ধারাবাহিকভাবে পাঁচটি শূন্যের যোগফল কতো? এ প্রশ্নের উত্তর মেলানোর জন্য গণিত সম্পর্কে খুব বেশি গভীর জ্ঞান রাখার প্রয়োজন পড়ে না। সুস্পষ্টভাবে বললে, শূন্য। এর সঙ্গে আরও এক বা একাধিক শূন্য যোগ করলেও তার ফলাফল শূন্যই হতো। এই সমীকরণ জানা থাকার পরও ইসলামী শরীয়াহ-ভিত্তিক পরিচালিত আর্থিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়া পাঁচটি ব্যাংককে (ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক) একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে সে প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত হয়েছে। এর নাম দেয়া হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। প্রশ্ন হলো, যে লক্ষ্য অর্জনে এই ব্যাংকের যাত্রা, তা কতোটা সফল হতে পারে? নাকি আরও অধিকতর দুর্বল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে এই ব্যাংক? বস্তুত, ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগ বাংলাদেশে এই প্রথম হলেও বিশ্বে এমন উদাহরণ আরও রয়েছে। অপ্রীতিকর হলেও সত্য যে, হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া সব উদ্যোগ সফল হয়নি। আর যেসব উদ্যোগ সফল হওয়ার উদাহরণ ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে ছিল সরকারের ইতিবাচক মনোভাব, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি এবং খোদ সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা।
এক্ষেত্রে সরকারের যে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে, এ উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমেই তা স্পষ্ট। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা নতুন ব্যাংকটির উপর নজরদারি কতোটা কঠোর রাখতে পারবে, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, নতুন যে ব্যাংকটির যাত্রা হচ্ছে সেটির মালিকানা থাকবে সরকারের হাতে। আমাদের দেশে যে কয়েকটি সরকারি ব্যাংক রয়েছে, তাদের আর্থিকভাবে সফল হওয়ার নজির কম। এসব ব্যাংকের সেবার মান নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে জনমনে। আর আমাদের এখানে কাঠামোগত একটি সমস্যা হলো, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর নীতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ দ্বারা নির্ধারণ হয় বিধায় বাংলাদেশ ব্যাংক সেগুলোর উপর হস্তক্ষেপ করতে পারে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি মূলত থাকে বেসরকারি মালিকানার ব্যাংকগুলোর উপর। যেসব প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে নতুন এ ব্যাংকটি গঠিত হচ্ছে, বেসরকারি মালিকানায় থাকার কারণে সেটি দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিতে। সেক্ষেত্রে, নতুন ব্যাংকটির পরিচালন প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত কিছু সমস্যার উদ্ভব স্বভাবতই হতে পারে, যেটা খুব সহজে সমাধান করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
মনে রাখা দরকার, কোনো ব্যাংকের অস্তিত্ব টিকে থাকার সম্ভাবনা নির্ভর করে তার আমানতকারীদের আস্থার ওপর। আমানতকারীদের আস্থা সুদৃঢ়? থাকলে একটি দুর্বল ব্যাংকও সবল করা যায়। আর আমানতকারীদের আস্থায় চিড় ধরলে একটি সবল ব্যাংকও সহসাই পরিণত হয় দুর্বল ব্যাংকে। অব্যাহতভাবে লুটপাটের শিকার হওয়া এই পাঁচ ব্যাংকের ওপর আমানতকারীদের আস্থা এখন নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়। নতুন আমানতকারী ও আমানত আসা তো পরের কথা, বিদ্যমান আমানতকারীরা ওত পেতে আছেন সুযোগ বুঝে সমুদয় আমানত তুলে আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো আছে এমন কোনো ব্যাংকে সরিয়ে নিতে। এভাবে গ্রাহকরা অব্যাহতভাবে তাদের আমানত তুলে নিলে নতুন ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াবে কীভাবে? নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে ব্যাংকটিকে পুনরায় দেয়া হবে বেসরকারি মালিকানায়। স্বল্প সময়ে সরকারি মালিকানায় থাকার বিষয়টি যখন অনেকটাই স্পষ্ট, তখন ব্যাংকটিতে নতুন আমানত আসার ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যায়। দেশে বেসরকারি খাতের একটি ব্যাংকের নাম পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকে অবশ্য বলতে পারেন, এ কারণেও সম্প্রতি যাত্রা করা ব্যাংকটিতে নতুন আমানত আসতে পারে। ইতিমধ্যে ব্যাংকটির জন্য নতুন স্কীম আনার ঘোষণাও দিয়েছেন গভর্নর। বলা বাহুল্য, বাজারে আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো হিসেবে চিহ্নিত ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান স্কীমের তুলনায় সেগুলো কতোটা আকর্ষণীয় হবে, তার ওপরও অনেকটাই নির্ভর করছে নতুন আমানতের সম্ভাবনা।
আরেকটি বিষয় হলো, কোনো ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো করার জন্য তার খেলাপি ঋণ উদ্ধার করা সমানভাবে জরুরি। এই দিকটিতে নজর কতোটা কার্যকর ভাবে দেয়া হচ্ছে এবং দেয়া হলেও তা আদতে কতোটা কাজে আসবে, সেটাও প্রশ্ন সাপেক্ষ। কারণ, চট্টগ্রামকেন্দ্রিক একটি বিশেষ শিল্পগোষ্ঠী সহ আরও যারা এসব ব্যাংক লুটপাটে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের পেছনে ছিল তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ মদত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার শতভাগ সহযোগিতা। স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাটি যদি তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করতে পারতো, তাহলে পরিস্থিতি হয়তো এতটা খারাপ হতো না। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক থেকে ঋণের নামে বের হয়ে যাওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে পাচার হওয়া টাকা উদ্ধার করা কতোটা সম্ভব হবে, সেটা বলা যায় এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। বাস্তবতা হলো, খেলাপি ঋণের টাকা যদি উদ্ধার করা সম্ভব না হয়, তাহলে পাঁচ শূন্যের যোগফল ইতিবাচক হওয়ার আশা শুধু দুরাশাতেই পরিণত হতে পারে।
এটা অনেকেরই জানা, সেবামুখী কোনো প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে হলে তার কর্মীদের রাখতে হয় উদ্দীপ্ত। যাতে তারা সেলফ মোটিভেটেড হয়ে নিয়োজিত থাকে স্বদায়িত্বে। নতুন গঠিত ব্যাংকটিতে এমন মনোভাবসম্পন্ন কর্মী এখন কতোজন রয়েছেন, তা ভেবে দেখার বিষয়। তারা বরং চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। এরমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবার ঘোষণা দিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মীদের বেতন কমানো হবে বিশ শতাংশ। কোনো প্রতিষ্ঠান যখন আর্থিক সমস্যায় পড়ে, তখন এমন সিদ্ধান্ত অবশ্য স্বাভাবিক। তবে দ্রব্যমূল্য এবং জীবনযাত্রায় ব্যয় যখন ক্রমাগতভাবে ঊর্ধ্বমুখী, এমন পরিস্থিতিতে বেতন-ভাতা কমিয়ে কোনো কর্মীর কাছে কাজের ক্ষেত্রে শতভাগ উদ্দীপনার আশা কতোটা সঙ্গত? অনেকে হয়তো এ মত দেবেন, তাদের বেতন-ভাতা লক্ষ্য অর্জনভিত্তিক করে দিতে। কিন্তু এটা করা হলে কর্মী অসন্তোষ বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানটি ভেতর থেকে হয়ে পড়বে আরও বেশি দুর্বল।
প্রসঙ্গত বলা দরকার, গত একযুগে ব্যাংকিং প্রযুক্তির যে হারে উন্নয়ন হয়েছে খাতটিতে নিয়োজিত কর্মীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এর সঙ্গে নিজেকে এখনো খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। আর তাদের একটি অংশ রয়েছে ব্যবস্থাপনার ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে। একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকেও এমন কিছু কর্মী থাকা অসম্ভব নয়। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মীদের বেতন-ভাতা হ্রাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারকেও এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, বেশি বেতনের নন পারফরমিং কোনো কর্মীকে চাকরিতে বহাল রাখা হয়নি। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বরং তাদের চাকরিতে বহাল রাখা বা না রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে সবার আগে। তবে এও মনে রাখা দরকার যে, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যাংক খাতের বর্তমান চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারা কারও প্রতি যেন করা না হয় অবিচার। এক্ষেত্রে পাওনা পরিশোধপূর্বক স্বেচ্ছায় অবসরের নীতি প্রস্তাব করা গেলে তাতে কর্মীদের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া মিলবে বলেই মনে হয়।
