বি ত র্ক

বন্দরে বিদেশি অপারেটর ঘিরে সংশয় যে কারণে

জনতার চোখ প্রতিবেদক | মতামত
নভেম্বর ২২, ২০২৫
বন্দরে বিদেশি অপারেটর  ঘিরে সংশয় যে কারণে

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনায় সমুদ্র বন্দরের গুরুত্ব সব সময়ই বেশি। আর কন্টেইনারে করেই এখন পণ্যসামগ্রী পরিবহন করা হয়। কন্টেইনার টার্মিনাল তাই গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্র বন্দরের সক্ষমতা বলতে প্রধানত বোঝায় কন্টেইনার টার্মিনালের সক্ষমতা। যে বন্দর যত দ্রুত ও কম খরচে কন্টেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ সারতে পারে, তার সুনাম তত বাড়ে। এদিক থেকে আমাদের প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রামের সুনাম নেই। এর টার্মিনালগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে না, এমন অভিযোগ পুরনো। বন্দরের সেবাগ্রহণকারীরা স্বভাবতই বেশি অভিযোগ করে থাকেন। এ অবস্থায় হালে বন্দর ব্যবহারের মাসুল একযোগে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলে ব্যবসায়ীরা তীব্র আপত্তি জানান। তারা বলেন, এতে ব্যবসার ব্যয় বাড়বে। সে ক্ষেত্রে বিশেষত রপ্তানি বাণিজ্যে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হবে তাদের। গত ক’মাস ধরে টানা রপ্তানি আয় কমার খবর রয়েছে। এর অন্যান্য কারণও থাকতে পারে। আমাদের প্রধান রপ্তানিপণ্য তৈরি পোশাকের ব্যবসা মার খেলে অর্থনীতিই মার খেয়ে যাবে, এটা মনে করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। বন্দরের মাসুল বিপুলভাবে বাড়লে আমদানি পণ্যেও খরচ বাড়বে। তাতে আমদানি সূত্রে মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা রয়েছে পুরোপুরি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক কমে এসেছিল। এ অবস্থায় সেটা নতুন করে বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। সরকারও যেসব আমদানি করে থাকে, তাতে ব্যয় বাড়বে। 
 

এরই মধ্যে দু’টি কন্টেইনার টার্মিনাল বিষয়ে চুক্তি সইয়ের ঘটনা বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে একটি অবশ্য নদী বন্দর। রাজধানীর অদূরে পানগাঁওয়ে এ টার্মিনাল নির্মাণ করেছিল সরকার নিজে। প্রায় এক যুগ আগে নির্মিত টার্মিনালটি লাভজনকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছিল না বলে খবর রয়েছে। এখন সুইজারল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠানকে এটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সরকার আশা করছে, এতে কিছু অর্থ হাতে আসবে। এ ক্ষেত্রে লোকসান থেকে রেহাই পাওয়াই লক্ষ্য মনে হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নদীপথে কন্টেইনার আনার জন্যই এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এর সঙ্গে জড়িত কর্মীরা এখন অনিশ্চয়তায় আছেন কাজের নিরাপত্তা নিয়ে। তাদের নিশ্চয়ই অধিকার রয়েছে সে বিষয়ে জানার। অপর চুক্তি ডেনমার্কের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। তারা চট্টগ্রামের লালদিয়া চরে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা করবেন। এক পর্যায়ে এটি হস্তান্তর করা হবে সরকারের কাছে। তারা বড় বিনিয়োগ করতে যাচ্ছেন বলে সরকার জানাচ্ছে। এটাকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের সাফল্য বলেও বর্ণনা করা হচ্ছে। ঠিকমতো কাজ চললে ২০৩০ সাল নাগাদ লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল চালু হবে। এখানে বড় বড় জাহাজ ভিড়তে পারবে বলে জানানো হচ্ছে। এতে করে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা নাকি অনেক বাড়বে। এতে আমাদের ‘অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড’ বলে বর্ণিত বন্দরটির মানোন্নয়ন হবে, সন্দেহ নেই। শিল্প-বাণিজ্য উপকৃত হবে। তবে যে সময় ও প্রক্রিয়ায় এ দু’টি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সইয়ের ঘটনা ঘটেছে, তা জন্ম দিয়েছে নেতিবাচক আলোচনার। 
 

