পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে এক ভ্রাতৃস্থানীয় সাংবাদিক এবারের নির্বাচন সম্পর্কে একটি জুতসই অভিধা দিয়েছেন। তিনি তার ফেসবুক পেজের লাইভে এবারের নির্বাচনকে ‘নির্ভেজাল’ নির্বাচন বলেছেন। তাই যেই সরকার গঠন করুক না কেন সেই সরকার হবে নির্ভেজাল সরকার। আসলে এবারে পশ্চিমবঙ্গে স্বচ্ছ, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণে নির্বাচন কমিশন যে দক্ষতা দেখিয়েছে তাকে সকলেই কুর্নিশ করেছেন। অথচ এই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন তথা এসআইআর এবং নির্বাচন চলাকালীন পর্যন্ত কয়েকশ’ প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিককে নির্বাচনের কাজ থেকে সরিয়ে দিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ মুক্ত রাখতে চেয়েছেন তা নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকে নানাভাবে সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন নির্বাচন কমিশন ও তার শীর্ষ কর্তা জ্ঞানেশ কুমারকে। রাজ্য জুড়ে তিনি এমন পর্যায়ে অভিযোগের ঝড়কে নিয়ে গিয়েছিলেন যে, সব ঝড় গিয়ে ভোটদানের নজিরবিহীন রেকর্ড তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক অতীতের সবক’টি পঞ্চায়েত থেকে বিধানসভা ও লোকসভার নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা, ভোটে কারচুপি, রিগিং, ভোটারদের ভয় দেখানো এবং মৃত্যুর ঘটনাকে স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছিল রাজ্যের মানুষ। মামলা-মোকদ্দমা হলেও এর থেকে মুক্তির পথ কেউ দেখাতে চান নি। কিন্তু এবার নির্বাচন কমিশন গত ১৫ বছরের নির্বাচনী সহিংসতা ও অন্যান্য অনিয়মের সব দিক নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। তারপরই প্রতিটি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কোনো রকম দ্বিধা না রেখে। সোজা কথায় বলা যায় মেরুদণ্ড সোজা রেখে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা অতীতে দেখা যায় নি। আর তাই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিদলকে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ‘গেট লস্ট’ বলে বের করে দেয়ার মতো দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। তবে এজন্য তাকে বিরোধীদের কাছ থেকে বিজেপি’র অনুচর ও দালাল বিশেষণও শুনতে হয়েছে। এমনকি এবার নির্বাচনের ঠিক আগে গোটা পুলিশ প্রশাসনকে যেভাবে মেরুদণ্ড সোজা রাখতে একের পর এক নির্দেশ দিয়েছেন তাও ছিল অভাবনীয়। আর তার ফলে নির্বাচনের সম্ভাব্য হাঙ্গামাকারী কয়েক হাজার দুষ্কৃতিকে ভোটের আগেই হেফাজতে নেয়া হয়েছিল। ফলে এবারের ভোট যে নির্ভেজাল হয়েছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
ভোট যন্ত্রবন্দি হওয়ার পর আলোচনা চলছে ভোটারদের অভিমুখ নিয়ে। বিশেষ করে মুসলিম ভোটের অভিমুখ কোন দিকে গিয়েছে। জরিপ সংস্থাগুলোর জরিপ যাই জানাক না কেন, স্পষ্ট উত্তর জানা যাবে আগামী ৪ঠা মে সোমবার ভোট গণনা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। তার আগে যেসব গাণিতিক সংখ্যা উঠে এসেছে তাও খুব আকর্ষণীয়। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিতে নাটকীয় বৃদ্ধি দেখা গেছে, যা রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৯০ শতাংশের গণ্ডি পার করেছে। ৮৫টি মুসলিম-অধ্যুষিত আসনে এই বৃদ্ধি ছিল আরও বেশি লক্ষণীয়, যেখানে ভোটার উপস্থিতির হার অন্যবারের তুলনায় ২ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় সারা রাজ্যে প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ মুসলিম ভোটারের নাম বাদ গেলেও মুসলিম-অধ্যুষিত সবক’টি আসনেই ভোটদানের হার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই বিপুল উপস্থিতি কীভাবে কোন দলের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে?
