সাফ কথা

অপ্রত্যাশিত নতুন সংকটকাল

হাসান মামুন | মতামত
এপ্রিল ৪, ২০২৬
অপ্রত্যাশিত নতুন সংকটকাল

ধরা যাক, ইরানের ওপর যে যুদ্ধটা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে; তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। বাংলাদেশের জনজীবন, অর্থনীতিতে এর কোনো প্রভাব নেই। তাহলেও তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বেগ পেতে হতো। এর বড় কারণ, দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিতে বিরাজমান শ্লথগতি। এ কারণে আওয়ামী লীগ সরকার তো রীতিমতো বাড়িয়ে দেখাতো প্রবৃদ্ধি। সরকারটি জানতো, সুদের হার জোরপূর্বক কমিয়ে রেখেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো যাচ্ছে না। এটা আটকে ছিল একটা স্তরে। তার প্রভাব ছিল কর্মসংস্থানে। কাজের সুযোগ কম, আবার নিত্যপণ্যের দাম বেশি- মোটা দাগে এটাই ছিল অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র। 


অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পরিস্থিতিটা আরও গভীরতা লাভ করে। প্রধান প্রধান খাতে নতুন বিনিয়োগ হয়নি বলা যায়। বিদ্যমান বিনিয়োগও অনেক ক্ষেত্রে অলস অবস্থায় ছিল। এর কারণ আমাদের জানা। অনেক বড় ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নেয়া হয়েছিল প্রশাসনিক পদক্ষেপ। তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ গুরুতর অভিযোগ ছিল। মবের শিকার হয়েও অনেকে ব্যবসায় আগ্রহ হারিয়েছিলেন তৃণমূল পর্যন্ত। তাছাড়া উদ্যোক্তারা অপেক্ষা করছিলেন নতুন সরকারের জন্য, যেটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়ে আসবে। তাদের কাছ থেকেই পাওয়ার কথা সুস্পষ্ট নীতিগত নির্দেশনা। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এটা আরও বেশি করে চায়। আর দেশি বিনিয়োগ না বাড়লেও তারা স্বভাবতই আস্থা পায় না। 
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েছে দু’মাসও হয়নি। এর কিছুদিন পরই উপসাগরীয় অঞ্চলে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে; বাংলাদেশে এর অভিঘাত পড়তে সময় লাগেনি। ইরানের সঙ্গে আমাদের তেমন বাণিজ্য অবশ্য নেই। সেখানে জনশক্তি রপ্তানিও একটা সময়ের পর আর হচ্ছে না। আমাদের অল্প কিছু মানুষ সেখানে ছিলেন, যারা শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী। তা সত্ত্বেও আমেরিকা ও ইসরাইল দেশটির ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার ফল আমাদের জন্য কেন বিষময় হচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন নেই। সবাই সেটা জানে এবং নিজ জীবনেও মানুষ দেখতে পাচ্ছে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব। এটা আরও তীব্র হতো, যদি এশিয়ার কিছু দেশের মতো এখানেও সরকার বাড়িয়ে দিতো জ্বালানির দাম। এর পেছনে ‘যুক্তি’ থাকলেও নতুন সরকার সেটা কেন করেনি, তাও জানা। এমন সিদ্ধান্ত অ-জনপ্রিয় হতো এবং এর প্রভাবে জনজীবনে তৈরি হতো বাড়তি ব্যয়ের চাপ। এমনিতেই মূল্যস্ফীতি এখনো অনুকূলে আসেনি। অস্থির আন্তর্জাতিক বাজারের কথা বলে জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে সেটা এক ধাক্কায় আবার বেড়ে যেতো। শিল্পসহ গোটা অর্থনীতিতেও বেড়ে যেতো উৎপাদন ব্যয়। এটা বাড়লে পণ্যের দাম যে বাড়ে, সেটা কার না জানা। এর প্রভাব পড়তো রপ্তানি বাজারেও। সেখানে প্রতিযোগিতামূলক থাকতে হলে পণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে হয়। এমনিতেও টানা ক’মাস আমাদের রপ্তানি আয় নিম্নগামী। এটা আর কখনো এভাবে দেখা যায়নি। 


