কান টানলে মাথা আসার মতোই জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট উপস্থিত হলে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেয় আমাদের দেশে। আমরা যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়েছি, সেগুলোর সিংহভাগই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এ ক্ষেত্রে আমরা আবার প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হলেও আমরা সৌরবিদ্যুতের দিকে যেতে পারিনি তেমন; যাওয়ার জোর প্রচেষ্টাও নিইনি। এদিকে যেতে পারলে গ্রীষ্মকালে অন্তত দিনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় অনেক ক্ষেত্রেই সৌরবিদ্যুৎ বা সোলারের সহায়তায় চলতে পারতাম। সেচকাজের পাশাপাশি কারখানায়ও সোলার ব্যবহার করে প্রচলিত উৎসের বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে পারতাম। শুরুর দিকে এ জন্য খরচ হয় বেশি; তবে পরে রক্ষণাবেক্ষণ বাদে তেমন ব্যয় নেই। প্রকৃতি সূর্যালোক থেকে বঞ্চিত না করলে এ ক্ষেত্রে কোনো সংকট হাজির হওয়ার কথা নয়। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা তো ভালোই। ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে সামনে আনা যায়। বিদ্যুৎ নিয়ে পাকিস্তান আমাদের চাইতেও বেশি সংকটে ছিল। দ্রুতই সোলারে অগ্রগতি আনতে পারায় তারা এখন কিছুটা স্বস্তিতে। অন্যদিকে আমরা খাবি খেতে শুরু করেছি। ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ ঘিরে জীবাশ্ম জ্বালানির বাজার অস্থির না হলেও এই গ্রীষ্মে আমরা লোডশেডিংয়ে পড়তাম।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের যে কাঠামোয় আছি, তাতে অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা থাকলেও লোডশেডিংয়ের শিকার হওয়াটা যেন আমাদের নিয়তি। বসিয়ে রাখা উৎপাদন ক্ষমতার জন্য ভাড়া পরিশোধের দায় থেকেও মুক্তি মিলছে না। চাহিদার বিবেচনায় এত বেশি উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনও নাকি ছিল না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার কেন সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে এ ধরনের উদ্যোগে ঢুকে পড়েছিল, এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা তারাও দিতে পারেনি। আ’লীগের শাসনামলেই এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল। বিশেষ করে এটা বলা হচ্ছিল, অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতার ভাড়া পরিশোধ তথা ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে সরকার বিদ্যুতের দাম অব্যাহতভাবে বাড়াচ্ছে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের চাপও রয়েছে যে, সরকার যেন ভর্তুকি কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনে। আইএমএফের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ কর্মসূচিতে ঢুকে পড়াতেও এ ধরনের চাপ বেড়েছিল। তাতে জনজীবনে বেড়ে যাচ্ছিল মূল্যস্ফীতির চাপ। কলকারখানায় বাড়ছিল উৎপাদন ব্যয়। অর্থনীতি, বিশেষত কর্মসংস্থানের জন্য জরুরি রপ্তানি খাতও ব্যয় বৃদ্ধির চাপে ভুগছিল। তারপরও প্রতি গ্রীষ্মে লোডশেডিং দিতে হতো এমনকি শিল্পে। গ্রামে তো লোডশেডিং হতোই। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পেয়ে গ্রামাঞ্চলে গড়ে ওঠা ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলোও সংকটে পড়ছিল। সেচে ডিজেলের ব্যবহার কমানো যাচ্ছিল না। এবার ইরান যুদ্ধের চাপে পরিস্থিতি আরও খারাপ কিংবা খারাপ হতে যাচ্ছে। ধান-চাল উৎপাদন ব্যাহত হয়ে খাদ্য নিরাপত্তা সংকটে পড়ে কিনা, এমন শঙ্কার কথাও অনেকে বলছেন।