বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে কেবলমাত্র নির্বাচন-পরবর্তী একটি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি একটি রূপান্তরমুখী গণতান্ত্রিক সন্ধিক্ষণ- যেখানে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল এবং সমাজ-তিনটির মধ্যকার সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত ও বিন্যস্ত হচ্ছে। এই সংজ্ঞার স্বচ্ছতা ও বিন্যাসের ভারসাম্য বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতি ও ভবিষ্যতের মসৃণ গতিপথের জন্য জরুরি।
বাংলাদেশের সংকুল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এন্তার পরামর্শ ও প্রেসক্রিপশন দেয়া হচ্ছে নানা ব্যক্তি ও পক্ষের তরফে। বিদেশি সংস্থাগুলোও পর্যবেক্ষণ আর বহিরাগত মূল্যায়ন হাজির করছে। বাংলাদেশকে এসব জ্ঞানদান করার মতলব যে সব সময় লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-নিরপেক্ষ সাধু উদ্যোগ হয়ে থাকে, তা মনে করার কারণ নেই। তবে, বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতির নানামুখী অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের জন্য নিজস্ব বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থের আলোকে সংস্কার, সংঘাত, সমন্বয়ের নতুন পাঠ গ্রহণ করা অবশ্যই জরুরি।
বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় সংঘাত থেকে সমঝোতার নানা দৃষ্টান্ত রয়েছে। কারণ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ কখনোই সরলরৈখিক হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্গঠন, লাতিন আমেরিকার চিলিতে সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন, কিংবা ইন্দোনেশিয়ায় সুহার্তো-পরবর্তী সংস্কার- সব ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ উপাদান লক্ষ্য করা যায়। আর তা হলো, সমন্বয় (পড়ড়ৎফরহধঃরড়হ) ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ (রহপষঁংরাব ফরধষড়মঁব)-এর সমান্তরাল উপস্থিতি।
দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে নেলসন ম্যান্ডেলা প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করে “ঃৎঁঃয ধহফ ৎবপড়হপরষরধঃরড়হ”-এর পথ বেছে নিয়েছিলেন। এতে রাজনৈতিক বৈধতা (ষবমরঃরসধপু) পুনর্গঠিত হয়। চিলিতে সামরিক শাসনের পর গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো একটি “ঢ়ধপঃবফ ঃৎধহংরঃরড়হ” মডেল অনুসরণ করে- যেখানে পুরনো ও নতুন শক্তির মধ্যে একটি ন্যূনতম সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইন্দোনেশিয়ায় আবার বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একযোগে পরিচালিত হয়, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়। এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে একটি মৌলিক শিক্ষা পাওয়া যায়: সংস্কার তখনই টেকসই হয়, যখন তা সমন্বিত, অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।
বাংলাদেশে সংস্কার বনাম স্থিতিশীলতা নিয়ে মতপার্থক্য আড়াল করার উপায় নেই। রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের সংকট লুকানো বিষয় নয়। তবে, ফ্যাসিবাদের আবর্জনা সরিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা সবাই বলছে ও স্বীকার করছে। কিন্তু সংস্কারকে কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাগত অদলবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর রাজনৈতিক আস্থার পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত করাটাই সবচেয়ে জরুরি ও চ্যালেঞ্জিং কাজ।
কেন জরুরি ও চ্যালেঞ্জিং, তার কিছু ইঙ্গিত রয়েছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের তত্ত্বে। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ দুর্বল হলে দ্রুত পরিবর্তন বা সংস্কার অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। একইসঙ্গে সংস্কার বিলম্বিত হলে তা স্থিতিশীলতার প্রতি পক্ষপাতের জন্ম দেয়। এ কথার মানে হলো, ভালো-মন্দ যা ছিল তাকেই গ্রহণ করে চলতে থাকে। এতে পুরনো অনিয়ম, ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতি বদলানোর বদলে গ্রহণ করা হয়। ফলে দ্রুত বা বিলম্বিত বা রাজনৈতিক আস্থাহীন সংস্কার জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ফাঁক বাড়ায়।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের নির্বাচনকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব, দলীয়করণ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস একটি নিম্ন-আস্থার রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়ে ভঙ্গুর কাঠামো তৈরি করেছে। ফলে এখানে সংস্কার ও স্থিতিশীলতার মধ্যে দ্বন্দ্ব নয়, বরং সমন্বয়হীনতার সংকট বিদ্যমান। এই সংকট নিরসনে প্রয়োজন একটি “ংবয়ঁবহপবফ ৎবভড়ৎস ংঃৎধঃবমু”- যেখানে রাজনৈতিক সংলাপ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার একে অপরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে এগোয়। যাতে সংলাপের রাজনীতিকে স্থান দেয়া যায় গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের কেন্দ্রবিন্দুতে।
বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার পক্ষে যে বিএনপিকে সংলাপে বসার আহ্বান জানানো হচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক উত্তরণের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরাসরি সঙ্গতিপূর্ণ। ঔহৃৎমবহ ঐধনবৎসধং-এর ফবষরনবৎধঃরাব ফবসড়পৎধপু ধারণা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তার মতে, গণতন্ত্র কেবল ভোটের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি একটি চলমান আলোচনা প্রক্রিয়া, যেখানে ভিন্নমতকে স্বীকৃতি দিয়ে যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয় চলমান সংলাপের মধ্যদিয়ে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে “রিহহবৎ-ঃধশবং-ধষষ” বা ‘বিজয়ী ক্ষমতাসীনরাই সবকিছু পাবে’ মর্মে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি চলছে, তা ভিন্নমত, বিরোধী কণ্ঠ এবং সংলাপের জায়গাকে সংকুচিত করেছে। ফলে বিরোধী রাজনীতি প্রায়শই রাস্তায় সংঘাতের মাধ্যমে কথা বলতে গিয়ে প্রকাশ পায়। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা দেখায়, এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি “সরহরসঁস পড়হংবহংঁং ভৎধসবড়িৎশ” তৈরি করা প্রয়োজন- যেখানে নির্বাচন পদ্ধতি, বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে ঐকমত্য গড়ে ওঠে। এবং বিতর্ক ও ভিন্নমত রাজনৈতিক বিভাজনের কারণ না হয়ে রাজনৈতিক সুযোগ পরিসর বৃদ্ধি করে ও ঝুঁকি কমায়।
