বই আলোচনা

‘ইতিহাস খালেদা জিয়াকে কীভাবে মনে রাখবে’

সোহরাব হাসান | মতামত
নভেম্বর ২২, ২০২৫
‘ইতিহাস খালেদা জিয়াকে কীভাবে মনে রাখবে’

মহিউদ্দিন আহমদ লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে ইতিমধ্যে নিজের আসন তৈরি করে নিয়েছেন। তাঁর প্রায় প্রতিটি বই পাঠকের কাছে সমাদৃত হচ্ছে।
তিনি আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাসদের রাজনৈতিক ইতিহাস লিখেছেন। জামায়াতে ইসলামী নিয়েও তার বই আছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন পাঠকপ্রিয় একাধিক বই। তাঁর এক এগারো বাংলাদেশ ২০০৭-২০০৮ বইটিতে আছে অনেক অজানা তথ্য, যা ভবিষ্যৎ গবেষকদের আকরগ্রন্থি হিসেবে কাজ করবে।
 

মহিউদ্দিন আহমদ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে প্রথম যার জীবনভিত্তিক রাজনৈতিক আখ্যান লিখলেন, তিনি বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপি’র চেয়ারপারসন। একজন গৃহবধূ নানা চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যদিয়ে যে কেবল ক্ষমতা নয়, জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে উঠেছেন, তারই বর্ণনা আছে এ বইয়ে নানা তথ্য-উপাত্তের সমাহারে।
 

মহিউদ্দিন  আহমদ কেন তিনি এই বই লিখতে উদ্বুদ্ধ হলেন, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘এ দেশে সফল রাজনীতিক অনেকেই আছেন। তাঁরা কেউ কেউ ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে পেরেছেন। আবার অনেক সুদর্শন নারী-পুরুষকে জানি, যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষ করে চলচ্চিত্রে কিংবদন্তি হয়ে আছেন। সুচিত্রা সেন থেকে সোফিয়া লরেন অনেকেই আমাদের কৈশোর যৌবনের ‘ক্রাশ’। রাজনীতিতে এমনটা খুব বেশি দেখা যায় না। আমাদের দেশে সুন্দর মুখের নেতা আমরা দেখি শেখ মুজিবের মধ্যে। এরপর দেখলাম খালেদা জিয়াকে। মহিউদ্দিন আহমদ বিএনপি’র ইতিহাস লেখার সময় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রথম  সাক্ষাৎ করেন। তাঁর সঙ্গে আলোচনা ছিল সংক্ষিপ্ত। দলের ইতিহাসের বিষয়ে জানতে চাইলে খালেদা জিয়া বলেন,  বিএনপি’র জন্মের সময় তো আমি ছিলাম না। এরপর বিএনপি’র সময় অসময় বইটি বের হলে লেখক এর একটি কপি খালেদা জিয়ার হাতে দিতে গেলে সেবারও রাজনীতি নিয়ে কিছু্‌ কথা হয়। মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর (খালেদা জিয়া) একটি বায়োগ্রাফি লেখার ইচ্ছার কথা জানান। তিনি বলেন, এরকম বই লিখতে হলে আপনার সঙ্গে অনেকবার বসতে হবে, কথা বলতে হবে। সেখানে উপস্থিত  দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, খুব ভালো হবে। তবে অফিসে না হয়ে বাসায় সাক্ষাৎকার নেয়াটাই ঠিক হবে।
 