বলা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে দেখাচ্ছে অতি উৎসাহ। এ ধরনের কাজে নির্বাচনের মাত্র ক’মাস আগে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে যারা বন্দর পরিচালনার মতো কাজ বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার বিরোধিতা করতেন, তাদেরকেই অন্তর্বর্তী সরকারের কাজের সমালোচনা করতে দেখা যাচ্ছে। তাদের পক্ষ থেকে জোরালো বিবৃতিও দেয়া হয়েছে মিডিয়ায়। চুক্তির বিষয়বস্তু প্রকাশের দাবি তুলেছেন তারা। তবে সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, শর্ত অনুযায়ী এ ধরনের চুক্তির সমস্ত কিছু প্রকাশ করা সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল অপর এক বিদেশি অপারেটরকে দেয়ার বিষয়ও চূড়ান্ত পর্যায়ে। এর আগে বিগত সরকারের শেষ সময়ে পতেঙ্গা টার্মিনালে যুক্ত করা হয়েছিল আরেক বিদেশি অপারেটরকে। সত্যি বলতে কী, হাসিনা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বহাল রেখেই বন্দর পরিচালনা করতে চাইছে অন্তর্বর্তী সরকার। অনেক বিষয়ে তাদের মধ্যে গুরুতর মতপার্থক্য থাকলেও এ ক্ষেত্রে ঐকমত্যই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক সরকারের সব সিদ্ধান্ত পরবর্তী সরকার এসে বাতিল করে দেবে, এটা অবশ্য কাজের কথা নয়। বিশেষত আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ‘নীতির ধারাবাহিকতা’ বজায় রাখার ওপর জোর দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমান সরকার তো নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার নয়। গণ-অভ্যুত্থানের পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে আসা এ সরকার বন্দর পরিচালনার মতো কৌশলগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তা পরবর্তী সরকারের জন্য রেখে দেয়াই ভালো ছিল বলে মত রয়েছে। সমুদ্র বন্দর কেবল অর্থনীতি-সংশ্লিষ্ট বিষয় হলে কথা ছিল। এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তাও জড়িত বলে মত প্রকাশ করা হচ্ছে। 
 

তাছাড়া আমাদের তো অনেকগুলো সমুদ্র বন্দর নেই। আর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই সিংহভাগ বাণিজ্য পরিচালিত হয়ে থাকে। সেজন্য এ বন্দরের যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে চারদিক বিবেচনা করে দেখা এবং সব অংশীজনের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা করে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। দু’টি চুক্তি সইয়ের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয়েছে বলেই সমালোচকরা মনে করছেন। সরকারের ‘উদ্দেশ্যে সততা’ থাকলেও স্বচ্ছতার অভাবে এ ক্ষেত্রে সমালোচনা হচ্ছে বেশি। একই সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের আমলে, সার্বভৌম সংসদে আলোচনার মাধ্যমে নেয়া হলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতো কম। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম মামলার রায় প্রদানের দিন ওই দু’টি চুক্তি সই হওয়াতেও অনেকে সন্দিহান হয়ে পড়েছেন। এ বিষয়ে সবকিছু প্রকাশের দাবি এ কারণেও জোরালো। 
 

বন্দরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে একের পর এক যুক্ত করার বিষয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাস এতই বেশি যে, নিউমুরিং টার্মিনাল চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়া বন্ধ করতে রিট করা হয়েছে হাইকোর্টে। এ সংক্রান্ত আইন ও নীতিমালায় একটি অন্তর্বর্তী সরকার এমন চুক্তিতে উপনীত হতে পারে না বলে রিটকারী আইনজীবী দাবি করছেন। আমরা আদালতের নিষ্পত্তি দেখার অপেক্ষায় থাকলাম। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার সময় এটি আকর্ষণে কোনো সরকার উদ্যোগী হলে তাতে আপত্তির কারণ তো নেই। তবে কোন ক্ষেত্রে, কী শর্তে এবং কতোটা স্বচ্ছতার সঙ্গে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে আনা হচ্ছে; সেটা অবশ্যই খতিয়ে দেখার বিষয়। একটি অন্তর্বর্তী সরকার মূল কাজে কম মনোযোগী হয়ে এ ধরনের কাজে বেশি নিবেদিত হলে সেটা নিয়ে সন্দেহ বাড়বে, এটাও স্বাভাবিক। রিট যখন হয়েছে, সে ক্ষেত্রে আমরা আশা করবো আদালত জনমনে সৃষ্ট সন্দেহ নিরসনে সরকারকে বক্তব্য প্রদান করতে বলবে। যে দু’টি চুক্তি এরই মধ্যে সই হয়েছে, সেগুলো দীর্ঘমেয়াদি বলে এর ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। জাতীয় স্বার্থের জন্য হানিকর চুক্তি নিয়ে আমরা তো কম সংকটে নেই। এজন্য বিগত সরকারটি খুবই সমালোচিত। অন্তর্বর্তী সরকারও তেমন ঝুঁকি নিচ্ছে কিনা, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। চুক্তি ক্ষতিকর হলে তা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগের বিষয়টিও জানা প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের ‘অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড’, এটা এই বন্দর সংক্রান্ত যেকোনো নতুন উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে।
 

মতামত'র অন্যান্য খবর