হালচাল

কঠিন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ সরকারের মূল্যায়নও কঠিন

হাসান মামুন | মতামত
মে ১৬, ২০২৬
কঠিন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ সরকারের মূল্যায়নও কঠিন

সময় দ্রুত গড়িয়ে যায়। এই তো সেদিন জাতীয় নির্বাচন হলো। একই সঙ্গে সংস্কার প্রশ্নে গণভোট। রাষ্ট্র সংস্কার একটি বড় এজেন্ডা হিসেবে হাজির হয়েছিল গণ-অভ্যুত্থানের পর। অভ্যুত্থানের সামনের কাতারে যারা ছিলেন, তাদের প্রভাব বেশি থাকায় এটি ঘটেছিল। শুধু অন্তর্বর্তী সরকারে নয়; ওই সময় সমাজেও তাদের প্রভাব বেড়ে গিয়েছিল। তবে ধীরে ধীরে সেটা কমে আসে। বাড়ে মাঠে থাকা প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি’র প্রভাব। বিএনপিও গণ-অভ্যুত্থানে ছিল; কিন্তু নির্বাচনের দাবি থেকে নড়েনি। সংস্কার আলোচনায়ও দলটি অংশ নেয়। এখন অবশ্য তাদের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচন আদায়ের জন্য সংস্কার প্রশ্নে কিছুটা কৌশল অবলম্বন করেছিলেন তারা। তাতে নির্বাচনটা হয়েছে এবং এতে বিএনপি বিপুলভাবে জয়লাভ করে ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। 


ক্ষমতায় ফিরে আসার পথটা বিএনপি’র জন্য খুবই কঠিন ছিল, এটা সবার জানা। তবে দীর্ঘদিনের নানা ক্ষয়ক্ষতির পর হাতে পাওয়া একটি দেশ পরিচালনা কতো কঠিন, এটা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার টিমের সদস্যরাই ভালো জানেন। এ নিবন্ধ বাজারে আসতে আসতে তার সরকারের তিন মাস পূর্ণ হয়ে যাবে। তিন মাসে একটি সরকারের মূল্যায়ন করা কঠিন। তা সত্ত্বেও অনেকেই মূল্যায়নে প্রয়াসী হবেন। কাজের মূল্যায়নের পাশাপাশি তার চ্যালেঞ্জগুলো বুঝতে চাওয়াও জরুরি। কী পরিস্থিতিতে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, সেটা সবারই জানা। তবে এ বিষয়েও সবাই একমত হবেন না। ভিন্নমত থাকবে। এটা গণতান্ত্রিক সমাজেরই বৈশিষ্ট্য। ভিন্নমতের চর্চা বরং বাড়ানো দরকার। 
ইরান যুদ্ধের প্রভাবের মধ্যে পড়তে না হলে তারেক রহমান সরকারের শুরুটা কেমন হতো, সেটা আসলে কারও পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল ছিল সেই সময়টায়। অন্তর্বর্তী সরকারও বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ মোটামুটি সন্তোষজনক জায়গায় রেখে গিয়েছিল। ব্যাংক খাতে অস্থিরতা কিছুটা কমে এসেছিল সাবেক গভর্নরের চেষ্টায়। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে শেয়ার বাজারেও ভালো সংকেত যাবে- এমন প্রত্যাশা ছিল। আর মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় এটা আবার বেড়ে গেছে গত এপ্রিলে। এ মুহূর্তে বাজারে বড় খবর- ডিমের দাম ১৫০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া। মাসখানেক আগেও এর ডজনপ্রতি দাম ছিল ১১০ টাকা। ইরান যুদ্ধে জ্বালানির দাম বাড়ায় সরকার বাধ্য হয়ে দেশে এর দাম বাড়ায়। তাতে ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের লম্বা লাইন উধাও হয়েছে। কিন্তু পরিবহন ব্যয় বাড়ায় ডিমের পাশাপাশি সবরকম পণ্যের দাম বাড়ছে। আবার অনেক বৃষ্টিপাত হচ্ছে এ সময়টায়। সে কারণে বাজারে নতুন আসা সবজির দাম বাড়তি। হাওরের একাংশে বোরো ধান মার খেয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাসের আর্থিক প্রণোদনা দেবে সরকার। ধান রক্ষা করা গেলে এটা জোগাতে হতো না। ধানটাও বাজারে আসতো। বোরো উত্তোলন শেষ পর্যন্ত কেমন হয়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। এর আবাদ শুরু হয়েছিল অন্তর্বর্তী শাসনামলে। ফসল উঠছে তারেক রহমান সরকারের সময়। তারা ধান-চাল কেনার জন্য দাম নির্ধারণ করেছেন। সেটা যথাযথ হলো কিনা, নাকি আরও বাড়াতে হবে- এসব আলোচনা এখন চলছে। 


