ভারতীয় উপমহাদেশে অনুপ্রবেশ নতুন কোনো সমস্যা নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই এটি চলছে। তখন বলা হতো শরণার্থী। এখন তা রূপান্তরিত হয়েছে অনুপ্রবেশে। আগে যা মানবিক সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হতো এখন তা পরিণত হয়েছে নিরাপত্তাজনিত সমস্যা হিসেবে। শুধু তাই নয়, অনুপ্রবেশ এখন আর শুধু সীমান্তকেন্দ্রিক কোনো সমস্যা নয়। এর প্রভাব এখন ভারতের মূল ভূখণ্ড জুড়ে গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে বলে মনে করেন ভারতের শাসকরা। ভারত সরকারের মতে, অনুপ্রবেশ সুদূরপ্রসারী সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিণতি সৃষ্টি করছে।
ভারতে অনুপ্রবেশ ঘটে নানা পথে। পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলঙ্কা থেকেও ভারতে অবিরত অনুপ্রবেশ হয়ে চলেছে। তবে পাকিস্তান থেকে সাধারণত সন্ত্রাসীদেরই অনুপ্রবেশ ঘটে। নেপাল ও ভুটান থেকে যে বেআইনি অনুপ্রবেশ ঘটে তা নগণ্য। একমাত্র বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকারীদের ঢল নিয়েই ভারত চিন্তিত বলে বিভিন্ন সরকারি পরিসংখ্যানে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে অভিবাসীদের নিরবচ্ছিন্ন আগমনের ফলে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং অন্যান্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জনসংখ্যার বিন্যাস বদলে দিয়েছে। জাতিগত ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়েছে, যার ফলে জমি, ভাষা এবং পরিচয় নিয়ে সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে।
মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ সামপ্রতিককালের সৃষ্টি। স্বাধীনতার আগে-পরে মিয়ানমার থেকে যে অনুপ্রবেশের ঢল দেখা গিয়েছে তা ছিল শরণার্থী। তবে সমপ্রতি বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের থাকতে দেয়ার পর থেকে ভারতেও এই সমস্যা তীব্র হয়েছে। তবে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশ থেকে নানা কারণে ভারতে অনুপ্রবেশ হয়েছে। এই অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে দুই ধরনের মানুষ আছেন। একদল বৈধ ভিসা নিয়ে ভারতে এসে আর ফেরত যাননি। তারা থেকে গিয়েছেন স্থায়ী ভাবে। কালের নিয়মে ভারতীয় পরিচয়পত্র বানিয়ে এখন তারা পুরোদস্তুর ভারতীয় নাগরিক। এদের মধ্যে অধিকাংশ হিন্দু জনগোষ্ঠীর মানুষ। আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যে কোটি কোটি বাংলাদেশের মানুষ এপারে চলে এসেছিলেন তাদের অধিকাংশ ফিরে গেলেও অনেকে থেকেও গিয়েছেন। তাদের ভারতে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য বিভিন্ন কাট অফ বছরও নির্ধারিত হয়েছে। আর একটি প্রবণতা হলো উপার্জনের তাগিদে ভারতে আসা। মূলত এরা সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকেই বেশি আসেন এবং ঝুঁকি নিয়েও অবৈধভাবে বসবাস করেন। এরা সবই বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ। অত্যন্ত গরিব। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এরা ভারতে এসে কাগজ কুড়ানো, পরিচারিকার কাজ এবং নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কায়িক শ্রমের কাজ করেন। এরা অধিকাংশই মওসুমি। মাঝে মাঝে ফিরে যান বাংলাদেশে। এমনও দেখা গেছে, বেআইনি অনুপ্রবেশের জন্য ধরা পড়েও সাজার মেয়াদ শেষে তারা জীবিকার সন্ধানে ফের ফিরে এসেছেন। আসলে এই ধরনের অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সমস্যাই প্রধানত দায়ী।
অবশ্য অনুপ্রবেশের মাধ্যমে মানব পাচার, মাদক পাচারের মতো ঘটনা ঘটে। তবে সন্ত্রাসীদেরও অনুপ্রবেশ ঘটে। এর বহু উদাহরণ রয়েছে। এরাই খাগড়াগড়ে বা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাসী মডিউল তৈরি করে বিপজ্জনক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন এবং এখানকার মানুষদেরও জেহাদিতে পরিণত করেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও এরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। আবার মিয়ানমার সীমান্তে সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠী সব সময় সক্রিয়।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনুপ্রবেশের সমস্যা রয়েছে। তবে সব জায়গায় এক মাপে নয়। ইউরোপীয় দেশগুলো অবশ্য সীমান্ত খুলে দিয়ে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছে। আবার মেক্সিকোর ৩১৪০ কিলোমিটার সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্র দুর্ধর্ষ দেয়াল তৈরি করেও অনুপ্রবেশ পুরোপুরি আটকাতে পারে নি। শেষ পর্যন্ত ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রেখে এবং ডিপোর্ট করার মাধ্যমে পরিস্থিতির মোকাবিলার চেষ্টা করেছে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অনুপ্রবেশ এখন স্পর্শকাতর বাক্যবন্ধ হয়ে উঠেছে। ভারতে এখন অনুপ্রবেশের রাজনীতি চলছে জোর কদমে। আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ জোরদার প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে। ভারতে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ তীব্র অভিঘাত তৈরি করে। এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপি নেতা থেকে শুরু করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অনুপ্রবেশকে প্রধান ইস্যু করে তুলেছিলেন। আর পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে বিজেপি’র সরকার গঠনের পর অনুপ্রবেশ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার কঠোর হাতে তা মোকাবিলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই সীমান্তের অরক্ষিত অঞ্চলে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার জন্য জমি হস্তান্তরের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আর এই খবরে তেতে উঠেছেন বাংলাদেশের অনেকে। এমনকি বাংলাদেশের মন্ত্রীরাও কড়া কড়া মন্তব্য করেছেন। ফলে ভারতও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃনির্মাণের যে চেষ্টা চলছে তাতে আঘাত লাগতে চলেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বাংলাদেশের অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা স্পষ্টতই একটি রাজনৈতিক বার্তা যা বিজেপি’র নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একটি প্রতীকী পদক্ষেপ।
