বিতর্ক

দ্বৈত নাগরিকত্ব, নির্বাচন ও সাংবিধানিক অবস্থান

শহীদুল্লাহ ফরায়জী | মতামত
জানুয়ারী ২৪, ২০২৬
দ্বৈত নাগরিকত্ব, নির্বাচন ও সাংবিধানিক অবস্থান

বিশ্বায়নের অপ্রতিরোধ্য এই যুগে ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব’ বিষয়টি কেবল একটি আইনি তকমা নয়, বরং সমকালীন ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির এক অপরিহার্য বাস্তবতা। উচ্চশিক্ষা, পেশাগত উৎকর্ষ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং অভিবাসন প্রক্রিয়ার প্রসারে মানুষ আজ নিজ ভূখণ্ডের সীমানা ছাড়িয়ে একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে আইনি ও আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দ্বৈত নাগরিকত্ব-সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য হলেও, রাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক অঙ্গনে গভীর ও অমীমাংসিত এক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
একদিকে রাষ্ট্রের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রশ্ন, অন্যদিকে বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিশাল মেধা ও সম্পদের সংযোগ-এই দুইয়ের টানাপড়েনেই বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্বের সাংবিধানিক অবস্থানটি আজ পর্যালোচনার দাবি রাখে।
 

দ্বৈত নাগরিকত্বের স্বরূপ: দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদারিত্বের প্রশ্নে। জাতীয় সংসদের সদস্যরা রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরাসরি লিপ্ত থাকেন। এমতাবস্থায়, তাদের ক্ষেত্রে ‘দ্বৈত আনুগত্যের’ (Dual Loyalty) ঝুঁকি, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি সম্ভাব্য আইনি বা রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রকট হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে দু’টি রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকা একজন ব্যক্তির পক্ষে জাতীয় স্বার্থের দ্বন্দ্বে (Conflict of Interest) পড়ার সম্ভাবনা থাকে, যা দেশের শাসনতান্ত্রিক সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। মূলত এই বাস্তবতাই দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধানের কঠোর অবস্থানের মূলভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
 

সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বিধি: সংসদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্ধারিত হয়েছে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে। ৬৬(২) বলা হয়েছে- “কোনো ব্যক্তি সংসদে সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি-তিনি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন।” এ ছাড়াও ৬৬ (২ক)-এতে বলা হয়েছে-  “জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হইয়া কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিলে এবং পরবর্তীতে উক্ত ব্যক্তির (ক)- দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করিলে; কিংবা খ) অন্য ক্ষেত্রে, পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করিলে-এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন না।”
 

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্নটি বেশ আলোচিত হচ্ছে। এই প্রশ্নে সাংবিধানিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সমপ্রতি জানিয়েছেন- ‘বিদেশি নাগরিকত্বধারী কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে তাকে অবশ্যই আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হবে। এই ত্যাগ হতে হবে স্বেচ্ছায় ও সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন, আবেদন গ্রহণের লিখিত স্বীকৃতি, প্রয়োজনীয় ফি-পরিশোধসহ সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দিতে হবে। এই নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয়।’ তিনি আরও জানান- ‘সংবিধানের ৬৬ (২ক) অনুচ্ছেদ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের নাগরিকত্ব যাচাই করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে এবং সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেই মনোনয়নপত্র যাচাই করা হয়।’
 

বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি প্রশ্ন হচ্ছে-সংবিধানের এই কঠোরতা কি কেবল সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে? রাষ্ট্রের  উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা যখন প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক চুক্তি কিংবা জ্বালানি-নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন তার যদি অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের দায়বদ্ধতা থাকে, তবে সেখানে ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest) ঘটা অনিবার্য। এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের একটি ঝুঁকি ও আইনি শূন্যতা।
 

বিচার বিভাগ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা: একইভাবে, উচ্চ আদালতের বিচারকগণ এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়োজিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও দ্বৈত আনুগত্যের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। অতীতে বিদেশি নাগরিক হয়েও উচ্চতর আদালতে বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। বিচার বিভাগ যখন রাষ্ট্রের কোনো অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক বিরোধের নিষ্পত্তি করে, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির একক ও অবিভাজ্য আনুগত্য থাকা অপরিহার্য। তাই জাতীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর স্বার্থে রাষ্ট্রের সকল শীর্ষ পর্যায়ের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন ও সুস্পষ্ট সাংবিধানিক রূপরেখা প্রণয়ন করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
 

পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব’ এবং ‘রাজনৈতিক নেতৃত্ব’-এই দুইয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা থাকা অপরিহার্য। প্রবাসীদের বিনিয়োগ, ব্যবসা ও বৈদেশিক সংযোগের সুযোগ অবারিত রাখা রাষ্ট্রের স্বার্থেই প্রয়োজন, তবে যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি নিয়োজিত- তাদেরকে অবশ্যই শুধু বাংলাদেশের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য নিশ্চিত করতে হবে। কোনো দ্বৈত নাগরিকত্ব বা দ্বৈত আনুগত্য গ্রহণযোগ্য নয়। বিগত সরকারের আমলে দেখা গেছে, অন্য দেশের (দ্বৈত নাগরিক) নাগরিকও উচ্চ আদালতে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একটি স্বচ্ছ আইনি-কাঠামো এবং প্রয়োজনে সংবিধানের যুগোপযোগী সংস্কারই পারে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে। 
 

লেখক: গীতিকবি ও সংবিধান বিশ্লেষক
faraizees@gmail.com
 

মতামত'র অন্যান্য খবর