রাজনীতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি? যদি দেখা যায় তাহলে কতোটুকু? আর দেখা না গেলে সেটা কেন? ৩৬ জুলাইয়ের স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন কতোটুকু এগিয়ে নিতে পেরেছে রাজনীতিকরা। অন্তর্বর্তী সরকার জুলাইয়ের ফসল। তাদের হাত ধরে জুলাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়েছে নাকি স্বপ্নকে পিষে মেরেছে? অনেক কাঠখড় মাড়িয়ে রাজনীতি আজকের এই অবস্থায় এসেছে। দীর্ঘ প্রায় ষোলো বছর স্বৈরাচারের জাঁতাকলে দেশ পিষ্ট হয়েছে। এ সময় দেশের মানুষ ভুলেই গিয়েছিল রাজনীতির আসল চিত্র। রাজনীতি দেশকে এগিয়ে নিতে পারে। রাজনীতি সম্প্রীতির এক উদাহরণ হতে পারে। সে সময় মানুষ দেখেছে রাজনীতি মানে প্রতিহিংসা। রাজনীতি মানে বিরোধী দলকে দমন। রাজনীতি মানে মানুষের কণ্ঠ চেপে ধরা। নির্বাচনকে নির্বাসনে দেয়া। তামাম দুনিয়ায় বাংলাদেশকে নিষ্ঠুরতম স্বৈরাচারের দেশ হিসেবে পরিচয় করা হয়েছিল। এ অবস্থায় মানুষের আশা-দুরাশায় পর্যবসিত হলো। তখনই একদল ছাত্র মাঠে নামে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে কোটাবিরোধী আন্দোলন দিয়ে শুরু হয় মাঠের আন্দোলন। এ আন্দোলনে ধীরে ধীরে শরিক হন সকল রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষ। অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে দেশ। তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের আক্রোশ গিয়ে পড়ে আন্দোলনের মাঠে। সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয় একের পর এক আন্দোলনকারীকে। পুলিশ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দেশ যখন উত্তাল তখন শেখ হাসিনাসহ তার সভা পরিষদ সব পালিয়ে যায় দেশ ছেড়ে। কেউ কেউ দেশে আত্মগোপনে থাকে। সেদিন ছিল ৫ই আগস্ট। আন্দেলনকারীরা দিয়েছেন ৩৬শে জুলাই নাম। এরপর টানা তিনদিন সরকারবিহীন থাকে দেশ। এ তিনদিন আন্দোলনের সামনে থাকা নেতারা সরকার গঠনে তৎপর হয়। যে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু করেছিলেন তারা অন্তর্বর্তী সরকারে নিজেদের কোটা আগে বুঝে নেয়। এটাই অন্তর্বর্তী সরকারকে পেছনে নিয়ে যায়।
আঠারো মাস তারা ক্ষমতায় থাকলেও তারা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে তেমন কোনো কাজই করেনি। নানা সংশয় দেখা দেয় নির্বাচন নিয়ে। বহু নাটকের পর ঘোষণা আসে নির্বাচনের। ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি এক তৃতীয়াংশ মেজোরিটি পেয়ে সরকার গঠন করে। এক মাস পর বসে সংসদ। প্রথম দিনেই প্রেসিডেন্টের ভাষণের বিরোধিতা করে সংসদ থেকে ওয়াক আউট করে বিরোধী দল। অথচ সরকারে থাকার সময়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া কয়েকজন প্রেসিডেন্টকে অপসারণে কোনো রা করেননি। বরং প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগে বাধ্য করতে যখন বঙ্গভবন ঘেরাও করা হয় তখন তারা সেখানকার কয়েকজনকে ফোন করে অনুরোধ করেন আন্দোলন থেকে সরে আসতে। আর সংসদে গিয়ে বলছেন প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে দিতে। এমন দ্বিচারিতা দেখে দেশের মানুষ অবাকই হন। আর সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোট নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দল ভিন্ন অবস্থান নেয়। এ নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত হয় একাধিকবার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের অনেকগুলো সংসদ গ্রহণ করেছে। আবার বেশক’টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ গ্রহণ করেনি সরকারি দল। যদিও সরকারি দল থেকে বলা হয়েছে এসব অধ্যাদেশ নিয়ে ভবিষ্যতে ব্যাপক আলাপ আলোচনা করে আইনে পরিণত করা হবে। একইসঙ্গে সরকারি দল বারবার বলছে, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন হবে। কোন জুলাই সনদ? যে জুলাই সনদে তারা স্বাক্ষর করেছেন। সংবিধান সংশোধন হবে। বিরোধী দলের কথা হলো- সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কার করতে হবে। উত্তপ্ত অবস্থায়ও একাধিক বিষয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দল অনেক বিষয়ে একমত হয়েছেন। তবে সংসদে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য ছিল মনে রাখার মতো। শান্ত, ধীরস্থির এবং সম্মানের সঙ্গে কথা বলার নতুন এক পথ দেখিয়েছেন তারা। সংসদ উত্তপ্তের