প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ধারা অবশ্য জোরালো ছিল। বলা যায়, এটাই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভরসার জায়গা। এতে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভকে একটা সন্তোষজনক জায়গায় রাখা সম্ভবপর হয়েছিল। রপ্তানি আয় ভালো হলে এটা আরও মজবুত হতো। রিজার্ভ জোরালো থাকলে জ্বালানিসহ পণ্যসামগ্রী আমদানিতে বেগ পেতে হয় না। রিজার্ভ এখনকার চাইতে ২৫ শতাংশ বেশি রাখা গেলেও সরকার যেভাবে বাড়তি সহায়তার জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে ধরনা দিচ্ছে, সেটা দিতে হতো না। স্থানীয় বাজারে ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখাও সহজতর হতো। এতে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখাটা সম্ভবপর হয় কিংবা হতে পারে। নতুন সরকার এলেও বিনিয়োগে এখনো গতি আসেনি। তার অবকাশও পাওয়া গেল না যুদ্ধের প্রভাবে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাওয়ায়। নতুন গভর্নর এসে এ লক্ষ্যে সুদের হার কমাতে উদ্যোগীও হয়েছিলেন। এখন আবার বলা হচ্ছে, ধীরে এগোতে হবে। এপ্রিলের জন্য জ্বালানির দাম না বাড়ানো হলেও পরের মাসেই সেই নীতি যে বহাল রাখা যাবে- এমন নিশ্চয়তা নেই। সরকারকে সব জ্বালানি পণ্য, এমনকি সার বেশি দামে কিনে আগের দামে সরবরাহ করতে হচ্ছে। বিদ্যমান রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতিতে এভাবে ভর্তুকি জুগিয়ে যাওয়া কতোখানি সম্ভব, কে জানে! 


উন্নয়ন খাত থেকে অর্থকড়ি কেটে এনে এভাবে ব্যয় মেটানোর ধারাটি অন্তর্বর্তী শাসনামলেও ছিল। সে কারণে সরকারি খাতেও এমনকি খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ বাড়েনি। এর প্রভাব পড়েছিল বিশেষত দরিদ্র জনগোষ্ঠীতে। রড, সিমেন্টের মতো সরবরাহকারী খাতগুলোয়ও প্রভাব পড়েছিল এবং এ কারণে সেইসব ক্ষেত্রেও কমেছে কাজের সুযোগ। এখন নির্বাচিত সরকারের আমলেও উন্নয়ন ব্যয়কে রাজস্বে টেনে আনার ধারা চলতে থাকলে এর ফলও ভিন্ন হবে না। তবে জ্বালানি পণ্য বিতরণ ব্যবস্থায় যে অরাজকতা দেখা দিয়েছে, সেটা নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে এর কিছুটা সুফল আমরা পাবো। যুদ্ধের কারণে অস্থির আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আসা চাপ সরকার জনগণের ওপর না দিয়ে কেন নিজের ওপর নিচ্ছে, সেটা এর মজুতদাররা বুঝবে না। কঠোর শাস্তির ভয়ে ভীত না হওয়া পর্যন্ত তারা বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবে। এ লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি সরকারকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তার প্রচেষ্টার খবরগুলোও কুশলতার সঙ্গে তুলে ধরতে হবে, যাতে ‘প্যানিক বায়িং’য়ে ঢুকে পড়া সাধারণ মানুষও আশ্বস্ত হয়। সেটি না ঘটা পর্যন্ত সরকারও স্বস্তি পাবে না। 


সরকার বলছে, চলমান বোরো মৌসুমে সারের ঘাটতি হবে না। গ্যাসের অভাবে সিংহভাগ সার কারখানা বন্ধ রাখার পাশাপাশি এর আমদানিও কিন্তু এখন কঠিন। যুদ্ধের প্রভাবে সারের দামও বেড়েছে। যুদ্ধ সহসা বন্ধ না হলে খাদ্যশস্যের আন্তর্জাতিক বাজারও অস্থির হবে। তখন গমসহ খাদ্যপণ্য আনতে হবে বেশি দাম দিয়ে। সরকারকে বলা হবে কর-শুল্ক কমাতে। স্থানীয় বাজার কিছুটা হলেও শান্ত রাখতে সেটা করতেও হবে সরকারকে। এমনিতেই রাজস্ব পরিস্থিতি খারাপ। আর তখন পরিস্থিতি হবে করুণ। নিকটেই আবার জাতীয় বাজেট দিতে হবে সরকারকে। তার পক্ষে কি সম্ভব হবে আয়করসহ বিভিন্ন খাতে কর বাড়ানো? একে তো নতুন সরকার; তার ওপর যুদ্ধের প্রভাবে জনজীবনে বেড়েছে অস্থিরতা। শিল্প থেকে কৃষি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বেড়েছে অনিশ্চয়তা। বোরোতে সার সংকট না হলেও জ্বালানির অভাবে ঘটতে পারে সেচ সংকট। এপ্রিল-মে এদেশে ‘উষ্ণতম সময়’ বলে বিবেচিত। তাপমাত্রা বাড়ার কারণেও এ সময়ে লোডশেডিং বাড়ে। ‘ক্যাপাসিটি’ অনেক বেশি থাকলেও উদ্ভূত জ্বালানি সংকটে আমরা কি বিদ্যুৎ উৎপাদন কাম্য পর্যায়ে রাখতে পারবো? খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি’র দ্বিতীয় শাসনামলে বিদ্যুৎ সংকট জাতিকে ভুগিয়েছিল। এখন ইরান যুদ্ধের চাপে একই সংকট ফিরে এলে জনগণ হয়তো সরকারকে সেভাবে দোষারোপ করবে না; তবে এর ভোগান্তি তীব্র হবে সন্দেহ নেই। উৎপাদন কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিপুলভাবে। বিশেষত প্রধান রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমাদের প্রতিযোগীরা এর সুযোগ নিতে চেষ্টা করবে। আর বাজার একবার হারিয়ে ফেললে তার পুনরুদ্ধার যে কতো কঠিন, সেটা কেবল উদ্যোক্তারা জানে। 


