সাম্প্রতিক

রাজপথের ঐক্য থেকে সংসদের মুখোমুখি অবস্থান

ড. মাহফুজ পারভেজ | মতামত
এপ্রিল ১৮, ২০২৬
রাজপথের ঐক্য থেকে সংসদের মুখোমুখি অবস্থান

জুলাই বিপ্লবের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে ত্রিমাত্রিক বাস্তবতায়। প্রথম পর্বটি ছিল সহযোগিতার। তারপর ভোটের মাঠে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। আর এখন সংসদীয় রাজনীতিতে চলছে দ্বন্দ্বের পালা। ফলে দেশের প্রধান দু’টি দল এখন ক্রমশ রাজপথের ঐক্য থেকে সংসদের মুখোমুখি অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে, ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিলের জাতীয় সংসদ অধিবেশনে। রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার এই চলমান ও জীবন্ত বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত ঐক্যের মধ্যে থাকবে, নাকি বিভেদের ফাটল তৈরি করবে- এটাই আপাতত বড় প্রশ্ন। 
 

আলোচ্য অধিবেশনের সংসদীয় কার্যক্রমে দেখা গেছে, সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণ-এই তিনটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দল সরাসরি মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে এটি কেবল একটি স্বাভাবিক সংসদীয় বিতর্ক মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরে গেলে বোঝা যায়, এখানে মূলত রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েই একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব কাজ করছে। এই দ্বন্দ্ব যদি ঐক্য ও সমঝোতার পরিসর পেরিয়ে যায়, তাহলে রাজনীতিতে বড় আকারের ফাটল তৈরির আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
 

সংবিধান প্রশ্নেই এই দ্বন্দ্ব সবচেয়ে প্রকট দেখা গেছে। বিরোধী দল যেখানে একটি মৌলিক সংস্কারের দাবি তুলছে-অর্থাৎ রাষ্ট্রের কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন চেয়েছে-সেখানে সরকার তুলনামূলকভাবে একটি নিয়ন্ত্রিত পথ বেছে নিতে চাইছে। তারা সরাসরি বড় ধরনের সংস্কারে না গিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যার মাধ্যমে ধাপে ধাপে সংশোধনের দিকে এগোনোর কথা বলা হচ্ছে। এই পার্থক্যটি কেবল কৌশলগত নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গিগত। একপক্ষ পরিবর্তনকে দেখছে জরুরি ও কাঠামোগত হিসেবে, অন্যপক্ষ সেটিকে দেখছে প্রক্রিয়াগত ও নিয়ন্ত্রিত রূপান্তর হিসেবে। ফলে এই প্রশ্নটি সংসদের ভেতরে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
 

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতেও একই ধরনের টানাপড়েন স্পষ্ট হয়েছে। যে সনদ একসময় আন্দোলনের মাঠে ঐক্যের প্রতীক ছিল, সংসদে এসে সেটিই এখন বিতর্কের উৎস হয়ে উঠেছে। বিরোধী দল এই সনদের দ্রুত ও পূর্ণ বাস্তবায়ন দাবি করে বলেছে, আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবের জন্য তা জরুরি। অন্যদিকে সরকার এই বাস্তবায়নকে সময়সাপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখতে চাইছে। ফলে সংসদীয় আলোচনায় এই ইস্যু শুধু নীতিগত বিতর্ক নয়, বরং রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের একটি ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
 

রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থান একেবারেই বিপরীতমুখী। সরকার যেখানে ভাষণটিকে বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি বাস্তবসম্মত উপস্থাপন হিসেবে দেখছে, সেখানে বিরোধী দল সেটিকে অসম্পূর্ণ বা বাস্তবতা আড়ালকারী বলে সমালোচনা করছে। এই বিতর্কে আসলে প্রতিফলিত হচ্ছে বৃহত্তর একটি প্রশ্ন-দেশের বর্তমান অবস্থার মূল্যায়ন কীভাবে করা হবে এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা কী হবে।
সংসদের ভেতরের আচরণ ও কার্যপ্রণালী এই দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করে তুলেছে। বিরোধী দলের আনা মুলতবি প্রস্তাবকে ঘিরে বাকবিতণ্ডা সংসদকে উত্তপ্ত করেছে। এই ধরনের ঘটনা শুধু তাৎক্ষণিক উত্তেজনাই সৃষ্টি করে না, বরং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতিকে আরও দৃশ্যমান করে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ‘গণভোটের রায় উপেক্ষা’ করার অভিযোগ উত্থাপন এই অবিশ্বাসকে আরও রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে সংসদের এই অধিবেশনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে: বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে সহযোগিতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি, কিন্তু প্রতিযোগিতা দ্রুত দ্বন্দ্বে রূপ নিচ্ছে। সংসদ, যা গণতান্ত্রিক সমঝোতার জায়গা হওয়ার কথা, সেখানে এখন একই সঙ্গে সংলাপ ও দ্বন্দ্ব-দুটোই পাশাপাশি চলছে।
 

