সা ম্প্র তি ক

বাঁশি যদি বাজে

মোজাম্মেল হোসেন | মতামত
নভেম্বর ৮, ২০২৫
বাঁশি যদি বাজে

ভোরে উঠে জনতার চোখ ম্যাগাজিনের জন্য এই লেখাটি তৈরি করবো বলে মনস্থির করেছি, অভ্যাসবসত মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রল করছি আমার জন্য কোনো নতুন খবর, কোনো বার্তা আছে কিনা। প্রথমেই চোখে পড়লো বর্তমান সময়ে রবীন্দ্রসংগীতের প্রধানতম গায়িকা অদিতি মহসিনের পোস্ট। আমার লেখার বিষয়বস্তুর সঙ্গে তো এর সম্পর্ক আছে। ক’দিন ধরে মন অত্যন্ত বিষণ্ন আমাদের সরকারের একটি সিদ্ধান্ত প্রকাশ পাওয়ার পরে। কোনো গোপন খবর নয়। সরকার ঘোষণা দিয়েই জানিয়েছেন। প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শরীর চর্চা ও সংগীতের শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার অতি সমপ্রতি ঘোষিত একটি সিদ্ধান্ত বাতিল। ঐ নিয়োগ দেয়া হবে না। বর্তমান সরকার নিয়মমাফিক জনগণের নির্বাচিত পাঁচ বছর মেয়াদি নিয়মিত স্বাভাবিক সরকার নয়। ছাত্রদের প্রবল রক্তক্ষয়ী এক আন্দোলনে অকস্মাৎ সরকারের পতন ঘটে যাওয়ায় রাজনৈতিক দলবিহীন ব্যক্তিদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী বা সাময়িক সরকার। দেশ নির্বাচন অনুষ্ঠান ও নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষা করছে। তবে সচরাচর রাজনৈতিক দল পরিচালিত সরকারের মন্ত্রীদের জায়গায় অধিষ্ঠিত এই সরকারের উপদেষ্টারা অধিক শিক্ষিত। প্রত্যেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত, কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং কয়েকজন বেসরকারিভাবে নাগরিক অধিকার, সমাজসেবা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে আন্দোলনে নেতৃত্বকারী এবং বর্তমান সরকারের সাময়িক দায়িত্ব পালন শেষে আবার তারা সেই কাজে ফিরে যাবেন। এমন একটি সরকারের দ্বারা শিশুদের শারীরিক-মানসিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য দু’টি ক্ষেত্রে সুযোগ বাড়ানোর বদলে সুযোগ (বিদ্যালয়ে) বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত? আমরা হকচকিয়ে গেলাম। কীভাবে সম্ভব? আমি নিজে ফেসবুকে একটি ছোট্ট পোস্টে আহত চিত্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলাম যে, প্রফেসর সি আর আবরারের মতো পরিশীলিত ব্যক্তি অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আধুনিক মানুষ আমাদের শিক্ষা উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল লরিয়েট বিশ্বমানব, তাদের সরকার এমন একটি প্রতিক্রিয়াশীল সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন?


অদিতি মহসিনের পোস্টটি পড়ে আমার মন প্রশান্ত হয়ে গেল। মনের গহিনে বাঁশি বেজে উঠলো। টিভির আবার চালু করা জনপ্রিয় ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের লোগোর পটভূমিতে নিজের ছবি দিয়ে পোস্ট করা বক্তব্যটি সম্পূর্ণ এখানে উদ্ধৃত করি: “বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ৩২ বছরের। যখনই যাই, এক অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে। নতুন করে ‘নতুন কুঁড়ি’র চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় যেয়ে আশার সঞ্চার হলো। ১০-১২ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েরা রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, দেশাত্মবোধকের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। এত ভালো গাইছে।  শত শত প্রতিযোগী লড়ছে। আমরা তাহলে কেন বলি যে, এই প্রজন্ম এসব গান শোনে না!”
আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত ঘরে ঘরে ছেলে-মেয়েদের গান শেখানোর ইচ্ছা পোষণ করে। সবাই পারে না, বরং কমই পারে। যতজন শুরু করে, বড় হতে হতে তার খুব কমই টিকে থাকে। তবু বাড়িতে গান বাজে না, কেউ শোনে না, কেউ গুনগুন করে গায় না- এমন কোনো বাঙালি বাড়ি আছে বলে আমার জানা নেই। 