ভারতের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, অনুপ্রবেশ সমস্যাটি এখন আর শুধু সীমান্ত অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। অবৈধ অভিবাসীরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে পাঞ্জাব এবং উত্তরাখণ্ড থেকে কর্ণাটক পর্যন্ত মূল ভূখণ্ডের গভীরে পৌঁছে গেছে। সরকারের মতে- দিল্লি, হায়দরাবাদ, গুরুগ্রাম, দিল্লি, মুম্বই এবং পুনের মতো প্রধান শহরগুলোতে অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে, যা নগর পরিষেবা এবং আবাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। বেশির ভাগ নথিপত্রহীন অভিবাসী কৃষি, নির্মাণ এবং গৃহকর্মে নিযুক্ত থাকে, সস্তা শ্রম দিয়ে বাজারকে প্লাবিত করে। এটি মজুরি কমিয়ে দেয় এবং স্থানীয় শ্রমিকদের বাস্তুচ্যুত করে। এ ছাড়াও, অনেক অনুপ্রবেশকারী অপ্রাতিষ্ঠানিক বা ধূসর অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত, যারা গবাদি পশু পাচার, মাদক চোরাচালান, জাল মুদ্রা এবং অবৈধ বাণিজ্যে লিপ্ত। এই কার্যকলাপগুলো শুধু আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিকেই দুর্বল করে না, বরং সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলোকেও শক্তিশালী করে, যাদের কয়েকটির সঙ্গে সন্ত্রাসী যোগসূত্র রয়েছে।
ভারত সরকার সীমান্ত এলাকার জনসংখ্যাগত পরিবর্তনকে শুধু স্থানীয় বিশৃঙ্খলা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মোকাবিলায়, সরকার একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জনসংখ্যাগত নিরাপত্তা মিশন গঠনের ঘোষণা দিয়েছে, যা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি দৃঢ় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
কিন্তু ভারতের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল ভোটব্যাংকের কৌশল অবলম্বন করেছে এবং জাল নথিপত্র তৈরিতে অবৈধ অভিবাসীদের সহায়তা করছে । তারা অনুপ্রবেশকারীদের সরকারি জমিতে, বিশেষ করে নদী তীরবর্তী এবং বনভূমিতে বসতি স্থাপনে সাহায্য করেছে। ২০২৫ সালের ১৫ই আগস্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লালকেল্লা থেকে ভাষণে এই ক্রমবর্ধমান হুমকির কথা তুলে ধরে সতর্ক করে বলেন যে, “অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা আমাদের যুবকদের রুটি-রুজি কেড়ে নিচ্ছে, আমাদের কন্যা ও বোনদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে এবং নিরীহ আদিবাসীদের বনভূমি দখল করে নিচ্ছে।” তবে ২০২৫ সাল থেকে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো শুরু হয়েছে। তবে আইনগত পদ্ধতি মেনে নয়। রাতের অন্ধকারে গোপনে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অভিবাসীদের ঠেলে দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশে। ইতিমধ্যে কয়েক হাজার অভিবাসীকে এইভাবে পুশব্যাক করা হয়েছে বাংলাদেশকে না জানিয়ে। যদিও ভারতের অভিযোগ, আইনি পদ্ধতি মেনে ২৮৫০টি প্রত্যর্পণের মামলা নিয়ে বাংলাদেশ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। ভারতের বিভিন্ন নাগরিক কমিটি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মতে, ভারত রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা হিসেবে যেভাবে অনুপ্রবেশ ইস্যুকে তুলে ধরেন তার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই বলেই মাত্র তিন হাজারের কম অভিবাসী নিয়ে সরকার প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নিয়েছেন। ভারতের বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সীমান্তে কড়া নজরদাবি সত্ত্বেও কীভাবে ব্যাপক হারে অনুপ্রবেশ ঘটছে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে আবার অনেকটাই পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের। আর এই সীমান্তের
২৫ শতাংশ বা ১০০০ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা বেড়াবিহীন। এই অংশের মধ্যে রয়েছে নদী ও পাহাড়ের মতো এলাকা। যেখানে বেড়া দেয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ। সুতরাং, শুধু বেড়া দিয়েই সীমান্ত সুরক্ষিত করে অনুপ্রবেশ বা চোরাচালানের মতো সমস্যা সমাধান করা যাবে না বলেই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত অনেকের অভিমত। সীমান্ত অঞ্চলে কাজ করা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতা বলেছেন, সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে দুর্নীতি এই সমস্যার গভীরে রয়েছে। তাই অনেকের মতে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বিএসএফের ওপর নিবিড় নজরদারি, নিয়মিত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রয়োজন রয়েছে।
প্রশ্নটা হচ্ছে, বাংলাদেশে রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ এত স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠেছে কেন? সীমান্তে বেড়া দেয়া যদি ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হয় তাহলে কি ভারতকে এই কাজ থেকে বিরত করা সম্ভব? আসলে বিষয়টির সঙ্গে জড়িত দু’পারের মানুষের নিবিড় যোগাযোগের প্রশ্নটি। আর বেড়া যে সীমান্ত অঞ্চলের গরিব মানুষের জীবনের ক্ষেত্রে কি রকম কাঁটা হয়ে ওঠে তা কি ভারত বা রাজ্য সরকার কখনো ভেবে দেখেছেন?