এই সময়

আওয়ামী লীগে হাসিনা যুগের অবসান!

সোহরাব হাসান | মতামত
জানুয়ারী ২৪, ২০২৬
আওয়ামী লীগে হাসিনা যুগের অবসান!

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার বিতাড়িত ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের পরই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছিল শেখ হাসিনা যুগের অবসান হলো কিনা। অনেকে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগেরও আওয়াজ তুলেছিলেন। রিফাইন্ড মানে পরিশীলিত আওয়ামী লীগ। বিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ।
 

সে সময়ে দলের কট্টরপন্থিরা বলতে থাকেন, শেখ হাসিনার মানে আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগ মানে শেখ হাসিনা। তাকে ছাড়া আওয়ামী লীগের কথা চিন্তাও করা যায় না। তারা প্রকৃতির নিয়মটাও মানতে চাইতেন না।
ভারতে নির্বাসিত শেখ হাসিনাও এমন সব কথা বলতেন যেন এখনো বাংলাদেশ তার কথা অনুযায়ী চলবে।  তিনি যেকোনো সময়ে সীমান্ত দিয়ে চট করে চলে আসবেন, এই  বার্তাও শোনা গিয়েছিল। দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়া নেতারা নিয়মিত উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলে তৃপ্তি অনুভব করলেও দেশের ভেতরে থাকা নেতাকর্মীরা বিপদে পড়েন। অনেকে হামলা মামলার শিকার হন। অনেকে মাসের পর মাস কারাবন্দি অবস্থায় কাটান। অতি সমপ্রতি বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা একদল নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন প্রচার চালাতে থাকেন যে, ২৩শে জানুয়ারি শেখ হাসিনা নতুন কোনো ঘোষণা নিয়ে আসছেন। অবশ্য দিল্লির সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন, তাদের কাছে সে রকম কোনো বার্তা নেই। তবে সেখানকার ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাবে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নির্বাসিত নেতা জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে পারেন।
 

এই পটভূমিতেই আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রী নিবাসন জৈনের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শেখ হাসিনা আর দলের নেতৃত্ব দেবেন না। বয়সের কারণেই সেটা সম্ভব নয়। সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছে ওয়াশিংটনে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বাড়িতে। আল জাজিরার এই সাক্ষাৎকারটি বাংলা ডাবিংসহ আওয়ামী লীগের ভেরিফাইড পেইজেও দেয়া হয়েছে।
 

শ্রীনিবাসন জৈনের প্রশ্ন ছিল: বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ আছে কি? জবাবে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, অবশ্যই আছে। আওয়ামী লীগ কোথাও যাচ্ছে না। এটি দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বৃহত্তম দল। আমাদের ভোট শেয়ার ৪০-৫০ শতাংশ। আপনি কি মনে করেন, এই ৪০-৫০ শতাংশ মানুষ হঠাৎ সমর্থন বন্ধ করে দেবে? ১৭ কোটি মানুষের দেশে ৬-৭ কোটি ভোটার আওয়ামী লীগের সমর্থক। তারা হঠাৎ দল ছেড়ে দেবে?
এরপর শ্রীনিবাসন জৈন জানতে চান- আপনার মা রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। যদি তিনি দেশে ফিরতেও পারেন, তিনি আর সক্রিয় রাজনীতিতে থাকবেন না?
 

সজীব ওয়াজেদ: না। তিনি বয়স্ক। এটিই তার শেষ মেয়াদ হওয়ার কথা ছিল। তিনি অবসর নিতে চেয়েছিলেন।
পরের প্রশ্নোত্তরটি ছিল এ রকম: তা হলে এটা কি হাসিনা যুগের সমাপ্তি?
 

সজীব ওয়াজেদ: সম্ভবত, হ্যাঁ।
 

শ্রীনিবাসন জৈন: অর্থাৎ আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরলেও তার নেতৃত্ব ছাড়াই?
 

সজীব ওয়াজেদ: হ্যাঁ। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। ৭০ বছরের পুরনো। তার সঙ্গে বা তাকে ছাড়াই দল থাকবে। কেউ চিরকাল বাঁচে না।
এর মধ্যদিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় শেখ হাসিনার রাজনীতি থেকে বিদায় নেয়ার বার্তাটিই দিলেন।
 

সজীব ওয়াজেদ জয় শেখ হাসিনার পুত্র। তিনি মায়ের সম্মতি ছাড়া এসব কথা বলেছেন, তা মনে হয় না। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আছেন ১৯৮১ সাল থেকে। পঁয়তাল্লিশ বছরেরও বেশি। সম্ভবত বাংলাদেশ দ্বিতীয় কোনো নেতা এত দীর্ঘ সময় কোনো দলের নেতৃত্বে ছিলেন না।
 

খালেদা জিয়া বিএনপি’র দায়িত্ব নেন ১৯৮৪ সালে। ৩০শে ডিসেম্বর তার মৃত্যুর মধ্যদিয়ে রাজনীতির একটি যুগের অবসান হয়েছে। যদিও বিএনপি’র বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান অনেক আগে থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। প্রথমে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও পরে জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান হন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন।
 

কিন্তু শেখ হাসিনা আগে থেকে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি তৈরি করেননি। সজীব ওয়াজেদ জয় পীরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সদস্য হলেও পরে নেতৃত্বে আসেননি। নির্বাচনও করেননি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা হয়েছিলেন। বাংলাদেশে তাহলে হয়তো বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুই তরুণ নেতা একসঙ্গে নির্বাচন করতেন। এখন তারেক রহমান নির্বাচন করছেন। আর সজীব ওয়াজেদ জয় আসামির কাঠগড়ায়।  আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে একটি মামলায় তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই দণ্ডও বাতিল হয়ে যায়।
 

আল জাজিরার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয়কে অনেক বেশি সাবলীল ও গোছানো মনে হয়েছে। প্রতিটি প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন ধীরস্থিরভাবে। তিনি চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান মোকাবিলায় সরকারের কিছু ভুল ও ব্যর্থতার কথা, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দুর্নীতি, বিরোধী দলের ওপর দমনপীড়নের  বিষয়ও তুলে ধরেন। তিনি আওয়ামী লীগের কিছু ভুল স্বীকার করেছেন। তবে সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার দায় অস্বীকার করেছেন। জয় বলেছেন, ‘মা গুলি করার হুকুম দিয়ে থাকলে আওয়ামী লীগ এখনো ক্ষমতায় থাকতো।’
 

আরও অনেক আওয়ামী লীগারের মতো জয়ও সরকারের ব্যর্থতা দেখেননি। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগকে ছাড়া আগামী নির্বাচন কারচুপির নির্বাচন হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলের তিনটি প্রহসনমূলক নির্বাচনের পক্ষে সাফাই গাইতেও কসুর করেননি দলীয় নেতৃত্বের সম্ভাব্য উত্তরসূরি। তবে এক প্রশ্নের জবাবে জয় বলেছেন, ‘দেখুন, ১৭ বছরে কি আমাদের সরকার ভুল করেছে? সরকারে থাকা মানুষজন কি বাড়াবাড়ি করেছে? হ্যাঁ। আমিও অনেক বিষয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম না। আমার মনে হয়েছে, কিছু লোককে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত ছিল, যা হয় নি।’
 

আমাদের রাজনীতিকেরা ক্ষমতায় থাকতে নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন না। ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পরই তারা সেই ভুল বুঝতে পারেন। রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। এর অর্থ আওয়ামী লীগের রাজনীতি শেষ হয়ে যায়নি। সময়ের ব্যবধানে দেশের অন্যতম প্রধান দল আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতিতে ফিরে আসবে। কিন্তু সেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে শেখ হাসিনা থাকছেন না, সে কথাটি আল জাজিরার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় স্পষ্ট করলেন। 

মতামত'র অন্যান্য খবর