এর মধ্যে ভালো খবর, মার্চে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে। ঈদ ছিল, ডলারের দামও বেড়েছে। এগুলো কারণ বটে। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা বাংলাদেশিরা আতঙ্কিত হয়ে সঞ্চিত অর্থ বেশি করে পাঠালে সেটা খারাপ আলামত বলতে হবে। তাদের ক’জন তো ইরানের পাল্টা হামলায় পড়ে হতাহত হয়েছেন। দেশে আসছে তাদের লাশ। জনশক্তি রপ্তানি খাতে ছড়িয়ে পড়েছে হতাশা। জেট ফুয়েলের দাম অনেক বাড়ানোয় উড়োজাহাজ চলাচল খাতও ক্ষতিগ্রস্ত। ইরান যুদ্ধের প্রথম ধাক্কা লেগেছিল এ খাতেই। যুদ্ধ আকাশপথে হলে এমনটাই ঘটে থাকে। এখন এটা ব্যাপকতা লাভ না করে একইভাবে চলতে থাকলেও কি বাড়বে জনশক্তি রপ্তানি? ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য তেমন না থাকলেও আমেরিকাকে ঘাঁটি করতে দেয়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে তো আমাদের নানামুখী সম্পর্ক। প্রবাসীদের অন্তত ৫০ শতাংশ রয়েছে ওইসব দেশে। সেখানে কিছু পণ্য রপ্তানিও করি আমরা। আর জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের উল্লেখযোগ্য অংশ আনি ওইসব দেশ থেকে। সেই আমদানি এখন কেন ব্যাহত, তা সবারই জানা। বিকল্প যেসব উৎস থেকে এসব জরুরি পণ্য আনতে হচ্ছে, তার দাম বাড়ছে। এগুলো আর সহজপ্রাপ্যও নয়। আমদানির বিকল্প রুটও আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্র থেকে আমদানিতে আবার ভাবতে হচ্ছে, আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আছে কিনা! এ সংকট তৈরিতে অন্তর্বর্তী সরকারও রেখে গেছে ভূমিকা। 


যুদ্ধের প্রভাবে এমন পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে আরও অনেক দেশকে, যাদের বিশেষ করে জ্বালানির ‘কৌশলগত মজুত’ নেই। আমাদের মতো আর্থিক সামর্থ্যের দেশের পক্ষে এ ধরনের মজুত রাখাও কঠিন। আমরা তো জ্বালানি পরিশোধন ক্ষমতাও বাড়াতে পারিনি স্বাধীনতা অর্জনের এত পরেও। চাহিদামতো ‘ক্রুড’ আনতে না পারলে একমাত্র রিফাইনারিটি সচল রাখাও যাবে না। তাতে ডিজেলসহ জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি হয়ে পড়বে আরও জটিল। এ অবস্থায় ভালো হতো কোনো এক সমীকরণে যুদ্ধটা বন্ধ হলে। এর বদলে ডনাল্ড ট্রাম্পের ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠানোর ঘোষণায় জ্বালানির বাজার হয়েছে নতুন করে অস্থির। ইরানও যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে লক্ষ্য অর্জনে বদ্ধপরিকর। এ অবস্থায় বাংলাদেশের নতুন সরকার ও জনগণ এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি পার করছে অপ্রত্যাশিত নতুন সংকটকাল। যুদ্ধ বন্ধ হলেও জ্বালানির বাজার স্বাভাবিক হয়ে আসতে সময় লাগবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামো পুনর্গঠনে কিছু কাজের সুযোগ বাড়বে অবশ্য। সেটা নেয়ার জন্য কাড়াকাড়িও থাকবে আমাদের মতো জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশগুলোর। তখন অবশ্য অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ আমরা পাবো। সরকারকে সেদিকে দৃষ্টি রেখেই কাজ করে যেতে হবে। নির্বাচনে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলেরই অঙ্গীকার ছিল বিশেষত তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর। 


লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মতামত'র অন্যান্য খবর