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার একটি উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ অবশ্য নেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কিন্তু আছে নীতির ধারাবাহিকতা। খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামলে গৃহীত জ্বালানি নীতিতে বিদ্যুতের নতুন উৎস হিসেবে পারমাণবিক প্রযুক্তির দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। তবে এ ধারায় উদ্যোগ গ্রহণ করে এক-এগারোর পর আসা শেখ হাসিনার সরকার। রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পাবনার রূপপুরে দুই ইউনিটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নেয়া হয়। এ বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য ইতিমধ্যে আগ্রহী সবার জানা হয়ে গেছে; কেননা ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে এর একটি ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে এরই মধ্যে। প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন ছিল। হাসিনা সরকারের পতনের পর এর চুক্তিতে বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগে মামলাও হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এ প্রকল্প বাস্তবায়নে দফায় দফায় বিলম্বও হয়েছে। সেটা না হলে এরই মধ্যে দু’টি ইউনিটই হয়তো চালু করে ফেলা যেতো। এ জন্য আবার প্রধানত দায়ী আরেকটি চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া না জড়ালে তাদের সহায়তায় এ প্রকল্পের কাজও এগিয়ে যেতো বলে ধরে নেয়া যায়। যুদ্ধটি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় এখনো আছে রাশিয়া। এ সূত্রে দেশে দেশে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হচ্ছে। তার সঙ্গে কাজে যাওয়া দেশগুলোও সংকটে। তবে এসব বাধা পেরিয়ে আমরা রূপপুরে নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন শুরু করতে পেরেছি, এটা কম কথা নয়। গ্রীষ্মের শুরুতে লোডশেডিং দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ার সময়টায় এখান থেকে কিছু বাড়তি বিদ্যুৎ আসার সম্ভাবনা অন্তত জেগেছে। তবে আগস্টে সেই ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেতে পেতে এর চাহিদাও কিছুটা কমে আসবে। ভরা বর্ষায় ও বোরো মৌসুমের পর বিদ্যুতের চাহিদা কমে। তবু আমরা চাইবো, রূপপুর প্রকল্প কোনো রকম অঘটন ছাড়া পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদনের দিকে যাবে। দ্বিতীয় ইউনিটও ক্রমে উৎপাদনে আসবে।
ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অভিজ্ঞতা অনেক দেশেরই রয়েছে। অভিজ্ঞতা অবশ্য বিচিত্র। এর ঝুঁকির দিকটি প্রযুক্তিজ্ঞানে সমৃদ্ধ দেশও উপেক্ষা করে না। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একাধিক বড় দুর্ঘটনার অভিঘাতের কথা তো কারও অজানা নয়। দেশ আর কালের গণ্ডি ছাড়িয়েও এর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তৃত হতে দেখা গেছে। এতে করে উন্নত কিছু দেশও পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হয়েছে। জনমতের চাপে পিছিয়ে আসার ঘটনাও কম নয়। এরই মধ্যে আমরা কোন বাস্তবতায় ও কোন সাহসে এ ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদনে এগিয়ে গেলাম আর এত ব্যয়বহুল প্রকল্প গড়লাম, সেটা নিয়ে বিতর্ক চলমান। একটি জনবহুল ও ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে এ ধরনের প্রকল্প ঝুঁকিমুক্তভাবে যুগের পর যুগ পরিচালনার সক্ষমতা আমরা কতো দিনে অর্জন করবো, সে প্রশ্নও রয়েছে। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ নিয়ে পরিবেশবাদীদের আপত্তি কম। এর জ্বালানি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে যদিও প্রশ্ন আছে। অবশ্য চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া নিজ দেশে নিয়ে গিয়ে তার মতো করে এটা পুঁতে ফেলার কথা। তারপরও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তো উপেক্ষা করা যায় না। তবে এ বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে স্থিতিশীলভাবে। একবার চালু হলে অন্যান্য কেন্দ্রের মতো এটা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনাও প্রায় শূন্য। পুনরায় চালুর জন্য একটা বিশ্রামকাল রয়েছে কেবল। আর এর উৎপাদন ব্যয় জীবাশ্ম জ্বালানি দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের চাইতে কম। প্রকল্প ব্যয় কম রাখা গেলে উৎপাদন ব্যয় আরও কম পড়তো। তবে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে এর আয়ুষ্কাল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যাবে। তাতে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে হয়তো কমে আসবে আরও। নিয়মিতভাবে এর জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম প্রাপ্তির বিষয়টিও নিশ্চিত বলে জানা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বিতর্কিত শুল্ক চুক্তিতেও প্রক্রিয়াটি সংকটে পড়বে না বলে জানা গেল।
কী ধরনের ঋণে এমন প্রকল্প আমরা বাস্তবায়ন করছি অর্থাৎ এর দায়দেনা বহন কতোটা কষ্টকর হবে, সে প্রশ্ন অবশ্য রয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমাদের দায়দেনা তো কম নয়। এখান থেকে বেরিয়ে একটা স্বস্তিকর জায়গায় যাওয়াটা নির্বাচিত সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভালো হতো এরই মধ্যে উচ্চ কর-শুল্ক কমিয়ে সোলারে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে পারলে। তাতে সরকার সম্ভাব্য কর হারালেও দীর্ঘমেয়াদে রেহাই পেতো অব্যাহতভাবে ভর্তুকি জুগিয়ে দায়দেনা বাড়ানোর মতো পরিস্থিতি থেকে। ভিয়েতনামসহ কিছু দেশের অভিজ্ঞতা সে কথাই বলে। বায়ু ও জলবিদ্যুতে আমাদের সম্ভাবনা অবশ্য কম। সোলারে বেশি। এর মধ্যে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে এগিয়ে যেতে পারলেও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে আমরা কমাতে পারতাম কয়লা আমদানি। সংকটে পড়ে এখন কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে বেশি। আদানি থেকে যে বিদ্যুৎ পাচ্ছি, সেটাও কয়লায় উৎপাদিত। ভালো যে, ইরান যুদ্ধে কয়লার সরবরাহ সরাসরি বিঘ্নিত হয়নি। তবে গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে কয়লার চাহিদা বাড়ায় এর দামে তো কিছু প্রভাব পড়বেই। দেশে প্রাপ্ত কয়লাও আমরা সেভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। এতে নাকি দাম আরও বেশি পড়ে যাবে। গ্যাসে যেটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, তাতে আবার আমদানিকৃত এলএনজি’র অংশই বেশি। এর দাম তো প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে যুদ্ধের প্রভাবে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় সরকারকে হয়তো এর দামও বাড়াতে হবে। তারেক রহমান সরকারকে দায়িত্ব নিয়েই এমন এক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যার পুরোটা অনুমান করা অসম্ভব ছিল।
এটা অবশ্য এখন ধরে নিতে হবে, যুদ্ধ থেমে গেলেও জীবাশ্ম জ্বালানির বাজার আগের মতো আর থাকবে না। এটা আগের ধারায় ফিরতেও অনেক সময় নেবে হয়তো। এর সরবরাহ আগের মতো থাকবে না ধরে নিয়েই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে আমাদের এগোতে হবে। এ অবস্থায় এমনকি পশ্চিমা দেশগুলোর অভিজ্ঞতা মাথায় নিয়ে যেতে হবে বিকল্পের দিকে। অন্তত বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বাড়াতে এবং নতুন উৎসগুলোয় জোর দিতে হবে। এর একটি অবশ্যই সোলার। আগামী বাজেটেই এ খাতে যতটা সম্ভব প্রণোদনা বাড়িয়ে দিতে হবে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। রূপপুরে আরও দু’টি ইউনিট গড়ে তোলার কথা সরকার ভাবছে বলে জানা যায়। তবে সে ক্ষেত্রে এগোতে হবে আরও বুদ্ধি-বিবেচনা প্রয়োগ করে। যে অভিজ্ঞতা রূপপুরে হয়েছে, সেটা মূল্যবান। তবে ঝুঁকিমুক্তভাবে প্রকল্পটি পরিচালনা করে সুফল নেয়া দরকার আগে। জনজীবন ও অর্থনীতিতে বিদ্যুতের চাহিদা অব্যাহতভাবে বাড়িয়ে যাওয়াও কাজের কথা নয়। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানোর দিকেও যাওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন কৃচ্ছ্রসাধন। এমনকি উন্নত বিশ্ব যেদিকে যেতে চাইছে, সেদিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে রাখা তো যাবে না।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট