নিবন্ধটি লেখার দিন নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে। তার আগে থেকে চলছে রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে গণভোট নিয়ে প্রচার। অন্তর্বর্তী সরকার নিজে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। সরকার শুরু থেকে তিনটি এজেন্ডা নিয়ে কাজ শুরু করেছিল। এর একটি হলো সংস্কার। আর জাতীয় নির্বাচন তার সর্বশেষ এজেন্ডা। এটা সম্পন্ন করে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে এ সরকার বিদায় নেবে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, নির্ধারিত দিনেই নির্বাচন হবে এবং এটি হবে ‘ইতিহাসের সেরা নির্বাচন’। একই দিনে গণভোটও হতে যাচ্ছে। নির্বাচনে নয়; তবে গণভোটে সরকার একটি পক্ষ। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের পক্ষে। শুরু থেকেই প্রধান উপদেষ্টা বলছেন, রাষ্ট্র সংস্কার না হলে পুরনো ব্যবস্থাতেই আমরা ফিরে যাবো। দাবি রয়েছে, সংস্কার আলোচনায় অংশ নেয়া রাজনৈতিক দলগুলোও যেন ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা চালায়। তবে স্বভাবতই তারা জাতীয় নির্বাচনে বেশি করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কেননা, এর সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্পর্কটা সরাসরি।
আমরা আশা করে আছি, নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে; যা দেখে বিদেশেও গুরুতর কোনো অভিযোগ উঠবে না। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের নির্বাচনী কার্যক্রম দেখতে উদারভাবে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। ইইউ থেকে একটি বিরাট প্রতিনিধিদল আসবে। তাদের অগ্রবর্তী টিম এসে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ শুরু করে দিয়েছে। মনোনয়নপত্রের আপিল নিষ্পত্তি সংক্রান্ত কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণ করছেন তাদের সদস্যরা। নির্বাচন কমিশন (ইসি) পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে। এরপরও যাদের মনোনয়নপত্র বাতিল অবস্থায় রয়েছে, তারা আদালতে গিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আনতে পারবেন। এ ইস্যুতে বরাবরের মতো এবারো তর্ক-বিতর্ক কম হয়নি। শেষতক দুই হাজারের মতো প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন বলে জানা গেল। প্রতীক বরাদ্দও সম্পন্ন।
ইসিতে নিবন্ধিত সিংহভাগ রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিলেও আমরা জানি, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মাত্র কয়েকটি দলের মধ্যে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নির্বাচনের মূল বিষয়। প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থী না থাকলে নির্বাচন স্বভাবতই আকর্ষণ হারায়। আকর্ষণ হারায় কেবল ভোটারের কাছে নয়; নির্বাচনের সব অংশীজনের কাছে। এমনকি আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে আসা সরকার তাদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়, যারা তাদের ভোট দেয়নি। অতীতে আমরা সমঝোতার বা পাতানো নির্বাচন দেখেছি। এর বিষময় ফলও ফলতে দেখেছি। যারা এর আয়োজক ছিল, এক পর্যায়ে জনতার তাড়া খেয়ে তারা আজ দেশছাড়া। এর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন বরং গণতন্ত্রকে মজবুত করে। এক ধরনের টেকসই সরকারও আমরা পাই এর মধ্যদিয়ে। নির্বাচন পরবর্তী স্থিতিশীলতার জন্যও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে আসা সরকার জরুরি।
নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর শান্তিপ্রিয় মানুষের প্রত্যাশা, এটা ঘিরে কোথাও বড় ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না। গণ-অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলার অবনতির ধারা কিন্তু রোধ হয়নি। সেজন্য তেমন সক্রিয়ও দেখা যায়নি সরকারকে, যদিও অপারেশন ডেভিল হান্টের দ্বিতীয় পর্যায় চলছে। যত অভিযানই চলুক, জনমনে স্বস্তি না এলে সেটাকে সফল বলা যায় না। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরও এমন সব ঘটনা ঘটেছে, যা দেখে লোকে খোদ নির্বাচন নিয়ে নতুন করে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ায় এ শঙ্কা কাটবে নিশ্চয়ই। তবে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর পর পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে কিনা, সে আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনে একটি বড় দল আওয়ামী লীগ নেই, তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ বলে। এটাকে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাস্তবতা বলেও মানুষ মেনে নিয়েছে। তবে তারা নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েই বসে থাকবে কিনা, সে প্রশ্ন রয়েছে। আওয়ামী লীগ কি নির্বাচন প্রতিহত করতে চাইবে? এ নিবন্ধ লেখার সময় ‘খবর’ রয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেবেন। সেখানে বা অন্য কোথাও তিনি যে বক্তব্যই রাখুন, সেটা দেশে থাকা আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা কতোটা অনুসরণ করবেন? সরকার ও গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর চাপের মুখে তারা মোটেও সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। তবে আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত দেশের একাংশ তারা চাইলে কিছু অরাজকতা তৈরি করতে পারবে বলেই মনে হয়। সরকার ওইসব এলাকায় দীর্ঘদিনেও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে পারেনি কেন, এর কোনো সদুত্তর নেই।
মাঠে থাকা দলগুলোর একাংশের দিক থেকেও নির্বাচনের পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার শঙ্কায় আছেন অনেকে। যাদের কারণে দেরিতে নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে তাদের দিকেই উঠছে অভিযোগের আঙ্গুল। তফসিল ঘোষণার পরও কোনো কোনো পক্ষ নানান বিষয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে নির্বাচন হতে না দেয়ার কিংবা আরও পিছিয়ে দেয়ার আওয়াজ তুলছে, যা সন্দেহ জাগাতে পারে। নিষিদ্ধ নয় বা হয়নি, এমন একটি দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়েও তোলা হচ্ছে প্রশ্ন। আবার ইসি’র ওপর সব দলই এক ধরনের চাপ সৃষ্টির চেষ্টায় রয়েছে। ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ দাবি করে এ ধরনের চেষ্টা অবশ্য সব নির্বাচনেই কমবেশি দেখতে পাওয়া যায়। সামনের দিনগুলোয় এ ক্ষেত্রে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলেই আমরা আশা করবো। নির্বাচনে যাওয়া দলগুলো খোদ নির্বাচন নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি করে ফায়দা পাবে না, এটা তাদের বোঝা উচিত। জনগণ অনেক প্রতীক্ষার পর নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। তারা চায় একটা সংশয়মুক্ত ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, যাতে পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে। এতে করে একটি নির্বাচিত সরকার দেশে আসবে, যারা নিশ্চিত করবে নাগরিকদের নিজ নিজ কাজ স্বস্তির সঙ্গে করার মতো একটা আস্থার পরিবেশ। একই সঙ্গে মানুষ চাইছে, সরকার যেন তার কাজের জন্য জবাবদিহি করে।
এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয় বিষয়ে এ পর্যন্ত যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে, বিএনপিই সরকার গঠন করবে। বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহী আন্তর্জাতিক মহলেও এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে। বিএনপি নেতা তারেক রহমান সুদীর্ঘ সময় পর দেশে ফিরে আসায় দলটির মধ্যে চাঙ্গা ভাবও পরিলক্ষিত। এ-ও ঠিক, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই প্রথম জামায়াতে ইসলামী রয়েছে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থায়। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিএনপি’র পাশাপাশি তারাও নির্যাতিত হয়ে পেয়েছে ‘মজলুমের ভাবমূর্তি’। গণ-অভ্যুত্থানে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, সেটাও সবার জানা। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জামায়াত ও তার সহযোগী দলগুলোর প্রভাব অনেক বেড়েছে। তফসিল ঘোষণার আগেই তারা অনানুষ্ঠানিক প্রচার চালিয়েছে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। প্রার্থীও অনেক আগে চূড়ান্ত করে রেখেছে বলে খবর বেরিয়েছিল। একটি ‘ইসলামপন্থি জোট’ গড়ে তুলেছিল তারা আগেই। গণ-অভ্যুত্থান থেকে বেরিয়ে আসা তরুণদের দল এনসিপিও এতে ভিড়েছে। একটি মোটামুটি শক্তিশালী ধর্মভিত্তিক দল শেষদিকে এ জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও তারা নির্বাচনে একটি প্রভাবশালী পক্ষ হিসেবেই থাকবে বলে ধারণা। বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলোর সঙ্গে এদের কমবেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে সিংহভাগ আসনে।
