ঢাকায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি’র সরকার গঠনের পর আট সপ্তাহের বেশি সময় কেটে গেছে। কিন্তু সম্পর্কের শীতলতা কাটানোর উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি ভারতের দিক থেকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। নীতিগতভাবে ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা দিয়েছে ঠিকই; কিন্তু দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ শুরু করার জন্য ভিসা পরিষেবা এখনো পর্যন্ত স্বাভাবিক করার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা জানা যায় নি। তবে ভারত সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে সক্রিয় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকটের পরিস্থিতিতে ভারত বাংলাদেশের ডিজেল সরবরাহ বৃদ্ধিতে অনুকূল সাড়া দিয়েছে। অবশ্য দুই দেশের মধ্যকার ২০০৭ সালের ডিজেল সরবরাহের চুক্তির বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।
সমপ্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা স্টপ ওভার হিসেবে ভারত সফর করেছেন। এই সফরের ফলাফল নিয়ে ভারতের তরফে কোনো বিবৃতি দেয়া হয় নি। ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে যেভাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও হুমায়ুন কবির নৈশভোজ বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে শুরু করে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে তার কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় নি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রচারিত বিবৃতিতে। দোভালের সঙ্গে খলিলুর রহমানের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। এর আগেও দুজনে নানা সময়ে বৈঠক করেছেন। একই ভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশের উপর আরোপিত বাণিজ্যিক বাধা দূরীকরণে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পিযূষ গোয়েলের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা সেটাও স্পষ্ট জানা যায় নি। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর ঘিরে ফলাফলের একটি ধোঁয়াশাপূর্ণ ছবিই পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অবশ্য ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরতের অনুরোধ জানানোর বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তেমনি গুরুত্ব পেয়েছে ইসলামিক মঞ্চের মুখপাত্র হাদি হত্যার অপরাধীদের ভারত থেকে ফেরত পাওয়ার বিষয়টি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারত সফরের বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় মিডিয়ায় দেয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে মন্তব্য করেছেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ‘ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে’ এগিয়ে যাবে। খলিলুর রহমানের মতে, উভয় পক্ষের স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে চালিত করবে। আর তাই তিনি আস্থা তৈরির জন্য ধৈর্য ধরার কথা বলেছেন।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলার মাধ্যমেই দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রাথমিক সূচক হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে কেনা অপরিশোধিত তেল ভারতে শোধন করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত সেই প্রস্তাবে প্রতিবেশী নীতির কথা ভেবে সাড়া দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা ভারতের স্বার্থেই জরুরি বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্র বিজ্ঞানের এক অধ্যাপক। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগ রয়েছে বিশাল অঙ্কের। ৫০টিরও বেশি প্রকল্প রয়েছে। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে তার অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে এবং ২০২৪ সালে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ও ৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা প্রদান করেছে। এই প্রধান বিনিয়োগগুলোর মধ্যে জ্বালানি খাতে রিলায়েন্স পাওয়ার (৩ বিলিয়ন ডলার) এবং আদানি পাওয়ারের (১.৫ বিলিয়ন ডলার) বড় প্রকল্পগুলো অন্তর্ভুক্ত।
ভারতকে সম্পর্কের স্থবিরতা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা জরুরি বলে মনে হলেও ভারত সুস্পষ্টভাবে ধীরে চলার নীতি নিয়ে চলেছে। ভারতের সামনে বাংলাদেশ নিয়ে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং তিস্তা প্রকল্প নিয়ে তৎপরতা এবং রংপুরে বিমানঘাঁটি তৈরিতে সহায়তার বিষয়গুলো ভারতের কাছে উদ্বেগের। একই ভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে সখ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছিল তা অব্যাহত রয়েছে। এই আবহে জামায়াতের নতুন করে উত্থান নিয়েও ভারত ভাবিত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এগুলোকে মেনে নিয়েই ভারতকে তার পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করতে হবে বলে মনে করেন কূটনৈতিক মহলের একটি অংশ।
অনেকে বাংলাদেশের মানুষের ভারত বিদ্বেষকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও, ভারত বিরোধিতা নতুন কিছু বিষয় নয়। পানি বণ্টন নিয়ে জটিলতা এক্ষেত্রে বড় বাধা বলে মনে করা হচ্ছে। মনে রাখা দরকার, সীমান্তের উভয় পারের মানুষের জীবিকা যৌথ নদীগুলোর প্রবাহের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সেই প্রবাহ প্রাকৃতিক নানা কারণেই এবং উজানে বাঁধ নির্মাণের মতো অবিমৃশ্যকারিতার ফল ভোগ করতে হচ্ছে দুই দেশের বিস্তীর্ণ অংশকে। কিন্তু একটি সহনশীল সমাধান বের করতেই হবে। গঙ্গা পানিচুক্তির নবায়নের ক্ষেত্রেও তার প্রয়োগ হতে হবে।
এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও ভারতকে নানা পদক্ষেপ নিতে হবে। তার একটি বিষয়ে ভারত অনেকটাই নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের শাসক দলের পাশাপাশি জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ককে টেকসই করার লক্ষ্যে তৎপরতা শুরু হয়েছে। সমপ্রতি দিল্লি সফরে তারেক রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিজেপি’র দুই নেতা বিজয় চৌথালিয়া ও শিশির বাজোরিয়া। বিজেপি নেতাদের হাতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি চিঠিও তুলে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন বিজেপি’র তরফে বাংলাদেশ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিশির বাজরিয়া। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের নতুন শাসক দলের সঙ্গে ভারতের শাসক দলের সম্পর্ক গড়ার এই চেষ্টার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে বিজেপিকে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থেই জামায়াতের সঙ্গেও দলীয় স্তরে সম্পর্ক স্থাপন করার পদক্ষেপ নিতে হবে বলে জানিয়েছেন কলকাতার এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
এই আবহে ঢাকায় ভারতের পরবর্তী হাইকমিশনার পদে মুসলিম প্রতিনিধি নিয়োগ নিয়ে আলোচনার যে পূর্বাভাস পাওয়া গেছে তাতে স্পষ্ট হয়েছে, পেশাদার কূটনৈতিক পথে চলার দীর্ঘদিনের রীতি পরিবর্তন করে রাজনৈতিক নিয়োগের মাধ্যমে সম্পর্ককে অন্য মাত্রা দেয়া। বিবিসি’র মতে, ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুরা চরম নির্যাতিত বলে বাংলাদেশে অনেকেই যে কথা বলে থাকেন, সেই ন্যারেটিভ মোকাবিলার একটা চেষ্টা দিল্লির তরফে দেখা যাচ্ছে।