ঢাকায় বুলবুল ললিতকলা একাডেমি ও ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠিত সংগীত অর্থাৎ নৃত্য-গীত-বাদ্যের স্কুলে প্রতি বছর ভর্তিচ্ছু ছেলে-মেয়ে অনেক আসে, সবাই ভর্তির সুযোগ পায় না। ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে ছোট-মাঝারি স্কুল ও গ্রুপ আছে তবে পৃথকভাবে গানের মাস্টারের কাছে শেখার চল বেশি। ছায়ানটের পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ সংগীত শিক্ষাকে আন্দোলন হিসেবে নিয়ে জেলায় জেলায়  যেয়ে কর্মশালা চালিয়ে উৎসাহিত করেছে। তবে এটাও ঠিক যে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গান শেখার চর্চা কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসছে। তুলনামূলক হিন্দু পরিবারে চর্চাটা বেশি। 
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাটা বলি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে কয়েক মাস মুজিবনগর তথা কলকাতায় ছিলাম। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ নয়, আমি ছিলাম সংবাদকর্মী। লিখে, পত্রিকা ছাপিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প, শরণার্থী শিবির ও মুক্তাঞ্চলে পাঠানোর কাজ। আমার বড় ভাইয়ের পরিবার দিনাজপুর থেকে মালদহে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন জেনে একবার মালদহে গেলাম। সেখানে ভোরবেলা আশপাশের বিভিন্ন বাড়ি থেকে হারমোনিয়ামে গলা সাধার শব্দ ভেসে আসতো। কলকাতায় পার্ক সার্কাসে থাকতেও এটা শুনেছি। আমি বাল্যকালে বগুড়া ও দিনাজপুরে থাকতে আমাদের পাড়ায় একাধিক বাড়িতে গানের মাস্টার আসতে দেখেছি। দিনাজপুরে মাহতাব মাস্টার ও প্রখ্যাত তবলচি ক্ষেত্রমোহন ভট্টাচার্য্যের স্মৃতি আমার মনে অক্ষয় হয়ে আছে। এখন যে এই সংস্কৃতিটি কমে গেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ষাটের দশকে হারমোনিয়াম টিউনিং করিয়েছিলাম বিজয় নগরে স্কাউট মার্কেটে প্রখ্যাত যতীন অ্যান্ড কোম্পানির একটি আউটলেটে। কিছুদিন আগে খুঁজতে গিয়ে দেখি সেটি নেই। অনেক দিন আগে উঠে গেছে। যতীনের একমাত্র দোকান এখন ঢাকায় শাঁখারি বাজারে আদি স্থানে। মৌচাকের কাছে হারমোনিয়াম বিক্রির তিনটি দোকান ছিল।  ব্রাহ্মণবাড়িয়া মিউজিক হল বা অনুরূপ নামের একটি দোকান খুঁজে পেলাম না। উঠে গেছে। মিউজিক প্যালেস নামে একটি দোকান পেয়ে সেখানে কাজ করালাম। মালিকের কাছে শুনলাম, এখন বাজার পড়ে গেছে। তিনি বললেন, এলিফ্যান্ট রোড ও নিউমার্কেটের আশপাশে কিছু ঝকঝকে দোকানে এখন পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র বেশি বিক্রি হয়। গিটার, ড্রাম, কি-বোর্ড, ইউকুলেলে ইত্যাদি। এই পরিবর্তন অজানা নয়। পরিবর্তনকে মানতেই হবে। তবে ব্যয়বহুল বাদ্য ও শব্দযন্ত্র কিনে তরুণদের ব্যান্ড গঠন ও ব্যক্তি পর্যায়ে সংগীতচর্চাও এক কথা নয়। 


বাংলা অঞ্চল তো আবহমান কাল গানের দেশ। কবিয়ালের দেশ। এখানে স্বভাবজাত বা প্রাকৃতিকভাবে গান হয়। প্রতিটি মা গান গেয়ে শিশুকে ঘুম পাড়ায়। স্কুলে না গেলেও মাঝি ভাটিয়ালি গায়, গাড়িয়াল ভাওয়াইয়া গায়, রাখাল বাঁশি বাজায়, গান গেয়ে সাপ খেলা হয়, গান গেয়ে ছাদ পেটানো হয়। এখানে আউল-বাউল, ফকির-মিসকিন সবাই গান গায়। গানে আধ্যাত্মিকতা প্রচার করে। 
মানুষের সংস্কৃতি চর্চার মধ্যে গান হচ্ছে সবচেয়ে আদি ও সর্বজনীন একটি প্রকরণ। পৃথিবীর সব দেশে গান আছে। নাচ আছে। যেমন আদি ও সর্বজনীন, তেমনি গান ও সংগীত অত্যন্ত পরিশীলিত ও উচ্চ মার্গের একটি চর্চা। গান যেমন স্বভাবত গাওয়া যায়, তেমনি গানের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য তা ব্যাকরণ মেনেও শিখতে হয়। আমাদের শিশুদের স্কুলে সংগীত শিক্ষা ও সংগীত শিক্ষকের তাৎপর্য কী? 
অনেক তাৎপর্য। সংগীত শিশুমনের মানসিক-শারীরিক বিকাশের জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান। সংগীতের চর্চা অন্যান্য শিক্ষার অগ্রগতিকে সাহায্য করে। সংগীতের মধ্যে যে সুরের সঙ্গে তাল, ছন্দ ও মাত্রা তা এমনকি গণিত শিক্ষাকে সাহায্য করে। সংগীত সকল মানুষের মিলন ও সমপ্রীতিকে জোরদার করে। পৃথিবীর সব দেশে শিশুশিক্ষার অনুসঙ্গ হিসেবে সংগীত রয়েছে। এখন বিশ্বে সম্ভবত আফগানিস্তান ছাড়া আর সকল মুসলিম দেশেই সংগীতকে উৎসাহিত করা হয় এবং বিশেষত স্কুলশিক্ষার পর্যায়েই। ইসলাম ধর্মের কিছু সংকীর্ণ ব্যাখ্যা ও নেতিবাচক প্রভাবের কারণে আগে সৌদি আরবে ছিল না, কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেই দেশে স্কুলে সংগীত শিক্ষার জন্য প্রতি বছর কয়েক হাজার করে সংগীত শিক্ষক প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। ও- দেশের সরকারি দৈনিক পত্রিকা ‘অ্যারাব নিউজ’-এ এ বিষয়ক খবর প্রকাশিত হয়েছে। গুগল সার্চ দিয়ে যে-কেউ দেখতে পারেন।


