আধুনিক সংবিধানতত্ত্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একটি মৌলিক ও নির্ধারক বিভাজন হলো্ত Constituent Power Ges Constituted Power। এই ধারণার প্রকৃতি ও পারস্পরিক সম্পর্ক যথাযথভাবে অনুধাবন না করলে গণভোটে জনগণের প্রত্যক্ষ রায় কেন কার্যকর হয়নি, তার প্রকৃত সাংবিধানিক তাৎপর্য বোঝা সম্ভব নয়।
Constituent Power (উৎপাদক ক্ষমতা) হলো জনগণের সেই প্রাথমিক, সার্বভৌম ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সংবিধানের জন্ম হয়। এটি কোনো পূর্বস্থিত আইনের অধীন নয়; বরং সকল আইনের উৎস। কোনো প্রতিষ্ঠানের দ্বারা এটি নিয়ন্ত্রিত নয়-বরং প্রতিষ্ঠানসমূহই এর সৃষ্টি। সহজভাবে বললে, এটি সেই ক্ষমতা, যা রাষ্ট্রকে গঠন করে এবং তার নিয়ম নির্ধারণ করে।
অন্যদিকে, Constituted Power (গঠিত ক্ষমতা) হলো সেই ক্ষমতা, যা সংবিধান প্রতিষ্ঠার পর তার নির্ধারিত কাঠামোর ভেতরে কাজ করে। সংসদ, আদালত ও নির্বাহী বিভাগ-সবই এই ক্ষমতার অন্তর্গত। এরা সংবিধান দ্বারা সীমাবদ্ধ এবং নির্দিষ্ট নিয়মের অধীন। তাদের বৈধতা নির্ভর করে সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের উপর। অর্থাৎ, এটি নিয়ম তৈরির ক্ষমতা নয়; বরং নিয়ম মেনে চলার ক্ষমতা।
এই ক্ষমতার সম্পর্ক মৌলিকভাবে একমুখী
Constituent Power creates the constitution; Constituted Power operates within it।
অতএব, জনগণই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উৎস, আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ সেই উৎসেরই কার্যকর রূপমাত্র।
এই সম্পর্কের ভাঙন থেকেই সংকটের সূচনা। যখন গঠিত ক্ষমতা-অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ-জনগণের প্রত্যক্ষ ও সার্বভৌম ইচ্ছার প্রকাশকে (যেমন গণভোটের রায়) অস্বীকার বা অকার্যকর করে, তখন তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং এটি Constituent Power-এর প্রত্যাখ্যান। অর্থাৎ, রাষ্ট্র নিজেই তার সৃষ্টিকারী উৎসকে অস্বীকার করছে। এই অবস্থায় সংকটটি আর আইনি পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি রূপ নেয় গভীর নৈতিক, দার্শনিক ও সার্বভৌমত্বের সংকটে।
বাংলাদেশের সামপ্রতিক গণভোট-সংক্রান্ত বিতর্ককে কেবল আইনি বা রাজনৈতিক মতবিরোধ হিসেবে দেখা হলে তা হবে একটি গুরুতর তাত্ত্বিক ভুল। এখানে যে প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছে, তা কেবল প্রক্রিয়াগত নয়-বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্বগত ভিত্তিকে স্পর্শ করে।
রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস কোথায়?
