সংস্কার, বিশেষত রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্য দূর করতে গিয়ে শেষে তাদের একটি পক্ষের দাবির দিকে হেলে পড়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যে সুপারিশ দিয়ে গেছে সরকারকে, সেটা অপ্রত্যাশিত ছিল। কমিশনের জন্য নির্ধারিত কার্যপরিধিতে এ ভূমিকা গ্রহণের বিষয় ছিল না বলেও জানা যায়। বিশেষ পরিস্থিতিতে কার্যপরিধি পরিবর্তন হতে পারে, সেটাও ঠিক। তবে ঐকমত্য কমিশন গঠনের যে উদ্দেশ্যের কথা শুরুতে বলা হয়েছিল, সে ধারাতেই তো কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। স্পষ্টতই সেটা হয়নি। ঐকমত্য কমিশন সংস্কার প্রশ্নে তীরে এসে তরী ডোবানোর মতো ঘটনা ঘটিয়েছে বললে ভুল হবে না। সাধারণ কিছু সংস্কার প্রশ্নে একমত হওয়া যত সহজ; সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুতর প্রশ্নে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা কিন্তু তত সহজ নয়। তবে নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আশাবাদ অনেক জোরালো হয়ে উঠেছিল, সেটা স্বীকার করতে হবে। সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্র কাঠামো পরিবর্তনের প্রত্যাশা বিশেষত ছাত্র-তরুণদের মধ্যে তীব্র হয়ে উঠেছিল। তবে গোটা রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা এর কতোখানি অনুকূলে, সেটাও চিন্তা করে দেখার বিষয়। সংস্কার আলোচনা ব্যর্থ হয়েছিল, তা অবশ্য বলা যাবে না। আমরা তো দেখলাম, ‘মৌলিক সংস্কার’ বলে বিবেচিত অধিকাংশ ইস্যুতেই রাজনৈতিক দলগুলো নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত ছাড়াই একমত হয়। সন্দেহ নেই, কয়েকটি গুরুতর প্রশ্নে বিএনপি সহ কিছু দল ভিন্নমত জানিয়েছে। ভবিষ্যতে এসব প্রশ্নে যে আর অগ্রগতি হবে না, তা মনে করারও কোনো কারণ নেই। সব প্রয়োজনীয় সংস্কারই এক সুযোগে সম্পন্ন করার ঘটনা কোনো দেশে ঘটেনি। বিপ্লবাত্মক ঘটনার পর আনা অনেক পরিবর্তন আবার বেশিদিন টিকে থাকে না। একতরফা সংস্কার অল্পদিনে ঝুলেও যায়। আমাদের দেশে তো মোটামুটি সব পক্ষের সম্মতিতে নির্বাচন ব্যবস্থায় আনা সংস্কার তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকারও বাতিল করে দিয়েছিল হাসিনা সরকার। এর ভেতর দিয়ে তারা নির্বাচন ব্যবস্থাই কার্যত উচ্ছেদ করে দেয়।
এ কারণে সিংহভাগ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, দীর্ঘ আলোচনায় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিষয়গুলো নিয়েই সরকার দ্রুত এগিয়ে যাবে জাতীয় নির্বাচনের দিকে। অনেক দাবি, পাল্টা দাবি ও দরকষাকষির পর নির্বাচনের একটা সময়সীমাও ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর তফসিল ঘোষণার দায়িত্ব অবশ্য নির্বাচন কমিশনের। তাদের ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী ডিসেম্বরের শুরুতে সেটি হওয়ার কথা। এর আগে জুলাই জাতীয় সনদেও মাঠে থাকা প্রধান দুই রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করে। ছাত্র-তরুণদের দল এনসিপি স্বাক্ষর না করলেও প্রত্যাশা ছিল, সরকার সচেষ্ট হলে সেটা অর্জন করা যাবে। আমরা লক্ষ্য করেছি, সনদে স্বাক্ষরের আগ মুহূর্তেও এতে বাদ পড়া কোনো কোনো বিষয় যুক্ত করে পরিস্থিতি সামলানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আনা হয়েছে সংশোধন। সবার যুক্তিপূর্ণ মত বিবেচনায় নিয়ে এ প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে নেয়া যেত আর সেটাই ছিল প্রত্যাশিত। ‘সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি’তেও অন্তত প্রধান সব রাজনৈতিক দলের মতকে সমন্বিত করার দায়িত্ব ছিল ঐকমত্য কমিশনের। এতে তারা স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়েছেন। গুরুতর প্রশ্নে ভিন্নমত উড়িয়ে দিয়ে যেভাবে গণভোট আয়োজন এবং পরবর্তী সংসদে তা পাস করার বিষয়ে যে সুপারিশ তারা সরকারকে দিয়ে গেছেন, তাতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
