আসন্ন ডিসেম্বর ২০২৬ গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে আর একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য পানি-নিরাপত্তা, পরিবেশ, খাদ্য, কূটনীতি এবং জাতীয় স্বার্থকে একই আলোচনায় আনার একটি বিরল কৌশলগত মুহূর্ত সামনে এসে উপস্থিত হবে। গঙ্গা চুক্তি নবায়ন করতে হলে বাংলাদেশকে শুধু আগের সূত্র টিকিয়ে রাখার দরকষাকষি নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক, জলবায়ু-সহনশীল এবং অববাহিকাভিত্তিক নদী-শাসনের নতুন কাঠামোর দাবি তুলতে হবে। তবে এক্ষেত্রে অর্জনের পাল্লা ভারী হওয়ার পূর্বশর্ত হলো বাংলাদেশের যথাযথ প্রস্তুতি ও দক্ষতা।
১২ই ডিসেম্বর ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছরের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছরের ডিসেম্বরে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নতুন চুক্তির আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে; এপ্রিল মাসে ১০ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠনের পর জুনে ভারতকে চিঠি দেয়া হয়। অক্টোবরের শুরুতেও ঢাকা জানায়, দিল্লির আনুষ্ঠানিক সাড়ার অপেক্ষা রয়েছে। ভারত বলেছে, গঙ্গা ও অন্যান্য অভিন্ন নদীসংক্রান্ত আলোচনা যৌথ নদী কমিশন-জেআরসি কাঠামোর মধ্যেই চলবে। এটি আশাব্যঞ্জক, কিন্তু আশার ভাষা ও কার্যকর সমঝোতার মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে; তাই বাংলাদেশের দরকার এখনই একটি সুস্পষ্ট নদীকূটনৈতিক রোডম্যাপ।
১৯৯৬: কেন চুক্তি সম্ভব হয়েছিল
গঙ্গা পানি প্রশ্নের কেন্দ্র ফারাক্কা ব্যারাজ। ফারাক্কা ব্যারাজ ১৯৭৫ সালে চালু হওয়ার পর শুষ্ক মৌসুমে ভাটির বাংলাদেশের পানি-প্রবাহ, বিশেষত পদ্মা-গড়াই ব্যবস্থায় মিঠা পানির সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হয়। বিষয়টি কোনো একটি নদীর পানির পরিমাণের বিরোধের পাশাপাশি জড়িয়ে ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌপথ, ভূগর্ভস্থ পানি, লবণাক্ততা, জীববৈচিত্র্য এবং সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ।
স্বাধীনতার পর দুই দেশের সম্পর্কের উষ্ণতা দ্রুতই পানি-রাজনীতির বাস্তবতায় পরীক্ষার মুখে পড়ে। ১৯৭৭ সালের চুক্তি, পরবর্তী স্বল্পমেয়াদি সমঝোতা এবং দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৬ সালের চুক্তি একটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল কাঠামো দেয়। এটি সম্ভব হয়েছিল কয়েকটি কারণে।
প্রথমত, ঢাকা ও দিল্লি উভয় জায়গায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটি বড় সমঝোতার প্রয়োজন বুঝেছিল। দ্বিতীয়ত, ভারতের তৎকালীন ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকার এবং বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের মধ্যে আস্থার একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তৃতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু কেন্দ্রীয় আলোচনায় বাস্তববাদী ভূমিকা পালন করেন, যার ফলে কলকাতা বন্দরের স্বার্থ রক্ষা এবং বাংলাদেশের ভাটির অধিকার-দুই বাস্তবতাকে পাশাপাশি দেখা সম্ভব হয়েছিল। চতুর্থত, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আই. কে. গুজরালের প্রতিবেশী-নীতি বৃহৎ রাষ্ট্রের প্রতি সংযম, উদারতা এবং আস্থা-নির্মাণের একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছিল।
১৯৯৬ সালের চুক্তির মূল কাঠামো ছিল জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ফারাক্কায় প্রাপ্য প্রবাহকে প্রতি দশ দিনভিত্তিক ভাগ করা। প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা কম হলে উভয় দেশ অর্ধেক পাবে; ৭০-৭৫ হাজার কিউসেক হলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক এবং ভারত পাবে অবশিষ্ট; আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক, বাংলাদেশ পাবে অবশিষ্ট অংশ। মার্চের নির্দিষ্ট সময়ে উভয় দেশের জন্য পর্যায়ক্রমে ৩৫ হাজার কিউসেকের নিশ্চয়তাও রাখা হয়েছিল।
সেই চুক্তি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। কিন্তু ইতিহাসের সাফল্যকে বর্তমানের চূড়ান্ত সমাধান ভাবা ভুল হবে। কারণ নদী বদলেছে, জলবায়ু বদলেছে, মানুষের চাহিদা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কৌশলগত পরিবেশও বদলেছে।
কেন ২০২৬ ভিন্ন
১৯৯৬ সালের চুক্তি মূলত ১৯৪৯-১৯৮৮ সময়কালের প্রবাহ-তথ্য ও শুষ্ক মৌসুমের পানিবণ্টন-প্রয়োজনকে ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই ভিত্তি অপর্যাপ্ত হওয়ার অন্তত পাঁচটি কারণ রয়েছে।
এক. জলবায়ু পরিবর্তন প্রবাহকে অনিশ্চিত করেছে
গঙ্গা অববাহিকা হিমালয়, বর্ষা, তাপমাত্রা, ভূগর্ভস্থ পানি, ভূমি ব্যবহার এবং উজানের অবকাঠামো-সবকিছুর যৌথ প্রভাবে পরিচালিত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কখনো অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও বন্যা, কখনো দীর্ঘ খরা, কখনো হিমবাহ-গলনজনিত প্রবাহের পরিবর্তন, আবার কখনো বর্ষার সময় ও তীব্রতায় অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। ফলে অতীতের গড় প্রবাহ দিয়ে ভবিষ্যতের ভাগাভাগি স্থির করা বিজ্ঞানসম্মত নয়। একটি নদীর পানি বণ্টনের পুরনো ধারণা ছিল: মোট পানি কতো, তার কতো ভাগ কে পাবে। নতুন বাস্তবতা হলো: কখন পানি আসছে, কতো দ্রুত আসছে, কতো দূষিত, কতোটা নাব্য, কতোটা ভূগর্ভে যাচ্ছে, কতোটা জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে লাগবে, এবং খরার সময় ন্যূনতম কতোটা পানি না থাকলে নদী-ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে-এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দুই. বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে লবণাক্ততার চাপ
গঙ্গা-পদ্মা-গড়াই ব্যবস্থার মিঠাপানি শুধু কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় নয়। এটি সুন্দরবন ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্যও জীবনরেখা। বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গড়াই হয়ে সুন্দরবনের দিকে মিঠাপানির প্রবাহ আশির দশকের শুরু থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং এর সঙ্গে নিম্নাঞ্চলের লবণাক্ততা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। পশ্চিম সুন্দরবনে লবণাক্ততার মাত্রা তুলনামূলক বেশি এবং ২০১০ সালের পর চরম লবণাক্ততার ঘটনা বেড়েছে। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: সুন্দরবনের সংকটের জন্য কেবল ফারাক্কা দায়ী নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, পলি জমা, স্থানীয় নদী-ব্যবস্থার ভরাট, চিংড়ি চাষের বিস্তার, অবকাঠামো, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কারণও ভূমিকা রাখে। কিন্তু উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে এই সব ঝুঁকি আরও তীব্র হয়। অর্থাৎ গঙ্গার পানি-প্রবাহ বাংলাদেশের জন্য শুধু কূটনৈতিক ইস্যু নয়; এটি উপকূলীয় অভিযোজন ও জলবায়ু নিরাপত্তার অংশ।
তিন. ভারতের চাহিদা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
ভারতের কৃষি, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক স্বার্থ পানির প্রশ্নকে ক্রমেই জটিল করেছে। ভারতও জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা দেশ; তার উজান ও মধ্যভাগে খরা, অনিশ্চিত বর্ষা, কৃষি-চাপ এবং পানি-দূষণের সমস্যা আছে। ফলে বাংলাদেশের কূটনীতি যদি ভারতের চাহিদাকে অস্বীকার করে, তবে তা কার্যকর হবে না। কিন্তু একইভাবে ভারতকেও বুঝতে হবে যে, ভাটির বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি সৃষ্টি করে উজানের পানি-নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। নদীকে একপক্ষের সার্বভৌম সম্পদ এবং অন্যপক্ষের দয়া-নির্ভর প্রাপ্তি হিসেবে দেখা হলে সহযোগিতার ভিত্তি দুর্বল হয়। গঙ্গা একটি ভাগ করা অববাহিকা; এর নিরাপত্তাও যৌথ।
চার. ভূরাজনৈতিক পরিবেশ বদলেছে
১৯৯৬ সালে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পানি-ইস্যু ছিল দ্বিপক্ষীয় আস্থা-নির্মাণের বড় পরীক্ষাগুলোর একটি। ২০২৬ সালে সেটি আরও বড় কৌশলগত প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েছে। ভারত এখন ইন্দো-প্যাসিফিক, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ, বঙ্গোপসাগরীয় নিরাপত্তা, চীনের আঞ্চলিক উপস্থিতি এবং সীমান্তবর্তী স্থিতিশীলতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে। বাংলাদেশের জন্যও ভারত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, প্রধান বাণিজ্য-সংযোগ, বিদ্যুৎ ও স্থল-যোগাযোগের অংশীদার এবং অভিন্ন নদী-ব্যবস্থার উজানের রাষ্ট্র। এই বাস্তবতায় নদীকূটনীতি আলাদা কোনো খাত নয়। পানি, সীমান্ত-নিরাপত্তা, বাণিজ্য, ট্রানজিট, জ্বালানি, জলবায়ু অর্থায়ন, উপকূলীয় সুরক্ষা, নৌযোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা-সব একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের পক্ষে গঙ্গা আলোচনাকে বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে তুলতে হবে, কিন্তু এটিকে অন্য ইস্যুর বিনিময়মূল্য বানানো যাবে না। পানি বাংলাদেশের জীবন-নিরাপত্তার প্রশ্ন; এটি অধিকার, ন্যায্যতা ও টেকসই সহযোগিতার ভাষায় তুলতে হবে।
পাঁচ. ৫৪টি অভিন্ন নদীর বাস্তবতা
বাংলাদেশ ও ভারত ৫৪টি অভিন্ন নদী ভাগ করে নেয়; কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পানিবণ্টন চুক্তি রয়েছে কেবল গঙ্গার জন্য। তিস্তা নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনার অচলাবস্থা দেখিয়েছে যে, একটি নদীর সমাধান অন্য নদীর স্বয়ংক্রিয় সমাধান নয়। গঙ্গা চুক্তির নবায়ন তাই শুধু গঙ্গার আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এটি হতে পারে একটি বেসিন-টু- বেসিন নয়, বরং রিভার-সিস্টেম-টু-রিভার-সিস্টেম দৃষ্টিভঙ্গির শুরু।
এখানে বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এক লাফে ৫৪ নদীর জন্য একক চুক্তি দাবি করা নয়-তা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। বরং জেআরসি’র অধীনে একটি অগ্রাধিকারভিত্তিক রোডম্যাপ প্রয়োজন: গঙ্গা নবায়ন; তিস্তা-সমাধানের সময়সীমা; বর্ষার বন্যা-পূর্বাভাস; ছোট নদীর তথ্যবিনিময়; দূষণ ও নদীভাঙন পর্যবেক্ষণ; এবং উজানের নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে পূর্ব-অবহিতকরণ।
বর্তমান চুক্তির সীমা কোথায়?
১৯৯৬ চুক্তিকে ব্যর্থ বলার সুযোগ নেই। বরং তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো-এটি তিন দশক ধরে আলোচনা, পরিমাপ এবং বিরোধ-নিয়ন্ত্রণের একটি কাঠামো দিয়েছে। কিন্তু তার তিনটি প্রধান সীমাবদ্ধতা এখন স্পষ্ট।
প্রথমত, এটি মূলত পরিমাণভিত্তিক। কতো কিউসেক পানি ভাগ হবে, সেটিই প্রধান বিষয়। নদীর স্বাস্থ্য, পানি-গুণমান, পলি, মৎস্য, জলাভূমি, নাব্যতা, ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ বা সুন্দরবনের পরিবেশগত চাহিদা চুক্তির মূল কাঠামোয় পর্যাপ্তভাবে স্থান পায়নি।
দ্বিতীয়ত, চুক্তিতে ৩০ বছর পর নবায়নের কথা থাকলেও, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনিশ্চয়তার জন্য পর্যায়ক্রমিক অভিযোজন বা বাধ্যতামূলক পর্যালোচনার শক্তিশালী ব্যবস্থা নেই। নতুন চুক্তিতে পাঁচ বছর অন্তর যৌথ পর্যালোচনা, বিজ্ঞানভিত্তিক পুনর্মূল্যায়ন এবং খরা-বন্যা পরিস্থিতির বিশেষ প্রটোকল থাকা দরকার।
তৃতীয়ত, তথ্যের প্রশ্ন। আধুনিক নদী শাসনে ডেটা ক্ষমতা। কোন স্টেশনে কতো প্রবাহ, কোন সময়ে পানি ছাড়ছে, বর্ষার পূর্বাভাস কী, জলাধারের অবস্থা কেমন, নদীর পানি-গুণমান কী, ভূগর্ভস্থ পানি কতোটা কমছে-এসব তথ্য যার কাছে থাকে, নীতিগতভাবে তার সুবিধা বেশি। আন্তর্জাতিক পানি আইনও নিয়মিত জলবিদ্যুৎ, আবহাওয়া, ভূগর্ভ, পরিবেশ ও পানি-গুণমান সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়ের ওপর জোর দেয়।
বাংলাদেশকে তাই ভারতের দেয়া তথ্য গ্রহণকারী দেশ হিসেবে নয়, যৌথ ডেটা-উৎপাদক ও যাচাইকারী অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
আন্তর্জাতিক আইন: বাংলাদেশের যুক্তির শক্তি
বাংলাদেশের দাবি আবেগের নয়; এটি আন্তর্জাতিক পানি আইনের স্বীকৃত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক জলপথের অ-নৌচলাচল ব্যবহারবিষয়ক কনভেনশন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। এজন্য-
এক) ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিসংগত ব্যবহার: উজান ও ভাটি উভয় রাষ্ট্রের সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও মানবিক প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পানি ব্যবহার করতে হবে।
দুই) উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা: একটি রাষ্ট্রের পানি ব্যবহার যেন অপর রাষ্ট্রের জন্য উল্লেখযোগ্য ক্ষতির কারণ না হয়।
তিন) সহযোগিতার বাধ্যবাধকতা: অভিন্ন নদী নিয়ে তথ্য, পরামর্শ, আলোচনা ও যৌথ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।
চার) নিয়মিত তথ্য বিনিময়: জলবিদ্যুৎ, আবহাওয়া, ভূগর্ভস্থ পানি, পরিবেশ, পানি-গুণমান ও পূর্বাভাসের তথ্য পরস্পরের মধ্যে আদান-প্রদান করা দরকার।
পাঁচ) পরিকল্পিত পদক্ষেপের ক্ষেত্রে অবহিতকরণ: এমন প্রকল্প গ্রহণের আগে অন্য রাষ্ট্রকে জানানো উচিত, যার ফলে ভাটির প্রবাহ বা পরিবেশে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।
তবে একটি কূটনৈতিক বাস্তবতা মনে রাখতে হবে: আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগুলো বাংলাদেশের নৈতিক ও যুক্তিগত অবস্থান শক্তিশালী করলেও, দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বিকল্প নয়। পানি প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত কার্যকর ফল আসে রাজনৈতিক সমঝোতা, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং উভয় দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সমন্বয় থেকে।
অতএব, বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত-আন্তর্জাতিক আইনকে চাপ প্রয়োগের একমাত্র হাতিয়ার না বানিয়ে, ন্যায্য সহযোগিতার যৌক্তিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা।
নবায়ন আলোচনায় বাংলাদেশের ছয় অগ্রাধিকার
১. ন্যূনতম পরিবেশগত ও মানবিক প্রবাহ: নতুন চুক্তিতে শুধু শতাংশ বা কিউসেক ভাগের সূত্র থাকলে চলবে না। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা-গড়াই-দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী ও সুন্দরবনের জন্য একটি বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত ন্যূনতম পরিবেশগত প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। এ প্রবাহ নির্ধারণে কৃষি, খাবার পানি, নৌপথ, মৎস্য, জলাভূমি, ভূগর্ভস্থ পানি, লবণাক্ততা এবং বাস্তুতন্ত্রের চাহিদাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। মেকং নদী কমিশনের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় প্রবাহ রক্ষা, ডেটা বিনিময়, পানি ব্যবহার পর্যবেক্ষণ ও পানি-গুণমানকে আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় আনা সম্ভব।
২. পাঁচ বছর অন্তর অভিযোজনমূলক পর্যালোচনা: আরও ৩০ বছরের জন্য স্থির সূত্রে নতুন চুক্তি করলে ভবিষ্যতে আবার একই সমস্যায় পড়তে হবে। তাই চুক্তিতে বাধ্যতামূলকভাবে থাকতে হবে: প্রতি পাঁচ বছরে যৌথ পর্যালোচনা; শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহের হালনাগাদ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ; বর্ষা, খরা, তাপপ্রবাহ ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার প্রভাব মূল্যায়ন; নদীর পানি-গুণমান ও পলি প্রবাহ পর্যবেক্ষণ; জরুরি পরিস্থিতিতে অস্থায়ী বণ্টন-বিধি; বিরোধ হলে দ্রুত নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া। এটি “চুক্তির অস্থিতিশীলতা” সৃষ্টি করবে না; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে চুক্তিকে টেকসই করবে।
৩. যৌথ ও স্বচ্ছ তথ্যব্যবস্থা: ফারাক্কা থেকে ভাটির গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট পর্যন্ত যৌথ পর্যবেক্ষণকেন্দ্র প্রয়োজন। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে: রিয়েল-টাইম প্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের তথ্য; স্যাটেলাইট ডেটা ও রিমোট সেন্সিং; স্বয়ংক্রিয় গেজিং স্টেশন; নদীর পানি-গুণমান ও লবণাক্ততা পর্যবেক্ষণ; পলি ও নাব্যতা-তথ্য; মৌসুমি বন্যা ও খরার পূর্বাভাস; উন্মুক্ত বা অন্তত যাচাইযোগ্য ডেটা- পোর্টাল। ডেটা নিয়ে পারস্পরিক সন্দেহ কমাতে উভয় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, পানি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একটি যৌথ বৈজ্ঞানিক প্যানেল গঠন করা যেতে পারে। এতে রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গা কিছুটা হলেও তথ্য-প্রমাণভিত্তিক আলোচনায় রূপ নেবে।
৪. সুন্দরবন ও দক্ষিণ-পশ্চিমকে চুক্তির কেন্দ্রে আনা: সুন্দরবনকে শুধু বাংলাদেশের একটি বন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ ইকোসিস্টেম, উপকূলরক্ষার প্রাকৃতিক বাঁধ, জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার এবং জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলার একটি আঞ্চলিক সম্পদ। সুন্দরবনের জন্য মিঠাপানির প্রবাহ, লবণাক্ততা পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তুতান্ত্রিক ঝুঁকির বিষয়টি নতুন চুক্তির আনুষ্ঠানিক অংশ হওয়া উচিত। সুন্দরবনের পানি-নিরাপত্তা ভারত ও বাংলাদেশের জন্য যৌথ লাভের ক্ষেত্র। সীমান্তের ওপারে বাঘ, বন, নদী, জোয়ার, লবণ ও ঘূর্ণিঝড় কোনো পাসপোর্ট মানে না। সুতরাং সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে যৌথ হাইড্রোলজিক্যাল-ইকোলজিক্যাল গবেষণা, লবণাক্ততা মানচিত্র, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু অভিযোজন তহবিল গড়ে তোলা সম্ভব।
৫. গঙ্গা নবায়নকে ৫৪ নদীর রোডম্যাপের সঙ্গে যুক্ত করা: গঙ্গা চুক্তি নবায়নের সঙ্গে একটি পৃথক যৌথ ঘোষণা হতে পারে: বাংলাদেশ-ভারত অভিন্ন নদী সহযোগিতা রোডম্যাপ ২০২৭-২০৩৫। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে: তিস্তা বিষয়ে সময়বদ্ধ আলোচনা; ছোট ও মৌসুমি নদীর তালিকা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ; বন্যা-পূর্বাভাস তথ্য আদান-প্রদান; উজানের প্রকল্প বিষয়ে পূর্ব-অবহিতকরণ; যৌথ নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প; পানি দূষণ ও শিল্পবর্জ্য পর্যবেক্ষণ; নৌপথ ও নদীভিত্তিক বাণিজ্য সহযোগিতা। এটি একটি বাস্তবসম্মত মধ্যপথ, যার একদিকে বাংলাদেশ সামগ্রিক অববাহিকাভিত্তিক দৃষ্টি দেখাবে, অন্যদিকে ভারতকে একবারে সব নদী নিয়ে কঠিন রাজনৈতিক সমঝোতায় ঠেলে দেবে না।
৬. জাতীয় প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক সক্ষমতা: নদীকূটনীতি কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। এখানে পানিসম্পদ, কৃষি, পরিবেশ, মৎস্য, নৌপরিবহন, পরিকল্পনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার, আইন বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সমন্বয় দরকার। বাংলাদেশের একটি স্থায়ী ন্যাশনাল রিভার ডিপ্লোম্যাসি সেল গঠন করা যেতে পারে। এর কাজ হবে: অভিন্ন নদীভিত্তিক ডেটাব্যাংক তৈরি; আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির বিশ্লেষণ; নদীপ্রবাহ ও জলবায়ু মডেলিং; চুক্তির অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন; আলোচকদের জন্য ব্রিফিং পেপার; জনপরিসরে দায়িত্বশীল তথ্যপ্রকাশ;
বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়। বাংলাদেশকে আলোচনার টেবিলে শুধু দাবি নিয়ে নয়, স্বতন্ত্র তথ্য, বিকল্প সূত্র, মডেল, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং বাস্তবসম্মত খসড়া চুক্তি নিয়ে বসতে হবে।
ভারত কেন লাভবান হবে
বাংলাদেশের ন্যায্য পানির দাবি ভারতের বিরুদ্ধস্বার্থ নয়। বরং একটি ন্যায্য ও বিজ্ঞানসম্মত চুক্তি ভারতের চারটি কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
প্রথমত, এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আস্থা পুনর্গঠনে সহায়তা করবে। পানি মানুষের জীবনের প্রশ্ন; এ বিষয়ে ন্যায্যতা দৃশ্যমান হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্য ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
দ্বিতীয়ত, উত্তর-পূর্ব ভারতের সংযোগ, বঙ্গোপসাগরীয় বাণিজ্য, বিদ্যুৎ সহযোগিতা, সড়ক ও রেলযোগাযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা-সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। পানি নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা এই বৃহত্তর সহযোগিতাকে দুর্বল করে।
তৃতীয়ত, সুন্দরবন ও জলবায়ু অভিযোজন দুই দেশের যৌথ স্বার্থ। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়লে তার পরিবেশগত প্রভাব কেবল বাংলাদেশের ভেতরে সীমিত থাকবে না।
চতুর্থত, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের উপস্থিতি, ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংযোগের রাজনীতিতে ভারত যদি প্রতিবেশী-সহযোগিতার একটি বিশ্বাসযোগ্য মডেল দেখাতে চায়, তাহলে পানি প্রশ্নে উদার ও ন্যায্য আচরণ তার কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।
অতএব, গঙ্গা চুক্তি কোনো দয়া বা ছাড়ের প্রশ্ন নয়। এটি পারস্পরিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি ভূকৌশলগত লাভের প্রশ্ন।
বিশ্ব থেকে শিক্ষা
বিশ্বের সফল নদী-শাসন মডেলগুলো একটি কথা স্পষ্ট করে: শুধু পানি ভাগ করে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি তৈরি হয় না; দরকার যৌথ প্রতিষ্ঠান, নিয়মিত ডেটা বিনিময়, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং যৌথ সুবিধা সৃষ্টি।
মেকং নদী কমিশন ডেটা বিনিময়, পরিকল্পিত প্রকল্পে পূর্ব-পরামর্শ, নদীর প্রবাহ রক্ষা, পানি ব্যবহার পর্যবেক্ষণ ও পানি-গুণমানের জন্য পৃথক প্রক্রিয়া গড়ে তুলেছে। দানিউব নদী সুরক্ষা কনভেনশন পানি-ব্যবস্থাপনাকে শুধু প্রবাহ নয়, পানি-গুণমান, ভূগর্ভস্থ পানি, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তুতান্ত্রিক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে। সেনেগাল নদী অববাহিকার ওএমভিএস মডেল আরও এক ধাপ এগিয়ে- সেখানে রাষ্ট্রগুলো যৌথ অবকাঠামোর অর্থায়ন, ব্যবস্থাপনা এবং সুফল ভাগাভাগির পথ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এসব অঞ্চলের মতো নয়; তাই হুবহু অনুকরণ সম্ভব নয়। কিন্তু শিক্ষা নেয়া সম্ভব। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি কাঠামো, যেখানে প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব থাকবে, কিন্তু নদীর স্বাস্থ্য ও মানুষের জীবন কোনো একক রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে বিপন্ন হবে না।
নবায়ন নয়, নতুন প্রজন্মের চুক্তি
২০২৬ সালের সামনে বাংলাদেশের দু’টি পথ খোলা। প্রথম পথ হলো-১৯৯৬ সালের চুক্তির প্রায় একই ভাষা ও সূত্র সামান্য সংশোধন করে আরও ৩০ বছরের জন্য নবায়ন করা। এতে স্বল্পমেয়াদে অনিশ্চয়তা কমবে, কিন্তু জলবায়ু, পরিবেশ, তথ্য ও অববাহিকা-শাসনের মৌলিক সংকট অমীমাংসিত থাকবে।
দ্বিতীয় পথ হলো-১৯৯৬ সালের চুক্তির ঐতিহাসিক অর্জনকে ভিত্তি ধরে একটি নতুন প্রজন্মের চুক্তি তৈরি করা। যেখানে থাকবে ন্যূনতম পরিবেশগত প্রবাহ, জলবায়ু অভিযোজন, পাঁচ বছর অন্তর পর্যালোচনা, যৌথ ডেটা ব্যবস্থা, সুন্দরবন সুরক্ষা, খরা-বন্যা প্রটোকল, পূর্ব-অবহিতকরণ এবং ৫৪টি অভিন্ন নদীর জন্য ধাপে ধাপে সহযোগিতার রোডম্যাপ। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ দ্বিতীয় পথেই। তবে এ পথের জন্য আবেগ নয়, প্রস্তুতি প্রয়োজন; অভিযোগ নয়, প্রমাণ প্রয়োজন; একমাত্রিক পানি-বণ্টন নয়, সমন্বিত নদী-শাসনের দৃষ্টি প্রয়োজন।
গঙ্গা কেবল একটি নদী নয়-এটি সভ্যতার স্মৃতি, খাদ্যের উৎস, পরিবেশের ভিত্তি, কৃষকের জীবন, সুন্দরবনের মিঠাপানি, নৌপথের সম্ভাবনা এবং দুই দেশের সম্পর্কের আস্থার পরীক্ষা। উজানে পানি-নিরাপত্তা আর ভাটিতে মানবিক ও পরিবেশগত সংকট-এই দ্বন্দ্ব টেকসই নয়। একটি নদীর সুস্থতা দুই তীরের মানুষের ভাগ্যকে একই স্রোতে যুক্ত করে। তাই ডিসেম্বর ২০২৬-কে শেষ সময় হিসেবে না দেখে নতুন শুরু হিসেবে দেখতে হবে। গঙ্গা চুক্তির নবায়ন যদি ন্যায়, বিজ্ঞান, পরিবেশ এবং পারস্পরিক স্বার্থের ওপর দাঁড়ায়, তবে এটি শুধু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার নদীকূটনীতির একটি নতুন মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে।
পানি রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়, যৌথ জীবনের ভিত্তি
গঙ্গা চুক্তি নবায়নের প্রাক্কালে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ, পানি-গবেষক, পরিবেশবাদী, কৃষক প্রতিনিধি এবং জনমত-সংশ্লিষ্ট মহলের একটি স্পষ্ট অবস্থান থাকা প্রয়োজন: অভিন্ন নদীর পানিকে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপ, কৌশলগত প্রভাব বা দ্বিপক্ষীয় দরকষাকষির হাতিয়ার বানানো চলবে না। বাংলাদেশের অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন যে, ভারত প্রাকৃতিক সম্পদ-বিশেষত পানিকে-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং বাংলাদেশের ন্যায্য পানির অধিকার নিশ্চিত করা দরকার। বক্তব্যটি একটি বৃহত্তর নাগরিক উদ্বেগ: ভাটির মানুষের জীবন, কৃষি, মাছ, মিঠাপানি, নদী, সুন্দরবন ও জলবায়ু-নিরাপত্তা কি উজানের একতরফা সিদ্ধান্তের অনিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করবে?
নাগরিক সমাজের দায়িত্ব ভারতবিরোধী আবেগ উস্কে দেয়া নয়; বরং তথ্য, আন্তর্জাতিক ন্যায়নীতি ও পরিবেশগত সত্যের ভিত্তিতে ন্যায্যতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলা। গঙ্গার পানি কোনো অনুগ্রহের বিষয় নয়, আবার সেটি সংঘাত উস্কে দেয়ার উপকরণও নয়। এটি একটি আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য, যুক্তিসংগত এবং টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক পানি আইনের মূল নীতিও হলো-অভিন্ন জলপথের পানি ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিসংগতভাবে ব্যবহার করতে হবে; কোনো রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডে অপর রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করা যাবে না; আর তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতা নিয়মিত হতে হবে।
ভারতের জন্যও এ মুহূর্তে বোধোদয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশে পানি-প্রশ্নে দীর্ঘস্থায়ী অসন্তোষ শুধু একটি পরিবেশ বা কৃষি-সমস্যা নয়; এটি দ্বিপক্ষীয় আস্থা, আঞ্চলিক সংযোগ, সীমান্তের স্থিতিশীলতা এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভারত যদি তার প্রতিবেশী-নীতিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে চায়, তবে তাকে দেখাতে হবে যে উজানের উন্নয়ন ভাটির ক্ষতির বিনিময়ে হতে পারে না। বাংলাদেশের ন্যায্য পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা ভারতের জন্য ছাড় নয়; এটি একটি স্থিতিশীল প্রতিবেশ, জলবায়ু-সহনশীল সুন্দরবন, সমৃদ্ধ আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত আস্থার বিনিয়োগ।
অতএব, ২০২৬ সালের গঙ্গা চুক্তির প্রশ্নে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের বার্তা হওয়া উচিত শান্ত কিন্তু সুদৃঢ়: পানিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়, যৌথ জীবনের ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। আর ভারতের জন্য বার্তা হওয়া উচিত সমানভাবে বাস্তববাদী: ভাটির ন্যায্যতা নিশ্চিত না করে উজানের নিরাপত্তাও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। গঙ্গার প্রবাহে যদি ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও সহযোগিতা থাকে, তবে দুই দেশের সম্পর্কও গভীর ও স্থিতিশীল হবে; আর যদি নদীকে ক্ষমতার প্রদর্শনের উপকরণ করা হয়, তবে তার ক্ষত কেবল নদীতীরে নয়, আঞ্চলিক রাজনীতিতেও জমতে থাকবে।
লেখক: সিনিয়র প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।