আন্তর্জাতিক

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের আগ্রহ, উদ্বিগ্ন ভারত

মোহাম্মদ আবুল হোসেন | আন্তর্জাতিক
আগস্ট ২৯, ২০২৬
মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের আগ্রহ, উদ্বিগ্ন ভারত

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে। এই নীতির মাধ্যমে ঢাকা একই সঙ্গে চীনের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ব্যাপক বাণিজ্য করেছে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে শ্রমিক পাঠিয়েছে, জাপানের অবকাঠামো সহায়তা নিয়েছে, ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে এবং পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বিশ্বব্যবস্থা যেভাবে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে তাতে এমন অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে জড়িত হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। নিরাপত্তা বিষয়ক উদ্যোগে অংশ নিয়েছে। অন্যের মানবিক বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষা বিষয়ক জোটে যোগ দেয়নি। ন্যাটো যেভাবে ইউরোপের বেশির ভাগ অংশকে একত্রিত করে শক্তিশালী জোট গঠন করেছে। সেখানে এক দেশের বিরুদ্ধে কোনো আক্রমণ বা হামলা হলে তা অন্য দেশের ওপর আক্রমণ বা হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সবার সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এদেশের চারদিকে বড় বড় শক্তিধর দেশ। আছে ভারত, চীনের মতো দেশ। এসব দেশের শক্তির তুলনায় বাংলাদেশ অনেক দুর্বল। ফলে কারও সঙ্গে সাংঘর্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখেনি বাংলাদেশ। তার অবস্থান জোটনিরপেক্ষ। কিন্তু বিশ্বব্যবস্থা প্রতিদিনই বিভক্ত হয়ে পড়ছে। অর্থের লেনদেন। ব্যবসা-বাণিজ্য। শক্তির প্রতিযোগিতা। বিশ্বের মধ্যে এক নম্বর শক্তিধর হিসেবে অবস্থান ধরে রাখা। এসব ইস্যুতে প্রতিদিন বিশ্ব ব্যবস্থায় সংঘাত। সেটা কূটনৈতিক। সামরিক বা সামাজিক। গড়ে উঠছে নতুন নতুন কৌশল। জোট। এশিয়া টাইমসে ঢাকার সাংবাদিক ফয়সাল মাহমুদ এ বিষয়ে লিখেছেন- যুক্তরাষ্ট্র নতুন নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে, চীন তার কৌশলগত নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করছে এবং ভারতও নিজস্ব নিরাপত্তা সম্পর্কের জাল শক্তিশালী করছে। তুরস্ক তার প্রভাব নিজ অঞ্চলের বাইরেও বাড়াচ্ছে। সৌদি আরবও কেবল ধনী মিত্ররাষ্ট্রের ভূমিকায় না থেকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করছে। আর পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রধারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি হিসেবে নিজেকে কৌশলগতভাবে প্রাসঙ্গিক রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে ঢাকার কাছে স্থায়ীভাবে ‘ভূ-রাজনৈতিক অপেক্ষাকক্ষে’ বসে থাকা আর আগের মতো নিরাপদ না-ও মনে হতে পারে।
 

এমন এক সময়ে সৌদি আরবে শুরু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি জোট। মক্কা চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক একজোট হয়েছে। এর মধ্যদিয়ে তারা ইসলামিক মূল্যবোধে একতাবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার করেছে। এই চুক্তির তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। সৌদি আরব হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে দেশটির ধর্মীয় গুরুত্বও অপরিসীম। কারণ, এই দেশেই অবস্থিত মুসলিমদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র কাবা, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সমাধি ও মসজিদে নববী। আছে আরাফাতের ময়দান। বাংলাদেশও একটি মুসলিম প্রধান দেশ। স্বাভাবিকভাবে সৌদি আরবের প্রতি বাংলাদেশের দুর্বলতা আছে। তার ওপর তারা সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি অভিবাসীকে কাজের অনুমতি দিয়েছে। এশিয়া টাইমস লিখেছে- ইতিমধ্যে হুতিদের হামলা থেকে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌপথ রক্ষায় সৌদি নেতৃত্বাধীন একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগে বাংলাদেশ যোগ দিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির বলেছেন, রিয়াদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন শুধু হজ ও ওমরাহকেন্দ্রিক না রেখে কৌশলগত সম্পর্কে উন্নীত করা প্রয়োজন।
 

তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
 

বাংলাদেশের জন্য তুরস্কও গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য অংশীদার। আঙ্কারা ড্রোন, সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্রসহ তুলনামূলকভাবে কম খরচের বিভিন্ন সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের বড় সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। চীনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের সশস্ত্র বাহিনী আধুনিকায়ন করতে চাওয়া বাংলাদেশের কাছে তুরস্ক তাই স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় অংশীদার। এরই মধ্যে খবর প্রকাশ হয়েছে কপ সম্মেলনে যোগ দিতে নভেম্বরে তুরস্কে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই সম্মেলনে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে বলে আশা করা যায়। ওদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলেছে। তিন দেশের মধ্যে পাকিস্তান সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অংশীদার। ফয়সাল মাহমুদ লিখেছেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলের বড় একটি সময় ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক ছিল অনেকটাই শীতল। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত উষ্ণ হয়েছে। বাণিজ্য, কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগ বেড়েছে। হুমায়ুন কবিরও পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগকে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
 

ভারত কেন উদ্বিগ্ন?
 

স্বাধীনতার পর ৫৫ বছর ধরে কোনো সামরিক জোটে না জড়ানোর নীতি অনুসরণ করে এসেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এবার সেই অবস্থান থেকে সরে এসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে ঢাকা। পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, ৭ই আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ওদিকে বাংলাদেশকেও এই চুক্তিতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি এই চুক্তিতে ইরানকেও যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে বিশ্ব মিডিয়ার খবরে জানা যায়। ইরানকে এমন সময়ে এই চুক্তিতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে অবরোধ দেয়ার ঘোষণা করেছে। উল্লেখ্য, মক্কা চুক্তিতে আছে সৌদি আরব। আবার বিশ্ব মিডিয়ায় খবর প্রকাশ হয়েছিল যে, ইরানে হামলা চালাতে ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিল সৌদি আরব। এখন এই চুক্তিতে যদি ইরান যুক্ত হয় আর তখন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে হামলা করে তাহলে সৌদি আরব তখন কি করবে? সে যা-ই হোক। চুক্তিটির মূল নীতি হলো- তিন সদস্যের যেকোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

 

 পশ্চিম এশিয়ায় ইরান সংঘাতের বিস্তার এবং ইরানসমর্থিত হুতিদের হামলার পর আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যেই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে হুমায়ুন কবির বলেছিলেন, তিন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে, যদি তা দেশের জাতীয় স্বার্থে কাজে আসে। আরেক প্রতিমন্ত্রীও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। ওদিকে সম্প্রতি চীন সফর করেছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। তা নিয়ে দ্য হিন্দু লিখেছে, বিতর্কিত ভারত-চীন সীমান্তের কিছু অংশের সীমানা নির্ধারণের আলোচনা এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে কথা বলেছে দুই দেশ। ২৫শে আগস্ট বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বৈঠকে বসে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে যে টানাপড়েনের সৃষ্টি হয়েছে, মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার একটি সম্ভাবনা সামনে এসেছে তখন অজিত দোভালের এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৈঠকটি ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধ নিয়ে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের ২৫তম দফার আলোচনার অংশ। 

 

দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনার পর দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার মধ্যেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। এ সফরের আগে ফার্স্টপোস্টের শিরোনাম- ক্যান এনএসএ অজিত দোভালস বেইজিং ভিজিট সুথ ইন্ডিয়া-চায়না টাইস বিফোর ব্রিক? এতে বলা হয়, সীমান্ত ইস্যুর পাশাপাশি ভারত-চীন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ক্ষেত্রেও দোভালের সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দোভালের সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা। বৈঠকটি হলে সাত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের পথও তৈরি হতে পারে। ওদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরব বাংলাদেশকে চুক্তিতে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ফলে বিষয়টি কেবল আরেকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ছবি তোলার মতো আনুষ্ঠানিকতা নয়; সদস্য হলে এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত দায়বদ্ধতাও যুক্ত হতে পারে। ভারতের জন্য মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত দুই বছরে বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের বহু পুরনো কৌশলগত ধারণাই বদলে গেছে। শেখ হাসিনা ছিলেন ঢাকার সঙ্গে ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার। তার পতন শুধু একটি সরকার পরিবর্তন করেনি; বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নীতির কেন্দ্রীয় ভিত্তিটিও দুর্বল করেছে। হাসিনা পালিয়ে ভারতে চলে যান। সেখান থেকে তার রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম কার্যক্রম দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরক্তির কারণ হয়ে আছে। ঢাকা বারবার ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এমন সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করছে, যাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ভারত আগে খুব একটা পছন্দ করতো না। পাকিস্তান আবার কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়েছে। তুরস্কের গুরুত্ব বেড়েছে। চীন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে। এমনকি ক্ষমতাসীন বিএনপিও বেইজিংয়ের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বাড়িয়েছে। ঢাকার দৃষ্টিতে এটি কূটনৈতিক বহুমুখীকরণ।