এ অবস্থায় সরকার আবার রাজনৈতিক দলগুলোকে বলেছে, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে জটিলতা নিরসনের জন্য সরকারকে ‘ঐক্যবদ্ধ দিকনির্দেশনা’ দিতে। সরকার গঠিত কমিশনের দীর্ঘ মধ্যস্থতায় যেসব প্রশ্নে দলগুলো এক জায়গায় আসতে পারেনি, সেসব প্রশ্নে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে কীভাবে দ্রুত ঐকমত্যে পৌঁছাবে, সেটা মোটেই বোধগম্য নয়। এ নিবন্ধ লেখার দিন অবশ্য খবর রয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর তরফ থেকে আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানিয়ে ফোন করা হয়েছে বিএনপি মহাসচিবকে। আলোচনার প্রস্তাব বিএনপি স্বভাবতই প্রত্যাখ্যান করবে না। কিন্তু এতে দ্রুত অগ্রগতির সুযোগ কম। ‘নাটকীয় অগ্রগতি’ অবশ্য রাজনীতিতে হয়ে থাকে। আর সেটা সম্ভব হয়তো দু’একটি ক্ষেত্রে। বিএনপি হয়তো প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে পিআর চালুর দাবি মেনে নিতে সম্মত হবে। তারা যেভাবে সেখানে পিআর চালুর বিষয়ে সম্মত হয়েছেন, সেটা নিম্নকক্ষের সমপ্রসারণ ছাড়া আর কিছু হবে না বলে সমালোচনা রয়েছে। এ প্রশ্নে আগেই বিএনপির ‘ছাড়’ দেয়া উচিত ছিল বলে অনেকে মনে করেন। তবে একটি রাজনৈতিক দল যদি সমালোচনার মুখেও কোনো প্রশ্নে অটল থাকে বা থাকতে চায়, তাতে অন্যদের কী বলার থাকতে পারে? দলটিকে চাপে ফেলে বাধ্য করা হলে পরে যদি তারা বেঁকে বসেন, তখন কী করা? এ কারণে এই নীতিই শ্রেয় যে, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাভাবিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে দ্রুত গণতন্ত্রে উত্তরণের দিকে যাওয়া। আর গণভোট হলে সেটা জাতীয় নির্বাচনের আগেই হতে হবে, এরও কোনো যুক্তি নেই। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলেও এর বিষয়বস্তু কিন্তু বাস্তবায়ন করবে আগামী সংসদ। সেই সংসদকে এর হুবহু বাস্তবায়নে দিনক্ষণ বেঁধে দিয়ে বাধ্য করার বিষয়টিও গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এসব কর্মকাণ্ড আদালতে প্রশ্নের মুখে পড়বে না, এমন নিশ্চয়তাও দেয়া যাচ্ছে না। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ রাষ্ট্রপতির বদলে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আসা সরকার প্রধানকে দিয়ে জারির দাবিও অদ্ভুত মনে হচ্ছে। সংবিধানের আওতায় বর্তমান রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণের পর নতুন করে এটি কীভাবে সম্ভব, এ প্রশ্ন তো উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।
এদিকে দেশ নির্বাচনী আবহে প্রবেশ করেছে বললে ভুল হবে না। সেটা স্বাভাবিকও। নির্বাচনের তো বেশি দেরি নেই। সরকার নিজেও বলছে, যেকোনো মূল্যে ফেব্রুয়ারিতে এবং রোজা শুরুর আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গণ-অভ্যুত্থানের পর মাঠে বড় ভূমিকায় থাকা সেনাবাহিনীর তরফ থেকেও বারবার বলা হচ্ছে, সময়মতো সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন শেষে তারা ব্যারাকে ফিরতে ইচ্ছুক। দেশরক্ষা বাহিনীকে এভাবে দীর্ঘদিন পুলিশি দায়িত্ব পালনে রেখে দেয়াটা জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্রহণযোগ্য নয় বলেই মনে হয়। গণ-অভ্যুত্থানে ভেঙে পড়া পুলিশকে সরকার কার্যকর করতে পারেনি এক বছরেরও বেশি সময়ে। এ সংস্কারটি বরং সবার আগে হওয়া উচিত ছিল এবং এ বিষয়ে কোনো পক্ষেরই আপত্তি ছিল না। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারেও কোনো দল আপত্তি জানায়নি। রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন সংক্রান্ত আরপিও সংশোধনের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে দেরিতে। এর মধ্যে ছোটখাটো সংস্কারে অগ্রসর হতে গিয়েও সরকার সব পক্ষের মত গ্রহণ করে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এনবিআর সংস্কার এর প্রমাণ। এতে করে রাজস্ব আদায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয় জটিল সময়ে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও বারবার আইনগত সংশোধনী আনতে হয়েছে সরকারকে। নিজেদের মতপার্থক্য, কোনো পক্ষের দিকে হেলে পড়া কিংবা অন্য যে কারণেই হোক, সরকারের মধ্যে শুরু থেকে দৃঢ়তার অভাব দেখতে পেয়েছে সবাই। সরকারের ওপর তাই আস্থা বাড়েনি। এর আগেও কয়েকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেখেছি আমরা। কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতিও ভিন্ন অবশ্য। তবে ভিন্ন পরিস্থিতিতে যে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা দেখানো জরুরি ছিল, তাতে অনেকখানি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে সরকার। নির্বাচনের আগ দিয়ে ঐকমত্য কমিশন যে জটিলতা সৃষ্টি করে বিদায় নিলো, তার দায়ও সরকার এড়াতে পারবে না। এ কমিশনের প্রধান তো প্রধান উপদেষ্টা নিজেই।
