প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংঘটিত সহিংসতা ও মব সন্ত্রাসে অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের পর বিবৃতি দিয়ে সরকারের দুঃখ প্রকাশ অথবা নিন্দা জানানোর রেওয়াজে কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার প্রথম দু’টি পঙ্ক্তির কথা মনে পড়ে গেল। পঙ্ক্তি দু’টি হলো, ‘ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কী ফল পাবে? মনস্তাপেও লাগবে না ওতে জোড়া...।’ গত দেড় বছরে পিটিয়ে হত্যা, অসংখ্য মাজার-দরগায় হামলা ও ভাঙচুর, ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর ভেঙে ফেলা, ভয় দেখিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার ঘটনায় সরকার ও তার প্রশাসন নির্লিপ্ত থেকেছে। এসব ঘটনায় জনমনের সৃষ্ট ক্ষোভ লক্ষ্য করে সরকার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিবৃতি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ এবং ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে। কিন্তু দোষীদের শাস্তি না দেয়ায় মব সন্ত্রাস, নৈরাজ্য বন্ধ করা তো দূরের বিষয়, বরং দিন দিন তা বেড়েছে। ফলে এসব ঘটনা ঘটেই চলেছে, আর সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে দুঃখ প্রকাশও চলছে। অর্থাৎ সরকারের মনস্তাপে কিছুতেই ফাটা ডিম আর জোড়া লাগছে না।
সরকারের ব্যর্থতার দিকে আঙ্গুল উঠেছে বারবার। অন্তর্বর্তীর ভেতরে কোনো কোনো অংশের এসব ঘটনার পেছনে উস্কানি বা ইন্ধন রয়েছে, সম্প্রতি এমন অভিযোগ বেশ জোরেশোরে উঠেছে। অভিযোগ হচ্ছে, সরকারের এই অংশটি বা ‘ডিপেস্টেট’ ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার জন্য নির্বাচন বিলম্বিত করতে চাচ্ছে। আর তাই এসব ঘটনায় ইন্ধন জোগাচ্ছে। সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রার্থী হতে চাওয়া শরীফ ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর পর গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ভয়াবহ ঘটনার পর সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ আনলেন প্রফেসর ইউনূস সরকারের সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের নিয়ে গঠিত দল এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে সরকারের ভেতরের একটি অংশের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ২২শে ডিসেম্বর ‘মব ভায়োলেন্সে আক্রান্ত গণমাধ্যম, আক্রান্ত বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবাদ সভায় নাহিদ মন্তব্য করেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা ও আগুন দেয়ার পুরো ঘটনাই পরিকল্পিত ছিল। তিনি বলেন, শরীফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর এবং মারা গেলে পরে কী কী ঘটনা ঘটানো হবে বাংলাদেশে, এটার একটা চক্রান্ত-পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি হয়েছে। এনসিপি সভাপতি বলেন, দুর্ভাগ্যবশত যে, জুলাইয়ের নাম বা শরীফ ওসমান হাদিকে ব্যবহার করে এটা ঘটানো হলো। সংবাদ মাধ্যমের ঘটনার তদন্ত ও বিচার দাবি করে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা বলেন, এই ঘটনা যারা সে রাতে ঘটিয়েছে, খুবই স্পষ্ট যে, কারা সেটার পক্ষে সম্মতি তৈরি করেছে, কারা সেই রাতে সেখানে গিয়েছে, লেখালেখি করেছে। তিনি বলেন, সবাই মিলে সরকারকে বাধ্য করতে হবে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করতে। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবীরের অভিযোগ আরও গুরুতর। এই হামলার খবর শুনে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি হিসেবে কর্তব্যবোধ থেকে তিনি ডেইলি স্টারে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং হামলাকারীদের দ্বারা হেনস্তার শিকার হন।
তিনি একটি টিভি চ্যানেলে টকশোতে সেদিন রাতের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘গত দেড় বছরে আমি এতগুলো মন্ত্রীকেও কোনোদিন ফোন করি নাই, কয়েক মিনিটে যতগুলো মন্ত্রীকে ফোন করেছি। তথ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, এটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যারা আছেন।’ নূরুল কবীরের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো, তিনি মনে করেন সরকারের কোনো না কোনো অংশ কিংবা গোটা সরকার এই ঘটনা ঘটতে দিয়েছে। নূরুল কবীরের বক্তব্য এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে এটা পরিষ্কার যে, হামলাকারীরা প্রথমে প্রথম আলোতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে। পরে ডেইলি স্টার ভবন আক্রমণ করে ব্যাপক লুটপাট চালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। ভয়াবহ আগুনে ভবনটির ভেতর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ভেতরে ২৫ থেকে ২৮ জন সংবাদকর্মী আটকে পড়েন। বিভিন্ন ফ্লোরে কর্তব্যরত এসব সংবাদকর্মী জীবন বাঁচাতে ছাদে আশ্রয় নেন। অনেকেই আগুনের তীব্র ধোঁয়ায় মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েন। বেশ কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। একজন সাংবাদিক ফেসবুকে এ বিষয়ে পোস্ট দিয়ে আকুতি জানান। দমকল বাহিনীকে বাধা দেয়া হয়েছে। ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর প্রকাশনা পরদিন অর্থাৎ শুক্রবার বন্ধ থাকে। একই রাতে হামলা চালানো হয় ছায়ানটে। হামলাকারীরা ভবনের দরজা-জানালা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভাঙচুর করে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। কম্পিউটার, ল্যাপটপ ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। হামলাকারীদের আক্রমণে ছায়ানটও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তৃতীয় বারের মতো হামলা চালিয়ে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে ভাঙচুর করা হয়। পরদিন সন্ধ্যায় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়েও আগুন দেয়া হয়। গণমাধ্যম দু’টিতে এবং ছায়ানটে তাণ্ডব বন্ধে সরকার যথাসময়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। ওসমান হাদির মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবে আইনশৃঙ্খলাজনিত এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে, সরকারের তা জানা থাকার কথা। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস হাদির মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর ওই রাতেই জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি ভাষণে অপপ্রচার ও গুজবে কান না দেয়া এবং যেকোনো হটকারী সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
সরকার প্রধান হিসেবে প্রফেসর ইউনূসের কাছে গোয়েন্দা তথ্য থাকার কথা। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কী সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা ব্যর্থ? অথবা সরকার জেনেও কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়নি বরং ঘটনা ঘটতে দিয়েছে। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে যে, সরকারের একটা অংশ বা গোটা সরকার ঘটনা ঘটতে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, সরকারের ভেতরে কোনো অংশ এবং বিশেষ গোষ্ঠী রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। ১৮ই ডিসেম্বর রাতের ঘটনার পর মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, সরকার প্রধান হিসেবে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস যেন অসহায়। সরকার প্রধান যদি অসহায় বোধ করেন তাহলে দেশের পরিস্থিতি যা হওয়ার কথা তাই হচ্ছে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান কিছুদিন আগে এই সরকারকে ‘অনুপস্থিত সরকার’ হিসেবে মন্তব্য করেছিলেন। হোসেন জিল্লুরের মন্তব্যের অর্থ দাঁড়ায়, সামগ্রিকভাবে দেশ পরিচালনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতা বা উপস্থিতি লক্ষণযোগ্য নয়।
তথ্য উপদেষ্টা ঘটনার তিনদিন পর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পরিদর্শনে যান। ১৮ই ডিসেম্বর গণমাধ্যমে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের একদিন পর সরকার যথারীতি বিবৃতি দিয়ে এসব ঘটনার ‘দ্ব্যর্থহীনভাবে’ নিন্দা জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে ডেইলি স্টার, প্রথম আলো ও নিউএজের সাংবাদিকদের পাশে রয়েছে সরকার। সাংবাদিকরা যে সন্ত্রাস ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন, তার জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে সরকার। অর্থাৎ কবি সুধীন্দ্রনাথের কবিতার সেই পঙ্ক্তির মতো, ‘মনস্তাপে ফাটা ডিমে তা দিয়ে জোড়া লাগানোর চেষ্টা।’ অবশ্য এ বিষয়ে দেশ-বিদেশ থেকে জোরালো প্রতিবাদ উঠায় এ পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা সংবাদপত্র পরিষদ ও নিউজ পেপার ওনার্স এসোসিয়েশনের প্রতিবাদ সভায় বক্তাদের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, মত প্রকাশ তো দূরে থাক, এখন বেঁচে থাকার প্রশ্ন। মত প্রকাশের দাবি ছাপিয়ে এটাই এখন বড় হয়েছে। তিনি ভবনে আগুন লাগার পর ভেতরে আটকে পড়া সংবাদ কর্মীদের প্রাণ সংশয়ে পড়ার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, সামাজিক মাধ্যমে দেখা গেছে যে, হামলাকারীরা বলছে, ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর যারা সাংবাদিক, ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের হত্যা করতে হবে। প্রতিবাদ সভায় সংহতি জানাতে এসে বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি জানি না এই মুহূর্তে কোন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আছি। আমার বয়স ৭৮ বছর। সারা জীবন সংগ্রাম করেছি একটি স্বাধীন, সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দেখবো বলে। আজ যে বাংলাদেশ দেখছি, এ বাংলাদেশের স্বপ্ন আমি কোনোদিন দেখিনি। সরকারের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়েছেন টিআইবি’র (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি মনে করেন রাষ্ট্রকাঠামোর অভ্যন্তরে মবতন্ত্র শুরু হয়েছে। প্রতিবাদ সভায় ডক্টর ইফতেখার বলেন, রাষ্ট্র কাঠামোর দায়িত্বে যারা অধিষ্ঠিত, তারা মব ভায়োলেন্সের পেছনের শক্তিকে তাদের ক্ষমতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতায় এমন পরিস্থিতি, এমনটাই মনে করেন জাতিসংঘের স্পেশাল র্যাপোট্রিয়ার আইরিন খান। এক বিবৃতি দিয়ে তিনি বলেন, এই হামলাগুলো এমনি এমনি হয়নি। দায় মুক্তির সংস্কৃতি মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা এবং গণমাধ্যম ও শিল্পীদের স্বাধীনতা রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিকভাবে কিছুদিন সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পিটিয়ে হত্যা, মাজার, দরগা ভাঙচুর করে ধ্বংস করা, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আক্রমণ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পণ্ড করে দেয়া কোনো ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার এ পর্যন্ত এসব ঘটনার ক’টি তদন্ত করে দোষীদের শনাক্তের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করেছে? সরকার এ ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান না নেয়ায় মব সন্ত্রাসীরা আশকারা পেয়েছে। ফাটা ডিমে আর তা না দিয়ে সরকারের উচিত হবে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম কাতারের অন্যতম যোদ্ধা শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন সময় মব সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা।
লেখক: কলামিস্ট