এই সময়

রাড্ডা থেকে ঘুণ্টিঘর, প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিলেন

শামীমুল হক | মতামত
অক্টোবর ২৪, ২০২৬
রাড্ডা থেকে ঘুণ্টিঘর, প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিলেন

রাড্ডা থেকে ঘুণ্টিঘর। স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখল থেকে মাদকবিরোধী অভিযান। দু’টি ঘটনায়ই ব্যবহার হয়েছে অস্ত্র। রাড্ডায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য জমি দখল। আর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘরে মাদক নির্মূলে অভিযান চালানো হয়েছে। রাড্ডাকাণ্ডে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি কাঠগড়ায়। মিষ্টির লোকজন এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত। কী ঘটেছিল সেখানে? ২৪শে সেপ্টেম্বর মধ্যরাত। মিরপুরে ‘রাড্ডা মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ দখল করার উদ্দেশ্যে গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটে। কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর, লুটপাটের পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেয়া হয়। এই সমিতির সঙ্গে মিষ্টি জড়িত। আর এ ঘটনা ঘটায় তার লোকজনই। এই   রাড্ডাকাণ্ড দেশ জুড়ে আলোচনার খোরাক জোগায়। প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে সরকার। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সময় নেননি। সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। মিষ্টি পদত্যাগ করেন। আর ঘুণ্টিঘরকাণ্ডে সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন আলোচনায় আসেন। মাদকের আড়ত ঘুণ্টিঘরে তার নিজের লোকজন নিয়ে অভিযান চালান। অভিযানের একপর্যায়ে নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্র প্রদর্শন করেন। তার এ ছবি মিডিয়ায় আসার পর এ নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। একজন প্রতিমন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি হয়ে তিনি কি এভাবে জনগণকে অস্ত্রের ভয় দেখাতে পারেন?  পক্ষে-বিপক্ষে তীব্র আলোচনার মধ্যেই তাকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এই নির্দেশ নিয়েও শুরু হয় আরেক খেলা। ইশরাকের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয় এটা গুজব। অন্যদিকে সরকারের সংশ্লিষ্টরা মুখে কুলুপ আঁটেন। মিডিয়াসহ দেশবাসী পড়ে যান এক বিভ্রান্তিতে। পরদিন সকালেই এর পরিসমাপ্তি ঘটে। ইশরাক যখন ঘোষণা দেন সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগ করবেন মন্ত্রিসভা থেকে। এখানে প্রশ্ন হলো-একজন সংসদ সদস্য পদ হারিয়েছেন জমি দখল ও মব সৃষ্টি করে স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখল করার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে। দেশবাসী প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। বাহবা দিয়েছেন। কিন্তু ইশরাক হোসেনের ঘটনায় সৃষ্টি হয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বেশির ভাগ মানুষ বলছেন, তাকে পদত্যাগ করতে বলা কতোটুকু যৌক্তিক। এ পদত্যাগে মাদকের জয় হয়েছে। সারা দেশে মাদক কারবারিরা উল্লাস নৃত্য করছে। তারা বলছে, মন্ত্রীর চেয়েও আমরা ক্ষমতাশালী। তাহলে প্রধানমন্ত্রীর কি করার ছিল-এ প্রশ্নটিও এসে যায়। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় যেকোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলতে পারেন। এতে কোনো ফাঁক ফোকর নেই। কিন্তু এমন সময়ে করাটা প্রশ্নসাপেক্ষ। প্রধানমন্ত্রী কিছুটা সময় নিতে পারতেন। পরে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিতে পারতেন। এখানেও আরেকটি বিষয় একজন জনপ্রতিনিধি ও প্রতিমন্ত্রী হয়ে তিনি এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করতে পারেন না। এখানেই তার ভুল। কিন্তু এ ভুল করেছেন সমাজকে মাদকমুক্ত করতে গিয়ে। যেখানে প্রতিপক্ষ মাদক কারবারি। যারা দেশের যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে তিলে তিলে। এ বিষয়টি ভেবে প্রধানমন্ত্রী তাকে কড়া বার্তা দিয়ে আরেকটি সুযোগ দিতে পারতেন। 


