পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসছে। প্রথম দফা নির্বাচন ২৩শে এপ্রিল, দ্বিতীয় দফায় ২৯শে এপ্রিল। ফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৪ঠা মে পর্যন্ত। এবার নির্বাচন হচ্ছে দু’ দফায়। যা সামপ্রতিক সময়ে রাজ্যের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন। গত নির্বাচন হয়েছে আট দফায়। আর এবার নিরাপত্তার অভূতপূর্ব আয়োজন করেছেন নির্বাচন কমিশন। লক্ষাধিক আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ানকে অন্য জায়গা থেকে আনা হয়েছে। আবার রাজ্যের প্রশাসনিক ও পুলিশ স্তরে নিয়মিত অপসারণের মাধ্যমে বার্তা দেয়া হচ্ছে পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ দেয়া হবে না। নির্বাচনকে ভয়মুক্ত, হিংসামুক্ত, হুমকিমুক্ত, প্রলোভনমুক্ত, ছাপ্পাহীন, বুথ-জাম ছাড়াই নির্বাচন হবে বলে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসকে নজিরবিহীনভাবে সমাজমাধ্যমে ঘোষণার মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এবারের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে বিশেষ উত্তেজনার কারণ হলো ক্ষমতা ধরে রাখা বনাম ক্ষমতা দখলের লড়াই। টান টান উত্তেজনা সব শিবিরেই। প্রচারকে তুঙ্গে নিয়ে চলেছেন তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি’র শীর্ষ নেতারা। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে ততই উত্তেজনার পারদ বাড়ছে। নয়াদিল্লি থেকে ঘন ঘন উড়ে আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আনা হয়েছে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও উত্তর প্রদেশের যোগী আদিত্যনাথের মতো প্রচারকদের। নারী হিসেবে আনা হয়েছে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তকেও। আর মমতা ও অভিষেক গোটা রাজ্য চষে বেড়াচ্ছেন। তিনি চার/পাঁচটি করে সভা করছেন।
তবে এবার লড়াইকে মোদি ও মমতার ইমেজের লড়াইয়ে পরিণত করা হয়েছে। মমতা বহুদিন ধরেই বলে এসেছেন, প্রার্থী কে তা দেখার দরকার নেই। রাজ্যের ২৯৪টি আসনেই তিনি প্রার্থী। সোজা কথা, তার মুখ মনে করেই ভোট দেয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এবার মোদিও তার ইমেজকে সামনে তুলে ধরে প্রচার করছেন। বলছেন, দুর্বার ঝড় আসছে। পরিবর্তন হবেই। শেষ পর্যায়ে তিনিও মমতার মতোই বলেছেন তিনিই সব আসনে প্রার্থী। এটা মনে রেখে বদল আনুন। বদলের প্রয়োজন ব্যাখ্যা করে মোদি ডবল ইঞ্জিন সরকারের অপরিহার্যতা ব্যাখ্যা করেছেন।
কিছু কিছু হাই ভোল্টেজ কেন্দ্র নিয়ে অফুরন্ত আগ্রহও তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী হয়েছেন গতবারের জয় ধরে রাখার লক্ষ্যে। আর এই কেন্দ্রেই প্রধান বিরোধী দল বিজেপি শুভেন্দু অধিকারীকে প্রার্থী করেছে। যদিও শুভেন্দুকে মুখ্যমন্ত্রীর মুখ হিসেবে লড়াই করার কোনো ঘোষণা বিজেপি করেনি, তবে শুভেন্দুর জয় নিশ্চিত করতে গতবারের বিজয়ী কেন্দ্র নন্দীগ্রামেও প্রার্থী করা হয়েছে। আর ভবানীপুরে শুভেন্দুর জয়কে নিশ্চিত করতে অমিত শাহ নিজেকে বাজি ধরেছেন। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপি হলেও এক সময়ের প্রভাবশালী বামফ্রন্ট, কংগ্রেস, এসইউসিআই, আইএসএফ, নবগঠিত আমজনতা উন্নয়ন পার্টিও শাসক দলকে টক্কর দিয়ে লড়াইয়ে শামিল হয়েছে। এমনকি সুদূর হায়দ্রাবাদ থেকে উড়ে এসে রাজ্যের নির্বাচনে নাম লিখিয়েছেন আসাদুদ্দিন ওয়াইসি’র পার্টিও।
বিজেপিকে এক সাবেক এনএসজি কমান্ডোকে দাঁড় করাতে হয়েছে। ধরে আনতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এক সাবেক উপদেষ্টাকেও। এমনকি আরজি-কর হাসপাতালে ধর্ষিতা ও খুন হওয়া চিকিৎসকের মাকেও রঙ্গমঞ্চে নামানো হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস ঠিক নির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণার আগ মুহূর্তে দলে যোগ দেয়া ১৩ জনকে প্রার্থী করে বুঝিয়ে দিয়েছেন লড়াইয়ে ব্যক্তির গুরুত্বও কম নয়। তবে দলের নেতাদের মতে, ভোট হয় মমতাকে দেখে। নন্দীগ্রামে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে ১৭ই মার্চের আগে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেয়া শুভেন্দুর এক সময়ের ঘনিষ্ঠকে প্রার্থী করেছে। সিপিআইএমের মতো আদর্শবাদী দলও জয়ের লক্ষ্যে নন্দীগ্রাম থেকে তুলে এনে তরুণ তুর্কি মীনাক্ষি মুখোপাধ্যায়কে প্রার্থী করেছে উত্তর পাড়ায়। আবার দীপ্সিতা ধরকে টেনে এনেছে উত্তর দমদমে। আইএসএফ শেষ মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেসের বিক্ষুব্ধ নেতা আরাবুল ইসলামকে প্রার্থী করেছে।
তৃণমূল কংগ্রেস কখনো বাঙালি অস্মিতা আবার কখনো সংখ্যালঘুদের বার্তা দিয়ে লড়াই করছে সেখানে বিজেপি সনাতন ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রচার করছে। এদের সঙ্গে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের মতো কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের ডালপালা ছড়ানো কর্মীরা। এর মধ্যে বিভেদের রাজনীতির বীজ বপন করার লক্ষ্যে উত্তরে গোর্খাল্যান্ড ও কামতাপুরীর ধুয়ো তোলার চেষ্টা হচ্ছে বিমল গুরুং ও জীবন সিংয়ের হাত ধরে। আবার তৃণমূল কংগ্রেসের বহিষ্কৃত নেতা হুমায়ুন কবীর মুসলিম আবেগকে উস্কে দিয়ে ছত্রভঙ্গ করতে চাইছে অনেক সমীকরণ।
নির্বাচনে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা বা ক্ষমতা দখল ছাড়া সুনির্দিষ্ট অর্জনের কোনো লক্ষ্য নেই। প্রতিশ্রুতির বহর বিরাট। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য যেভাবেই হোক জয়ী হওয়া। ভোটারদের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করার এক চমৎকার ব্যবস্থা। এরই মধ্যে প্রচারের অঙ্গ হিসেবে কু-কথার স্রোত বইতে শুরু করেছে। ভোটাররা সে সব শুনে কি ভাবছেন তা ভাবার সময় কারোর নেই। ভোট হচ্ছে বহুমুখী। কোনো আসনে প্রার্থীর সংখ্যা। আবার কোনো আসনে ১৩, ১২, ১১ বা ১০ জন। সবচেয়ে কম প্রার্থী ৫ জন। ফলে কাটাকুটির অঙ্কে সমীকরণের দফারফা। বেশ কিছু আসনে গতবারের ব্যবধান ছিল সামান্য ভোটের। সেই কেন্দ্রগুলোতে ভাগ্য নির্ধারিত হবে কাটাকুটির অঙ্কে। রাজ্যে ভোটার কমেছে ৯১ লাখ। ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটার এবার এসআইআর প্রক্রিয়ায় কমে এসেছে ২৫ শতাংশে। মুসলিম ভোট ব্যাংকের উপর নির্ভরশীল দলগুলো তাই অনেকটাই শঙ্কিত। আবার কংগ্রেস ও বাম দলগুলো মুসলিম আনুগত্য ফিরিয়ে আনতে তৎপর হয়েছে।
ফলে সার্বিকভাবে বৃহৎ দুই প্রতিপক্ষ ছাড়া অন্য দলগুলো কতো শতাংশ ভোট নিজেদের দিকে টানতে পারবেন তার উপর নির্ভর করছে ক্ষমতার স্থিতি কিংবা ক্ষমতার পরিবর্তন। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট। আর বিজেপি পেয়েছিল ৩৮ শতাংশ ভোট। তবে শেষ লোকসভা নির্বাচনে এই হারের সামান্য অদল-বদল হয়েছে। অন্যদিকে বামফ্রন্ট যদি ৬ শতাংশ এবং কংগ্রেস ৩ শতাংশ ভোটকে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে পারে তবে শেষ পর্যন্ত ফল কী হবে তা জানার জন্য ৪ঠা মে পর্যন্ত কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।