মাঝেও আশা জাগিয়েছে। এমনভাবে ভবিষ্যতে সংসদ এগিয়ে গেলে দেশও এগিয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় কথা- বহুদিন পর বাংলাদেশের সংসদ পেয়েছে দু’জন পুরুষ নেতা। সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতা দু’জনই পুরুষ। তাইতো সংসদ অধিবেশনের সমাপ্তি ভাষণে দুই নেতাই দেশকে হৃদয়ে ধারণ করে কথা বলেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- দেশের স্বার্থে আমরা একসঙ্গে কাজ করবো। আর বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন- ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রেখে চলুন এগিয়ে যাই। দুইজনের এ বক্তব্য স্পষ্ট করে অতীত থেকে ভিন্ন হবে আগামীর বাংলাদেশ। তবে সংসদে কয়েকজন সংসদ সদস্যের উস্কানিমূলক বক্তব্য সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই তাদের সমালোচনা করেছেন। এতে সরকারি দলের এমপি যেমন রয়েছেন তেমনি রয়েছেন বিরোধী দলের এমপি। এসব সমালোচনা তাদের আগামীতে সতর্ক হতে সহায়তা করবে বলে বিশ্বাস। আর স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দক্ষ হাতে সংসদ সামলিয়েছেন।
আরেকটি বিষয় দেশবাসীর নজরে এসেছে, তা হলো- বিরোধী দল সংসদে এক কথা বলে এসে বাইরে আবার জনসভা কিংবা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। অন্য কথা বলেছে। সেখানে সরকারকে নানা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কোনো কোনো নেতা। সরকারের দুই মাস যেতে না যেতেই এমন হুঁশিয়ারি সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। এ ছাড়া এমপিদের জন্য উপজেলা পরিষদে অফিস করার সিদ্ধান্ত নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। নানাজনে নানা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন এতে। সংসদ সদস্যরা উপজেলায় বসলে স্থানীয় সরকারের কাজে বাধার সৃষ্টি হবে- এমন কথাও বলছেন কেউ কেউ। তাদের কথা এমপিদের কাজ আইন প্রণয়ন। উপজেলায় তাদের কাজ কি? আবার এক সংসদ সদস্যের গাড়ি দাবির বিষয়টি নিয়েও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে সর্বত্র। অনেকে বলেছেন- এমপিরা গাড়ি ভাড়া বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা পান। তারা জনপ্রতিনিধি।
জনগণের কাছে যেতে হলে তাদের গাড়ি দিয়ে যেতে হবে কেন? আর তারা নির্বাচিত হয়েছেন পাঁচ বছরের জন্য। ওই সংসদ সদস্য সংসদে ইউএনওরা গাড়ি পেলে তারা পাবেন না কেন এমন প্রশ্নও তুলে ধরেছিলেন। এ নিয়েও অনেকে বলেছে ইউএনও’র অনেক উপরে তাদের অবস্থান। ইউএনও’রা চাকরি করছেন। এমপিদের তো চাকরি নয়। তবে সংসদ নেতার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারি দলের কোনো এমপি ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি ও সরকারি প্লট নেবেন না। এ সিদ্ধান্তে ওই এমপি একমত পোষণ করেছেন। তাছাড়া বিষয়টি দেশ জুড়ে মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছে। সংসদে সরকারি দল আর বিরোধী দল বাকবিতণ্ডা হবে এটাই স্বাভাবিক। বিরোধী দলের ওয়াক আউট করাও সংসদীয় রীতির অংশ। এসবের মাঝেও সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে অম্লমধুর আলোচনা এ সংসদকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। এভাবে চললে জুলাইয়ের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন অবশ্যই হবে। সরকারি দলের ভালো কাজকে সমর্থন করা ও বিতর্কিত কাজের যুক্তির সঙ্গে বিরোধিতা করাই হলো বিরোধী দলের কাজ। এ কাজ বিরোধী দল সঠিকভাবেই করতে পারবে এমনটা আঁচ করা যায়। আর সরকারি দলও সকল কাজে বিরোধী দলকে পাশে চায় এমন কথা সংসদ নেতাসহ অনেক সদস্য জোর গলায় বলেছেন। তার উদাহরণও জাতি দেখেছে। জ্বালানি সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত কমিটিকে সমর্থন করে বিরোধী দল থেকে পাঁচজনের নাম দেয়ার কথা সংসদে জানান ডা. শফিকুর রহমান। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে তিনি ধন্যবাদ জানান। অবশ্য এ কমিটির প্রস্তাব বিরোধীদলীয় নেতাই সংসদে তুলেছিলেন। যা প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন।
নির্বাচনের পর প্রথম সংসদ। আর এ সংসদে বেশির ভাগ এমপিই নতুন। তাদের অনেক কিছু শেখার আছে। সংসদীয় রীতিনীতি, বিধিবিধান সম্পর্কে ধীরে ধীরে তারা নিজেদের আয়ত্তে আনবেন। আগামী সংসদ অধিবেশনগুলো অবশ্যই আরও প্রাণবন্ত হবে।