মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সামরিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সমর কৌশলের চলমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে কোণঠাসা মার্কিন পক্ষের স্থলযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আলামতও স্পষ্ট হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞরা ইরানে স্থলযুদ্ধকে চিহ্নিত করেছেন ‘বিভ্রম’ নামে। সতর্কবার্তা দিয়ে বলছেন, এর পরিণতি হবে আরও মারাত্মক ও ভয়াবহ।
সবচেয়ে বড় যে বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন স্থলযুদ্ধ কেবল একটি সামরিক অভিযান হবে না। হবে একটি জটিল ভূরাজনৈতিক জুয়া। বিশেষ করে, অস্ট্রেলীয় সামরিক বিশ্লেষক ও গবেষক মিক রায়ান তার আলোচিত প্রবন্ধ “ ওৎধহ: অ ষধহফ ধিৎ রষষঁংরড়হ”-এ যে ধারণা তুলে ধরেছেন, তা মূলত এই যুদ্ধের অন্তর্নিহিত বিভ্রম, রাজনৈতিক প্রলেপ এবং বাস্তবতার নির্মমতা উন্মোচন করে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বনাম কৌশলগত বাস্তবতা
প্রথমেই প্রশ্ন আসে-কেন একটি স্থলযুদ্ধের কথা ভাবা হচ্ছে? প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য নীতিগত অবস্থান বিশ্লেষণ করলে তিনটি স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সামনে আসে: ১. শক্তি প্রদর্শন, ২. মিত্রদের আশ্বস্ত করা এবং ৩. কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি। কারণ, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে “পৎবফরনরষরঃু ংরমহধষরহম’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি রাষ্ট্র যখন তার প্রতিপক্ষকে বোঝাতে চায় যে, সে পিছু হটবে না, তখন প্রায়ই সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পথ বেছে নেয়।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দেয়। ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে তেমন শিক্ষাই রয়েছে। সদ্য অতীতের এই দুই যুদ্ধই দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সংকল্প দেখানোর জন্য সামরিক অভিযান শুরু করা সহজ। কিন্তু তা থেকে সম্মানজনক প্রস্থান নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন, ব্যয়বহুল এবং ক্ষতিকর বা অলাভজনক। ইরানের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেশি।
সামরিক লক্ষ্য: অর্জনযোগ্য নাকি কল্পনাপ্রসূত?
মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় কয়েকটি লক্ষ্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা। ওহঃবৎহধঃরড়হধষ অঃড়সরপ ঊহবৎমু অমবহপু-এর পর্যবেক্ষণে থাকা এই সক্ষমতা বহুদিন ধরেই মার্কিন উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু স্থলবাহিনী দিয়ে এই অবকাঠামো “নিরাপদ” করা মানে একটি দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়া, যা রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
মার্কিনিদের দ্বিতীয় কৌশলগত কারণ হলো, গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল সরবরাহ এই প্রণালি দিয়ে হয়। এটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপর্যস্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তবে এই প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করা মানে শুধু নৌ-ক্ষমতা নয়; উপকূলীয় নিরাপত্তা, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং স্থলভিত্তিক সমন্বিত অপারেশন-সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। সবগুলো শর্ত পূরণ করে হরমুজে কর্তৃত্ব করা মার্কিনিদের জন্য স্বপ্নের সমতুল্য। তৃতীয়ত, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা দ্বীপ দখল করে কূটনৈতিক দরকষাকষিতে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করতে পারেন ট্রাম্প। কিন্তু এই লক্ষ্যগুলো “সীমিত যুদ্ধ” ধারণার মধ্যে পড়ে, যেখানে সামরিক শক্তি সীমিত রেখে রাজনৈতিক ফলাফল অর্জনের চেষ্টা করা হয়। সমস্যা হলো-ইরান এই ধরনের সীমিত যুদ্ধের ফাঁদে পড়বে না বা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাবে না।
ইরানের কৌশল: অসম যুদ্ধ ও কগনিটিভ ডোমেইন
ইরানের সামরিক দর্শন বোঝার জন্য আমাদের “asymmetric warfare” ধারণার দিকে তাকাতে হবে। ইরান জানে, প্রচলিত যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেয়া কঠিন। তাই তারা বেছে নিয়েছে “পড়মহরঃরাব ধিৎভধৎব”- যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র শুধু ভৌগোলিক নয়, বরং মানসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও বহুমাত্রিক। ইরানের লক্ষ্য হবে নানা দিক থেকে মার্কিন সৈন্যদের ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি করা, বন্দি করা এবং সেই দৃশ্যগুলো বৈশ্বিক মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া। এতে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ জনমত দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। ওংষধসরপ জবাড়ষঁঃরড়হধৎু এঁধৎফ ঈড়ৎঢ়ং এবং তাদের সহযোগী মিলিশিয়ারা এই ধরনের যুদ্ধকৌশলে দক্ষ। এই কৌশল নতুন নয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে বিশ্ব দেখেছে, কীভাবে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র জনমতের চাপে যুদ্ধ থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। ইরান সেই অভিজ্ঞতাকে আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।
রাশিয়ার ভূমিকা: প্রক্সি প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায়
বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইরান একা নয়। রাশিয়া এই সংঘাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ “ভড়ৎপব সঁষঃরঢ়ষরবৎ” হতে পারে। পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া ইতিমধ্যে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িত। এই প্রেক্ষাপটে, ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য, সাইবার সহায়তা বা অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করা রাশিয়ার জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ। এটি এক ধরনের “রহফরৎবপঃ ৎবঃধষরধঃরড়হ” যেখানে ইউক্রেনে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের প্রতিশোধ অন্য একটি থিয়েটারে বা যুদ্ধমঞ্চে নেয়া হয়।
ভৌগোলিক বাস্তবতা: যুদ্ধের অদৃশ্য শত্রু
ইরানের ভূগোল এই সম্ভাব্য যুদ্ধে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এটি একটি বিশাল, পাহাড়ি এবং বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ড। ইরানের আয়তন প্রায় ১.৬ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার-যা ইরাক বা আফগানিস্তানের তুলনায় অনেক বেশি জটিল অপারেশনাল পরিবেশ তৈরি করে। লজিস্টিক বা রসদ সরবরাহ এখানে একটি প্রধান সমস্যা। দীর্ঘ সরবরাহ লাইন, শত্রুর হামলার ঝুঁকি এবং প্রতিকূল ভূপ্রকৃতি-সব মিলিয়ে মার্কিন বাহিনী একটি “ষড়মরংঃরপধষ হরমযঃসধৎব”-বা সরবরাহের ভীতিকর স্মৃতির মুখোমুখি হতে পারে। এ ছাড়া, হরমুজ প্রণালির প্রায় ২০০ কিলোমিটার উপকূলরেখা সুরক্ষিত রাখা একটি বিশাল সামরিক দায়িত্ব। এটি করতে হলে বিপুল সংখ্যক সৈন্য, যুদ্ধজাহাজ এবং বিমান মোতায়েন করতে হবে-যা মার্কিনিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
ব্যর্থতার ঝুঁকি: সীমিত যুদ্ধের বিপদ
গবেষক মিক রায়ান একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন-যদি এই যুদ্ধ সীমিত আকারে চলতে থাকে এবং দ্রুত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা উল্টো ফল দিতে পারে। ইরানের মনোবল ভাঙার বদলে এটি আরও দৃঢ় হয়ে উঠতে পারে আর মার্কিন নেতৃত্বের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এই “বংপধষধঃরড়হ ঃৎধঢ়” আধুনিক যুদ্ধের একটি পরিচিত সমস্যা। একবার যুদ্ধ শুরু হলে, তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ছোট আকারের সংঘাত দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে, এবং তখন তা থেকে পেছনে ফিরে আসা বা “বীরঃ ংঃৎধঃবমু” প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। মার্কিনিরা এমন একটি পরিস্থিতিতে পড়লে আম ও ছালা, উভয়টিই হারাবে।
স্থলযুদ্ধের মৌলিক বাস্তবতা
স্থলযুদ্ধের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো-এটি নানা নাটকীয়তা ও জটিলতায় পূর্ণ। সামরিক বিশেষজ্ঞ ক্লজভিৎজের ভাষায়, যুদ্ধ কখনোই পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। বাস্তবতা সবসময়ই অনিশ্চিত, বিশৃঙ্খল এবং ভয়াবহ। এ জন্য শেষ পর্যন্ত স্থলযুদ্ধেও ঝাঁপিয়ে পড়া হয়। কিন্তু, এটা সত্য যে, শুধুমাত্র স্থলযুদ্ধই শত্রুর মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে পারে। তবে, এর জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। এই তিনটির কোনো একটি অনুপস্থিত থাকলে, স্থলযুদ্ধ দ্রুত বিপর্যয়ে পরিণত হয়। ইরানের রণক্ষেত্রে তিনটি শর্ত পূরণ করা মার্কিনিদের জন্য শুধু কঠিনই নয়, প্রায়-অসম্ভব।
বিভ্রমের পরিণতি
ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন স্থলযুদ্ধ মূলত একটি “রষষঁংরড়হ” বা বিভ্রম। এমন একটি বিভ্রম, যেখানে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তব সামরিক সীমাবদ্ধতাকে আড়াল করে। এটি এমন একটি যুদ্ধ, যা শুরু করা সহজ, কিন্তু শেষ করা অত্যন্ত কঠিন।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে বহুমাত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রক্সি যুদ্ধ এবং তথ্যযুদ্ধ একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে, সেখানে ইরানে একটি স্থলযুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত হবে না; এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে। অতএব, মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নেয়া নয়। বরং “কোন যুদ্ধটি করা উচিত” বা “লাভজনক’’-এই মৌলিক প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়া। বিশেষজ্ঞরা যে “স্থলযুদ্ধের বিভ্রম”-এর কথা বলেছেন, তা মূলত সেই মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত ফাঁদ, যেখানে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবতার সীমাবদ্ধতাকে আড়াল করে ফেলে। এই বিভ্রম থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি অনিবার্য হয়ে ওঠে। একগুঁয়ে ট্রাম্প কৌশলের বদলে উত্তেজনার বশে বিভ্রমে নিপতিত হলে পুরো দেশকে নিয়ে ফাঁদে আটকে যেতে পারেন।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে-ভুল যুদ্ধের মূল্য কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয় নয়। বরং তার প্রতিক্রিয়া বহুমাত্রিক এবং দীর্ঘস্থায়ী। ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। রাষ্ট্রের ভেতরে জনমত বিভক্ত হয়ে পড়ে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমেরিকার নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একইভাবে ইরাক বা আফগানিস্তানে যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে পড়ে, যেখানে যুদ্ধ মিশন শেষ করার ঘোষণার পরও বাস্তবে যুদ্ধের বহুমাত্রিক আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক রেশ শেষ হয়নি। তা আরও নতুন ধরনের সংঘাত শুরু করে। যার প্রতিক্রিয়া মার্কিনিদেরও সইতে হয়।