এই বাস্তবতা অস্বাভাবিক নয়, বরং একটি রূপান্তরমান গণতন্ত্রের স্বাভাবিক লক্ষণ। তবে এখানে ঝুঁকিও রয়েছে। যদি এই দ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু যদি তা ক্রমশ আস্থার সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থার দিকে নিয়ে যায়, তাহলে সেই ঝুঁকি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই প্রভাবিত করতে পারে।
সুতরাং, মার্চ-এপ্রিলের এই সংসদ অধিবেশন কেবল একটি নিয়মিত আইনসভা কার্যক্রম নয়। এটি আসলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি প্রতিচ্ছবি-যেখানে একই সঙ্গে সহযোগিতার অবশিষ্ট ছায়া, প্রতিযোগিতার তীব্রতা 

এবং দ্বন্দ্বের উত্থান-তিনটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
 

তবে, বাংলাদেশের সামপ্রতিক রাজনীতিকে গভীর ভাবে বুঝতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় সেই উত্তাল জুলাইয়ের দিনগুলোর দিকে। তখন রাজপথে এক ধরনের বিরল ঐক্য দেখা গিয়েছিল-ছাত্র, তরুণ, রাজনৈতিক কর্মী, নাগরিক সমাজ-সবাই যেন একটি সাধারণ লক্ষ্যকে সামনে রেখে দাঁড়িয়েছিল। সেই লক্ষ্য ছিল একটাই: কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। তখন মতভেদ ছিল। কিন্তু তা ছিল গৌণ। মূল সুর ছিল এক-পরিবর্তন দরকার।
কিন্তু রাজনীতির এক অমোঘ বাস্তবতা হলো, আন্দোলনের সময় যে ঐক্য তৈরি হয়, ক্ষমতার রাজনীতিতে এসে তা আর আগের মতো থাকে না। কারণ আন্দোলন চালানোর জন্য যে ধরনের ঐক্য দরকার, রাষ্ট্র চালানোর জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সমঝোতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং কৌশল। জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঠিক এই পরিবর্তনটাই ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে।
 

প্রথমদিকে মনে হয়েছিল, আন্দোলনের শক্তিগুলো একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করবে-যেখানে ঐকমত্য হবে মূল ভিত্তি এবং বিভেদ থাকবে সীমিত। কিন্তু সময় যত এগোচ্ছে, ততই বোঝা যাচ্ছে যে, বাস্তবতা কল্পনা বা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। যারা একসঙ্গে লড়েছিলেন, তারাই এখন ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ সরকারে, কেউ বিরোধী আসনে। এই অবস্থানগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে ভাষা, অগ্রাধিকার, এমনকি দৃষ্টিভঙ্গিও।
এই পরিবর্তনের একটি বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনায়। শুরুতে এটি ছিল একটি সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রতীক-একটি নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর স্বপ্ন। কিন্তু এখন সেই সনদকে ঘিরেই দেখা যাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা। কেউ মনে করছেন দ্রুত ও গভীর সংস্কার ছাড়া এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। অন্যরা বলছেন, রাষ্ট্রকে একবারে নাড়িয়ে দিলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। তাই ধীরে ধীরে এগোনোই বুদ্ধিমানের কাজ। আবার কেউ কেউ পুরো বিষয়টিকে দেখছেন রাজনৈতিক বাস্তবতার চোখ দিয়ে-কী করা সম্ভব, কী করা সম্ভব নয়, সেই হিসাব কষে।
 

