিষয়টি বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামো, বিশেষ করে যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে এগিয়ে নেয়া হবে। এ ছাড়া গঙ্গার অংশীদার ভারতের বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফেও আগের চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। এই রাজ্যগুলোও এবারের চুক্তিতে তাদের হিস্যার দাবি জানিয়েছে। গঙ্গা ইস্যুটির রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলেও তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এর বিরোধিতা করেছিলেন। বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থি হিসেবে চুক্তিটির সমালোচনা করেছিল বিএনপি। এবার বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ই সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে। ফলে নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ আরও শক্তভাবে নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে দিল্লির সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায় ঢাকা।
 

হাসিনার প্রত্যর্পণে দিল্লির অবস্থান: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আগে আরেকটি বড় ইস্যু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি দীর্ঘদিন ধরেই জানিয়ে আসছে ঢাকা। দিল্লির সঙ্গে আলোচনায় এই বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারতের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দিল্লিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও ঢাকার আপত্তি রয়েছে। সফরের পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে বিষয়টি তাই আলাদা গুরুত্ব বহন করছে।
 

হাদি হত্যার আসামিদের ফেরত চায় ঢাকা: দুই দেশের আলোচনায় শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক মুখপাত্র হাদি সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত হওয়ার পর হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চায় ঢাকা। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারতে অবস্থানরত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি দিল্লির কাছে তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান ও সহযোগিতার মাত্রা সম্পর্কে স্পষ্টতা চায় বাংলাদেশ। ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আলোচনায় এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। প্রসঙ্গত, ইতিমধ্যেই হাদির হত্যায় জড়িত প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ।
 

শুধু সফরের আনুষ্ঠানিকতা নয়, দেশের স্বার্থ রক্ষায় মনোযোগী ঢাকা: তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ চলছে। ঢাকার প্রত্যাশা, সফরটি যেন কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ, আনুষ্ঠানিক বৈঠক আর যৌথ বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি চায় ঢাকা। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, সফরের আগে এ কারণেই বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। নিরাপত্তা থেকে শুরু করে পানি, প্রত্যর্পণ ও সীমান্তের বাইরে অবস্থানরত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড-প্রতিটি বিষয়েই ঢাকার অবস্থান পরিষ্কার করতে চায় সরকার। এই প্রেক্ষাপটে ত্রিবেদীর এবারের দিল্লি সফর তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, ঢাকায় বসে তিনি শুধু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন না, একই সঙ্গে ঢাকার বার্তাও সরাসরি দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। ফলে তার ঝটিকা সফর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায় নিয়ে দিল্লির ভাবনারও একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

 

এক্সক্লুসিভ'র অন্যান্য খবর