যখন রাষ্ট্র একদিকে গণভোটকে “ঘটনাক্রমে সিদ্ধ” বলে স্বীকার করে, অথচ অন্যদিকে সেটিকেই আদালতের বিচারাধীন বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন এটি কেবল নীতিগত দ্বিধা নয়; বরং একটি সচেতন দ্বৈততা-যেখানে রাষ্ট্র একই সঙ্গে স্বীকৃতি ও স্থগিতকরণের ভেতর নিজেকে বিভক্ত করে ফেলে।
এই অবস্থান কোনো সাধারণ সাংবিধানিক টানাপড়েন নয়; বরং এটি একটি constitutive fracture&Z একটি মৌলিক বিচ্ছেদ, যেখানে রাষ্ট্র তার উৎস (constituent will) এবং তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ (constituted order)-এর মধ্যে সংযোগ হারিয়ে ফেলে।
এখানে প্রশ্নটি আর কে সঠিক-তা নয়; বরং রাষ্ট্র কি তার বৈধতার ভিত্তির প্রতি অনুগত, নাকি তা থেকে বিচ্যুত হয়ে আত্মবিরোধী কাঠামোতে পরিণত হয়েছে।
এই দ্বৈততা ইঙ্গিত করে যে, রাষ্ট্র এখনো নিশ্চিত নয়-জনগণ কি চূড়ান্ত বৈধতার উৎস, নাকি জনগণের ইচ্ছাকেও বৈধতা পেতে প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের মধ্যদিয়ে যেতে হবে। এই অনিশ্চয়তা কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি রাষ্ট্রের দার্শনিক অবস্থানের সংকট।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানকে কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি ছিল একটি প্রকৃত constituent moment&Z একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যেখানে জনগণ নিজেকে রাষ্ট্র-সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে প্রকাশ করে।
গণ-অভ্যুত্থান তাই কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি সেই বিন্দু, যেখানে জনগণ বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর সীমা অতিক্রম করে সেটিকেই পুনঃনির্ধারণের ক্ষমতা দাবি করে।
কিন্তু এই পড়হংঃরঃঁবহঃ সড়সবহঃ-কে অস্বীকার করা মানে কেবল একটি রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করা নয়; বরং রাষ্ট্রের নিজস্ব জন্ম-উৎসকে অস্বীকার করা। তখন সংবিধান কার্যকর থাকলেও তার নৈতিক ভিত্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। আইন ও প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে, কিন্তু জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে তার সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফলে রাষ্ট্র এক ধরনের legitimacy crisis-এ প্রবেশ করে, যেখানে বাহ্যিক স্থিতিশীলতার আড়ালে আস্থার গভীর সংকট তৈরি হয়।
অতএব প্রশ্নটি আর কেবল গণভোট কার্যকর হয়েছে কি হয়নি-তা নয়; বরং রাষ্ট্র কি তার উৎসের প্রতি অনুগত থাকবে, নাকি তা থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকবে।
এই প্রেক্ষাপটে গণভোটকে কেবল “ঘটনা” বলা একটি গুরুতর তাত্ত্বিক অবমূল্যায়ন। এটি প্রকৃতপক্ষে জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রত্যক্ষ বহিঃপ্রকাশ।
ঘটনাক্রমে ‘‘সিদ্ধ” বলা একটি রাজনৈতিক অর্ধসত্য। কারণ গণভোট কেবল একটি ঘটনা নয়; এটি একটি constitutive প্রক্রিয়া, যা নতুন বৈধতা ও সাংবিধানিক অভিমুখ নির্মাণ করে।
ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও নৈতিক দ্বিচারিতা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একাধিক মুহূর্ত রয়েছে, যেখানে জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাই বৈধতার চূড়ান্ত উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে-এবং সেই স্বীকৃতি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষা করেনি।
১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ এবং ১০ই এপ্রিলের ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ সেই ধারার সর্বোচ্চ উদাহরণ। সেই মুহূর্তে কোনো কার্যকর সংবিধান ছিল না, কোনো আদালতের অনুমোদনও নেয়া হয়নি; বরং জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের ভিত্তিতেই একটি নতুন রাষ্ট্রের বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ, Constituent Power নিজেই নিজেকে বৈধতার উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
একই ধারাবাহিকতা দেখা যায় ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে। ত্রিদলীয় জোটের রূপরেখা প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় বিএনপি প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিল, এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা প্রচলিত সাংবিধানিক ধারার বাইরে গিয়েও গ্রহণযোগ্যতা পায়। তখন “সংবিধানে এর স্থান কোথায়” বা “আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন কিনা”-এই প্রশ্নগুলো ওঠেনি, কারণ একটি মৌলিক সত্য স্বীকৃত হয়েছিল: জনগণের ইচ্ছাই বৈধতার উৎস।
অথচ বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি লক্ষণীয় অসামঞ্জস্য দেখা যায়। গণ-অভ্যুত্থানের পর গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একযোগে আয়োজনের প্রস্তাবের সময়, সেই গণভোটের পক্ষে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকেই “হ্যাঁ” ভোটের আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই একই গণভোটের প্রতি সংশয় বা আপত্তি একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে।
এটি কেবল রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন নয়; বরং নীতিগত ধারাবাহিকতার বিচ্যুতি। যে প্রক্রিয়াকে একদিকে বৈধতার উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, অন্যদিকে সেটিকেই পরবর্তীতে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলে, তা সংশ্লিষ্ট অবস্থানের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে।
অতএব প্রশ্নটি অনিবার্য
যে নীতি ১৯৭১ ও ১৯৯০ সালে বৈধ ছিল, তা ২০২৪ সালে অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায় কীভাবে?