অবশ্য এ ধরনের পরিস্থিতিতে যৌক্তিক কারণে প্রতিষ্ঠান কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও কর্মীদের মধ্যে দেখা দেয় অসন্তোষ। তবে সেই প্রক্রিয়া যাতে মানবিকভাবে সম্পন্ন হয়, সেটাও রাখতে হবে বিবেচনায়। এরই মধ্যে খবর এসেছে যে, কোনো কোনো ব্যাংক তাদের কর্মীদের বেতন দিচ্ছে গ্রাহকের আমানত থেকে। প্রফেশনালিজম তো বটেই, ব্যাংকিং চর্চা এটাকে অ্যালাউ করে কিনা, সেটাও বড় এক প্রশ্ন। এজন্য অবশ্যই মনে রাখতে হবে, কর্মীদের প্রতি মানবিকতা দেখাতে গিয়ে গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা যাতে বিঘ্নিত না হয়। আমরা জানি, চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ওই বিশেষ শিল্প গ্রুপের মালিকানাধীন অন্য ব্যাংক থেকেও সম্প্রতি চাকরি হারিয়েছেন আরও কয়েক হাজার কর্মী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অসন্তোষও নানাভাবে দৃশ্যমান। এসব সাবেক ব্যাংকারের নেতিবাচক প্রচারণায় আবার গ্রাহকদের একটি অংশ হচ্ছেন প্রভাবিত। ব্যাংক খাত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন প্রতিনিয়ত যেমন নেতিবাচক আলোচনা হচ্ছে, আগে এতটা কখনো হয়েছে বলে মনে হয় না। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো যদি গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে চায়, সবার আগে সেটা শুরু করতে হবে চাহিবামাত্র কাক্সিক্ষত পরিমাণ আমানত ফেরত দিয়ে। মনে রাখা জরুরি, সমস্যায় থাকা শরীয়াহ’র ভিত্তিতে পরিচালিত দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংকটি কিন্তু গ্রাহকের পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে এই উপায়ে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কী সহসাই পারবে ওই অবস্থায় পৌঁছাতে? মনে হয়, পারবে না। আর যদি পারেও, সেটা হবে একটা মিরাকল। মনে রাখা চাই, নতুন প্রতিষ্ঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ওই অবস্থায় পৌঁছতে আদৌ পারবে কিনা, সেটা নিয়ে কিন্তু সন্দেহ রয়েছে খোদ নীতি নির্ধারকদেরও। একই সুরে কথা বলতে শোনা যাচ্ছে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত বিশেষজ্ঞদের। তাহলে নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কী?
হয়তো একটা পর্যায়ে গিয়ে এই ব্যাংকটিকে অবসায়নের দিকেই যেতে হবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু একে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টার মধ্যদিয়ে জনসাধারণের করের যেসব টাকা খরচ হবে, সেটা তো আর কখনো ফেরত আসবে না। সরকার চাইলে এ ব্যাংকগুলো সরাসরি অবসায়নের দিকে যেতে পারতো। প্রয়োজনীয় আইন না থাকলে সেটা তৈরি করে নিয়ে হলেও এ প্রক্রিয়ায় যাওয়া সম্ভব ছিল নির্দলীয় এ সরকারের পক্ষে। এখন এও বলা হচ্ছে, ব্যাংকটিকে ভবিষ্যতে বেসরকারি মালিকানায় পুনরায় ছেড়ে দেয়া হবে কিনা কিংবা কবে দেয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে নির্বাচিত দলীয় সরকার। কোনো দলীয় সরকারের পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ অবশ্য অতটা সহজ নয়। কেউই চাইবে না এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নিজেদের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ করতে। এ অবস্থায় স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, বিড়ালের গলায় তাহলে ঘণ্টা বাঁধবে কে? কার সিদ্ধান্তে নির্ধারণ হবে এ ব্যাংকের চূড়ান্ত ভাগ্য? পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে দলীয় সরকারের জন্য বালিশ খেলার মতো অন্যের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে নিজেকে বাঁচানোর মতো একটি ইস্যু হয়ে থাকলো, সম্ভবত। আর এই সিদ্ধান্তের বলি হবেন নিরীহ আমানতকারীরা। Í
লেখক: ব্যাংকার