এক্ষেত্রে দলগুলোর মধ্যকার ভেতরের দ্বন্দ্বগুলোও নিরসন করতে হয়। একইভাবে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের সুরাহা না করা হলে তা দ্বিমুখী প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। দার্শনিক ঝরফহবু ঞধৎৎড়-িএর রাজনৈতিক সুযোগ কাঠামো তত্ত্ব অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ বিভাজন কখনো কখনো নতুন রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করে। তবে এটি যদি সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত না হয়, তাহলে তা সংঘাতকে তীব্রতর করতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণে দেখা যায়, রাজনৈতিক বিভাজনকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছিল- যেমন বহুদলীয় নির্বাচন ও বিকেন্দ্রীকরণ। বাংলাদেশেও দলীয় মতপার্থক্যকে যদি প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায়, তাহলে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে। অন্যথায়, এটি রাজনৈতিক অস্থিরতার উৎস হয়ে উঠবে।
তাছাড়া, ন্যায়বিচার বনাম প্রতিশোধের পরিস্থিতিও রাজনৈতিক পরিসর থেকে সরিয়ে দিতে হবে। গণতান্ত্রিক রূপান্তরকালের নৈতিকতাকে অবশ্যই দলীয় সংকীর্ণতাকে বাদ দিয়ে বহুমাত্রিক ও বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। এ কারণে অনেকেই প্রমাণবিহীন মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছেন, যা বৈশ্বিক ঃৎধহংরঃরড়হধষ লঁংঃরপব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দক্ষিণ আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার অনেক দেশে দেখা গেছে- প্রতিশোধমূলক বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক মেরূকরণকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আর প্রতিশোধ থেকে সরে আসলে স্থিতি ও সমপ্রীতি বৃদ্ধি পায়।
আইনবিদ ঔড়যহ জধষিং-এর ন্যায়বিচার তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিশোধমূলক না হয়ে নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হয়। বাংলাদেশে যদি বিচারব্যবস্থা অতীতের মতো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতেই থাকে, তাহলে তা সরকারের বৈধতা ও সমাজের ঐক্যকে দুর্বল করবে। ফলে প্রয়োজন একটি “নধষধহপবফ লঁংঃরপব ধঢ়ঢ়ৎড়ধপয”- যেখানে জবাবদিহিতা ও পুনর্মিলন (ধপপড়ঁহঃধনরষরঃু ধহফ ৎবপড়হপরষরধঃরড়হ) একসঙ্গে অগ্রসর হয়।
অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক বাস্তবতার বিষয়েও উদার মনোভাব আবশ্যক। রাজনীতির স্বার্থেই অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দিতে হয়। বিশেষত, ঐঁসধহ ঝবপঁৎরঃু বা মানবিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে রাজনৈতিক নীতি ও কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হয়। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা দেখায়, অর্থনৈতিক সংকট রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে- যেমন আরব বসন্তের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। তাই, রাজনীতি সর্বাগ্রে মানবিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির মূল বিষয়গুলোর দিকে নজর দেবে, এটাই কাম্য। তবে, বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা আরও জটিল। কারণ এটি একটি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে অবস্থিত, যেখানে ভারত ও চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ও প্রভাবশালী শক্তি। ইধৎৎু ইুঁধহ-এর জবমরড়হধষ ঝবপঁৎরঃু ঈড়সঢ়ষবী ঞযবড়ৎু অনুযায়ী, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক গতিশীলতা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক সম্পর্কের ওপরও নির্ভরশীল, তা বাংলাদেশ ও অন্যান্য প্রতিবেশীদের অনুধাবন করতে হবে।
সমন্বিত গণতন্ত্রের পথে সংস্কার, সংঘাত, সমন্বয়ের নতুন পাঠ গ্রহণ করা বাংলাদেশের জন্য কৌশলমাত্র নয়, বাস্তব অগ্রাধিকার। পর্যবেক্ষণ এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়-বাংলাদেশ এখন একটি “পৎরঃরপধষ লঁহপঃঁৎব”- এ অবস্থান করছে, যেখানে সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করবে। এই প্রেক্ষাপটে তিনটি বিষয় অপরিহার্য: সমন্বিত ও ধাপে ধাপে সংস্কার (পড়ড়ৎফরহধঃবফ ধহফ ংবয়ঁবহপবফ ৎবভড়ৎসং), অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, ন্যায়বিচার ও পুনর্মিলনের ভারসাম্য।
বহু প্রত্যাশিত গণতন্ত্র কেবল প্রতিষ্ঠান নয়, একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতি তখনই পরিপক্ব হয়, যখন ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং অংশীদার হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশ যদি বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে এই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, তাহলে বর্তমান সংকটই একটি নতুন গণতান্ত্রিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। অন্যথায়, সমন্বয়ের অভাবই হয়ে উঠবে ভবিষ্যতের সংঘাত ও অস্থিরতার প্রধান কারণ।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।