এ নির্বাচনের বড় বৈশিষ্ট্য হলো, জাতীয় সংসদের কোনো আসনেই একতরফা ভোট হওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকলেও থাকছে ‘না’ ভোট দেয়ার সুযোগ। মাঝে বাতিল হয়ে যাওয়া এ সুযোগ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এমনকি বিদেশ থেকে পোস্টাল ব্যালটে ভোটদানের সুযোগও তৈরি করা হয়েছে এবার। তারা গণভোটেও অংশ নিতে পারছেন। সব মিলিয়ে নির্বাচনটি আকর্ষণীয় হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে মাঠে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে নির্বাচনের প্রধান অংশীজন ভোটাররা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বেন- এতেও সন্দেহ নেই। বিশেষ করে নারী ও বিভিন্ন ধরনের সংখ্যালঘু ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত হলে সেটা হবে দুর্ভাগ্যজনক।
পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দিয়ে ঘরে ফিরে নাগরিকদের নিরাপদে থাকার নিশ্চয়তা সরকারকেই সৃষ্টি করতে হবে। এটা ইসি’র কাজ নয়; বরং সরকার, আরও নির্দিষ্ট করে বললে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ মন্ত্রণালয়ই কিন্তু রয়েছে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন ইসি’র। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর মাঠে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে অনেক বেশি সমন্বিতভাবে ব্যবহার করতে হবে। ইসি’র চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। আর তার ভূমিকা হতে হবে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ।
সরকারের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা কিন্তু বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সরকার একেকবার একেক দিকে হেলে পড়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তাতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেড়েছে অবিশ্বাস। দেশ আদৌ নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে কিনা, সে বিষয়েও কখনো কখনো অবিশ্বাস বেড়েছে। ছড়িয়েছে গুজব। নির্বাচনের দিনক্ষণ স্থির হওয়ার পরও এটা থেকে রেহাই পাওয়া যায়নি। মাঠে থাকা সব রাজনৈতিক দল স্থির হওয়া সময়ে নির্বাচন চায় কিনা, সে আশঙ্কাও ছিল। নির্বাচনী প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার পর এখন শঙ্কা, মোক্ষম কোনো ইস্যুতে বড় গোলযোগ সৃষ্টি করে কোনো পক্ষ এটা বানচাল করতে চাইবে কিনা। কোনো পক্ষ তেমন ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপের দিকে গেলে সেটা প্রথমত দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে ইসি ও সরকারকে। গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য যারা উদগ্রীব, তাদেরকেও বিশেষ করে এমন শঙ্কার বিষয়ে পূর্ণ সজাগ থাকতে হবে।
গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য দেশের ব্যবসায়ী সমপ্রদায়ও অপেক্ষা করে আছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবেশ একান্ত প্রয়োজন। রাজস্ব পরিস্থিতিসহ নানা কারণে সরকারি খাতেও বিনিয়োগ সন্তোষজনক নয়। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থান স্থবির। বেশিদিন এ পরিস্থিতি বহাল থাকলে কোনো না কোনো স্পর্শকাতর ইস্যুতে ব্যাপক সামাজিক অসন্তোষ দেখা দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। ভালো হতো অল্প কিছু ‘জরুরি সংস্কার’ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্রুত নির্বাচনের দিকে চলে যেতে পারলে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে পরবর্তী পর্বে প্রবেশের ক্ষেত্রে বেশি দেরি করলে অনেক সময়ই হিতে বিপরীত হওয়ার শঙ্কা থাকে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট