কেন এ বছর বিশ্বকাপ নিয়ে যেন কারও মাথাব্যথা নেই?

ডেভিড ওয়ালেস-ওয়েলস | আন্তর্জাতিক
জুন ১৩, ২০২৬
কেন এ বছর বিশ্বকাপ নিয়ে যেন কারও মাথাব্যথা নেই?

একসময় বিশ্বকাপকে নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজন বলা হতো। কিন্তু এখন এটি উত্তর আমেরিকার মাটিতে শুরু হয়েছে। অথচ মনে হচ্ছে তেমন কেউই যেন খুব একটা আগ্রহী নয়। হাজার হাজার টিকিট অবিক্রীত। কয়েক সপ্তাহ আগেও অনেক টিকিট সরকারি মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে পুনরায় বিক্রি হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে প্রত্যাশিত বিমানযাত্রীর চাপ তৈরি হয়নি, আর যেসব হোটেল অতিরিক্ত কয়েক মিলিয়ন ডলার আয়ের আশা করেছিল, তারা এখন দেখছে সেই আয় খুব ধীরগতিতে আসছে। ফিফাকে অনেক হোটেল কক্ষের ব্লক বুকিং বাতিল করতে হয়েছে। একইসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ হিসেবেও বৈশ্বিক বয়কটের আলোচনা চলছে- তার যুদ্ধনীতি, সীমান্তনীতি এবং সাম্রাজ্যবাদী ঔদ্ধত্যের প্রতিবাদে।
 

খেলা শুরু হয়েছে। এখন আগ্রহ নিশ্চয়ই বাড়বে। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, আর্সেনাল ও প্যারিস সেন্ট-জার্মেইয়ের মধ্যকার ক্লাব ফুটবলের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল নিয়ে যে উত্তেজনা ছিল, বিশ্বকাপকে ঘিরে তার চেয়েও কম প্রত্যাশা কাজ করছে। আর আমার মনে হয়, এটি আমাদের খেলাধুলার বাইরেও রাজনীতি ও সংস্কৃতির বৈশ্বিক বাস্তবতা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই উদাসীনতা হয়তো খুব বিস্ময়কর নয়, যদিও টুর্নামেন্টের অধিকাংশ ম্যাচই দেশটির মাটিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দলটি আগের তুলনায় বেশি প্রতিভাবান হলেও বহু বছর ধরেই খুব একটা মুগ্ধ করতে পারেনি। দেশটিতে ফুটবল এখনো বিকাশমান একটি খেলা, প্রধান ক্রীড়ায় পরিণত হয়নি। আর সাম্প্রতিক সময়ে অনেক আমেরিকানই সহজ-সরল দেশপ্রেমের আবেগে খুব বেশি ভাসছেন না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি বিষয়- টিকিটের মূল্য অত্যন্ত চড়া।
 

আমার কাছে আরও বিস্ময়কর মনে হয়েছে বিশ্বের বাকি অংশের নীরবতা। দশকের পর দশক ধরে প্রতি চার বছর পর বিশ্ব যেন এক মাসের জন্য থেমে যেতো। মানুষ এক ধরনের বৈশ্বিক কিন্তু তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ গোত্রভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উৎসবে অংশ নিতো। কিন্তু আজ বিশ্বকাপ আর ক্রীড়া বিশ্বের ওপর সেই আগের মতো প্রভাব বিস্তার করছে না। গত এক যুগে ক্লাব ফুটবল এমন এক বৈশ্বিক উপস্থিতি তৈরি করেছে যে, বিশ্বকাপকে হয়তো পুরোপুরি সরিয়ে দিতে পারেনি, কিন্তু ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের তালিকায় অন্তত তার একেবারে পাশেই গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিবর্তনকে আরও বিস্ময়কর করে তুলেছে আরেকটি বিষয়। বিশ্ব জুড়ে যখন রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের ঢেউ উঁচু হচ্ছে, তখন ধারণা করা স্বাভাবিক ছিল যে ফুটবলেও জাতীয়তাবাদী আবেগ আরও তীব্র হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় রাজনীতির এই যুগে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে বৃহৎ ক্লাবগুলোর প্রতি- যেসব ক্লাবের দল গড়ে ওঠে আন্তর্জাতিক তারকাদের নিয়ে, যাদের একত্র করে বিশাল করপোরেশনগুলো, আর যাদের জার্সিতে থাকে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের স্পন্সরশিপ।
 