‘আদালতে বিচারাধীন’ বলার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। আদালত সংবিধান থেকে উৎসারিত; আর সংবিধান জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। অতএব আদালত জনগণের ঊর্ধ্বে নয়; বরং সেই সার্বভৌম ইচ্ছারই সীমাবদ্ধ ও বিধিবদ্ধ অভিব্যক্তি। যদি আদালত জনগণের প্রত্যক্ষ রায়কে স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতা দাবি করে, তবে তা নিছক বিচারিক ব্যাখ্যা নয়; বরং একটি লঁৎরংফরপঃরড়হধষ ড়াবৎৎবধপয, যা বিচার বিভাগের সাংবিধানিক সীমারেখা অতিক্রম করে।
এই অবস্থায় প্রশ্নটি আর কেবল আইন ব্যাখ্যার নয়-বরং ক্ষমতার উৎস নির্ধারণের।
বর্তমান রাষ্ট্রীয় অবস্থানে একটি স্পষ্ট দ্বৈততা দেখা যায়:
“গণভোট হয়েছে, তাই এটি সিদ্ধ”,
“বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন”,
“সংবিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে”-
এই তিনটি অবস্থান একত্রে একটি গভীর সাংবিধানিক অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করে, যা একটি dual sovereignty claim-এর জন্ম দেয়। একদিকে জনগণের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, অন্যদিকে সেই সার্বভৌমত্বকেই প্রক্রিয়াগতভাবে স্থগিত রাখা।
এটি এক ধরনের নৈতিক পলায়ন-যেখানে রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না, বরং সিদ্ধান্তকে ক্রমাগত বিলম্বিত করে।
নৈতিক প্রজাতন্ত্র: একটি বিকল্প ভিত্তি
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি সুসংহত নৈতিক-রাজনৈতিক ভিত্তি-যা রাষ্ট্রকে কেবল ক্ষমতার কাঠামো নয়, বরং বৈধতার একটি নৈতিক বিন্যাস হিসেবে পুনর্গঠন করে। এই ভিত্তির নাম হতে পারে নৈতিক প্রজাতন্ত্র (Moral Republic), যেখানে রাষ্ট্রের বৈধতার চূড়ান্ত উৎস জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা।
(১) জনগণের ইচ্ছা- প্রাথমিক বৈধতার উৎস
গণভোট কোনো প্রশাসনিক তথ্য নয়; এটি সার্বভৌম ইচ্ছার প্রত্যক্ষ ও বিধান-সৃষ্টিকারী (constitutive) প্রকাশ।
(২) রাষ্ট্রের ভূমিকা- রূপান্তর, পুনর্বিচার নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের ইচ্ছাকে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপান্তর করা; সেই ইচ্ছাকে পুনর্বিচার, স্থগিত বা প্রতিস্থাপন করা নয়।
(৩) আদালতের সীমা- সাংবিধানিক সংযম
আদালত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার রক্ষক; কিন্তু সার্বভৌম ইচ্ছার বিকল্প বা ঊর্ধ্বতন উৎস নয়।
গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে সংঘটিত গণভোট জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রত্যক্ষ বহিঃপ্রকাশ এবং সেই কারণে রাষ্ট্রের জন্য এটি একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
বাংলাদেশ আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে: একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা, অন্যদিকে জনগণের প্রত্যক্ষ সার্বভৌম ইচ্ছা। এই দ্বৈততা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
রাষ্ট্র হয় জনগণের ইচ্ছাকে স্বীকার করে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সাংবিধানিক রূপান্তর ঘটাবে, নয়তো নিজের বৈধতার ভিত্তিকেই ক্রমশ দুর্বল করে তুলবে।
যে রাষ্ট্র জনগণের রায়কে একই সঙ্গে “সিদ্ধ” এবং “বিচারাধীন” হিসেবে উপস্থাপন করে, সে রাষ্ট্র তার বৈধতার উৎসকে দ্বৈত ভাষার কৌশলে কার্যত অস্বীকার করে।
এর বিপরীতে, যে রাষ্ট্র জনগণের প্রত্যক্ষ ইচ্ছাকে চূড়ান্ত বলে স্বীকার করে এবং তা বিলম্ব ছাড়া আইনি কাঠামোয় রূপ দেয়-সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত নৈতিক প্রজাতন্ত্র।
অতএব, গণভোটের রায়কে স্থগিত, বিলম্বিত বা অস্বীকার করার যে কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে, তা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক সার্বভৌমতার প্রতি অবমাননা এবং প্রজাতন্ত্রের নৈতিকতার মৌল ভিত্তির প্রতি গভীর বিশ্বাসঘাতকতা।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই জনগণের রাষ্ট্র হতে চায়, তবে তাকে একটি মৌলিক নীতি স্বীকার করতে হবে-জনগণের ইচ্ছাই চূড়ান্ত বৈধতার নির্ধারক।
লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
faraizees@gmail.com