স্বভাবজাত গানের দেশ বাংলাদেশকে গানশূন্য কল্পনা করা যাবে না। কিন্তু আধুনিককালে রাজনীতির হাত ধরে এক দুর্দৈব উপস্থিত হয়েছে। ধর্ম তথা ইসলামকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানো। ধর্মের নামে ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডকতা। গানবাজনাসহ সকল সংস্কৃতি চর্চার বিরুদ্ধে। ওহাবি ইসলাম বা উগ্র ইসলামবাদ। এরা মাজার আক্রমণ করে, বাউলদের আখড়া ভাঙে, তাদের ওপর শারীরিক হামলা চালায়। বর্তমানে এই অনভিপ্রেত অনাকাঙ্ক্ষিত চাপেই সরকার স্কুলে সংগীত ও শরীরচর্চা শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েও তা পরে বাতিল করেছে। 


এই নিয়োগের সিদ্ধান্তটি ছিল ২০২০ সালে তখন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু চার বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি। সেই ধারাবাহিকতায় এবার সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করার পর জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী আপত্তি তোলে। সরকার পিছিয়ে যায়। আমরা স্মরণ করতে পারি, প্রফেসর ইউনূসের সরকার সংবিধান, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করার সঙ্গে নারীদের অগ্রগতি বিষয়েও একটি কমিশন করেছিলেন। রিপোর্ট জমা দিলে প্রধান উপদেষ্টা প্রশংসা করে বলেছিলেন তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু অনেক চমৎকার পরামর্শের সঙ্গে সম্পত্তির উত্তরাধিকারে মেয়েদের সমান অংশ দেয়ার প্রস্তাব থাকার কারণে জামায়াত-হেফাজতসহ ধর্মীয় দল ও গোষ্ঠীগুলো গর্জন করে ওঠে তার বিরুদ্ধে। তারা সমাবেশ করে কমিশনের নারী নেত্রীদের কুৎসিত ভাষায় গালাগাল করে। সরকার পিছিয়ে গিয়ে একেবারে চুপ। নারী নেত্রীদের সম্মানের জন্যও তারা টুঁ-শব্দ করেন না। প্রাথমিক স্কুলে সংগীত ও শরীরচর্চা শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্নেও একই ঘটনা ঘটলো। এ বিষয়ে জনমনের তীব্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে সরকার প্রয়োজনীয় অর্থাভাবকে কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়েছে। আমরা সমপ্রতি বিদেশ থেকে ডজন ডজন বিমান ও সমরাস্ত্র ক্রয়ের ও পরবর্তী সরকারের মন্ত্রীদের জন্য অত্যন্ত দামি গাড়ি কেনার পরিকল্পনার খবর জেনেছি। এমতাবস্থায় শিক্ষক নিয়োগে অর্থাভাবের বিষয় কেন  দেশবাসীর কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে? তাহলে অল্পদিন আগে নিয়োগের পক্ষে প্রজ্ঞাপনটি হয়েছিল কোন ভিত্তিতে? 


লেখাটা শুরু করেছিলাম ভালো লাগার অনুভূতি দিয়ে। শেষ করছি এই কথা বলে যে, বাঁশি যদি বাজে তো তাকে থামানো যাবে না। কেউ থামাতে এলে তাকে রুখে দিতে হবে। 

মতামত'র অন্যান্য খবর