নিজ দেশের জার্সি পরে, নিজের দেশের জন্য হৃদয় উজাড় করে খেলা স্থানীয় প্রতিভায় গড়া জাতীয় দলগুলো? অবশ্যই তারা এখনো সমর্থকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জাতীয় দলকে ঘিরে মানুষের আবেগের তীব্রতা দিয়ে আজকের বৈশ্বিক জনপ্রিয়তার যুগকে ব্যাখ্যা করার ভানও আর কেউ করতে পারে না। সম্ভবত এর কারণ হলো, একসময় আন্তর্জাতিক ফুটবল জাতীয়তাবাদী আবেগকে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার দিকে পরিচালিত করতো। কিন্তু বাস্তব জাতীয়তাবাদের যুগে এসে হয়তো সেই আবেগ প্রকাশের জন্য আমাদের আর আলাদা কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন হচ্ছে না।
 

অথবা এর কারণ হতে পারে, যেমন দুই দশক আগে ফ্র?্যাঙ্কলিন ফোয়ের তার বই ‘হাউ সকার এক্সপ্লেইনস দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ লিখেছিলেন, ক্লাব ফুটবলের গোত্রবাদ আসলে জাতীয়তাবাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতো এবং তা নিজেই বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ ছিল। অথবা হয়তো ব্যাখ্যাটি আরও সাধারণ। ক্লাব ফুটবল বছরে প্রায় পুরো সময় জুড়েই চলে। প্রতি সপ্তাহে ম্যাচ হয়, কখনো কখনো সপ্তাহে একাধিকবারো। অন্যদিকে বিশ্বকাপ আসে চার বছরে মাত্র এক মাসের জন্য। একজন সমর্থক আর কতোটা ফুটবল গ্রহণ করতে পারে? আবেগ বিনিয়োগের জন্য মানুষের আসলে কতোগুলো উপলক্ষ প্রয়োজন? কিন্তু তারপরও এই প্রবণতাটি আমার কাছে এক ধরনের ধাঁধার মতো মনে হয়। এর একটি কারণ সম্ভবত এই যে, নতুন জনতাবাদী যুগের শুরুর দিকের একটি বহুল প্রচলিত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল- এই রাজনীতির শক্তি এসেছে সেইসব মানুষের কাছ থেকে, যারা মনে করতেন তাদের দেশের অভিজাত শ্রেণি তাদের পরিত্যাগ করেছে। সম্পদ ও বিশ্বনাগরিক পরিচয়ের জোরে সেই অভিজাতরা যেন এক ধরনের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক জগতে প্রবেশ করেছে- যেভাবে স্থানীয় ফুটবল তারকারা বড় ক্লাবে চলে গিয়ে নিজেদের শেকড়কে পেছনে ফেলে আসে।
আসলে বিশ্বায়ন ক্লাব ফুটবলকে যেভাবে বদলে দিয়েছে, সেটিও অনেকটা এমনই একটি গল্প। ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে ২০০০ ও ২০১০-এর দশকে আরও দ্রুতগতিতে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ও স্পেনের লা লিগার মতো শীর্ষ লীগগুলো এবং রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও বার্সেলোনার মতো ক্লাবগুলো বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের দলে ভেড়াতে শুরু করে। এরপর দ্রুত সম্প্রসারণশীল কেবল ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনের মাধ্যমে সেই বৈশ্বিক প্রতিভাকে আবার বৈশ্বিক দর্শকদের কাছেই বিক্রি করা হয়। ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সফল একটি মডেল। তবে এর সাংস্কৃতিক প্রভাব কিছুটা অদ্ভুতও বটে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নিউ ইয়র্কের উগান্ডায় জন্ম নেয়া এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র আর্সেনালের প্রিমিয়ার লীগ শিরোপা জয়ের উদ্‌যাপন কিংবা চ্যাম্পিয়ন্স লীগে তাদের অগ্রযাত্রা নিয়ে অন্তত ততটাই আবেগপ্রবণ, যতটা তিনি এনবিএ ফাইনালে সাফল্য নিয়ে হয়ে থাকেন। আবার বারস্টুল স্পোর্টসের ম্যাসাচুসেটসে জন্ম নেয়া আলোচিত ব্যক্তিত্ব ডেভ পোর্টনয় মৌসুমের শেষ দিনে টটেনহ্যামের অবনমন এড়ানোর উচ্ছ্বাস উদ্‌যাপন করেন ঠিক সেই আবেগে, যে আবেগে তিনি সাধারণত প্যাট্রিয়টস বা রেড সক্সকে সমর্থন করেন।
 

