ভাই আপনার পেশা কী? কী করেন, কীভাবে চলেন। সবমিলিয়ে কেমন আছেন? জবাব-কিছু করি না। অমুক ‘ভাই’য়ের সঙ্গে আছি। ‘ভাই’কে নিশ্চয় চেনেন। জবাব শুনে ভদ্রলোক ভড়কে গেলেন। সাহস পেলেন না অন্য কিছু বলতে। আসলে ‘ভাই’ কী করেন এলাকার সবাই জানেন। তিনি মাস্তান। তিনি নেতা। তিনি মানুষের পকেট কাটেন। ভয় দেখিয়ে টাকা বানান। ওই টাকার কিছু ভাগ দেন। বিখ্যাত চাঁদাবাজ হিসেবে তার নাম চারদিকে। পুলিশ ভয় পায়। ধরতে এসেও ধরে না। উপরের তলায় খবর পাঠায়-স্যার, তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। শিল্পপতিরা মাস শেষে তাকে সম্মানী পাঠান। এলাকার মানুষ তটস্থ। শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে সব জায়গাতে একই চিত্র। চাঁদাবাজের ভয়ে অনেক ব্যবসায়ী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এলাকামুখী হচ্ছেন না। নতুন কোনো শিল্পকারখানা গড়ার চেষ্টা করছেন না অনেকে। ব্যাংক থেকে কবে, কখন, কাকে ঋণ দেয়া হচ্ছে এই নেটওয়ার্কও চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে। ব্যাংক ম্যানেজারদেরকেও তারা শাসিয়ে আসে। লোন হওয়ার প্রক্রিয়া চলামাত্রই খবর দিতে হবে। চাঁদাবাজ নেটওয়ার্ক সচল। অমুক ‘ভাই’, তমুক ‘ভাই’ এই নেটওয়ার্কের মালিক এবং নিয়ন্ত্রক। চাঁদাবাজি এক ধরনের মহামারিতে রূপ নিয়েছে। খুনখারাবি বাড়ছে। সরকার বদলায়, নেটওয়ার্কও বদলে যায়। রাজধানী ঢাকার অলিগলিতে চাঁদাবাজরা সক্রিয়। ফুটপাথের ব্যবসায়ীরা দিশাহারা।
কারণ দিনের মধ্যে অন্তত তিনটি গ্রুপকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। স্কুল-কলেজেও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য। এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। শাসকদলের সমর্থন ছাড়া চাঁদাবাজি করা যায় না। লাগে প্রশাসনের সমর্থন। অলিগলিতে যে সব যান চলে সেখানেও নিয়ন্ত্রণ এই ‘ভাই’দের। ব্যবহার হচ্ছে অস্ত্র ও মাদক। ‘ভাই’দের সাপোর্টে চলে কিশোর গ্যাং। দুশ্চিন্তার ছাপ অভিভাবকদের কপালে। ইদানীং মব সন্ত্রাস নতুন করে জেগে উঠেছে। রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা হতবাক করেছে জাতিকে। দখলবাজি আর ভাগাভাগি চলছেই। হালে আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধেও দখলবাজির নানা অভিযোগ। ঢাকায় তো একজন আইনপ্রণেতাকে সরিয়েই দেয়া হয়েছে। শিল্পাঞ্চলে সবচাইতে বেশি চাঁদাবাজি হচ্ছে। এমন কী বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও অস্থির। তারা এই পরিস্থিতির জন্য মোটেও প্রস্তুত নন। মাসোহারা দিতে তারা অভ্যস্ত। আবার কখনো কখনো সে সব ‘ভাই’দের কাছ থেকে নিম্নমানের মালামাল নিতেও বাধ্য করা হয়। ব্যতিক্রম হলেই হামলা-নির্যাতন। বলা হয়ে থাকে-এই চাঁদার ভাগ নাকি ঘাটে ঘাটে দিতে হয়! আগে এই চাঁদার নেটওয়ার্ক ছিল কিছুটা গোপনে। এখন প্রকাশ্যে, ঘোষণা দিয়ে। রাজনৈতিক মদত ছাড়া চাঁদাবাজি যে চলে না-এটা সবার জানা। কেন এমন হলো?
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনিক দুর্বলতাই এর মূল কারণ। ‘ভাই’য়ের হাতে এলাকার গোটা প্রশাসন। তিনি যা চান তাই হয়। সহযোগিতা না করলেই একদম বান্দরবানে। আবার কখনো ওএসডি। টেন্ডার নিয়ে নতুন এক বাণিজ্য। ‘ভাই’য়ের নিয়ন্ত্রণে এলাকার টেন্ডার। সংবাদমাধ্যমে টেন্ডার ছাপা হওয়া মাত্রই একাধিক গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠে। কাজ পাওয়ার আগেই ‘ভাই’য়ের সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়। হাটে, মাঠে, ঘাটে ও বালুমহাল লিজ-ইজারা-সবখানেই ‘ভাই’। শাসক দলের নেতারা সবই জানেন। কিন্তু তারা কোনো অ্যাকশনে যান না। বলাবলি আছে, নেতার বাসায়ও ভাগ পৌঁছে যায় সময়মতো। এই পরিস্থিতি শুধু এখন নয়, যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। সরকার বদলায় চাঁদাবাজের ফরম্যাটেও নতুন রূপ পায়। সাধারণ মানুষ এখানে জিম্মিই থেকে যায়। এমনকি কবরের মাটি পেতেও ‘ভাই’ ধরতে হয়। বেশ কিছু চাঁদাবাজ গ্রুপ রয়েছে যারা দেশের বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। কথায় কথায় একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘আপনারা সবসময়ই আমাদের দোষারোপ করেন। বলেন, আমরা দেখেও নাকি দেখি না! কিন্তু আমাদের যে কষ্ট- সেটা আপনারা জানেন। প্রমোশন, পোস্টিং কেনাবেচা-এটা তো আপনাদের অজানা নয়। একজন অফিসার যখন কেনাবেচার মাধ্যমে কোনো এলাকার দায়িত্ব পান তখন তার কাজ কী হয়।
তখন তার প্রথম কাজ হচ্ছে-যে পুঁজি তিনি বিনিয়োগ করেছেন তা উঠানো। আর উঠাতে গিয়েই তিনি চাঁদাবাজদের সঙ্গে মিলে যান।’ স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন নিয়োগেও ‘ভাই’দের নিয়ন্ত্রণ। এমনকি প্রশাসনিক কর্তারাও বলে বসেন, বুঝেনই তো! আমাদের কী-ইবা করার আছে! বিদেশগামী বাংলাদেশিদের বিড়ম্বনা অন্যখানে। তাদেরকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে ছাড়পত্র পেতে হয়। ‘ভাই’য়ের নেটওয়ার্ক এখানেও সচল। ‘ভাই’য়ের ইশারা ছাড়া কিছুই মেলে না। এসবের জন্য একটা পদ দরকার। এত গেল ছোটখাটো চাঁদাবাজির কিছু খবরাখবর। ছিনতাই-রাহাজানি নিত্যদিনের ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর মানুষের আস্থাহীনতা বাড়ছে। কমিশন বাণিজ্য আগেও ছিল। তবে ধরনটা অনেকখানি পাল্টে গেছে। আগে বিদেশি ব্যাংকে টাকা জমা হতো। এখন ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে। এজন্য কোনো অ্যাকাউন্ট লাগে না। ঝুঁকিও নাকি কম। পর্দার আড়ালে সামপ্রতিক বেশ কিছু ঘটনায় রীতিমতো চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।