বর্তমান জাতীয় সংসদে যেই বিরল কয়েকটি বিষয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি মতৈক্যে পৌঁছেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখা। এর মাধ্যমে তারা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করলো। যদিও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কিত অনেক অধ্যাদেশ ক্ষমতাসীনেরা নির্বিচারে রহিত করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হলো, এতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কতোটা শক্তিশালী হবে? আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অদৃশ্য করে দিতে নানা অপকৌশলের আশ্রয় নিলেও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেনি (যদিও ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েকদিন আগে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে মন্দ নজির স্থাপন করেছিল)। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত ও এনসিপি মিলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই রাখলো। আইনে বলা হয়েছে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও এর অভিযুক্ত নেতাদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত এই আইন বলবৎ থাকবে।
ইতিহাসে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার মোক্ষম আইনি অস্ত্রটি ব্যবহারের বহু নজির আছে। পাকিস্তান আমলে দীর্ঘ সময় কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। আবার ১৯৫৩ সালে কাদিয়ানি দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর ধর্মের ভিত্তিতে দল করার অনুমতি ছিল না। তদুপরি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়ক ভূমিকা পালনের জন্য মুসলিম লীগ, জামায়াত, পিডিপি ও নেজামে ইসলামকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এসব দল নিষিদ্ধই ছিল।
পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে প্রথমে আইডিএলের নামে জামায়াত রাজনীতি করার সুযোগ পায়। ততদিনে ধর্মীয় দলগুলোর ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। একই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি ও খন্দকার মোশ্তাক আহমদের ডেমোক্রেটিক লীগকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘস্থায়ী ছিল না। দুটো দলই ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।
১৯৮০ সালে জামায়াত নিজের নামে আবির্ভূত হওয়ার পর দলটিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুই দলই একে অপরকে ঠেকাতে জামায়াত ও জাতীয় পার্টিকে পক্ষে নিয়েছে। বিএনপিকে ঠেকাতে আওয়ামী লীগ অন্তত তিনটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ডামি বিরোধী দল করছিল। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে ভোটের হিসাবনিকাশ বদলে যেত এবং জামায়াত প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত নাও হতে পারতো।
আওয়ামী লীগ তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে। অতীতে আরও অনেক দলের ভাগ্যে সেটি ঘটেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে আইন করে নিষিদ্ধ করে ক্ষমতাসীন বিএনপি কতোটা লাভবান হয়েছে। দলের যেসব নেতা হত্যা ও দমনপীড়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের বিচার হওয়া আর দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখা এক কথা নয়। কোনো দল রাজনীতি করতে পারবে কি না সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক জনগণ। তাদের হাতেই বিষয়টি ছেড়ে দেয়া উচিত।
লেখক, গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ আর জামায়াতে ইসলামী সংসদের প্রধান বিরোধী দল-এটা বাংলাদেশের রাজনীতির বড় প্যারাডক্স। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সরকার যদি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে, সেটা হবে পৃথিবীতে দ্বিতীয় উদাহরণ স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়ী হওয়া দলটির এই ভাগ্য বরণ করা। এর আগে ঘানার স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটিকে নিষিদ্ধ করেছিল দেশটির পরবর্তী শাসক।
অন্তর্বর্তী সরকার যখন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল তখন দেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছিল না। সদ্য বিদায়ী ক্ষমতাসীন দলটির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াও ছিল প্রবল। সেই প্রতিক্রিয়া সময়ের ব্যবধানে যে ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল, তার প্রমাণ ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সব দলই আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।
এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার বিধানটি আইনে পরিণত করে বিএনপি এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছে কিনা- সেই প্রশ্নও উঠেছে। এর মাধ্যমে তারা বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপিকে আশ্বস্ত করতে চাইলো যে, তারা আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করবে না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নিজেকে একাত্তরের একমাত্র ধারকবাহক হিসেবেও প্রমাণ করলো।
সমপ্রতি জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা সংক্রান্ত ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’টি হুবহু পাস হয়। এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। অধ্যাদেশের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
এর আগে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কোনো সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিধান ছিল না। তখন বলা ছিল, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে ওই ব্যক্তিকে তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারে বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে। তবে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধনী এনে সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে সংসদে অনুমোদের সুপারিশ করেছিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি রহিত করা হয় এবং ১৬টি পরবর্তী সময়ে আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আনার সুপারিশ করা হয়।
২০২৫ সালের ১১ই মে সন্ত্রাসবিরোধী আইন
সংশোধনে জারি করা অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। তখন সংসদ কার্যকর না থাকায় আইনটি অধিকতর সংশোধন করে আশু ব্যবস্থা নিতে সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদে দেয়া ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করেন। পরে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।
এখানে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকার উভয়ই সূক্ষ্ম কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সংগঠন তথা সত্তাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখানে সত্তা নয়, এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হলো।
ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী লীগ বিএনপি’র ওপর দমনপীড়ন চালিয়েছে। হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গায়েবি মামলায় জেলে পাঠিয়েছে। যারা এসব অপকর্ম করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিলে কেউ আপত্তি করবে না। কিন্তু বিচারের নামে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে মাসের পর মাস কারাগারে আটক রাখায় দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি বাড়বে। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে ডানপন্থিরা লাভবান হবে। আগে তাদের শক্তিশালী বড় দুই দলকে মোকাবিলা করতে হতো, এখন একটিকে করতে হবে। বাংলাদেশে দিনে দিনে ডানপন্থিদের পাল্লা ভারী হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকার যখন সন্ত্রাস দমন আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল, তখন বিএনপি নেতাদের কণ্ঠে ভিন্ন কথা শোনা গেছে। তারা বলেছিলেন, আইন করে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করাকে বিএনপি সমর্থন করে না। ভোটের মাধ্যমেই জনগণ রায় দিক কোনো দল রাজনীতিতে থাকবে কি থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো আওয়ামী লীগকে প্রকাশ্য রাখার ঝুঁকি যেমন অন্তর্বর্তী সরকার নেয়নি, বিএনপি সরকারও নিতে চায় না।
জাতীয় সংসদে এই আইন পাসের পর সাবেক স্পিকার ও আওয়ামী লীগ নেতা শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার হওয়া এবং দ্রুত জামিনে মুক্তি পাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা চলছে।
প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কি বিএনপি আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক সুবিধা দিচ্ছে? এর আগে সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেনও গ্রেপ্তার হওয়ার পর দ্রুত মুক্তি পেয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পরপরই। তাহলে কি বাংলাদেশের মানুষ আরেকটি রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ দেখতে পাচ্ছে? যেকোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক দলে ভাঙা- গড়া বা শুদ্ধি অভিযান অসম্ভব নয়।
কথা হলো আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব রিফাইন্ড বা পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ চান কিনা? দলের নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে মনে হয়, তারা চব্বিশ পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা একেবারেই অনুধাবন করতে পারছেন না। তারা মনে করছেন, অচিরেই বাংলাদেশে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটবে এবং আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতায় এসে যাবে।