পার্শ্ব ভাবনা

অজানা পথে ঢুকছে দেশ?

খায়রুল আনোয়ার | মতামত
নভেম্বর ২২, ২০২৫
অজানা পথে ঢুকছে দেশ?

দেশ কি ক্রমেই এক অজানা পথে ঢুকছে? এই পথের শেষ কোথায় সম্ভবত তা কারও জানা নেই। গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে নাকি গণভোট আগে, এই জটিলতার অবসান ঘটিয়েছেন স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে। তবে গণভোট নিয়ে বিতর্ক চলছেই। মোট ৪টি বিষয়ের ওপর মাত্র একটি প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেয়ার ব্যবস্থায় গণভোটের কি পরিণতি হয়, তাও অনিশ্চিত। নির্বাচন কমিশন আগামী মাসের প্রথম দিকে তফসিল ঘোষণা করবে। প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ইতিমধ্যে ২৩৬ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী অনেক আগেভাগেই ৩০০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে পুরোপুরি গণসংযোগে নেমে পড়েছে। এনসিপি কয়েকটি আসনে মনোনয়ন প্রকাশ করে বাদবাকি আসনের জন্য অন্য দলের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছে। এত কিছুর পরেও দেশ যেন নির্বাচনী আমেজ থেকে অনেক দূরে। জনমনে এখনো ঘুরে ফিরে একই প্রশ্ন, নির্বাচন কি হবে? সাধারণ মানুষের মাঝে নানা ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে। প্রধান উপদেষ্টার ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে ‘সেরা নির্বাচন’ আয়োজনের ঘোষণা সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারছে না। নির্বাচনের ট্রেনযাত্রা শুরু হয়েছে- অনেক আগেই এমন ঘোষণা দিয়েছেন সরকারের বেশ কয়েক উপদেষ্টা। তবে নির্বাচনী ট্রেন ঠিকঠাক মতো গন্তব্যে পৌঁছাবে কিনা- তা নিয়েও অনেকের মনে রয়েছে সংশয়। সামগ্রিকভাবে দেশে বিরাজমান অবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এই সংশয়ের প্রধান কারণ।
 

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। পলাতক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলার রায়ের আগে কয়েকদিন ধরে সারা দেশে অসংখ্য নাশকতার ঘটনা ঘটে। রায়ের তারিখ নির্ধারণের দিন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতারা সামাজিক মাধ্যমের ‘লকডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। এরপর দেয়া হয় ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি। এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ককটেল বিস্ফোরণ, পেট্রোল বোমা হামলা, এম্বুলেন্সসহ বেশ কিছু যানবাহনে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে গাছ ফেলে মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে পরিবেশ উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে, বাংলামোটরে এনসিপি অফিসের অদূরে। সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে ‘ঢাকায় বেশি ককটেল, বাইরে বেশি আগুন ও সড়ক অবরোধ’। প্রধান উপদেষ্টার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যালয়েও আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংবাদপত্রের তথ্য অনুসারে, ১০ই নভেম্বর থেকে ৮ দিনে ঢাকাসহ সারা দেশে  ৪২টি যানবাহনে আগুন দেয়া হয়েছে। আগুনে দগ্ধ হয়ে দুই বাস চালকের মৃত্যু হয়েছে।
 

এসব ঘটনায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, নির্বাচন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতোটা অনুকূল থাকবে? প্রার্থী ঘোষণার কয়েকদিন পর চট্টগ্রামে গণসংযোগকালে গুলিবিদ্ধ হন বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ। তিনি চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। এই নির্বাচনী প্রচার অভিযানে গুলির ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন এক যুবক। রাজধানীতে সূত্রাপুরে জনসমক্ষে ধাওয়া করে গুলি ছুড়ে এক যুবককে হত্যা করে হেঁটে চলে যায় দুই সন্ত্রাসী। আদালত থেকে বেরিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন ওই যুবক। ১৭ই নভেম্বর রাজধানীর মিরপুরে দোকানে ঢুকে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সংবাদপত্রের তথ্য অনুসারে ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ ক্রমেই সক্রিয় হচ্ছে, বাড়ছে অস্ত্রের ব্যবহার, সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে অস্ত্র। সমকালে ১৮ই নভেম্বর প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, অপরাধীদের হাতে এখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে এবং পরবর্তী সময়ে অনেক অস্ত্র-গুলি সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেছে। পুলিশের লুট হওয়া ১ হাজার ৩৪২টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। গত ১৫ মাসে চট্টগ্রামে ৩৫ খুন, এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ২২, একই সময়ে খুলনায় ৪১টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কমপক্ষে ১৫টি ঘটেছে রাজনৈতিক বিরোধের কারণে।
 

এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলার নাজুক অবস্থা তুলে ধরে। তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী ময়দানের অবস্থা কি দাঁড়াবে, তা এক বিরাট জিজ্ঞাসা। গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে বিভাজন বেড়েছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছে অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বর্তমানে  কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতারা। বিদেশে বসে তারা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে কর্মসূচির ঘোষণা দিচ্ছেন। দেশে সংঘটিত হচ্ছে নানা ধরনের নাশকতার ঘটনা। রাজনৈতিক দলগুলোর বিভাজনের মধ্যে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। গত ১৩ই নভেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তা না হলে জাতি এক মহাবিপদের সম্মুখীন হবে।’ প্রশ্ন হচ্ছে, প্রধান উপদেষ্টার এই সতর্কবার্তা কি রাজনৈতিক দলগুলো অনুধাবন করতে পারবে? বাস্তব অবস্থা দেখে তা মনে হয় না।
পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। পতিত ও পলাতক শক্তির নানামুখী তৎপরতা বাড়তে পারে। ইতিমধ্যে মৃত্যুদণ্ডের রায় ‘কারচুপিপূর্ণ ও পূর্বনির্ধারিত’ বলে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মানবজমিনের খবরে বলা হয়েছে, রায়ের তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়ায় ভারতের অজ্ঞাত স্থান থেকে প্রতিক্রিয়া দেন তিনি। প্রতিক্রিয়াটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেছেন, এই রায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার দাবি, এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা উদ্দেশ্য নয়। অন্তর্বর্তী সরকার ও তার উপদেষ্টাদের ব্যর্থতার ওপর থেকে বৈশ্বিক নজর সরাতেই এই রায় দেয়া হয়েছে। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এই অভিযোগগুলো হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নিয়ে যেতে। পাশাপাশি ন্যায্যতার ভিত্তিতে পরিচালিত ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি হতে তার কোনো ভয় নেই বলে শেখ হাসিনা জানান (মানবজমিন, ১৮ই নভেম্বর)।
 

রায় ঘোষণার আগে শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে একই কথা বলেছিলেন। অর্থাৎ তিনি বলেছেন, ‘রায় কি হবে এটি জানা আছে।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখা এবং আসন্ন নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হলে দেশে সহিংসতা হবে। এর অর্থ হচ্ছে, জয় এক ধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রাখলেন। এ থেকে সহজেই ধারণা করা যায় যে, আওয়ামী লীগ নির্বাচন ভণ্ডুল করার যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। চালাবে নানামুখী তৎপরতা। তাদের একটি লক্ষ্য হবে, বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচন বানচাল করা অথবা বিতর্কিত করা।
 

প্রফেসর ইউনূসের সরকার আকাশছোঁয়া আকাঙক্ষা নিয়ে সংস্কারের পরিকল্পনা করেছিলেন। জনপ্রশাসন, পুলিশ, স্বাস্থ্য, নারী, গণমাধ্যমসহ অন্যান্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতির বিষয়ে সরকার এক ধরনের নীরব ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। প্রায় নয় মাস ধরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন লাগাতার সংলাপ করে যে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছে, তাও বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেনি। সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে যেসব প্রস্তাব দেয়া হয়েছে এবং পরবর্তীতে যার ভিত্তিতে আদেশ জারি হয়, আগামীতে তা গভীর সংকট তৈরি করবে- সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এমনটাই মনে করেন। দীর্ঘ ১৫ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও অন্তর্বর্তী সরকার জনমনে আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এখনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের তৃতীয় দিনে বলেছেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো না চাইলে এবং তারা যদি সমস্যা সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে দেখবেন যে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা থেকে আশঙ্কা এসে যাচ্ছে।’ বিএনপি মহাসচিব সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, আমরা একটা অস্থিরতার মধ্যে বাস করছি। অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে না পারলে রাজনীতির আকাশে মেঘ ঘনীভূত হবে। দেশ এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবিত হবে।
লেখক: কলামিস্ট 
 

মতামত'র অন্যান্য খবর