ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থা তার নাগরিক ও বহির্বিশ্বের কাছে দীর্ঘকাল ধরে যে আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে এসেছে, তা গত কয়েক মাসের ভারতব্যাপী বিক্ষোভের জেরে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে এই বিক্ষোভ। ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা দেয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের দাবিও উঠেছে। বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘তেলাপোকা জনতা পার্টিও একই দাবিতে দেশ জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেছে, যাকে তারা ‘যন্তর মন্তর সিজন-২’ হিসেবে অভিহিত করেছে। জুলাই মাসে প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে বাধ্য করা আন্দোলনের সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটানোই তাদের লক্ষ্য। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভোট চুরি করা হয়েছে বলে বেশ কিছুদিন ধরেই অভিযোগ করেছেন বিরোধী দল নেতা রাহুল গান্ধী। একসময় শাসক দল তা নিয়ে কটাক্ষ করলেও এখন বিজেপি’র মাথায় বাজ ভেঙে পড়েছে। ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান শরিক দলগুলোও নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজ ও সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বচ্ছতা দাবি করতে শুরু করেছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এত অভিযোগ সত্ত্বেও যখন নীরবতা অবলম্বন করেছেন, তখন বিজেপি’র পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের হয়ে সাফাই গাওয়ার বিষয়টি প্রশ্ন তুলেছে যে, ভারতে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক সংস্থার হয়ে কেন শাসক দল কথা বলছে।
ভারতের বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তৎপরতার সময় প্রশ্ন তোলা হয়েছিল এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এর পেছনে ভোটারদের নাম, বিশেষ করে ভারতের সংখ্যালঘুদের একটা অংশের নাম বাদ দেয়ার চেষ্টা দেখতে পেয়েছেন। আর এই এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ৬০ লাখের উপর মানুষ ভোট থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এখনো তারা ট্রাইব্যুনালের বিচারের উপর নির্ভর করে রয়েছেন। কিন্তু সেই কাজেও গতি নেই। পশ্চিমবঙ্গে একটি ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারপতি হতাশ হয়ে বলেছেন, যে গতিতে কাজ হচ্ছে তাতে ১৪৫ বছর লেগে যাবে সকলের আবেদন নিষ্পত্তি করতে। সমপ্রতি বোম্বে হাইকোর্টের দুই বিচারপতি এসআইআর মামলা শুনানি চলাকালীন নির্বাচন কমিশনকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেছেন, “যোগ্য ভারতীয় নাগরিকদের নাম যেন ভোটার তালিকায় থাকে সেটা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের কর্তব্য। কিন্তু আপনারা কী করছেন? নাগরিকদের নামই যদি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে তাহলে এই গোটা এসআইআর প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্যটা কী?”
গত মাসে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে যে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছিল, তা এখন দাবানলে পরিণত হতে চলেছে। ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সুশীল সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ৭৬ বছরের দীর্ঘ বিশ্বাসযোগ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এখন একটাই দাবি প্রকম্পিত করে তুলেছে গোটা দেশকে। তা হচ্ছে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ চাই। কিন্তু কেন এই দাবি? ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে ফাঁস করে দেয়া হয়েছে যে, কমিশন এমন বেশ কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা নিয়ে গত ১০ মাসে দুজন নির্বাচন কমিশনার প্রশ্ন তুলেছিলেন। ভোটার নিবন্ধন ফরমে পরিবর্তন থেকে শুরু করে ভোটার তালিকা দেখার সুযোগ পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয় এবং ভোটার তালিকার ডেটাবেস ব্যবহারের সুযোগ এবং এর আইটি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে যত বিতর্ক তৈরি হয়েছে, নতুন ভোটারের নাম তোলার ফরম-৬ এর পরিবর্তন নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। এ নিয়ে গত ২৬শে সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন একটি বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছিল, ফরম-৬ আবেদনের সঙ্গে ভোটারদের যে ঘোষণাপত্র দিতে হয়েছে, তা বহাল রেখেছিল সুপ্রিম কোর্ট। নতুন ভোটারদের ফরম-৬ এর সঙ্গে দেয়া অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রে জানাতে হয়েছে, আগের এসআইআরে তাদের নিজের, বাবা-মা বা পিতামহ বা পিতামহীর নাম ছিল কিনা। সেই নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক। এ নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল, এর ফলে বৈধ ভোটারদের নামও বাদ পড়তে পারে। কিন্তু এবার কমিশনের সেই বক্তব্য নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ জানিয়েছে, ফরম-৬ এর পরিবর্তনে অনুমোদন দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট। কারা সেই পরিবর্তনে অনুমোদন দিয়েছিল, তা জানতে চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবিন্দর সিংহ সাঁধু সতর্ক করেছিলেন যে, সরকার এই সংক্রান্ত ১৯৬০ সালের রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টর্স রুলস-এ সংশোধন করার আগে ফরম বদলানো ঠিক হবে না।
কারণ, আইন বলছে, সংশোধন না করে এই সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। কিন্তু সেই সতর্কতা কানে নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাঁধু ফরম-৬ এ ওই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত এবং বেআইনি’ বলে আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং তা প্রত্যাহারের কথা বলেছিলেন। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমার সেই সব আপত্তিকে আমলে নেন নি। অথচ নির্বাচন কমিশনে একজনের পরিবর্তে তিনজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, তিনজনের মতৈক্যের ভিত্তিতেই সব সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর মতপার্থক্য থাকলে তা সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমার এসবের কোনো তোয়াক্কাই করেন নি। বিরোধী নেতাদের অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমার বিজেপি’র পুতুল হয়ে কাজ করেছেন। লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির নামে প্রতিটি রাজ্যে লাখ লাখ ভোটারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ভোটের অঙ্গন থকে দূরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে বিজেপির জয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। ফলে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মতো রাজ্যের সামপ্রতিক নির্বাচনকে বাতিল করারও দাবি তোলা হয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে মামলা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। এসআইআর পর্বে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন কিংবা একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনেরও আর্জি জানানো হয়েছে আদালতে। তদন্তের আর্জির প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে চেয়েছে শীর্ষ আদালত। নোটিশ পাঠিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
বিরোধীরা অবশ্য রাজনৈতিকভাবেই জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবি নিয়ে শাসক দলকে অভিযুক্ত করার পথেও সক্রিয় রয়েছে। কংগ্রেস সভাপতি খাড়্গে বলেছেন, আমাদের লড়াই অবিচারের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার পর আমরা যে সর্বজনীন ভোটাধিকার পেয়েছিলাম, সরকার তা খর্ব করার চেষ্টা করছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সরকারের হাতের পুতুল হয়ে গিয়েছেন। মোদি ও শাহ যা বলেন, তিনিও তা-ই করেন। এমনটা চলতে থাকলে একনায়কতন্ত্রের সূচনা হবে।
কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর আসন্ন নির্বাচনের আগেই বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব নথি জনসমক্ষে আনা প্রয়োজন এবং ভোটার তালিকা বাদ দেয়া ও সফটওয়্যার পরিবর্তনের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। যতক্ষণ না এই উদ্বেগগুলোর বিশ্বাসযোগ্য সমাধান হচ্ছে, ততক্ষণ প্রতিটি নতুন নির্বাচন সমাধান দেয়ার বদলে আমাদের গণতন্ত্রের সংকটকে আরও গভীর করে তুলবে। ্ত