অবশ্য প্রতিমন্ত্রী ইশরাক অস্ত্র হাতে অভিযানের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, ঘুণ্টিঘর এলাকায় প্রবেশের পর একদল লোককে ছোটাছুটি করতে দেখেন তারা। এ সময় নিজের নিরাপত্তার জন্য তিনি লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নেন। তার দাবি, পরে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে এলাকায় হেঁটে বিভিন্ন স্থানে মাদক বিক্রি ও সেবনের চিত্র দেখতে পান। কয়েকটি ভবনে ঢুকে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনভর্তি একটি স্কুলব্যাগ, প্রায় ৩০০ গ্রাম হেরোইন, কয়েক বোতল মদ এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এসব সামগ্রী কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে সেখানে থাকা ব্যক্তিরা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে দাবি করেন ইশরাক। অভিযানের পর ৬ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় বলেও জানান তিনি। ইশরাক হোসেন বলেন, কাউকে নিজের হাতে শাস্তি দেয়া তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং অভিযানে যাদের পাওয়া গেছে, তাদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করাই ছিল লক্ষ্য। তিনি দাবি করেন, অস্ত্রটি তিনি কাউকে ভয় দেখানো বা হুমকি দেয়ার জন্য ব্যবহার করেননি। নিজের নিরাপত্তার জন্য অল্প সময়ের জন্য হাতে রেখেছিলেন। তার বক্তব্য, অস্ত্র হাতে থাকার দৃশ্যটি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে মাদকবিরোধী অভিযানের মূল উদ্দেশ্য আড়ালে চলে যায়। মোটকথা ইশরাক একে মিডিয়া ট্রায়াল হিসেবে ইঙ্গিত করেছেন।  অবশ্য, এ নিয়ে মিডিয়া ট্রায়ালের বিষয়টিও এখন আলোচনায় রয়েছে। কেউ কেউ দলের গ্রুপিংয়ের বিষয়টিও টেনে আনছেন।  এটা নির্মম বাস্তবতা যে, ঢাকার অন্যতম মাদক হাব হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে তিনি এই অভিযানে অংশ নেন। এর আগে সেখানে মাদক সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর গুলি করেছিল। ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথাও বলে নি। ফলে আত্মরক্ষার জন্য কিছু সময় ইশরাকের হাতে নিজের লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র ছিল। আচ্ছা মাদকের বিরুদ্ধে কেন ইশরাককে নামতে হলো? পুলিশ কেন এখনো যথেষ্ট সক্রিয় হতে পারছে না। মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দেশ ও নতুন প্রজন্মকে কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব?  


সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, তার কারণে বিএনপি বা সরকার যাতে বিব্রত না হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কাজ আড়ালে পড়ে না যায়, সেজন্যই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাওয়ার পাশাপাশি তিনি মাদক নির্মূলে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতিও চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাতে সম্মতি দিয়েছেন বলেও জানান ইশরাক। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা দেন। বলেন, আমি মনে করছি যে, আমার এই মাদকবিরোধী অভিযান কেবলমাত্র শুরু হলো, এটি চলমান থাকবে। যতদিন চলমান থাকবে, আমার কারণে যাতে প্রধানমন্ত্রীর কোনো কর্মকাণ্ড ম্লান হয়ে না যায়, ঢাকা না পড়ে যায়, আমার দল যাতে কোনো কারণে বিব্রত না হয়। গেন্ডারিয়া এলাকার ঘুণ্টিঘর ও মুন্সিরটেক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা চলছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার তার কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। মাদক বিক্রির পাশাপাশি এলাকাটি বিভিন্ন ধরনের মাদক সরবরাহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। ইশরাকের ভাষ্য, দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি স্থানীয় থানা-পুলিশের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। ঘুণ্টিঘর এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল। এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আধা-সরকারি পত্র পাঠানো এবং ফাঁড়ির জন্য জায়গা নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ইশরাকের দাবি, গত ১৮ই সেপ্টেম্বরের একটি বৈঠকে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে এলাকাটিতে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ১৭ই অক্টোবর অভিযান চালানো হয়। অভিযানে যাওয়ার আগে পুলিশকে জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন ইশরাক। 


অভিযানের পর থেকেই আলোচনায় গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর মাদকের আস্তানা। শুধু আস্তানা নয়, আড়ত হিসেবে পরিচিত মাদক কারবারিদের কাছে। রেললাইনের পাশের ঝুপড়ি ঘর, আশপাশের ভবন, ছাদ ও অলিগলিতে প্রকাশ্যেই চলে মাদক কেনাবেচা ও সেবন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, গ্রেপ্তার কিংবা সাময়িক তৎপরতা- কোনো কিছুতেই থামছে না এই কারবার। দিনরাত লোকজন আসছেন,  নিয়ে যাচ্ছেন মাদক। মাদক বিক্রির এই লেনদেন চলছে সবার চোখের সামনেই, প্রকাশ্য দিবালোকে। রেললাইনের পাশের ঝুপড়ি ঘরগুলোতে চলে মাদক সেবন। এ এলাকায় হাত বাড়ালেই মাদক মেলে। কিছু কিছু জায়গায় পুলিশের ভয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সহজে প্রবেশ করতে পারেন না। আসলে মাদকের উৎস, সরবরাহকারী ও কারবারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন হচ্ছে না। মাদকের সহজলভ্যতা তরুণদের একটি অংশকে আসক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পাশাপাশি মাদক কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। আরেকটি বিষয় হলো- মাদকসেবীদের গ্রেপ্তার করার পর আইনের ফাঁক ফোকরে জামিনে বেরিয়ে এসে আবার মাদক কারবারে লিপ্ত হয়। তাই তাদের নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না। সবশেষে বলতে হয়, যে যাই বলুক- একটি কথা না বললেই নয়,  প্রধানমন্ত্রীর দু’টি সিদ্ধান্তেই রয়েছে পরিবর্তনের সরাসরি ইঙ্গিত। যতই আলোচনা- সমালোচনা হউক না কেন এটি নির্দ্বিধায় বলা যায়- এ সিদ্ধান্তে দলের নেতাকর্মীদের কাছে কঠোর বার্তা পৌঁছে গেছে। কিন্তু নেতাকর্মীরা কি প্রধানমন্ত্রীর এ বার্তার মর্মার্থ বুঝতে পেরেছে। লক্ষণ কী বলে? 

মতামত'র অন্যান্য খবর