ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরাইলিরা নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, অত্যাচার, সহিংসতা ও সন্ত্রাস চালিয়ে আসছে। সর্বশেষ তারা ফিলিস্তিন থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা করেছে। পশ্চিম তীরে দখল করে নেয়া অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা রাষ্ট্রীয় মদতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত গাজা ও পশ্চিম তীরে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছে ইসরাইলিরা। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত একে গণহত্যা বলে আখ্যায়িত করে অভিযুক্ত করেছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক আদালত। এ নিয়ে এতদিন মুসলিম দেশগুলো কথা বললেও এখন ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তাদেরই ঘনিষ্ঠ মিত্র বৃটেন। পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ করার যে পরিকল্পনা করেছে ইসরাইল এবং তা সম্প্রসারণ করছে তার বিরুদ্ধে প্রথমে সতর্কতা জারি করে বৃটেন। অবশেষে বৃটেন, কানাডা সহ ইসরাইলের মিত্র ১২টি দেশ ইসরাইলের অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর জবাবে নেতানিয়াহু সরকার ইসরাইলে বৃটেনের কন্স্যুলেট বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে এক সময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বৃটেনের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কে বড় আকারে ফাটল দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ফাটলই নয়, এই সম্পর্ক অবনতি হয়ে এখন তলানিতে চলে এসেছে। এর মধ্যে আবার বৃটেনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে রাশিয়া। তারা বলেছে, ইউক্রেন যদি বৃটেনে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে তাদের দিকে, তাহলে তারা বৃটেনে হামলা চালাবে। এর ফলে বিশ্বে সমর বিশেষজ্ঞরা নড়েচড়ে বসছেন। তাদের চোখে-মুখে উদ্বেগের রেখা। কারণ, যদি সত্যি বৃটেনে রাশিয়া হামলা করে বসে তাহলে তা থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। এমনিতেই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে বলে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে সৌদি আরব, কাতার, জর্ডান, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক সহ অনেক দেশ। পাকিস্তানও হুঁশিয়ারি দিয়েছে। কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। চীনের সঙ্গে তো আগে থেকেই এই যুদ্ধ চলছে। তিনি গ্রিনল্যান্ডকে দখল বা কিনে নেয়ার হুমকি দিয়ে ইউরোপকে খেপিয়ে তুলেছেন। কানাডার নিয়ন্ত্রণে থাকা লেক অন্টারিওকে গুগল ম্যাপে ‘লেক আমেরিকা’ নামকরণ করেছেন। একের পর এক শুল্ক আরোপ করে যাচ্ছেন দেশগুলোর ওপর। ফলে বিশ্ব ব্যবস্থা ক্রমশ বিভক্ত হচ্ছে। নানা মেরূকরণ দেখা দিচ্ছে। তবে বৃটেনের সঙ্গে ইসরাইলের দ্বন্দ্ব যে আকার নিয়েছে, অন্যদিকে বৃটেনকে রাশিয়া যে হুমকি দিয়েছে তাতে রাজনীতির সমীকরণ মেলানো কঠিন। এরই মধ্যে ইসরাইলের বিরুদ্ধে দেয়া বৃটেনের নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানিয়েছে ইসরাইলের বিপুল সংখ্যক বিশিষ্ট ব্যক্তি। এ বিষয়ে গার্ডিয়ানে সাংবাদিক এমা গ্রাহাম হ্যারিসন চমৎকার একটি প্রতিবেদন লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদিদের বসতি সম্প্রসারণ ও ক্রমবর্ধমান সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বৃটেনের আরোপ করা নতুন নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানিয়েছেন ইসরাইলের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। ইসরাইল একাডেমি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজের প্রেসিডেন্ট, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশটির সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান এবং সাবেক মন্ত্রী ও কূটনীতিকরা এই পদক্ষেপকে ইসরাইলি সরকার ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার ‘অনিবার্য পরিণতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা লিখেছেন, ‘ইহুদি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে, ইসরাইল রাষ্ট্রের বৈধতার বিরুদ্ধে নয়। ইসরাইলের সরকার দেখাতে চাইছে যে, ইহুদি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত ইহুদিবিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। তবে তাদের এমন প্রচারণা বা এমন প্রতিক্রিয়ার কোনো ভিত্তি নেই।’
বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা করছেন। তবে ৮ই সেপ্টেম্বর তিনি যে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন এবং যে মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছেন, তা ছিল বিস্ময়কর। অধিকৃত পশ্চিম তীরে পরিবর্তন আনতে অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে এটি ছিল বহু বছরের মধ্যে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ কোনো মিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ‘হারেৎস’ পত্রিকায় এস্থার সলোমন লিখেছেন, ইসরাইল সরকার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক রীতির অবসান ঘটিয়েছে। অস্পষ্ট বক্তব্য ও প্রচুর ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশের পরিবর্তে বাস্তবে কিছু করার রীতি গ্রহণ করেছে তারা। ফ্রান্স ও কানাডা বসতি এলাকায় উৎপাদিত পণ্যের ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা ঘোষণা করায় এবং আরও ১০টি ইউরোপীয় দেশ একই ধরনের পদক্ষেপকে সমর্থন করায় বৃটেনের সিদ্ধান্তের প্রভাব আরও বেড়েছে। আগাম বৃটেনের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করা হলেও ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ পদক্ষেপের সমালোচনা করেননি।
ইদিয়ত আহরোনোত পত্রিকায় ইতামার আইখনার লিখেছেন, ‘জেরুজালেম বৃষ্টির জন্য প্রস্তুত ছিল, কিন্তু যা এসেছে তা পুরোপুরি এক ভয়াবহ ঝড়। ৮ই সেপ্টেম্বর ইসরাইল এতটাই অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়েছে যে, দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা পর্যন্ত ‘গোয়েন্দা-কূটনৈতিক ব্যর্থতা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।’ ইহুদি পিপলস পলিসি ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ ইহুদি ইসরাইলি অধিকৃত পশ্চিম তীরের আংশিক বা পুরোপুরি সংযুক্তির পক্ষে। আসন্ন নির্বাচনে প্রধান সব প্রার্থীই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করছেন। তবে দেশটির নিরাপত্তা, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে ক্রমেই জোরালো বিরোধিতা দেখা যাচ্ছে। চলতি গ্রীষ্মে তারা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি সন্ত্রাসবাদ এবং ‘জাতিগত নির্মূলের মতাদর্শে’ সরকারের সমর্থনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
ইসরাইল একাডেমি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজের প্রেসিডেন্ট ও বৃটেনে জন্ম নেয়া অধ্যাপক ডেভিড হারেল বলেন, বৃটেনের পদক্ষেপকে সমর্থন করে দেয়া যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের একজন। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা বন্ধ এবং দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে যারা তার মতো চেষ্টা করছেন, এই নিষেধাজ্ঞা তাদের জন্য জরুরি সহায়তা হিসেবে এসেছে।
দ্য গার্ডিয়ানকে এই শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে ইহুদিবিদ্বেষ ও ইসরাইল বিরোধিতার বিরুদ্ধে আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়বো। এ কারণেই ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সার্বিক বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞার পক্ষে আমি নই। কিন্তু ইসরাইল যা করছে, তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া ন্যায়সংগত এবং আমি তা সমর্থন করি। বিশেষ করে এই সময়ে পশ্চিম তীরে ইসরাইল যা করছে, তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, যারা নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করার আহ্বান জানাচ্ছেন, তারা ফিলিস্তিনিদের প্রতিদিনের বাড়তে থাকা সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ার বাস্তবতা এবং দখলদারিত্ব ইসরাইলের ভবিষ্যতের জন্য যে ঝুঁকি তৈরি করছে। এই দু’টিই উপেক্ষা করছেন তারা। সেখান থেকে (অধিকৃত ফিলিস্তিন) বেরিয়ে আসা, অথবা অন্তত এখনকার জন্য এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করা এবং সত্যিকার অর্থে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান নিয়ে আলোচনা শুরু করা শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্যই ভালো নয়। আমরা এই অসহায় মানুষগুলোর প্রতি কোনো অনুগ্রহ করছি না। বরং নিজেদের জন্যও সমানভাবে, সম্ভবত আরও বেশি, উপকার করছি।
বৃটেনের নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করে দেয়া যৌথ বিবৃতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট, ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সাবেক কমান্ডার ড্যান হালুটজ, সাবেক মন্ত্রী ইউলি তামির ও রনি বার’অন এবং জার্মানিতে ইসরাইলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ইয়োরাম বেন জিভও স্বাক্ষর করেছেন। তারা লিখেছেন, ‘দেশ থেকে ইহুদি সন্ত্রাসবাদের কলঙ্ক মুছে ফেলার জন্য ইসরাইল রাষ্ট্রের ঠিক এই সিদ্ধান্তটিই পাওয়া উচিত ছিল।’ সাবেক কূটনীতিক নাদাভ তামিরও এই পদক্ষেপকে ইসরাইলের জন্য ভালো বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনিদের সংযুক্তিকরণ ও জাতিগত নির্মূল ঠেকাতে যেকোনো পদক্ষেপ ইহুদি জনগণের গণতান্ত্রিক আবাসভূমি হিসেবে ইসরাইলের জায়নবাদী দৃষ্টিভঙ্গির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করে। এটি আমাদের আরও নিরাপদ ও নৈতিক হতে সহায়তা করবে।
ইসরাইলের বৈদেশিক বাণিজ্য প্রশাসনের প্রধান রোয়ি ফিশারের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর অধিকৃত অঞ্চলগুলো থেকে বৃটেনে রপ্তানি করা পণ্যের মূল্য ছিল মাত্র ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বিপরীতে পণ্য ও সেবাসহ দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৪৪০ কোটি ডলার। তবে বসতি সম্প্রসারণে অর্থায়ন বা সহায়তা করে এমন যেকোনো কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা ইসরাইলের প্রধান ব্যাংক ও বিমা কোম্পানিগুলোকে বৃটেনে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে তাদের কার্যক্রমের মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য করতে পারে। মিলিব্যান্ড নতুন পদক্ষেপগুলোর বিস্তারিত জানাননি। তবে এই উদ্যোগ বসতি নির্মাণের গতি কমিয়ে দিতে বা তা বন্ধ করে দিতে পারে। ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটের সাবেক স্পিকার আব্রাহাম বুর্গ মিলিব্যান্ডকে বিশ্বব্যাপী দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অনেক ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনির মতো আমিও মিলিব্যান্ডের সাহসী নৈতিক নেতৃত্বের জন্য কৃতজ্ঞ। এটি একটি ভালো শুরু। থামবেন না।
তবে ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সা’আর নির্বাচনের আগে তার দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘নির্লজ্জ হস্তক্ষেপের’ জন্য মিলিব্যান্ডের সমালোচনা করেছেন। বিরোধী রাজনীতিকরা অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকার প্রচারণা জোরদার করতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৃটেনের নিষেধাজ্ঞাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। ইসরাইলের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষক দালিয়া শেইন্ডলিন বলেন, বৃটেনের এই পদক্ষেপ অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। কারণ ইসরাইলি ভোটারদের মনোযোগ মূলত অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর দিকে। শেইন্ডলিন বলেন, ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের পর থেকে ইসরাইল আরও বেশি নিজের ভেতরে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সাধারণভাবে বিশ্বের প্রতি মনোভাব এখন এমন যে, ওরা সবাই আমাদের ঘৃণা করে। আপনি যদি নেতানিয়াহুর সমর্থক হন, তাহলে এটিকে ইহুদিবিদ্বেষের কারণে তারা আমাদের বিরুদ্ধে- এমন প্রমাণ হিসেবে দেখতে পারেন। আর আপনি যদি বিরোধী শিবিরের হন, তাহলে নেতানিয়াহুর নীতির কারণে বিশ্ব আমাদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে- এটি তার আরও একটি প্রমাণ হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু এসব নীতি কীভাবে নির্বাচনী সমীকরণের চিত্র বদলে দেবে, তা এক কঠিন হিসাব। মিলিব্যান্ড যেদিন বক্তব্য দেন, সেদিনই রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করে। একই দিনে ‘হারেৎস’ একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে ৭ই অক্টোবরের হামলার আগে নেতানিয়াহুকে দেয়া নিরাপত্তা সতর্কবার্তার কথা তুলে ধরা হয়- যেগুলো তিনি উপেক্ষা করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ইসরাইলের ১৪টি মানবাধিকার সংগঠনও নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানিয়েছে। ‘বিৎসেলেম’, ‘ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস ইসরাইল’ এবং ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-সহ সংগঠনগুলোর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় প্রথম পদক্ষেপ। বিবৃতিতে তারা আরও বলেছে, ইসরাইলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক যেন অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের বসতি স্থাপন প্রকল্প, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও জাতিগত নির্মূলকে আর সক্ষম না করে এবং ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণাধীন সব ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকারের ওপর বৃহত্তর আক্রমণকে সমর্থন না করে, তা নিশ্চিত করতে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আরও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানাই।
