বিতর্ক

মেঘালয়ে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, নীরব আগ্রাসনের রাজনীতি

শহীদুল্লাহ ফরায়জী | মতামত
মে ৩, ২০২৬
মেঘালয়ে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, নীরব আগ্রাসনের রাজনীতি

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ‘উন্নয়ন’ শব্দটি প্রায় এক ধরনের নৈতিক বৈধতার আবরণে ঢেকে গেছে- যেন উন্নয়ন মানেই অগ্রগতি, আর অগ্রগতি মানেই ন্যায়। কিন্তু আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা এই সরল সমীকরণকে নির্মমভাবে ভেঙে দেয়। যেখানে এক রাষ্ট্রের উন্নয়ন অন্য রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে, সেখানে উন্নয়ন আর নিরপেক্ষ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার এক সূক্ষ্ম, কিন্তু গভীর প্রয়োগ।
এই উন্নয়নের ভাষ্যের আড়ালে নীরবে পরিবর্তিত হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, রূপান্তরিত হচ্ছে ভূ-প্রাকৃতিক ভারসাম্য, আর সবচেয়ে গভীরভাবে প্রভাবিত হচ্ছে নিম্নপ্রবাহের দেশ- বাংলাদেশের জলজ জীবন ও পরিবেশগত স্থিতি।
ভারতের মেঘালয় রাজ্যে মিন্তদু (Myntdu) ও কিনশি (Kznshi) নদীর ওপর একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা, যা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন পানিবণ্টন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
প্রভাব নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা কেবল পরিবেশগত নয়- এটি একটি মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে: যে নদী একাধিক রাষ্ট্রের ভূখণ্ড অতিক্রম করে, তার ওপর সার্বভৌম অধিকার কার?
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমাদের উত্তরের সীমান্তের ওপারেই ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড়। প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সবুজ অরণ্য অঞ্চলটি চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরামের মতো বৃষ্টিবহুল এলাকাকেও ধারণ করে আছে।


এই পাহাড় থেকে মিন্তদু নদী জৈন্তিয়া হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যা আমাদের কাছে সারি গোয়াইন নদ নামে পরিচিত। আবার কিনশি নদী সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে যাদুকাটা নাম নিয়েছে।
এই নদীগুলো মেঘনা অববাহিকার সুরমা নদীর শাখা। মেঘালয় সরকারের জলবিদ্যুৎ পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে মিন্তদু ও কিনশি নদীর ওপর অন্তত সাতটি বাঁধ নির্মিত হবে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় উদ্বেগ বয়ে আনতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইনে আন্তঃসীমান্ত নদী একটি ‘যৌথ সম্পদ’- কিন্তু বাস্তবে এই যৌথতা প্রায়ই একটি বিভ্রম। কারণ উজানে অবস্থানকারী রাষ্ট্র প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের বাস্তব ক্ষমতা অর্জন করে, আর ভাটির রাষ্ট্র সেই নিয়ন্ত্রণের পরিণতি ভোগকারী এক অনিশ্চিত সত্তায় পরিণত হয়। এই অসম সম্পর্কই জন্ম দেয় এক নতুন ক্ষমতার রাজনীতির- জল-রাজনীতি, যেখানে পানি হয়ে ওঠে কূটনৈতিক চাপ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার।
এই প্রকল্পগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো- এগুলো এককভাবে বড় নয়; বরং বহু ছোট প্রকল্পের সমষ্টি। কিন্তু এই ‘ছোটত্ব’ কোনো নিরাপত্তা দেয় না; বরং উল্টোভাবে এটি একটি বৃহৎ বিপর্যয়ের ভিত্তি তৈরি করে। বহু বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের সম্মিলিত প্রভাব একটি বড় বাঁধের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। যেখানে কোনো একক ভয়াবহ ক্ষতি দৃশ্যমান নয়, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো একটি বাস্তুতন্ত্র, একটি সমাজ, একটি অর্থনীতি।
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়, কৃষি বিপর্যস্ত হয়, এবং হঠাৎ পানি ছেড়ে দিলে বন্যার তীব্রতা বাড়ে। অর্থাৎ, ক্ষয় শুরু হয় জীবনের প্রতিটি স্তরে-ধীরে, নীরবে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে। এই প্রক্রিয়াকে ‘ধীরগতির সহিংসতা’ বলা যায়- যেখানে ধ্বংস তাৎক্ষণিক নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অনিবার্য।


এখানে আমরা একটি মৌলিক নৈতিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি-উন্নয়ন বনাম ন্যায়। উজানের রাষ্ট্র তার উন্নয়নের যুক্তি হিসেবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বলে। কিন্তু এই উন্নয়ন যদি ভাটির মানুষের জীবিকা, পরিবেশ ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে, তাহলে তা আর নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য থাকে না। উন্নয়ন তখন আর অগ্রগতির প্রতীক নয়; বরং হয়ে ওঠে আধিপত্যের একটি রূপ।
ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিই হলো-সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে থাকা মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, উন্নয়নের সুবিধা কেন্দ্রীভূত হয় শক্তিশালীদের হাতে, আর এর ক্ষতি ছড়িয়ে পড়ে দুর্বলদের মধ্যে। ফলে এই উন্নয়ন প্রকৃতপক্ষে ন্যায্যতার মানদণ্ডে ব্যর্থ।


এখানে আরেকটি গভীর প্রশ্ন উঠে আসে- রাষ্ট্রের ভূমিকা কী? একটি রাষ্ট্র যদি তার জনগণের অস্তিত্বমূলক স্বার্থ- পানি, পরিবেশ, জীবিকা- রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এটি একটি নৈতিক ব্যর্থতা। আন্তঃসীমান্ত নদী ইস্যুতে কার্যকর কূটনৈতিক ও আইনি অবস্থান নিতে ব্যর্থ হওয়া মানে জনগণের সার্বভৌম স্বার্থকে অবহেলা করা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো- পানি ক্রমেই একটি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। ভবিষ্যতের বিশ্বে ‘পানি নিরাপত্তা’ আর কেবল পরিবেশগত বিষয় থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় উপাদান। যে রাষ্ট্র পানি নিয়ন্ত্রণ করবে, সে-ই আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে প্রভাবশালী হবে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন এক নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। 


আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় কেবল প্রযুক্তিগত বা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার কাঠামো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি ন্যায্য ও মানবিক চুক্তি- যেখানে উন্নয়নকে পরিবেশগত ভারসাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে সমন্বিত করা হবে।
একই সঙ্গে, এই ধরনের সিদ্ধান্তে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কারণ নদী কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়- এটি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই নদী সম্পর্কিত যেকোনো বড় সিদ্ধান্তে জনগণের সম্মতি অনুপস্থিত থাকলে, সেই সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক বৈধতা হারায়।
অতএব-উজানের উন্নয়ন যদি ভাটির অস্তিত্বকে বিপন্ন করে, তবে তা উন্নয়ন নয়; এটি এক ধরনের নীরব ভূ-রাজনৈতিক আগ্রাসন।
এই আগ্রাসন দৃশ্যমান নয়, কিন্তু গভীর; এটি যুদ্ধের মতো হঠাৎ আসে না, বরং ধীরে ধীরে একটি জাতির জীবনরেখাকে ক্ষয় করে। বাঁধের গেট দিয়ে নিয়ন্ত্রিত পানির প্রবাহই তখন হয়ে ওঠে এক নতুন ধরনের ক্ষমতার ভাষা-যেখানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় নীরবে, কিন্তু স্থায়ীভাবে। 
 

লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
faraizees@gmail.com

মতামত'র অন্যান্য খবর