সত্যি বলতে কি, সরকারকেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে যত দ্রুত সম্ভব এ জটিলতা নিরসন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা আলাপ করে দু’একটা ইস্যুতে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করতে হয়তো পারবে। তবে হাতে বেশি সময় নেই। নভেম্বরের মধ্যভাগের মধ্যেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট প্রশ্নের সুরাহা হয়ে যাওয়া উচিত। এসব প্রশ্নে বিভেদ চলতে থাকায় ‘প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি’ ইতিবাচক হচ্ছে না বলে হালে বক্তব্য দিয়েছে আইআরআই নামক যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা সংস্থা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ অন্যান্য বিষয়েও তাদের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। তারা সরকারকে এসব দিকে দ্রুত নজর দিয়ে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। জনপরিসরেও এসব ঘিরে কম আলোচনা হচ্ছে না। দেশ নির্বাচনী আবহে প্রবেশ করেছে, এটা যেমন ঠিক; তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনে চলতে থাকা অস্থিরতা এবং সরকারের এক ধরনের নির্লিপ্ততায় জনমনে উদ্বেগও কম নেই। জাতীয় নির্বাচনের মাস কয়েক আগেও অনেকের মনে প্রশ্ন, নির্বাচন শেষ পর্যন্ত হবে তো? অতীতে কোনো নির্বাচনের আগে এমন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছিল বলে মনে হয় না। ওয়ান ইলেভেনের পর গঠিত সরকার রাজনীতির উভয় পক্ষকেই চাপে ফেলে কিছু সংস্কার আনতে চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তাতে সফল না হলেও তারা নির্বাচনের দিকে দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে গিয়েছিলেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নিয়ে আসা হয়েছিল নিয়ন্ত্রণে। এবারকার পরিস্থিতি স্পষ্টতই ভিন্ন এবং সার্বিকভাবে এর উন্নতিও ঘটছে না। উল্টো সরকার নিজে থেকে জটিলতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করার কারণ রয়েছে। সরকারের ‘নিজস্ব এজেন্ডা’ রয়েছে, নাকি মাঠে সক্রিয় কোনো গোষ্ঠীর পক্ষে তারা এমন ভূমিকায় অবতীর্ণ; সেটা অবশ্য স্পষ্ট নয়। তবে বাজারে প্রশ্নটা শুরু থেকেই রয়েছে এবং হালে এটা নতুন করে পেয়েছে তীব্রতা।
জাতীয় নির্বাচনের আগে আলাদা করে গণভোট আয়োজনের আর্থিক, প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত সামর্থ্য সরকারের আছে বলে মনে হয় না। তবে নভেম্বরের মধ্যে গণভোট দাবি করা পক্ষটি সরকারকে এক প্রকার হুমকি দিতেও শুরু করেছে। মাঠের রাজনীতিতে এসব আমরা দেখছি অনেকদিন ধরে। প্রকৃত বাস্তবতা যদিও ভিন্ন। গণভোটের প্রয়োজনে জাতীয় নির্বাচন আরও পিছিয়ে দেয়া যেতে পারে বলে বক্তব্য দিতেও দেখা যাচ্ছে কোনো কোনো মহলকে। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি তাদের বিবেচনায় রয়েছে বলে মনে হয় না। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি কি তাদের বিবেচনায় রয়েছে? ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত সবাই অপেক্ষা করে আছে একটা স্থিতিশীল সরকার ও দেশ পাওয়ার আশায়। অনেক জটিলতা পেরিয়ে স্থির হওয়া সময়েই তাই নির্বাচন হতে হবে এবং এটা হতে হবে মানসম্পন্ন। এমনিতেই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এতে অংশ নিতে পারছে না। এ অবস্থায় নির্বাচনটি যদি আবার সুষ্ঠু না হয়, তাতে গণতন্ত্রে উত্তরণ মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই নাও হতে পারে। যেটুকু অগ্রগতিই আসুক, তা যেন টেকসই হয়। সেটা সংস্কার হোক আর নির্বাচন। ধরেবেঁধে সংস্কারে কাউকে রাজি করানোর জন্য আর কালক্ষেপণ না করে যার যা বক্তব্য, সেটা নির্বাচনের মাঠে জনগণের সামনে পেশ করাই ভালো। গণতন্ত্রে তারাই শেষ বিচারক আর দেশের মালিক তারাই। রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তী সরকারসহ সব পক্ষকেই এ বাস্তবতা বুঝে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ থেকে অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট