তী র্য ক ম ন্ত ব্য

সিভিলিয়ান সুপ্রিমেসি বনাম ডি ফ্যাক্টো ক্ষমতা

শহীদুল্লাহ ফরায়জী | মতামত
নভেম্বর ৮, ২০২৫
সিভিলিয়ান সুপ্রিমেসি বনাম ডি ফ্যাক্টো ক্ষমতা

রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও ক্ষমতার উৎস
রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও গণতান্ত্রিক চরিত্র নির্ধারণের মূল প্রশ্নটি একক: ক্ষমতার প্রকৃত উৎস জনগণ, নাকি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী যন্ত্র নিজেই?
এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করে কোনো রাষ্ট্র জনগণের নাগরিক কর্তৃত্বের (Civilian Supremacy) ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে বৈধ কিনা। অন্যথায়, যদি অদৃশ্য ডি ফ্যাক্টো ক্ষমতা-অর্থাৎ, অনির্বাচিত, গোপন কর্তৃত্ব-রাষ্ট্রের নীতি ও দিকনির্দেশ নির্ধারণ করে, তবে তা রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেয়।
 

দর্শন ও বৈধতার ভিত্তি
জন লক ও জঁ-জাক রুশোর মতো দার্শনিকদের মতে, রাষ্ট্রের এই বৈধতা কোনো প্রশাসনিক বা সামরিক প্রভাব থেকে নয়, বরং জনগণের সম্মতি থেকে উদ্ভূত। রুশো গভীরভাবে বলেছেন- সার্বভৌমত্ব অবিভাজ্য, জনগণের ইচ্ছাই রাষ্ট্রের প্রাণ।
এই দার্শনিক সত্য প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র যত শক্তিশালীই হোক, তার অস্তিত্বের নৈতিক ভিত্তি জনগণের অনুমোদনের ওপরই নির্ভরশীল।
হান্না আরেন্ট যেমন সতর্ক করেছিলেন, ‘Power and violence are opposites’ (ক্ষমতা ও জবরদস্তি বা সহিংসতা বিপরীত ধারণা)।” অর্থাৎ, যেখানে জবরদস্তি রাজত্ব করে, সেখানে জনগণের সম্মতি থেকে উদ্ভূত প্রকৃত বৈধ ক্ষমতা অনুপস্থিত থাকে। ডি ফ্যাক্টো ক্ষমতা সেই জবরদস্তির পথে হাঁটে। এটি সংবিধানবহির্ভূত বা অনির্বাচিত শক্তির হাতে রাষ্ট্রের বাস্তব সিদ্ধান্ত তুলে দেয়। এর ফলে রাষ্ট্র ‘আইনি গণতন্ত্র’ হিসেবে টিকে থাকলেও ‘নৈতিক গণতন্ত্র’ হিসেবে ভেঙে পড়ে। কারণ, গণতন্ত্রের প্রাণ কেবল নির্বাচন নয়-রাষ্ট্রযন্ত্রের জনগণের প্রতি নৈতিক জবাবদিহি।
 

সিভিলিয়ান সুপ্রিমেসির মৌল দর্শন
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সামরিক, প্রশাসনিক, বিচারিক ও নির্বাহী-সব অঙ্গেরই চূড়ান্ত আনুগত্য থাকা উচিত সংবিধান ও জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতি, যা সংসদের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এই ভারসাম্যই সিভিলিয়ান সুপ্রিমেসির মৌল দর্শন।
যখন রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গ নিজেকে ‘রাষ্ট্রের প্রকৃত রক্ষক’ মনে করে, তখন তা জনগণের ওপর এক প্রকার নৈতিক অভিভাবকত্ব আরোপ করে, যা গণতন্ত্রবিরোধী। গণতন্ত্রে জনগণই রক্ষক, রাষ্ট্র নয়। এমন মানসিকতা আনুগত্যের কেন্দ্র জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা থেকে সরিয়ে অদৃশ্য ক্ষমতার বলয়ে নিয়ে যায়; রাষ্ট্র তখন নিজেকে সেবকের বদলে তত্ত্বাবধায়ক মনে করে-এটাই গণতন্ত্রের নৈতিক বিচ্যুতি।
 

ডি ফ্যাক্টো ক্ষমতার নীরব রূপান্তর
ডি ফ্যাক্টো (De Facto) ক্ষমতা কখনোই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে না, কিন্তু তার উপস্থিতি সর্বব্যাপী। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এটি এক নীরব রূপান্তর ঘটায়-বৈধতা জনগণের উৎস থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতার অদৃশ্য বলয়ে আশ্রয় নেয়। তখন সিদ্ধান্তগুলো আর জনমতের প্রতিফলন থাকে না, বরং হয়ে দাঁড়ায় ‘অপ্রকাশ্য অনুমোদনের’ প্রতিচ্ছবি।
এই অবস্থায় রাষ্ট্র আইনি কাঠামোয় টিকে থাকে ঠিকই, কিন্তু নৈতিক ভিত্তি হারায়। জনগণের মালিকানার অনুভূতি নিঃশেষিত হয়, এবং রাষ্ট্র রূপান্তরিত হয় এক বিমূর্ত যন্ত্রে-যার শক্তি আছে, কিন্তু কোনো নৈতিক অস্তিত্ব নেই। ফলে জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিশ্বাসের সম্পর্ক ভেঙে যায়।
 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে সামরিক ও বেসামরিক ক্ষমতার মধ্যে যে তীব্র টানাপড়েন বিদ্যমান, তা জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামো থেকে ক্ষমতাকে প্রায়শই প্রাতিষ্ঠানিক বলয়ে সরিয়ে নিয়ে গেছে। এই দ্বন্দ্বের প্রথম সফল প্রকাশ ঘটে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যদিয়ে, পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়। দুই দফা সামরিক শাসন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ও বৈধতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে। এই ধারাবাহিকতা রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতাকে ক্রমশ দুর্বল করেছে এবং আজও সেই মৌলিক প্রশ্নটি জিইয়ে রেখেছে।
 

একটি নৈতিক রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য অনিবার্য পদক্ষেপ
১. সংবিধানের সর্বোচ্চতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা: রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গকে সাংবিধানিক জবাবদিহির আওতায় আনা।
২. স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত কাঠামো: অদৃশ্য প্রভাব বা পটভূমির অনুমোদন যেন রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ না করে, তা নিশ্চিত করা।
৩. নৈতিক প্রশাসন: ক্ষমতার প্রতিটি ধাপে সেবা, দায়িত্ব ও জনগণের বিশ্বাসের নীতি পুনরুদ্ধার করা।
৪. নাগরিক সমাজের জাগরণ: জনগণকে সচেতন হতে হবে যে রাষ্ট্র তাদের নৈতিক মালিকানার সম্পদ; তারা নীরব থাকলে এই মালিকানা অন্য কেউ দখল করবে।
 

রাষ্ট্রের নৈতিক প্রতিশ্রুতি
রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি অস্ত্র বা প্রশাসনে নয়-তা নিহিত থাকে জনগণের নীরব বিশ্বাসে। সিভিলিয়ান সুপ্রিমেসি সেই বিশ্বাসের নাম, আর ডি ফ্যাক্টো ক্ষমতা তার বিপরীত।
আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্র সেই সূক্ষ্ম সীমারেখায় দাঁড়িয়ে-যেখানে ইতিহাস আবার আমাদের সামনে এক নৈতিক প্রশ্ন রেখেছে: আমরা কি রাষ্ট্রকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে পারবো, নাকি অদৃশ্য 

 

শক্তির কাছে বন্দি হয়ে থাকবো?
রাষ্ট্র কোনো যন্ত্র নয়; এটি এক নৈতিক প্রতিশ্রুতি-যা জনগণ ও শাসকের মধ্যে বিশ্বাসের সেতু তৈরি করে। সেই সেতু ভেঙে গেলে রাষ্ট্র আর জনগণের থাকে না, বরং শক্তির মালিকদের হয়ে যায়।
এই অনিবার্য সত্যটি মনে রাখা প্রয়োজন-সিভিলিয়ান সুপ্রিমেসি হারালে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ও বৈধতা হারিয়ে যায়।
যে দেশে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রাম হয়েছিল এবং গণতন্ত্রের জন্য এখনো জনগণ আত্মদান করে, সে রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠাই হবে মুক্তিযুদ্ধ ও গণ-অভ্যুত্থানে  অভিপ্রায়ের প্রকৃত পরিপূর্ণতা। 


লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
faraizees@gmail.com

মতামত'র অন্যান্য খবর