মুসলিম অধ্যুষিত ৮৫টি আসন এমন জেলাগুলোতে অবস্থিত যেখানে জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশেরও বেশি মুসলিম। কয়েক দশক ধরে এই জেলাগুলো কংগ্রেস এবং বামদের দখলে ছিল। তবে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এই ৮৫টি আসনের মধ্যে ৭৫টিতে জয়লাভ করে, যা তাদের পক্ষে সংখ্যালঘু ভোটের একত্রীকরণের ইঙ্গিত দেয়। কংগ্রেস এবং বামেরা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, অন্যদিকে বিজেপি একমাত্র উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং বাকি আসনগুলোর বেশির ভাগ জয়লাভ করে।
তবে এবার কংগ্রেস এককভাবে নির্বাচনে লড়েছে পুরনো জমিদারি উদ্ধারে। বামরাও এবার নতুন উদ্যমে লড়াইয়ে শামিল হয়েছিল। এ ছাড়া ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের বহিষ্কৃত হুমায়ুন কবীরের দলে। মুসলিম আবেগকে উস্কে দিয়ে হুমায়ুন কবীর নির্বাচনের কিছুদিন আগে বাবরি মসজিদ তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন।
মুর্শিদাবাদ এমন একটি জেলা যেখানে জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশেরও বেশি মুসলিম। সম্ভবত এই অঞ্চলের সবচেয়ে বেশি নজরে থাকা জেলা। ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস এই জেলার ২২টি আসনের মধ্যে ২০টিতে জয়লাভ করে। এ বছর এই জেলায় ভোটদানের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরো জেলার মধ্যে রঘুনাথগঞ্জে মুসলিম ভোট সর্বোচ্চ ২০.৫ শতাংশ বৃদ্ধির রেকর্ড করেছে। জঙ্গিপুরে ১৭.৯ শতাংশ, সাগরদীঘিতে ১৬.৪ শতাংশ, সামসেরগঞ্জে ১৬ শতাংশ এবং সুতিতে ১৪.৫ শতাংশ মুসলিম ভোট বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলার প্রতিটি আসনেই ভোটদানের হার বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২১ সালের আগে মালদা এবং উত্তর দিনাজপুর কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি ছিল। এখন মালতিপুরে মৌসুম নূর পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেরায় এবং কংগ্রেস এককভাবে লড়াই করায় এই জেলাগুলো নিয়ে কৌতূহল রয়েছে সকলেরই।
মালদা জেলার রতুয়ায় ভোটদানের হার ১৬.২ শতাংশ, চাচোঁলে ১৫.৩ শতাংশ, মালতিপুরে ১৪.৭ শতাংশ এবং হাবিবপুরে ১৪.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, উত্তর দিনাজপুরের গোয়ালপোখরে ১৯.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পুরো অঞ্চলের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃদ্ধি হিসেবে রেকর্ড করেছে। চাকুলিয়ায় ১৭.৫ শতাংশ, ইসলামপুরে ১৩.৯ শতাংশ এবং করণদীঘিতে ১৩.৪ শতাংশ ভোটদানের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলার ৯টি আসনের সবক’টিতেই ভোটদানের হার ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি হয়েছে।
এসআইআর ভোটার বাতিলের ক্ষেত্রে মুর্শিদাবাদ এবং মালদা শীর্ষ জেলাগুলোর মধ্যে ছিল। মুর্শিদাবাদে ৪,৫৫,১৩৭টি এবং মালদায় ২,৩৯,৩৭৫টি নাম বাদ পড়েছে। তা সত্ত্বেও ভোটদানের হার অনেক আসনে ৯০ শতাংশের বেশি।
বীরভূমেও ভোটদানের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। মুররাইতে এটি ১৩.৩ শতাংশ, রামপুরহাটে ১১ শতাংশ, নলহাটিতে ১০.৭ শতাংশ এবং সুতিতে ১০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। লাভপুর এবং ময়ূরেশ্বরে তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি কম হলেও ইতিবাচক বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। বীরভূমের ১১টি আসনের সবক’টিতেই ভোটদানের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩১টি আসন রয়েছে। সেখানে ভোটদানের হার সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মেটিয়াবুরুজে ভোটদানের হার ১৮ শতাংশ, কসবাতে ১৭.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে কংগ্রেস-বাম জোট থেকে তৃণমূল কংগ্রেস এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) দিকে যে পরিবর্তন ঘটেছিল, তা এক নির্ণায়ক মোড় নিয়েছিল। ৮৫টি মুসলিম-অধ্যুষিত আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে ব্যাপক মুসলিম ঐক্যবদ্ধতা দেখা গিয়েছিল। ফলে কংগ্রেস ও বামেরা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
এবারের নির্বাচনে প্রবণতা একটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দ্বিমেরু লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিযেছে। বিশেষ নিবিড় সংশোধনের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাম বাদ দেয়া সত্ত্বেও রঘুনাথগঞ্জের মতো আসনগুলোতে ৯০ শতাংশেরও বেশি ভোট পড়েছে। মুর্শিদাবাদ ও মালদায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেয়া হলেও এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণের হার কমেনি। বরং, এই জেলাগুলোতে ভোটার উপস্থিতির হার ঐতিহাসিক বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে ৪.৫ লাখেরও বেশি নাম বাদ দেয়া সত্ত্বেও মুর্শিদাবাদের বেশ কয়েকটি আসনে ভোটদানের হার ৯৬ শতাংশের সীমা অতিক্রম করেছে।
মুর্শিদাবাদ ও মালদায় ভোটার নাম বাদ দেয়ার বিষয়টি ২০২৬ সালের নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, ‘এসআইআর ভীতি’-র ফলেই ভোটারদের বিপুল সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করেছে। আর তাই তৃণমূল কংগ্রেস মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এই বিপুল ভোটদানকে তাদের শাসনের বৈধতা এবং পরিচয়ভিত্তিক উদ্বেগের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছে।
তবে বিজেপি রেকর্ড সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতিকে জোরালো সরকারবিরোধী মনোভাব এবং শাসন পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বলে আখ্যা দিয়েছে। মমতার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, ২০১১ সালের থেকেও এবার পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা মানুষের মধ্যে ছিল অনেক বেশি। হিন্দুরা জোটবদ্ধ হয়ে ভোট দিয়েছে এবং মুসলিম ভোটের একটি বড় অংশও বিজেপি’র পক্ষে এসেছে।