ইরানের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকিগুলো আরও জটিল। প্রথমত, কৌশলগত অবস্থানের প্রশ্ন। ইরান শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের একটি কেন্দ্রীয় ভূরাজনৈতিক পরাশক্তি। এখানে সামরিক হস্তক্ষেপ মানে কেবল একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত নয়, বরং পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যকে নাড়িয়ে দেয়া। ওংষধসরপ জবাড়ষঁঃরড়হধৎু এঁধৎফ ঈড়ৎঢ়ং-এর মাধ্যমে ইরান ইতিমধ্যে লেবানন, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে একটি “networked deterrence” গড়ে তুলেছে। ফলে ইরানে আক্রমণ মানে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধের ঝুঁকি।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ব্যয়। আধুনিক যুদ্ধ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আফগানিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে বাধ্য হয়, যার অর্থনৈতিক প্রভাব এখনো বহন করছে মার্কিনিরা। ইরানের বিরুদ্ধে একটি স্থলযুদ্ধ আরও বেশি ব্যয়বহুল হবে-কারণ এটি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং এতে নৌ, বিমান ও স্থল-তিনটি ডোমেইনেই সমানভাবে সম্পদ ব্যয় করতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বৈশ্বিক তেলের বাজারে অস্থিরতা, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকেও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হবে না। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিপদ। একটি যুদ্ধের সফলতা বা ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, হতাহতের সংখ্যা বাড়ে এবং সুস্পষ্ট সাফল্য না আসে, তাহলে জনমত দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ট্রাম্প বা যেকোনো মার্কিন নেতৃত্বের জন্য এটি একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে। ইরান যে “পড়মহরঃরাব ধিৎভধৎব” কৌশল গ্রহণ করতে পারে-যেখানে মার্কিন ক্ষয়ক্ষতি প্রচার করে জনমত প্রভাবিত করা হয়-তা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক অবস্থান ও বৈধতা। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা আগের মতো একমুখী নয়। রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সক্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থিত। ইরানে একতরফা সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে বিশ্ব পরিসরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ও বৈধতার প্রশ্ন তুলবে নানা দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রচেষ্টাকে নৈতিক ও তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করে ফেলা হবে। বিশেষ করে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজেকে আন্তর্জাতিক আইনের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছে, তখন ইরানের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান মার্কিন দ্বৈত মানদণ্ডের চেহারা স্পষ্ট করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুদ্ধের শেষ লক্ষ্য। ইরানে আক্রমণ করার পর যুক্তরাষ্ট্র কী অর্জন করতে চায়? শাসন পরিবর্তন? পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস? নাকি কেবল চাপ সৃষ্টি? যদি এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর না থাকে, তাহলে যুদ্ধ একটি অবিবেচক, অলাভজনক ও উদ্দেশ্যহীন সামরিক পদক্ষেপে পরিণত হবে-যার কোনো নির্দিষ্ট শেষ বা অর্জন নেই। মার্কিনিরা তেমন একটি চক্রে আবদ্ধ হলে মুখে চুনকালি মাখিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হবে।
বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া
এই প্রেক্ষাপটে, মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া জরুরি। তাদের জন্য সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক ঝুঁকি, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া-সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ একটি ভুল যুদ্ধের প্রভাব কেবল একটি প্রজন্ম নয়, বহু প্রজন্ম ধরে একটি রাষ্ট্রের কৌশলগত গতিপথকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিনিদের আক্রমণাত্মক স্থলযুদ্ধ তাই শুধু একটি সামরিক বিকল্প নয়। এটি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যার প্রতিটি ধাপই গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। অন্যথায়, “স্থলযুদ্ধের বিভ্রম” খুব দ্রুতই বাস্তবতার নির্মমতায় পরিণত হতে পারে। অতএব, ইরানে স্থলযুদ্ধ-কেবল একটি বিভ্রমই নয়, একটি সতর্কবার্তাও।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।