অর্থাৎ ক্লাব ফুটবলের সমর্থন এখন একেবারেই বৈশ্বিক হয়ে উঠেছে। আর তার মানে অনেক ক্ষেত্রেই এটি বেশ খামখেয়ালি বা আকস্মিক- কোনো ভৌগোলিক বা জাতীয় সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়। তাত্ত্বিকভাবে জাতীয় দলগুলোর আকর্ষণ ভিন্ন হওয়ার কথা। সেখানে সমর্থনের ভিত্তি হওয়ার কথা কম খামখেয়ালি। যারা মনে করেন তাদের দেশ থেকে দেশপ্রেম ও জাতীয় পরিচয়ের বোধ হারিয়ে যাচ্ছে, তাদের কাছে জাতীয় দল সেই অনুভূতি পুনরুদ্ধারের এক কল্পিত মঞ্চ হতে পারতো।
ধরা যাক, মেরিন লা পেনের সময়ে ফরাসি ফুটবল সমর্থকদের সবচেয়ে বেশি আবেগপ্রবণ হওয়ার কথা ছিল ফ্রান্সের জাতীয় দল ‘লে ব্লু’কে ঘিরে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, দলের কৃষ্ণাঙ্গ তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে যখন রাজনৈতিক মন্তব্য করেছেন, তখন অনেকেই তাকে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আবার বৃটেনে ‘রিফর্ম’ রাজনীতির যুগে হয়তো অনেকে ধারণা করেছিলেন, বিশ্বায়নের আগের সময়ের গর্বিত ফুটবল উচ্ছৃঙ্খলতার এক জাতীয় পুনর্জাগরণ দেখা যাবে। টমি রবিনসনের ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ সমাবেশের রাস্তায় হয়তো সেই উগ্র আবেগের দেখা মেলে। কিন্তু ফুটবলের ক্ষেত্রে লন্ডনকে যেন ইংল্যান্ডের জাতীয় দল ‘থ্রি লায়ন্স’-এর চেয়ে আর্সেনালকে নিয়েই বেশি উত্তেজিত দেখা যায়।
এমনকি ওএসিস ব্যান্ডের পুনর্মিলনী সফরও হয়তো জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে বিশ্বকাপের চেয়েও বড় ঘটনা হয়ে উঠতে পারে। 

