জামায়াতের সঙ্গের জোটকে শুরু থেকেই নীতিগত ও কৌশলগতভাবে ভুল মনে করেছেন এনসিপি থেকে সদ্য পদত্যাগ করা দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। সতর্ক করেছিলেন, এই সিদ্ধান্তের জন্য এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে। প্রায় এক বছর ধরে দলের ভেতরে সেই অবস্থান থেকে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের গতিপথ পরিবর্তনে ব্যর্থ হয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এনসিপি’র প্রতিষ্ঠাকালীন এই নেত্রী। দল ছাড়ার ঘোষণায় শুধু চারটি বিষয়ে মতপার্থক্যের ব্যাখ্যাই দেননি, তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে নিজের ভাবনাগুলো। পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারকে ভিত্তি করে নতুন রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সামান্তা।
দলের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে গত বৃহস্পতিবার বিকালে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান সামান্তা শারমিন। এনসিপি’র পুনর্গঠিত কমিটিতে পদাবনতির দুই সপ্তাহের মাথায় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এই নেত্রী। এর আগে তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র এবং এনসিপি’র জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন।
একটি দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন সামান্তা। সেখানে এনসিপি’র রাজনৈতিক অবস্থান, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট, নির্বাচনী কৌশল, নারীর রাজনৈতিক অধিকার এবং দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে নিজের আপত্তির কথা জানিয়েছেন। সামান্তা জানিয়েছেন, গত প্রায় ১১ মাস ধরে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ, প্রস্তাব, আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে এসব বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এনসিপি তার প্রারম্ভিক মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক থাকতে পারছে না বলে মনে করেন তিনি।
জামায়াতের সঙ্গে জোট, শুরু থেকেই আপত্তি: এনসিপি’র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট বা আসন সমঝোতার প্রশ্নে সামান্তা শারমিনের আপত্তি নতুন কিছু নয়। গত ২৮শে ডিসেম্বর ২০২৫-এ তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, জামায়াত নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক মিত্র নয়। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও দর্শনের সঙ্গে সমঝোতায় গেলে এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে। তার মতে, এনসিপি’র মূলনীতি ও রাষ্ট্রকল্প জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিচার, সংস্কার ও গণপরিষদ নির্বাচন তথা সেকেন্ড রিপাবলিকের ধারণাকে কেন্দ্র করে এনসিপি’র রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছিল। ফলে এসব বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান যেকোনো রাজনৈতিক মিত্রতার পূর্বশর্ত হওয়া প্রয়োজন।
পদত্যাগের ঘোষণাতেও এই আপত্তির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। সামান্তার বক্তব্যে, রাষ্ট্রের বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো যেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য সাংবিধানিক সংস্কার, আইনের সংস্কার এবং রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এই তিনটির কোনোটিকেই নিজেদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রপ্রকল্পের অংশ মনে করে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
এনসিপি’র সদ্য সাবেক এই নেত্রী মনে করেন, জামায়াত প্রকৃত অর্থে সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপন্থি রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে দলটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় ধারণ করে। ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়া এবং সেই ভূমিকাকে অপরাধ হিসেবে স্বীকার না করাও তাদের রাজনৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তির অংশ বলে দীর্ঘ ওই পোস্টে উল্লেখ করেছেন সামান্তা।
প্রতিষ্ঠাকালীন এনসিপি’র এই নেত্রীর মতে, এনসিপি যখন জামায়াতকে সংস্কারের পথে বন্ধু মনে করেছে তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, যারা স্বভাবজাত কারণেই উদার, গণতান্ত্রিক, যারা সংস্কারের প্রকৃত শক্তি, তারা সংস্কারের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এনসিপি’র নিজস্ব ও রাজনৈতিক লাইন স্পষ্ট না থাকায় জামায়াতের মধ্যে এনসিপিকে হারিয়ে যেতে হচ্ছে এবং জামায়াতের জন্য নানান ইস্যুতে প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহায়ক ভূমিকা নিতে হচ্ছে।
নির্বাচনী জয় নয়, রাজনৈতিক জয়কে গুরুত্ব দেয়ার কথা: নির্বাচন নিয়েও এনসিপি’র নেতৃত্বের সঙ্গে সামান্তার ছিল মতপার্থক্য। তার মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনটি একটি রাজনৈতিক নির্বাচন হিসেবে অনুষ্ঠিত হওয়ার সকল সম্ভাবনা ছিল। এই ভূখণ্ডে এমন রাজনৈতিক নির্বাচন বারবার এসেছে যেমন ’৪৬ সালে, ’৫৪ সালে, ’৭০ সালে এমনকি ’৯০ সালেও। এসব নির্বাচন কেবল ক্ষমতাসীন দল পরিবর্তনের নয় বরং একটা রাজনৈতিক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। ’২৬-এর নির্বাচনের পূর্বে এটি যেন একটি রাজনৈতিক নির্বাচন না হয়ে ক্ষমতা বদলের নির্বাচনে পর্যবসিত হয়, সেই লক্ষ্যে নির্বাচনকে অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক চরিত্র থেকে সরাতে চেয়েছে পুরনো রাজনৈতিক দলগুলো।
নারীর রাজনৈতিক অধিকার ও এনসিপি’র অবস্থান: পদত্যাগের কারণ হিসেবে নারীর রাজনৈতিক মালিকানা ও অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন সামান্তা শারমিন। তার মতে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নারীরা শুধু অংশগ্রহণ করেননি; তারা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক, সম্মুখসারির যোদ্ধা ও রক্ষাকর্তা ছিলেন।
ব্যারিকেডের সামনে তাদের অবস্থান ও সাহস অভ্যুত্থানকে সর্বজনীন রূপ দিয়েছিল। কিন্তু বিজয়ের পর পুরনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো নারীদের সেই বিজয়ের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে সক্রিয় হয়েছে। নারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, ন্যায্য হিস্যা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ তার।
সামান্তার মতে, এনসিপি’র সামনে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। শুধু দলে নারীদের অন্তর্ভুক্তি নয়, নেতৃত্ব, সংখ্যা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এনসিপি সেই পথে হাঁটেনি। বরং নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে দলের ভূমিকার মিল তৈরি হয়েছে।
কাউন্সিল ছাড়াই পুনর্গঠন, প্রশ্ন অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রে: এনসিপি’র পুনর্গঠিত কমিটি নিয়েও অসন্তোষ জানিয়েছেন সামান্তা। তিনি জানান, কাউন্সিল আয়োজন না করে পুনরায় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
পদত্যাগের পর কী করবেন সামান্তা: এনসিপি ছাড়ার পর নিজের রাজনৈতিক অভিমুখও তুলে ধরেছেন সামান্তা শারমিন সেই দীর্ঘ পোস্টে। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রয়োজন বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে ঐক্যের রাজনীতি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল এমন একটি রাজনৈতিক স্বপ্ন ও সম্ভাবনা তৈরি করা, যা মানুষকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করাবে না; বরং ভিন্নমত, ভিন্ন বিশ্বাস ও ভিন্ন পরিচয় সত্ত্বেও একটি অভিন্ন জাতীয় আকাঙ্ক্ষার জায়গায় ঐক্যবদ্ধ করবে। সামান্তার মতে, ভারতবিরোধিতা করতে গিয়ে আমেরিকার পক্ষ নেয়া, কিংবা আমেরিকাবিরোধিতা করতে গিয়ে চীনের স্বার্থের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মিলিয়ে ফেলা- কোনোটিই স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের রাজনীতি হতে পারে না।
এনসিপি’র সদ্য সাবেক এই যুগ্ম আহ্বায়কের মতে, বাংলাদেশের তরুণদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন একটি দল গঠন করা নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক ঐক্য নির্মাণ করা, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিভাজনই রাজনীতির চালিকাশক্তি হবে না; মতাদর্শের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন লক্ষ্যকে তা গ্রাস করবে না; আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের ঊর্ধ্বে কোনো বিদেশি শক্তির অবস্থান থাকবে না। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তরুণ সমাজ যদি আবার সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ নেয়, তবে তা হতে হবে অতীতের কোনো দলের পুনরাবৃত্তি নয়-বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের নতুন প্রচেষ্টা।
তিনি সেই জায়গার অংশ হবেন উল্লেখ করে বলেন, আমি এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ- যারা আমার সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে চান সকলকে আহ্বান করছি, যোগাযোগ করুন। আমি আপনাদেরকে সঙ্গে নিয়েই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরির প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে চাই। এসব বিষয়ে ‘জনতার চোখ’কে সামান্তা শারমিন বলেন, আসলে বাইরের দুনিয়াটা এখন একটু নতুন। আমি সবার সঙ্গে কথা বলতে চাই। যেহেতু আমি সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছি, ইতিমধ্যে অনেকেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তাদের সঙ্গে বসেই কথা বলবো। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও বসতে চাই। যেসব দল আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইবে, তাদের সঙ্গেও আলোচনা করবো। তবে আমার যে রাজনৈতিক লাইন, আমি যে অবস্থান তুলে ধরেছি, সেটিই বহাল থাকবে। এই রাজনৈতিক লাইনের সঙ্গে যাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও উপযুক্ত বন্ধু হিসেবে পাবো, তাদের সঙ্গেই কাজ করবো।