বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। ফলে বৈশ্বিক যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার ঢেউ আমাদের উপকূলে এসে পড়বে- এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে আমরা যে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছি, তার মূলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ যুদ্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায় যা একটি ‘ওয়ার অফ চয়েস’ বা স্বেচ্ছায় বেছে নেয়া যুদ্ধ। তবে এক মাস পেরিয়ে যাওয়া এই যুদ্ধ এখন কেবল একটি অঞ্চল নয়, বরং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্পের এই যুদ্ধং দেহী নীতির কারণে স্বয়ং মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেই ভাঙন দেখা দিয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে ট্রাম্পের একনিষ্ঠ সমর্থক ও ইউএস কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টারের ডিরেক্টর জো কেন্টের পদত্যাগ এর একটি বড় উদাহরণ। কেন্ট তার পদত্যাগপত্রে স্পষ্ট করেছেন যে, এই যুদ্ধ মার্কিন স্বার্থে নয়, বরং ইসরাইলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে পরিচালিত হচ্ছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, যেখানে তিনি অন্তহীন যুদ্ধ থেকে সরে এসে অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে মন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা সম্পূর্ণ ভূলুণ্ঠিত।
পরিসংখ্যান বলছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে। ইকোনমি হ্যান্ডলিং রেটিং ২৯ শতাংশে নেমে আসা এবং ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পতন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আসন্ন নভেম্বরের মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানরা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি যুদ্ধব্যয় সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
ইরান গত কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই ‘অ্যাসিমেট্রিক’ বা অসম যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে। আয়াতুল্লাহ খামেনির নির্দেশনায় তারা এমন এক প্রযুক্তিগত কৌশল গ্রহণ করেছে, যেখানে ২০-৩০ হাজার ডলারের একটি ড্রোন ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ব্যয় করতে হচ্ছে ২ মিলিয়ন ডলারের ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর। এই অর্থনৈতিক চাপে গালফ দেশগুলো আজ পর্যুদস্ত। কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও বাহরাইনের মতো দেশের জিডিপি ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
ইরানের মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের বলয় থেকে বের করে আনা এবং মার্কিন জনমতকে যুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড় করানো। হরমুজ প্রণালিতে সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করে বিশ্ব অর্থনীতিতে কম্পন ধরিয়ে দেয়া এখন ইরানের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
বাংলাদেশের কী হবে?
বাংলাদেশের জন্য এই যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানির ৯৫ শতাংশ আসে সৌদি আরব, ইউএই ও কাতারের মতো দেশ থেকে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং আমাদের প্রয়োজনীয় ইউরিয়া সার আসে। এই রুটটি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মার্চে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
ডিজেল সংকটের কারণে পরিবহন খাত যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তার চেয়েও বড় আশঙ্কার জায়গা হলো কৃষি। দেশে ২৭ লাখ টন ইউরিয়ার চাহিদার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। বোরো মৌসুমে জ্বালানি ও সারের ঘাটতি থাকলে উৎপাদন ২৫-৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে। প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকার জ্বালানি ভর্তুকি দেয়া সরকারের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। ৪টি সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ২৩ শতাংশ পাওয়ার প্ল্যান্ট অকেজো হয়ে পড়া আমাদের শিল্প উৎপাদনকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশে ১২ কেজি এলপি গ্যাসের মূল্য ৩৮৭ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে এক কোটি পরিবার এলপিজি’র উপর নির্ভরশীল। এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য যেটা বিইআরসি করেছে তাহলে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়ার একটা আশঙ্কা করা যাচ্ছে। রেস্টুরেন্টে এজন্য মূল্য বাড়তে পারে। সবমিলিয়ে মূল্যস্ফীতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে পারে ১০ থেকে সাড়ে ১০ শতাংশের মধ্যে।
ফায়দা লুটছে ইসরাইল, বেকায়দায় ট্রাম্প
ইসরাইল এই যুদ্ধে ইরানকে চিরতরে স্তব্ধ করার একটি ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হিসেবে দেখছে। সাদ্দাম হোসেন বা মুয়াম্মার গাদ্দাফির মতো শক্তিশালী কোনো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী এখন নেই, তাই ইসরাইলের পূর্ণ মনোযোগ এখন ইরানের দিকে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার কথা বললেও মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। ইরান একটি বড় দেশ এবং তাদের জাতীয়তাবাদী চেতনা অত্যন্ত শক্তিশালী। এই যুদ্ধ ইরান সরকারকে তাদের জনগণের কাছে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ইরানের এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাও ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। এই ‘স্ট্র্যাটেজিক ওভাররিচ’ বা অতিরিক্ত কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কাল হতে পারে।
ডনাল্ড ট্রাম্প হয়তো কল্পনাও করেননি যে, এই যুদ্ধ এতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। মধ্যপ্রাচ্যে গ্রাউন্ড ইনভেশন বা স্থল অভিযান চালালে মার্কিন সেনাদের ক্যাজুয়ালটি বা প্রাণহানি কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, যা ট্রাম্পের রাজনৈতিক কফিনে শেষ পেরেক ঠুঁকে দিতে পারে। যুদ্ধের পরিণতি যাই হোক, নৈতিকতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে পরাজিত হয়েছে। আর বাংলাদেশসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো এই ‘ওয়ার অফ চয়েস’-এর চড়া মূল্য দিয়ে যাচ্ছে।
ইতিহাসের পাতা থেকে দেখলে ১৯৫৬ সালে যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স মিশরে সুইচ চ্যানেলে একটি সামরিক অভিযান করেছিল ইসরাইলের সহযোগিতায়। সেই যুদ্ধে মিশরকে পরাজিত করা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের চাপে সুইচ চ্যানেলের দখল তারা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের করুণ সমাপ্তির পথ তখনই। যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬ সালে এসে ইরানের উপর যে আক্রমণ করেছে। এটা ইসরাইলের স্বার্থ মাথায় রেখেই করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখানে একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে স্কেটস রয়েছে। সেটাকে কি হুমকির মুখে ফেলে দিলো? চীন ও রাশিয়া এই যুদ্ধ থেকে ইতিমধ্যে অনেক সময় পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তি দেখার। রাশিয়ার মাসিক আয় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে তেল থেকে। চীন এখান থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে নিজেকে বিকল্প হিসেবে ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। একটি পুরনো প্রবাদ আছে ‘ডোন্ট স্টপ ইয়োর এনিমি ফর্ম মেকিং আউট অব দ্য স্টেট’। যুক্তরাষ্ট্রের এই হঠকারিতার জন্য ভবিষ্যতে চীন ও রাশিয়া কী অনেক উপকৃত হবে।