সেদিন খালেদা জিয়া কিন্তু তার ওপর বই লেখার বিষয়ে খুব আগ্রহ দেখাননি। তিনি বলেছেন, জীবনী লেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র তো আমি নই। এটা ছিল তাঁর বিনয়। এরপর রাজনীতিতে অনেক ঘটনা ঘটে। উদ্দেশ্যমূলক মামলায় খালেদা জিয়া দণ্ডিত হয়ে জেলে যান। ফলে জেল, হাসপাতাল ও বাসায় অন্তরীণ অবস্থায় তাঁকে কাটাতে হয় পুরোটা সময়। তিনি অন্তরীণ অবস্থা থেকে মুক্তি পান ৫ই আগস্ট ক্ষমতার পাালাবদলের পর।  
ফলে খালেদা জিয়ার সঙ্গে মহিউদ্দিন আহমদের দেখা করা বা সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ হয়নি। তারপরও তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবন আখ্যান লিখেছেন। নাম দিয়েছেন ‘খালেদা।’ এ বইয়ে অন্যদের ভাষ্যে খালেদা জিয়ার শৈশব ও কৈশোরের কথা থাকলেও সিংহভাগ জুড়ে আছে রাজনৈতিক চড়াই উৎরাইয়ের কাহিনী। যেকোনো বৈরী পরিস্থিতিতে তাঁর দৃঢ় ও আপসহীন মনোভাবের কথা।
 

মহিউদ্দিন আহমদ উপসংহারে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘ইতিহাস খালেদাকে কীভাবে মনে রাখবে? নিজেই এর জবাব দিতে গিয়ে লিখেছেন, বিএনপি সেভাবে একটি দল ছিল না, যেভাবে রাজনৈতিক দল তৈরি হয় আমাদের দেশে। বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্যদিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতার বলয়ের ভেতর থেকে দল তৈরি করেছিলেন। পরে খালেদা জিয়া সে দলকে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নেন। আজকে আমরা যে বিএনপি দেখি; সেটার আইকন  জিয়াউর রহমান হলেও; কিন্তু দলটাকে এ পর্যায়ে এনেছেন খালেদা জিয়া।’
 

মহিউদ্দিন আহমদের মতে, খালেদা জিয়াই প্রথম নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। এর আগে যেসব নির্বাচন হয়েছে, তার সবটা নিয়েই বিতর্ক ও প্রশ্ন আছে। একই সঙ্গে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীও। বিরোধী দলের নেতা হিসেবে খালেদা জিয়া যতটা সাফল্য দেখিয়েছেন, সরকার প্রধান হিসেবে সেটা দেখাতে পারেননি। এর পেছনে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিই প্রধানত দায়ী। ক্ষমতায় থাকতে বিএনপি যে দখলদারি রাজনীতি করতো, আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় এসে একই কাজ করেছে। বিরোধী দলের ক্ষেত্রেও এটা শতভাগ সত্য।
 

মহিউদ্দিন আহমদের শেষ কথা হলো, হাসিনা সরকারের আমলে খালেদা জিয়া অনেকদিন গণবিচ্ছিন্ন থাকতে বাধ্য হয়েছেন। অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু তিনি ধৈর্য ধরে ছিলেন। নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল তাঁর। এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সেই বিশ্বাসের কারণেই নেতাকর্মীরা তাঁকে ছেড়ে যাননি তৎকালীন সরকারের চাপ, নির্যাতন ও প্রলোভন সত্ত্বেও। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে একদল নেতাকর্মী ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে জুটে যান। মন্ত্রী- এমপি হয়ে আখের গোছান। অতীতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির শাসনামলে এমন দৃশ্য অহরহ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বিগত পনের বছরে ক্ষমতাসীনেরা যে বিএনপি’র উপজেলা পর্যায়ের একজন নেতাকেও ভাগিয়ে নিতে পারেননি, তার পেছনে খালেদা জিয়ার ক্যারিশমাই কাজ করেছে।
 

বিএনপিতে খালেদা জিয়া এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এ কারণে দীর্ঘদিন অসুস্থ ও রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকার পরও বিএনপি তাকে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য প্রস্তাব করেছে। আসলে বিএনপিতে এখনো খালেদা জিয়া প্রধান ভরসা ও শক্তি। খালেদা জিয়ার চার দশকের রাজনীতির আখ্যান জানতে বইটি অবশ্য পাঠ্য বলে মনে করি। 
 

মতামত'র অন্যান্য খবর