এমন কেন হচ্ছে?
এর সহজ একটি উত্তর হতে পারে- ক্লাব ফুটবল এত বড় এবং এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে বহু মানুষের কাছে সেটিই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক সময় আন্তর্জাতিক ফুটবলের চেয়েও ক্লাব ফুটবলে খেলার মান বেশি দেখা যায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ২০১৫ সালের ফিফার দুর্নীতি কেলেঙ্কারি এই প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অনেকে অভিযোগ করেন, ফিফার বিতর্কিত সভাপতি সংস্থাটিকে ভুল পথে পরিচালিত করেছেন। আবার রাশিয়া, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো সাম্প্রতিক আয়োজক দেশগুলোও বিশ্বকাপের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় রয়েছে। জাতীয় দলগুলো খুব কম সময় একসঙ্গে খেলে। বিভিন্ন লীগে খেলা ফুটবলাররা হঠাৎ করে সপ্তাহান্তে এসে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অংশ নেয়, তারপর আবার নিজ নিজ ক্লাবে ফিরে যায়। ফলে পুরো আয়োজনটিই যেন কিছুটা অর্থহীন, অতিরিক্ত করপোরেট, ফিকে ও প্রাণহীন বলে মনে হয়। 
তবে আমার মনে হয়, এর পেছনে আরও গভীর কিছু কাজ করছে। ফ্রান্সের ঘটনাটির কথাই ধরা যাক। মেরিন লা পেনের ন্যাশনাল র?্যালি পার্টির উত্থান এবং তা দেশের ভবিষ্যতের জন্য কী অর্থ বহন করতে পারে- এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এর পরপরই তিনি ডানপন্থি ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। খেলোয়াড়রা যখনই রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন, তখনই প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। যেমন মার্কিন উপস্থাপক লরা ইনগ্রাহামের সেই বহুল আলোচিত মন্তব্য- ‘চুপ থাকো, আর ড্রিবল করো’।
অথবা সম্প্রতি রাজনৈতিক সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে পরিচয় করিয়ে দেয়ায় নিউ ইয়র্ক জায়ান্টসের কোয়ার্টারব্যাক জ্যাকসন ডার্টকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের কথাও মনে করা যেতে পারে। কিন্তু এমবাপ্পের ঘটনাটি ছিল আরও জটিল। এখানে জাতীয় দলের সবচেয়ে বড় তারকা বলছিলেন, ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলটির কল্পিত ফ্রান্সে তার মতো মানুষের কোনো জায়গা নেই। আর ওই দলের নেতারা প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে যেন এমবাপ্পের কথাটিকেই সত্য প্রমাণ করলেন। তাকে আরও বেশি করে বিশ্বাসঘাতক অনুপ্রবেশকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হলো- এমন একজন হিসেবে, যিনি নাকি তাদের জাতীয় গর্বের যোগ্য বাহক নন। এ ধরনের দ্বন্দ্ব এখন আর খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ আজকের জাতীয় দলগুলোর খেলোয়াড় তালিকা গড়ে উঠছে বিভিন্ন প্রবাসী জনগোষ্ঠী, সাম্প্রতিক অভিবাসনের ধারায় গড়ে ওঠা সম্প্রদায় এবং বহুমাত্রিক সামাজিক বাস্তবতা থেকে উঠে আসা মানুষদের নিয়ে। ফলে এসব দল ক্রমেই কম সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে উঠছে সেই নির্লজ্জ ডানপন্থি কল্পনার সঙ্গে, যেখানে জাতিকে কেবল ‘রক্ত ও মাটি’র ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এই পরিবর্তনই হয়তো বারাক ওবামার মতো একজন মানুষকে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের জয় উদ্‌যাপন করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
 

কিন্তু যারা জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে আবারো জাতিগত পরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তাদের কাছে একই ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। আর এই বিষয়টি হয়তো আমাদের আরও বৃহত্তর এক বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা দেয়। অর্থাৎ, বৈশ্বিক রাজনীতিতে আমরা যেটিকে জাতীয়তাবাদ বলে চিহ্নিত করি, সেটিকে হয়তো আরও যথাযথভাবে সংকীর্ণ স্থানীয়তাবাদ বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক মানসিকতা হিসেবে বর্ণনা করা যায়। কারণ জনতাবাদীরা অনেক সময় জাতি সম্পর্কে সরাসরি দাবি তোলেন না; বরং তারা দাবি করেন জাতিকে কীভাবে পুনর্গঠন করা উচিত। সাধারণত সেই পুনর্গঠনের লক্ষ্য থাকে কোনো প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শের দিকে ফিরে যাওয়া, যার রূপরেখা প্রকৃত অর্থে জাতীয় নয়, বরং অনেক বেশি স্থানীয় ও সংকীর্ণ।
 

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে বোঝা যায়, বিশ্বায়ন শুধু শিল্পায়নের অবসান, পুঁজি পাচার কিংবা বিশ্বের ধনকুবেরদের রাষ্ট্রহীন জীবনযাত্রা নিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। এটি আরও একটি পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ডানপন্থি রাজনীতির অনেক অনুসারীর কাছেই জাতি নামের ধারণাটিকেই রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের একটি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য একক বলে আর মনে হয় না। যে জাতি একসময় দেশপ্রেম ও গর্বের উৎস ছিল, সেটিই এখন তাদের কাছে ক্ষোভ, হতাশা এবং আফসোসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য এমন নয় যে উদারপন্থিরা আজকের দিনে জাতীয়তাবাদ নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন না। বরং এক অর্থে আমরা সবাই এখন জাতীয়তাবাদ নিয়ে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। আর সম্ভবত সে কারণেই আর্সেনাল কিংবা পিএসজি’র মতো ক্লাবকে সমর্থন করা আজ অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। কারণ, শেষ পর্যন্ত সেই সমর্থনের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নেই। তা মূলত অর্থহীন- আর ঠিক সেই অর্থহীনতাই হয়তো তাকে আরও স্বস্তিদায়ক, আরও নিরাপদ এবং আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

 

 

আন্তর্জাতিক'র অন্যান্য খবর