এই মতপার্থক্যগুলো খুব স্বাভাবিক, কিন্তু এগুলোই এখন সূক্ষ্ম ফাটলের রূপ নিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-বিচার ও দায়বদ্ধতা। অতীতের অন্যায়গুলোর বিচার কতোদূর হবে? এখানে কেউ চান পূর্ণ জবাবদিহি, আবার কেউ মনে করেন রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া স্থিতিশীলতা আসবে না। এই দ্বন্দ্ব নতুন নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই দেখা গেছে পরিবর্তনের মুহূর্তে বিচার ও স্থিতিশীলতার মধ্যে একটি টানাপড়েন তৈরি হয়। বাংলাদেশও এখন সেই দ্বান্দ্বিক বাস্তবতার মুখোমুখি।
 

সংসদীয় রাজনীতিতে এই দ্বান্দ্বিক বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। একই আন্দোলনের সহযোদ্ধারা এখন একে অপরের নীতির সমালোচনা করছেন। পাল্টা বক্তব্য দিচ্ছেন। রাজনৈতিকভাবে বিপরীত অবস্থান নিচ্ছেন। এটি গণতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক দিক। কিন্তু এর মধ্যেই ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে অবিশ্বাসের একটি আবহ। গতকালের সহযোদ্ধা আজকের প্রতিদ্বন্দ্বী-এই রূপান্তর যতটা স্বাভাবিক, ততটাই স্পর্শকাতর ও বিপজ্জনক। 
বিদ্যমান বাস্তবতাকে তাত্ত্বিকভাবে দেখলে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি অস্বাভাবিক নয়। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানে বহুবার দেখা গেছে, একটি আন্দোলন যখন সফল হয়, তখন সেই আন্দোলনের ভেতরেই থাকা বিভিন্ন শক্তি পরবর্তীতে ক্ষমতা ও প্রভাবের জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। আন্দোলনের সময় যে ঐক্য ছিল, তা মূলত একটি সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু সেই শত্রু সরে গেলে ভেতরের পার্থক্যগুলো সামনে চলে আসে। ইতিহাসের দিকে তাকালেও একই চিত্র দেখা যায়-বিপ্লব বা পরিবর্তনের পর ঐক্য নয়, বরং বিভাজনই বেশি প্রকট হয়।
 

তাহলে কি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দূরত্ব বাড়ছে? উত্তরটি সরল নয়। কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবেই দূরত্ব তৈরি হচ্ছে-বিশেষ করে নীতিগত প্রশ্নে, মতাদর্শিক প্রতিযোগিতায় এবং রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ এখনো ঘটেনি। একটি ন্যূনতম ঐকমত্য এখনো টিকে আছে, বিশেষ করে গণতন্ত্র পুনর্গঠন এবং কর্তৃত্ববাদবিরোধী অবস্থানের ক্ষেত্রে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশ এখন এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে ঐক্য ও বিভেদ সুপ্তভাবে-একসঙ্গে চলছে। একদিকে আছে আন্দোলনের স্মৃতি, অন্যদিকে আছে ক্ষমতার বাস্তবতা। এই দুইয়ের টানাপড়েনই বর্তমান রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করছে।
 

আগামী দিনে এই টানাপড়েন কোনদিকে যাবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি রাজনৈতিক শক্তিগুলো মতভেদ সত্ত্বেও একটি ন্যূনতম সমঝোতা বজায় রাখতে পারে, তাহলে এই রূপান্তর গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু যদি বিভেদ ক্রমেই গভীর হয়ে বিরাট ফাটল তৈরি করে তীব্র মেরূকরণের দিকে যায়, তাহলে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়বে।
জুলাইয়ের আন্দোলন বাংলাদেশকে কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা দেয়নি,  একটি নৈতিক ভিত্তিও তৈরি করেছিল। এমন একটি বিশ্বাস দিয়েছিল যে, গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অর্জন সম্ভব। কিন্তু ক্ষমতার বাস্তবতায় প্রবেশের পর সেই বিশ্বাস এখন একটি কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
 