ইউরোপে ইসরাইলের অন্যতম শক্তিশালী মিত্র ছিল বৃটেন। ৭ই অক্টোবরের হামলার আগ পর্যন্ত ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সমাধানের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি না থাকলেও বৃটেনের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক বেশ সমৃদ্ধ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পর বৃটেন এখন ইসরাইলের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে বৃটেন ইসরাইলের সঙ্গে একটি ‘ট্রেড অ্যান্ড পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট’ (টিপিএ) প্রতিষ্ঠা করে। এর পরপরই সাইবার, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য দুই দেশ একটি নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে। শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং ক্রমবর্ধমান দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা দুই দেশের উষ্ণ সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল। ৭ই অক্টোবরের হামলার পরপরই ইসরাইলকে সমর্থন এবং হিজবুল্লাহ ও ইরানকে ইসরাইলে হামলা থেকে নিবৃত্ত করতে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সামরিক বাহিনী পাঠানোয় বৃটেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দেয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালের এপ্রিল ও পরে অক্টোবরে ইসরাইলের ওপর ইরানের হামলা প্রতিহত করতেও বৃটেন ও ফ্রান্স উভয় দেশ অংশ নেয়। কিন্তু সম্প্রতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। মার্চে কোনো রকমে টিকে থাকা যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর অবশিষ্ট জিম্মিদের মুক্তি দিতে হামাসের ওপর চাপ বাড়াতে ইসরাইলি সামরিক নীতি আরও কঠোর করা হয়। কিন্তু ইসরাইলি সামরিক বাহিনী তাদের অভিযান আরও জোরদার করার পাশাপাশি গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে অবরোধ আরোপ করায় দেশটির কূটনৈতিক মিত্রদের মধ্যে রাজনৈতিক সমর্থন ও সদিচ্ছা দ্রুত কমতে শুরু করে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, গাজায় যুদ্ধের উদ্দেশ্য হামাসকে ধ্বংস করা। তবে তার উগ্রপন্থি জোটসঙ্গীদের বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এর বৃহত্তর লক্ষ্য হলো ফিলিস্তিনিদের বিতাড়ন এবং পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত করা। এসব বিষয় যখন প্রকাশ্যে এবং গোপনে চলছে তখন বৃটেনের রাজনীতিতে মস্কোর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত একটি সংসদীয় প্রতিবেদন ৮ই সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রুশ ধনকুবেরদের স্বাগত জানিয়েছে ইসরাইল এবং তারা ক্রেমলিনকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করতে অনিচ্ছুক। রুশ হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব নিয়ে প্রতিবেদনের একটি অংশে বলা হয়েছে, কিছু দেশ মস্কোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। তবে অন্যরা রাশিয়া নিয়ে বৃটেনের উদ্বেগের সঙ্গে একমত নয়- অথবা উদ্বিগ্ন হলেও রাশিয়ার ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এতটা দৃঢ় অবস্থান নিতে তারা প্রস্তুত নয়।
প্রতিবেদনে ফ্রান্সকে এমন একটি দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা ক্রেমলিনের প্রকাশ্যে নিন্দা করে না। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, অস্ট্রিয়া ও ইতালি মস্কোর আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে। এই অংশে উল্লেখ করা একমাত্র অন্য দেশটি হলো ইসরাইল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমরা এমন প্রতিবেদনও লক্ষ্য করেছি যে, ইসরাইল রুশ ধনকুবের ও তাদের বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ক্রেমলিনকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করতে অনিচ্ছুক। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে রাশিয়ার কোনো হস্তক্ষেপ হয়ে থাকলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করার জন্য বৃটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে প্রতিবেদনটি। অতীতে ক্রেমলিনের হস্তক্ষেপের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তা খতিয়ে দেখতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য সরকারকে সমালোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ধনকুবেররা তাদের বিপুল সম্পদ ব্যবহার করে বৃটিশ রাষ্ট্রব্যবস্থার বিস্তৃত পরিসরে পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো এবং প্রভাব তৈরি করেছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বৃটেনে রাশিয়ার প্রভাব এখন ‘নতুন স্বাভাবিকতা’। পুতিনের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা বিপুলসংখ্যক রুশ নাগরিক বৃটেনের ব্যবসায়ী ও সামাজিক পরিমণ্ডলে ভালোভাবে একীভূত হয়েছেন এবং তাদের সম্পদের কারণে গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছেন। বিশেষ করে ‘লন্ডনগ্রাদে’ এই মাত্রার একীভূতকরণের অর্থ হলো, সরকার এখন যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেগুলো প্রতিরোধমূলক নয়; বরং ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখার প্রচেষ্টা। ‘লন্ডনগ্রাদ’ নামে পরিচিত লন্ডনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে রুশ ধনকুবেরদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যাপকভাবে দেখা হয়। তারা শহরের অভিজাত এলাকাগুলোতে বিলাসবহুল সম্পত্তিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। ফলে ইসরাইল, বৃটেন ও রাশিয়া সম্পর্কের নতুন সমীকরণ কোন্দিকে ধাবিত হয় তা সময়ই বলে দেবে।