সাফ কথা

নেহা বোরার বক্তব্য ও জুলাই বিতর্ক

শহীদুল্লাহ ফরায়জী | মতামত
অক্টোবর ২৪, ২০২৬
নেহা বোরার  বক্তব্য ও  জুলাই বিতর্ক

ভারতের তরুণ নেত্রী, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর নেহা বোরার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার মূল প্রশ্ন হলো-জুলাই কি ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, নাকি বৈষম্য, কর্তৃত্ববাদ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কোনো ব্যক্তির বক্তব্য কিংবা আন্দোলনকারীদের বিচ্ছিন্ন মতাদর্শের পরিবর্তে অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, প্রধান দাবি ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি ছিল বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অবস্থানের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধে। তাদের মতাদর্শ অভিন্ন ছিল না; কিন্তু বৈষম্য, দমন-পীড়ন, কর্তৃত্ববাদ ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে তারা এক হয়েছিলেন। তাই কোনো একটি মতাদর্শ দিয়ে এই অভ্যুত্থানের সামগ্রিক চরিত্র নির্ধারণ করা তার বহুত্ববাদী বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।
কোনো আন্দোলনে কারা অংশ নিয়েছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আন্দোলনটি কোন ক্ষমতাকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং কী পরিবর্তনের দাবি তুলেছে। জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ক্রমে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ও জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর সংগ্রামে পরিণত হয়েছিল। অতএব, একে কেবল ধর্মীয় মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেমন অসংগত, তেমনি কোনো ডানপন্থি বা ধর্মীয় শক্তির অংশগ্রহণের কারণে একে তাদের একক বিজয় হিসেবেও দাবি করা যায় না।
 

জুলাইয়ের তাৎপর্য বুঝতে হলে জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি সামনে আনতে হবে। জ্যাঁ-জাক রুশোর ঞযব ঝড়পরধষ ঈড়হঃৎধপঃ গ্রন্থে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বৈধতার ভিত্তি হিসেবে জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আধুনিক গণতন্ত্রের মূলনীতিও তাই-রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো শাসক বা দলের নিজস্ব সম্পত্তি নয়; জনগণের সম্মতি, অধিকার ও সাংবিধানিক বিধানের অধীনেই তার বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
কিন্তু নির্বাচিত সরকার যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে, বিরোধী মত দমন করে এবং নাগরিকের অধিকার সংকুচিত করে, তখন গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো কার্যকর গণতন্ত্রের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের অধিকার রক্ষার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের আধিপত্য বজায় রাখার উপকরণে পরিণত হলে গণ-অভ্যুত্থান রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তোলে।
 

জুলাই আমাদের সামনে সেই প্রশ্নই হাজির করেছে: রাষ্ট্র কি জনগণের অধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠান, নাকি জনগণ রাষ্ট্রক্ষমতার উপকরণ? রাষ্ট্রের আনুগত্য কি কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি, নাকি সংবিধান ও জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতি?
তবে একটি সরকারের পতন আর রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর এক বিষয় নয়। পুরনো কর্তৃত্বের অবসানের পর নতুন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে অভ্যুত্থানের মুক্তিকামী আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হতে পারে। তাই জুলাইয়ের সাফল্য শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন দিয়ে বিচার করা যাবে না; দেখতে হবে, রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামো, প্রশাসনিক সংস্কৃতি, বিচারব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগের পদ্ধতি কতোটা বদলেছে এবং নাগরিকের অধিকার কতোটা সুরক্ষিত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে নেহা বোরার বক্তব্যকে তার রাজনৈতিক অবস্থান ও ভারতের নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত। বাংলাদেশের তরুণদের সংগ্রাম ভারতের তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক সংহতির অর্থ এক দেশের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা অন্য দেশের ওপর আরোপ করা নয়। দুই দেশের ইতিহাস, সামাজিক কাঠামো ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। অভিজ্ঞতা বিনিময় সম্ভব, কিন্তু একটি আন্দোলনের পরিচয় অন্যটির পরিচয় দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।
 

ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত যখন ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকের অধিকার সীমিত করা হয়, ভিন্নমত দমন করা হয় কিংবা রাষ্ট্রকে কোনো বিশেষ ধর্মীয় ব্যাখ্যার একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধীন করার চেষ্টা চলে। কিন্তু এই উদ্বেগের যথার্থতা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জুলাইয়ের প্রধান ঐতিহাসিক কারণ- বৈষম্য, কর্তৃত্ববাদ ও রাজনৈতিক অধিকারহীনতা-আড়াল করা উচিত নয়। ধর্মীয় মৌলবাদবিরোধী ও কর্তৃত্ববাদবিরোধী সংগ্রাম পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, কিন্তু তারা অভিন্ন নয়।
 

গণতন্ত্রের ভিত্তি বহুত্ববাদ: ভিন্ন বিশ্বাস ও মতাদর্শের মানুষের সমান নাগরিক মর্যাদা। এর অর্থ কোনো মতাদর্শকে অন্য সব মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। জুলাইয়ের রাজনৈতিক শিক্ষা হলো, নাগরিকের স্বাধীনতা কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
 

এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন নির্বাহী ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি এবং মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা। একই সঙ্গে গণতন্ত্রকে শুধু নির্বাচনে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নীতি নির্ধারণ, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতার জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের পাশাপাশি অংশীদারিত্বের গণতন্ত্রই রাষ্ট্রকে অধিক জবাবদিহিমূলক করে তুলতে পারে। জুলাইয়ের উত্তরাধিকার রক্ষার শর্ত তাই স্পষ্ট: এর বহুত্ববাদী চরিত্র স্বীকার করতে হবে, অভ্যুত্থানকে ক্ষমতা দখলের বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তি বা দলের আনুগত্যের পরিবর্তে সাংবিধানিক দায়িত্বের অধীন করতে হবে। জনগণ যদি কেবল সরকার পতনের সময় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠেন, অথচ পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের কার্যকর ভূমিকা না থাকে, তবে অভ্যুত্থানের গণতান্ত্রিক সম্ভাবনা অপূর্ণই থেকে যাবে।
 

নেহা বোরার বক্তব্যকে ঘিরে বিতর্ক তাই ডানপন্থা ও বামপন্থার দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়। এর কেন্দ্রীয় প্রশ্ন আরও মৌলিক: একটি গণ-অভ্যুত্থানের মালিক কে- কোনো দল, সংগঠন বা মতাদর্শ, নাকি সেই জনগণ, যাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ তাকে ঐতিহাসিক শক্তিতে পরিণত করেছে?
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মালিকানা কোনো একক মতাদর্শের নয়। এর উত্তরাধিকার জনগণের সম্মিলিত মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় নিহিত-যার ভিত্তি বৈষম্যের অবসান, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক অধিকার ও জনগণের সার্বভৌমত্ব। বাংলাদেশের তরুণদের সংগ্রাম ভারতের তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে পারে, যেমন অন্য দেশের গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা থেকেও বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে। এই সংহতির ভিত্তি হওয়া উচিত স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অধিকারের প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকার; কোনো দেশের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা অন্য দেশের ওপর আরোপ নয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মালিকানা কোনো একক দল, গোষ্ঠী বা মতাদর্শের নয়; এর মালিক জনগণ, যাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ তাকে ঐতিহাসিক শক্তিতে পরিণত করেছে। এই অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার কোনো বিশেষ মতাদর্শের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় নয়, বরং বৈষম্যহীনতা, মানবিক মর্যাদা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় নিহিত।
জুলাইয়ের চূড়ান্ত তাৎপর্য শুধু একটি সরকারের পতনে নয়; বরং এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায়, যেখানে জনগণ রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হবেন এবং কোনো সরকার, দল বা গোষ্ঠীই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে না।
 

লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। faraizees@gmail.com

মতামত'র অন্যান্য খবর