আশার কথা হলো, ঐক্যের যে অভিজ্ঞতা তখন গড়ে উঠেছিল, তা এখনো সম্পূর্ণ বিলীন হয়নি। তবে সেই ঐক্যের ওপর ভর করেই এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। যেখানে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা একসঙ্গে সহাবস্থান করছে। অর্থাৎ, অতীতের সংহতি বর্তমানের রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে ঠিকই, কিন্তু সেটি এখন আর একক নিয়ামক নয়, তা প্রতিনিয়ত নতুন প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্কের সঙ্গে সমন্বয় করে এগোচ্ছে।
রাজনীতিতে সমন্বয় অটুট থাকা মানে শুধু সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সুম্পর্ক বজায় রাখা নয়,  একটি কার্যকর রাজনৈতিক বোঝাপড়া টিকে থাকা, যেখানে মৌলিক প্রশ্নগুলোতে (সংবিধান, নির্বাচন, বিচার, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা) পারস্পরিক আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে না। এই আস্থার উপস্থিতি গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণতন্ত্র কেবল প্রতিযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না, টিকে থাকে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা আর কার্যকর সহযোগিতার মিলিত উপস্থিতি ও ভারসাম্যের ওপর।
 

যদি এই সমন্বয় ও ভারসাম্য অটুট থাকে, তাহলে প্রতিযোগিতাও ইতিবাচক চরিত্র ধারণ করে। বিরোধী দল সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে, সরকার বিরোধী মতকে সম্পূর্ণভাবে দমন না করে একটি কাঠামোর মধ্যে রাখবে আর এর মাধ্যমে সংসদ কার্যকর থাকবে, নীতিনির্ধারণ চলবে এবং জনগণের আস্থা ধীরে ধীরে দৃঢ় হবে। এই অবস্থায় মতভেদ থাকলেও তা ব্যবস্থার ভেতরেই সমাধানযোগ্য থাকে।
 

কিন্তু রাজনীতিতে এরূপ সমন্বয় ও ভারসাম্য ভেঙে গেলে যে ফাটল তৈরি হয়, সেটি ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। প্রথমত, বিশ্বাসের সংকট (crisis of trust) তৈরি হয়। সরকার মনে করে বিরোধী দল শুধু বাধা দিচ্ছে আর বিরোধী দল মনে করে সরকার তাদের সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করছে। এই পারস্পরিক সন্দেহ রাজনীতিকে সংলাপ ও সমঝোতা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। দ্বিতীয়ত, এই ফাটল সংসদীয় কার্যক্রমকে অকার্যকর করে দিতে পারে। বিতর্ক তখন আর নীতিনির্ভর থাকে না। তা হয়ে ওঠে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার কৌশল। ফলাফল হয় মারাত্মক। আইন প্রণয়ন ধীর হয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার থেমে যায়। সংসদ তার মূল ভূমিকা হারাতে শুরু করে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব যদি প্রাতিষ্ঠানিক সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে তা রাস্তায় নেমে আসে। তখন সংঘাত বাড়ে, মেরূকরণ তীব্র হয় এবং রাজনীতি আবার অস্থিরতার দিকে ধাবিত হয়। ইতিহাস বলে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কখনো কখনো অগণতান্ত্রিক শক্তির জন্য সুযোগ তৈরি হয়।
 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ফাটল যদি গভীর হয়, তাহলে জুলাইয়ের আন্দোলন যে নৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল- সেই বিশ্বাসই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষ যদি দেখতে পায় যে ঐক্যের প্রতিশ্রুতি ভেঙে গিয়ে কেবল ক্ষমতার দ্বন্দ্বই প্রাধান্য পাচ্ছে, তাহলে গণতন্ত্রের প্রতি তাদের আস্থা কমে যায়। আর গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখানেই-যখন জনগণ বিশ্বাস হারাতে শুরু করে।
 

তাই রাজনীতিতে ভারসাম্য ও সমন্বয় অটুট থাকা মানে শুধু রাজনৈতিক সৌজন্য নয়। গণতন্ত্রের স্থায়িত্বের পূর্বশর্ত। আর সেই সমন্বয় ভেঙে গিয়ে যদি বিভেদের ফাটল বিস্তৃত হয়, তাহলে তা ধীরে ধীরে পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দিতে পারে। ফলে রাজপথের ঐক্য থেকে সংসদের মুখোমুখি অবস্থানে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোকে সামগ্রিক পরিস্থিতি আর ভবিষ্যতের বিপদ-আপদ বিবেচনা করেই পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
 

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।
 

মতামত'র অন্যান্য খবর