মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের পর থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন ইশরাকের পদত্যাগ! ‘অস্ত্র হাতে’ মাদকবিরোধী অভিযানের জেরে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের পর ইশরাক হোসেনকে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন। দলের নেতাকর্মীরা তার পক্ষে দিচ্ছেন নানা স্ট্যাটাস। বিরোধী নেতারাও তাকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, আরও ভেবেচিন্তে পদত্যাগের বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা দেয়া উচিত ছিল। কাদের খুশি করার জন্য পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে- এমন প্রশ্নও তুলেছেন বিএনপি’র নেতাকর্মীরা। বলছেন- লঘুপাপে গুরুদণ্ড দেয়া হয়েছে। ওদিকে একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে মন্ত্রী-এমপিসহ সবাইকে কঠোর সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র। মন্ত্রী-এমপিদের যারা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করবেন তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে সূত্রটি। অন্যদিকে বিএনপি এবং সরকারের একটি পক্ষ ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের পক্ষ নিলেও আরেকটি পক্ষ এর বিপক্ষে।
ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ নিয়ে সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও বিএনপি’র কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে মানবজমিনের। তারা জানিয়েছেন, ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের মধ্যদিয়ে মন্ত্রী-এমপিদের বার্তা দেয়া হয়েছে, যারা এই ধরনের কর্মকাণ্ড করবেন তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এর প্রভাব দলের অন্য নেতাকর্মীদের ওপরে পড়বে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে রাজপথের একজন পরীক্ষিত নেতাকে পদত্যাগের নির্দেশে বিস্মিত হয়েছেন নেতাকর্মীরা। ইতিমধ্যে এই ঘটনায় দলের একটি অংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে হাই-কমান্ডের ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না। মেহেদী হাসান জয় নামে এক বিএনপি’র কর্মী নিজের ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ইশরাক বিএনপি’র একজন ত্যাগী নেতা। ২০১৮ সাল থেকে তাকে দেখছি। ভুল সবাই করে তবে সিদ্ধান্ত বুঝে নেয়া দরকার। বর্তমানে রাশেদ আর নুর এই সরকারের যে কাজে আসেন নাই, ইশরাক হোসেন সেই কাজে আসছেন।
রেজাউল হক রেজা নামে আরেকজন ফেসবুকে লিখেছেন, ইশরাক হোসেনের মতো সাহসী নেতা বিএনপিতে হাতেগোনা। যিনি দলকে বাঁচিয়ে রাখা কিংবা দেশের প্রয়োজনে জীবন বাজি রেখে বিগত সরকারের সকল নির্যাতন সহ্য করে জনগণ নিয়ে রাজপথেই থেকেছেন। শহরকে মাদকমুক্ত করার জন্য নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে সাধারণ জনগণের মতো রাস্তায় নেমেছিলেন। এই কারণে মন্ত্রিপরিষদ থেকে কেন তাকে পদত্যাগ করতে হবে? যারা এই দেশ বুঝে না। যারা এই দেশের রাজনীতি বুঝে না। জনগণের চাওয়া-পাওয়া বুঝে না। তাদের পরামর্শ শুনে সিদ্ধান্ত নিলে বিএনপি’র পরীক্ষিত নেতারা এই ইশরাকের মতোই ঝরে যাবে। তখন দল বুঝবে যে, খারাপ সময়ে নেতার কতো সংকট। সুবিধাবাদীরা পালাবে।
হোসেন সাদ্দাম নামে আরেকজন লিখেছেন, কাদেরকে খুশি করার জন্য রাজপথের বিপ্লবী নেতা প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মনে রাখবেন ইশরাক হোসেনের মতো নেতারা রাজপথে ছিল বলেই দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন সংগ্রাম করে টিকে ছিলেন! আমি বিএনপি’র একজন ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে দেশের নাগরিক হিসেবে ইশরাক ভাইয়ের মাদকবিরোধী এই অভিযানকে শতভাগ সমর্থন করি। ইশরাকের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ওই থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কর্মরত পুলিশ থাকতেও ওই এলাকায় মাদক নির্মূল করা সম্ভব হলো না কেন?
গত শনিবার নিজ সংসদীয় আসন গেন্ডারিয়ায় মাদকের আস্তানায় অস্ত্র হাতে অভিযান চালান ইশরাক। এ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। রোববার বিকালে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী ইশরাককে ডেকে নিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর রাতে পদত্যাগের নির্দেশের খবরটিকে অস্বীকার করলেও সকালে অডিওবার্তা দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণার কথা জানান ইশরাক।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মানবজমিনকে বলেন, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে। যারা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করবেন, দল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। আর একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে। আর সঠিক ব্যবস্থা নিলে বুঝতে হবে সরকার সঠিক পথে আছে।
মঙ্গলবার ভোলায় এক অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সদ্য পদত্যাগ করা ইশরাক হোসেনের মাদক ও দুর্বৃত্ত দমনে যাওয়ার উদ্যোগটি ভালো ছিল। ইশরাক হোসেন পুলিশের ওপর গুলিবর্ষণকারী একদল মাদকসেবীকে দমন করতে গিয়েছিলেন। তবে তার নিজের হাতে অস্ত্র নেয়াটা ঠিক হয়নি, এটি তার পদমর্যাদার সঙ্গে মানানসই নয়। ইশরাক হোসেন সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তার সঙ্গে বডিগার্ড ও পুলিশ সদস্য ছিল। প্রয়োজনে দলীয় কর্মীরাও সহযোগিতা করতে পারেন। একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর হাতে বৈধ কিংবা অবৈধ অস্ত্র কোনোটিই শোভা পায় না।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ইশরাক হোসেনের সাম্প্রতিক কাজের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ও মতভিন্নতা থাকতে পারে। তবে যে উদ্যোগকে কেন্দ্র করে এত আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে, সেটির লক্ষ্য, নৈতিকতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে ন্যূনতম দ্বিধার অবকাশ নেই। প্রতিমন্ত্রীর পদ বা পদত্যাগপত্র দিয়ে ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা আত্মত্যাগকে পরিমাপ করা যায় না। সাময়িক যেকোনো সিদ্ধান্তের চেয়ে দল, দেশ ও মানুষের কল্যাণে তার অবদান এবং আন্তরিক অবস্থান অনেক বেশি অর্থবহ। জনগণের সরকারের বার্তা এখানে অনেকটাই স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আস্থাভাজন, ত্যাগী ও জনপ্রিয় একজন তরুণ নেতার সাহসী ও জনবান্ধব উদ্যোগের বাস্তবায়নেও যদি কোনো বিতর্কের অবকাশ থাকে, সেখানেও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথযাত্রায় সামনের দিনগুলোতেও, সরকারের প্রতিটি পর্যায়ে দায়বদ্ধতার ধারা বজায় থাকবে।
ইশরাক হোসেনের এই ঐতিহাসিক, অভূতপূর্ব পদত্যাগ মোটেই কোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়। বরং আত্মোপলব্ধি, সংশোধনী ও গণমানুষের ভালোবাসায় সামনে তার জন্য আরও বৃহত্তর ও গণমুখী রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের পথ উন্মোচিত হতে পারে, ইনশাআল্লাহ।