 

 কিন্তু নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে এটি এমন এক অতিথির মতো, যে বাড়ির মালিক অনুপস্থিত থাকার সুযোগে ঘরের আসবাব নতুন করে সাজাচ্ছে। পাকিস্তান এখনো ভারতের প্রধান সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রতি তুরস্কের সমর্থন এবং কাশ্মীর প্রশ্নে আঙ্কারার অবস্থানের কারণে ভারত-তুরস্ক সম্পর্কও উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হয়েছে। এই দুই দেশকে নিয়ে গঠিত একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোয় এমন একটি দেশ যোগ দিলে, যে দেশটি তিনদিক থেকেই ভারতের সীমান্তে ঘেরা, সেটি নয়াদিল্লিতে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করবে। ভারতের কিছু বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সম্ভাব্য পদক্ষেপকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের মক্কা জোটে যোগদান ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা পরিবেশে প্রথমবারের মতো একটি বহিরাগত সামরিক মাত্রা তৈরি করতে পারে। তবে বাংলাদেশের জন্য ভূগোলও একটি কঠিন বাস্তবতা।
 

মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে এর বাধ্যবাধকতা। এসব প্রশ্নের মধ্যে আছে- ইরান যদি সৌদি আরবে হামলা চালায়, তখন বাংলাদেশ কী করবে? তুরস্ক সিরিয়ার মতো আরেকটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে ঢাকার অবস্থান কী হবে? আর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন- ভারত ও পাকিস্তান সংঘাত শুরু হলে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশের ওপর কী ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে? এখানেই বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে। ফয়সাল মাহমুদ লিখেছেন- ইরানের সঙ্গেও বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তেহরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের নিয়ে তৈরি নিরাপত্তা কাঠামোয় যোগ দিলে সেই সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার সামরিক সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তাই মক্কা জোটের তিন দেশের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানো এবং আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেয়া- এই দু’টি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। তিন দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সৌদি বিনিয়োগ ও শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কৌশলগতভাবে লাভজনক। পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা একটি সার্বভৌম দেশের স্বাভাবিক অধিকার। কিন্তু এসবের কোনোটিই বাংলাদেশকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করে না যে, ওই দেশগুলোর কোনো একটির ওপর হামলা মানেই বাংলাদেশের ওপর হামলা। এখানেই নতুন সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রথম বড় পরীক্ষা। জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া শুনতে সহজ মনে হয়। কিন্তু যখন বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় স্বার্থ পরস্পরের বিপরীত দিকে টানতে শুরু করবে, তখন সেই নীতি বাস্তবায়নই হয়ে উঠবে সবচেয়ে কঠিন। 

 

মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ নতুন কৌশলগত প্রভাব অর্জন করতে পারে এবং দেখাতে পারে যে, ঢাকা আর ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্ধারিত পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোয় থাকতে চায় না। কিন্তু এর বিনিময়ে গত পাঁচ দশকের কৌশলগত অস্পষ্টতা বদলে যেতে পারে পশ্চিম এশিয়ার সামরিক সংঘাতে নতুন দায়বদ্ধতায়। পাশাপাশি বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিবেশী বৃহৎ শক্তি- ভারতের সঙ্গেও উত্তেজনা বাড়তে পারে। ভারতেরও একটি বাস্তবতা মেনে নেয়া প্রয়োজন। তা হলো হাসিনাপরবর্তী বাংলাদেশ পাকিস্তান, তুরস্ক ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়বে, নয়াদিল্লি তা পছন্দ করুক বা না করুক। প্রতিটি সম্পর্ককে ভারতবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখলে শেষ পর্যন্ত সেই জোটবদ্ধতাই তৈরি হতে পারে, যেটিকে ভারত সবচেয়ে বেশি ভয় করছে। বাংলাদেশের সামনেও অবশ্য একটি অস্বস্তিকর সত্য রয়েছে। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন মানে শুধু জোটে যোগ দেয়ার স্বাধীনতা নয়; কোনো জোটের প্রয়োজন না হওয়ার মতো আত্মবিশ্বাসও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের অংশ। পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশ এমন একটি ভারসাম্য বজায় রেখেছে- সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কিন্তু কারও সামরিক মিত্র নয়। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ঢাকার সামনে নতুন কৌশলগত সুবিধার দরজা খুলতে পারে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে বাংলাদেশকে এমন সামরিক দায়বদ্ধতাও গ্রহণ করতে হতে পারে, যা গত ৫০ বছর ধরে রক্ষা করে আসা তার পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতাকেই শেষ পর্যন্ত সীমিত করে দিতে পারে। 

 

আন্তর্জাতিক'র অন্যান্য খবর