এর মধ্যে পুলিশ সপ্তাহ হয়ে গেল। এবার অবশ্য সরকারের কৃচ্ছ্র সাধন কর্মসূচির কারণে চারদিনে কর্মসূচি শেষ করা হয়েছে। পুলিশের কিছু দাবি-দাওয়া প্রতিবারই তোলা হয়। এবারও ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা। ন্যায্য দাবিও ধীরে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া পে-স্কেলও ঝুলে আছে। আসছে বাজেটে এর নিষ্পত্তি হবে কিনা, সন্দেহ রয়েছে। তবে এসব দাবি পূরণ করতে না পারলেও জনপ্রশাসনকে সক্রিয় করতে হবে সরকারকে। তাকে যতটা সম্ভব জনকল্যাণে নিয়োজিত করতে হবে। পুলিশ তো আলাদা কিছু নয়; প্রশাসনেরই অংশ। তবে তাদেরকে সামনে থাকতে হয় বলে সমালোচনাটা বেশি হয় তাদের। গণ-অভ্যুত্থানে পুলিশকে কার্যত পালিয়ে যেতে হয়েছিল, সরকারের সঙ্গে। এরকম ঘটনার পর তাদের কাজে ফিরিয়ে আনা কতো কঠিন, সেটা যারা করেন তারাই জানেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর পর গত তিন মাসেও পুলিশকে আশানুরূপ ভূমিকায় দেখা যায়নি। পুলিশের পাশাপাশি প্রশাসন সাজিয়ে তোলার কাজ সম্পন্ন হয়েছে কিনা, বোঝা যাচ্ছে না। বেতন-ভাতা না বাড়িয়েও প্রশাসনকে কীভাবে কার্যকর করে তোলা যায়, সামনে সেই দক্ষতা দেখাতে হবে সরকারকে। এটাকে কার্যকর করা না গেলে যে আকারের বাজেটই সরকার দিক না কেন, সেটা বাস্তবায়ন করা যাবে না। দেশের মানুষের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীরাও দেখতে চাইবে, মেয়াদের প্রথম বাজেট সরকার যেন বাস্তবায়ন করতে পারে। খালি ব্যয় করলে হবে না; দক্ষতার সঙ্গে সেটা করতে হবে- যাতে মানুষ সুফল পায়। 


দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পর থেকে সামনে আসা হাম পরিস্থিতি সরকারকে ভোগাচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করে দ্রুতই ফিলিং স্টেশনের সমস্যা কাটানো গেছে; কিন্তু হামের শিকার হাজার হাজার শিশুকে তো সহজে সারিয়ে তোলা যাচ্ছে না। অতীতে টিকা সংগ্রহ আর টিকাদানে কখন কী হয়েছিল, সে বিষয়ে উদ্বেগজনক তথ্য মিলেছে। এ বিষয়ে তদন্তও চলমান বলে জানানো হয়েছে। সঠিকভাবে এর দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে সরকারকে। কিন্তু এরই মধ্যে চারশ’র বেশি শিশুকে আমরা হারিয়েছি। ৫০ হাজারের বেশি শিশু এরই মধ্যে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত, এটা বিশ্বে রেকর্ড। টিকাদান কর্মসূচিতে আমাদের সাফল্য তো কম ছিল না। শিশুদের কিছু রোগ নির্মূলের পথেই আমরা হাঁটছিলাম। এরই মধ্যে এই বিপরীতযাত্রার জন্য তারেক রহমান সরকার অবশ্য দায়ী নয়। তবে ঘটনাটি তার সরকারের আমলেই ঘটে চলেছে। টিকার ঘাটতি দূর করে নতুন করে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করায় সক্রিয়তা দেখিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে চিকিৎসা দিয়ে রোগীদের সারিয়ে তোলার কাজে সীমাবদ্ধতা যেমন আছে; সমন্বয়হীনতাও কম নেই। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে আসা শিশুদের রক্ষা করা যায়নি বলেই নাকি এত মৃত্যু! রাজধানীতেও রয়েছে জরুরি চিকিৎসা দেয়ার ক্ষেত্রে করুণ সীমাবদ্ধতা। এ অভিজ্ঞতার পর তারেক রহমান সরকারকে স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ নজর দিতেই হবে। করতে হবে ‘কৌশলগত বিনিয়োগ’। এক মেয়াদে অনেক কিছু করা হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু সরকার যদি এমন দু’-তিনটি কাজে দৃশ্যমান ও অর্থপূর্ণ সাফল্য দেখাতে পারে, সেটা মানুষ মনে রাখবে। 


জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষে এর মূল্যায়ন করছেন অনেকে। সরকারি ও বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্যই সংসদে নবাগত। প্রধানমন্ত্রী নিজে তাদের একজন। এটাকে অপেক্ষাকৃত তরুণদের সংসদ বলেই অভিহিত করা যায়। মন্ত্রিসভায়ও তাদের উপস্থিতি বেশি। এর শক্তির দিকটি হালকা করে দেখা যাবে না; দুর্বলতার দিকটিও নয়। জনগণ অবশ্য শক্তির সদ্ব্যবহারই দেখতে চাইবে। একটি বড় বিরোধী দল সংসদে রয়েছে, সেটাও গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। তবে তাদেরকে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এর মানে এই নয়, সরকারকে নেতিবাচক কাজেও সহায়তা জোগাতে হবে। এ চর্চা আমরা অতীতে দেখেছি। তাতে একটি বিরোধী দল রাজনৈতিক অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। সরকারের কাজের ওপর নজরদারি ও তার ন্যায়সঙ্গত বিরোধিতার জন্যই বিরোধী দল। সংসদের পাশাপাশি তারা রাজপথেও আন্দোলন রচনা করতে পারে। তবে কথায় কথায় রাজপথে যাওয়ার হুমকি মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে কিনা, সেটাও তাদের বিবেচনা করে দেখতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে তাদের অবস্থান হয়তো সরকারের চাইতে জোরালো। সেটা ঘিরে তারা নিজ জনসমর্থন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে পারে; কিন্তু একটি নির্বাচিত সরকারকে তো তার অপছন্দের সংস্কারে বাধ্য করা যাবে না। এ প্রশ্নে তাকে হয়তো অজনপ্রিয় করে তোলা যাবে। সরকারকে সমালোচনার আরও যেসব সুযোগ ছিল, সেগুলোয় বিরোধী দলকে কিন্তু তেমন আগ্রহী দেখা যাচ্ছে না। তাদের মনে রাখতে হবে, তারাও যার যার আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন এবং তাদের দিকেও সবার দৃষ্টি রয়েছে। 


নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে দেশে ফিরে তারেক রহমান বিপুল জনসংবর্ধনা পেয়েছিলেন। তখন বলেছিলেন, তার একটি স্বপ্ন রয়েছে। পরমুহূর্তেই সংশোধন করে বলেন, আমাদের একটি স্বপ্ন আছে। এ স্বপ্ন তো নতুন নয়। দেশে নিয়মিতভাবে নির্বাচন হবে; সংসদ ঠিকমতো চলবে; সেখানে জরুরি সব প্রশ্ন আলোচিত হবে; সুশাসন বাড়ানোর প্রয়াস নেয়া হবে; স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাও বিকশিত হবে; গ্রাম পর্যন্ত মানুষ উন্নয়নের সুফল পাবে; বাজার অর্থনীতির মধ্যেও একটি ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে- এটাই তো স্বপ্ন। মুক্তিযুদ্ধে এটা ছিল মুক্তিপাগল মানুষের মনের গভীরে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও একই স্বপ্ন কাজ করেছে। কেননা, দীর্ঘদিনেও এর বাস্তবায়নের পথে আমরা যাইনি। বিপরীত দিকেই বরং গিয়েছি। তারেক রহমান ঠিকই বলেছেন, বেশি অতীত চর্চা করে ফায়দা নেই। আমাদের বেশি করে সামনে তাকাতে হবে। 


জ্বালানি ও হাম সংকট সামাল দিয়ে সরকারকে একটি গ্রহণযোগ্য বাজেট দিতে হবে। অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার নিয়মিত কাজগুলোও চালিয়ে যেতে হবে। ইট-পাথরের উন্নয়ন অনেক হয়েছে। তাতে দুর্নীতিও কম বাড়েনি। এবার ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা তথা ভেতরগত উন্নয়নে জোর দিতে হবে। যেটুকু সামর্থ্য রয়েছে, দক্ষতার সঙ্গে সেটা কাজে লাগানো জরুরি। সরকার নানা ধরনের কার্ড বিতরণ করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মনোযোগী হয়েছে দ্রুত। এটা তার সদিচ্ছার প্রকাশ ও স্বচ্ছতা। তবে এসব ব্যয়ের পাশাপাশি রাজস্ব আয়ের দিকেও জোর দিতে হবে। সরকারের ঋণ আরও বেড়ে যেতে দেয়া যাবে না। ১৮ মাসে দেশে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের। গোটা মেয়াদে বিদেশে এক কোটি নতুন কর্মজীবী পাঠানোর অঙ্গীকারও আছে। এগুলো করা গেলেই উন্নয়ন টেকসই হবে। তার জন্য দেশে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নও প্রয়োজন। ক্ষমতাসীন দলের দুর্বৃত্তদের সামলাতে না পারলে অর্থনীতির সর্বনাশও ঠেকানো যায় না। গত তিন মাসে এদিকে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে বলে কিন্তু দাবি করা যাবে না। 


লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মতামত'র অন্যান্য খবর